বর্তমানে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হলেন জ্ঞানেশ কুমার। নরেন্দ্র মোদি সরকার নতুন আইনের আওতায় নিয়োগ পাওয়া প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার তিনি। সম্প্রতি তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়েছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক ভিডিও বার্তায় ভারতের ছাত্রনেতা নেহা বোরা বলেন, “আপনারা নিশ্চয়ই ধর্মেন্দ্র প্রধানের কথা শুনেছেন। জ্ঞানেশ কুমার, এবার আপনার পালা। আমরা আসছি।”
এর দুই দিন পর দিল্লি, মুম্বাই ও কলকাতাসহ ভারতের বড় শহরগুলোতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যঅগের দাবিতে বিক্ষোভের ঘোষণা দেওয়া হয়।
তবে গতকাল শুক্রবার দিল্লির বিখ্যাত প্রতিবাদ কেন্দ্র ‘যন্তর মন্তরে’ ছাত্র ও নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর পূর্বঘোষিত সমাবেশ রুখে দিয়েছে পুলিশ। পুরো এলাকা ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলার পাশাপাশি সেখান থেকে বেশ কয়েকজন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও অসংখ্য বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা পাইয়ে দিতে কমিশনারদের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। এর জেরেই তার পদত্যাগের দাবি উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটে স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের লেখা এক প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে।
নেহা বোরা এ বছরের জুলাইয়ে ভারতের তরুণদের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। ওই আন্দোলনের মুখে মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদ ছাড়তে হয়েছিল। এবার সেই তরুণদের আন্দোলনের লক্ষ্য হলেন জ্ঞানেশ কুমার। তাদের সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিরোধী দলগুলোও রয়েছে। প্রায় দেড় বছর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হওয়ার পর থেকেই তিনি নানা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন।
কেন এই পদত্যাগের দাবি?
দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেন এবং বিজেপিকে অন্যায্য সুবিধা দেন। এমনকি তাকে নাৎসি জার্মানির গণহত্যার অন্যতম প্রধান সংগঠক অ্যাডলফ আইখম্যানের সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে।
গতকাল থেকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভের সর্বশেষ কারণ হলো দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে লিখিত আপত্তি বা ভিন্নমত নথিভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু তাদের আপত্তি গুরুত্ব পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, তাদের না জানিয়েও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব আপত্তির বিষয় ছিল ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ।
জ্ঞানেশ কুমারই প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার, যাকে মোদি সরকারের করা নতুন আইনের অধীনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই আইনটি সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশ করা আগের নিয়োগব্যবস্থা বদলে দিয়েছে।
নতুন আইনের ফলে সরকার নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা পেয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কাজের জন্য নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষাও দেওয়া হয়েছে।
বিরোধীরা এই আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তবে মামলাটি এখনো খুব বেশি এগোয়নি। পাঁচ বিচারপতির একটি সাংবিধানিক বেঞ্চে শিগগিরই এই মামলার শুনানি শুরু হওয়ার কথা।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিরোধী দলগুলো বলছে, এই প্রতিবেদন তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগকেই জোরালো করেছে। তাদের দাবি, বিজেপি সরকার জ্ঞানেশ কুমারকে ব্যবহার করে নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে প্রভাব বিস্তার করছে, যার শুরু হয় ভোটার তালিকা থেকে।
ওই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পরে ভারতের নির্বাচন কমিশন দাবি করে, কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য অস্বাভাবিক নয়। কমিশনের বক্তব্য, বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু বিষয়ে আপত্তি থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি শেষ পর্যন্ত তিন সদস্যের কমিশনের সম্মতিতেই নেওয়া হয়েছে।
তবে কমিশনের এই বক্তব্যে পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন ভোটার তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআর নামে এই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
দ্য ডিপ্লোম্যাট জানিয়েছে, ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীসহ কয়েকজন বিরোধী নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধির অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ভোট কারচুপি করা হচ্ছে। এ কারণে নির্বাচন কমিশনের ভেতরের এই মতবিরোধকে বিরোধীরা শুধু প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে না। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করা হচ্ছে।
এদিকে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রকাশের দিন সিজেপির নেতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “জ্ঞানেশ, ইট’স ডান ব্রো।”
সিজেপি জ্ঞানেশ কুমারকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের সময় বেঁধে দিয়েছিল। বিরোধী দলগুলোও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানায়। তাদের অভিযোগ, তিনি নির্বাচন কমিশনের অন্য সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করছেন। তবে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ করেননি।
দ্য ডিপ্লোম্যাট জানিয়েছে, এ কারণে আগামী কয়েক দিনে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হওয়ার কথা রয়েছে। কিছু বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেবে সিজেপি, আবার কিছু করবে বিরোধী দলগুলো। গত কয়েক দিন ধরে কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ করেছেন। রাজধানীতে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের সামনেও তারা সমাবেশ করেছেন।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে উত্তর প্রদেশে জ্ঞানেশ কুমারের বাড়ির গেট ও দেয়ালে কংগ্রেসের কয়েকজন কর্মী কালি দিয়ে স্লোগান লিখে দেওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্দোলনের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য জ্ঞানেশ কুমার হলেও দাবি শুধু তার পদত্যাগে সীমাবদ্ধ নয়। সিজেপি ও বিরোধী দলগুলো ভোটার তালিকা সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়াটিই বাতিল করতে চাইছে।
রাহুল গান্ধী বলেন, জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়োগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাই তার কাজ ও ভুলের দায় থেকে প্রধানমন্ত্রীও এড়িয়ে যেতে পারেন না বলে দাবি করেছেন।
বিজেপির সমর্থকদের দাবি, ভোটার তালিকা পরিষ্কার করা সরকারের একটি স্বাভাবিক দায়িত্ব। বিজেপির কয়েকজন নেতা আবার নির্বাচনী সংস্কারে কাজের জন্য জ্ঞানেশ কুমারকে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কারগুলোর একটি দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন।
আইনে জ্ঞানেশ কুমারের সুরক্ষা
দ্য ডিপ্লোম্যাট বলছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের তুলনায় জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানো অনেক কঠিন। বড় কোনো সংকট সামলাতে প্রধানমন্ত্রী চাইলে একজন মন্ত্রীকে পদ থেকে সরিয়েও দিতে পারেন। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সহজে সরানো যায় না। কারণ নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই এই পদকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ভারতের সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিকে যেভাবে সহজে সরানো যায় না, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেও একই ধরনের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, অসদাচরণ বা অক্ষমতার প্রমাণ থাকলেও তাকে সরাতে হলে সংসদের উভয় কক্ষে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাব পাস করতে হবে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রস্তাব সফল হয়নি। এ বছরের শুরুতে সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সভাপতিরা জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর জন্য বিরোধীদের দেওয়া নোটিশও গ্রহণ করেননি।
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ছবি: সংগৃহীত
এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে, মোদি সরকার সুপ্রিম কোর্টের মামলার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করবে। একই সময়ে ক্ষমতাসীন দল জ্ঞানেশ কুমার ও তার নেওয়া ‘সাহসী সিদ্ধান্তের’ পক্ষে জনসমর্থন তৈরির চেষ্টা করতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
অন্যদিকে, সিজেপি, বিভিন্ন শিক্ষার্থী সংগঠন ও তরুণদের সংগঠনগুলো মনে করছে, রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে চাপ তৈরি করা সম্ভব। তবে তারা কতটা দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারবে এবং জ্ঞানেশ কুমারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। এর মধ্যে অক্টোবর মাসে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। তাই এই সময়ে দীর্ঘদিন আন্দোলনের গতি ধরে রাখা তাদের জন্য সহজ হবে না।