ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং বিতর্কিত বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ (এসআইআর) বাতিলের দাবিতে দেশটিতে বিক্ষোভ চলছে। এই বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, আগামীকাল শনিবার ককরোচ জনতা পার্টির ‘দিল্লি চলো’ কর্মসূচি ডেকেছে। এই কর্মসূচিকে ঘিরে নরেন্দ্র মোদি সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। মেট্রোস্টেশন বন্ধ ও পুলিশ মোতায়েনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এমনকি দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতিও দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তার জন্য দিল্লিতে নজিরবিহীন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে। তিনি আগে থেকেই জেড প্লাস নিরাপত্তা পেতেন। নতুন করে তার বাসভবন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও এসআইআরকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক সমাজের একাংশের সমর্থন পেয়েছে। অভিনেতা প্রকাশ রাজ, ইউটিউবার ও অধিকারকর্মী ধ্রুব রাঠিসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ছবি: রয়টার্স
বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি পুলিশ
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, আগামীকালের ওই বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে একাধিক বিধিনিষেধ জারি হতে যাচ্ছে।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভের বিষয়ে বাধ্যতামূলকভাবে ১০ দিন আগে জানানোর নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। এ কারণে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
পুলিশ আরও বলেছে, আগের বিক্ষোভের সময়ও কিছু নিয়ম ভাঙার অভিযোগ ছিল। জনসাধারণের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকার কয়েকটি স্থানে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা কার্যকর রয়েছে। এসব বিধিনিষেধ ভাঙলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে পুলিশ।
৫৭টি মেট্রোস্টেশন বন্ধ ঘোষণা
এনডিটিভি জানিয়েছে, ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা সংবেদনশীল এলাকাগুলোর দিকে যেতে পারেন এবং সেখানে ভিড় জমতে পারে–এমন আশঙ্কায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, আজ শুক্রবার রাত ৯টা থেকে সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোর প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট বন্ধ থাকবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে। যাত্রীদের যাত্রা শুরুর আগে মেট্রো চলাচলের সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এনডিটিভি জানিয়েছে, এসব স্টেশনের ওপর দিয়ে চলাচলকারী মেট্রো ট্রেনের সংখ্যাও কমানো হতে পারে। বিধিনিষেধের আওতায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, নয়াদিল্লি, প্যাটেল চক, জনপথ, মান্ডি হাউস, বারাখাম্বা রোড, আইটিও, দিল্লি গেট, খান মার্কেট, লোক কল্যাণ মার্গ, উদ্যোগ ভবন, কাশ্মীরি গেট, হাউজ খাস, আইএনএ ও লাজপত নগর।
কয়েকটি ট্রেন বাতিল
বিক্ষোভের কারণে দিল্লির রেল চলাচলেও প্রভাব পড়েছে। নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলস্টেশনগামী কয়েকটি ট্রেনও বাতিল করা হয়েছে। শনিবার সকাল ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে এসব স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল ট্রেনগুলোর। ট্রেনগুলো যাত্রার শুরুর স্টেশন থেকেই বাতিল করা হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদার
এনডিটিভি জানিয়েছে, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৮ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দিল্লি পুলিশের সহায়তায় কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২২১টি কোম্পানি মোতায়েনের ব্যবস্থা করেছে। এসব বাহিনীতে প্রায় ২৩ হাজার সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচটি নারী সদস্যদের নিয়ে গঠিত আধা সামরিক বাহিনীর কোম্পানিও থাকবে।
দ্য হিন্দু জানিয়েছে, দিল্লিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে অন্তত ৭ হাজার কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) সদস্য আনা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠি থেকে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে সিআরপিএফের ৪০টি কোম্পানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ছত্তিশগড় থেকে আরও ৩০টি কোম্পানিকে দিল্লিতে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। প্রতিটি কোম্পানিতে প্রায় ১০০ জন সদস্য রয়েছেন।
ভারতে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠছে। ছবি: রয়টার্স
নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন স্তরে ব্যারিকেড বসানো হবে। নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া দিল্লির বিভিন্ন স্থানে মুখমণ্ডল শনাক্ত করার ক্যামেরা বসানো হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। বিক্ষোভ চলাকালে উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানাসহ দিল্লির আশপাশের সব রাজ্যকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, এ ছাড়া, বিক্ষোভের সময় আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য দিল্লির বিভিন্ন জেলায় প্রায় ১০টি অস্থায়ী আটককেন্দ্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের মধ্যে বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়াম ও ছত্রসাল স্টেডিয়াম রয়েছে। উত্তর-পশ্চিম দিল্লি, পূর্ব দিল্লি ও নরেলাতেও এ ধরনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
দিল্লিতে প্রবেশের বিভিন্ন পথেও কড়া নজরদারি চালাবে পুলিশ। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্ষোভে অংশ নিতে লোকজনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন–এমন সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শহরের প্রবেশপথেই আটকে দেওয়া বা আটক করা হতে পারে।