পর্ব-৩
হ্যাল ব্র্যান্ডস

সাম্রাজ্যের এই নতুন যুগে লাতিন আমেরিকায় কোনো ইউরোপীয় বা এশীয় সামরিক ঘাঁটি থাকবে না; ওয়াশিংটনের সমুদ্রপারের সব মিত্রজোট তখন মৃত বা ছিন্নভিন্ন। এটিকে বিশ্বের বিভিন্ন অংশের জন্য একগুচ্ছ ‘মনরো ডকট্রিন’ হিসেবে ভাবা যেতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে কিছু প্রভাব বলয় তৈরি হয়েছে অপরাধীদের গোপন চুক্তির মাধ্যমে, যার ক্লাসিক মারাত্মক শক্তি প্রয়োগ করছেন– আর একই সাথে ইউরেশিয়ার সম্মুখভাগের মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে চাপ দিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ট্রাম্পের এই বুড়ো আঙুল দেখানো আসলে ১৯ শতকের মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট রিচার্ড ওলনির সেই ঘোষণার এক ২১ শতকীয় প্রতিধ্বনি, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে ওয়াশিংটন ‘এই মহাদেশে কার্যত সার্বভৌম।’
আমরা এই সম্ভাবনার আভাস পাচ্ছি যে, গোলার্ধীয় আধিপত্য হয়তো একদিন বৈশ্বিক উপস্থিতির পরিপূরক না হয়ে বরং তার স্থান দখল করে নেবে। তবুও ট্রাম্প কোনো সংকীর্ণ গোলার্ধীয় চিন্তাবিদ নন– তিনি একদিকে ডনরো ডকট্রিনের কথা বলেন, আবার অন্যদিকে দূরবর্তী মহাদেশগুলোতে শান্তি চুক্তির জন্য চাপ দেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে চরম উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
সম্ভবত এর কারণ তিনি জানেন যে, কঠোরভাবে বিভক্ত প্রভাব বলয়ের বিশ্ব একটি পরাশক্তির জন্য অত্যন্ত মর্যাদাহানিকর এবং পতনের শামিল হবে। এমন বিশ্বে ইউরেশীয় মিত্রদের সাথে কোনো একতরফা সুবিধাজনক বাণিজ্য চুক্তি থাকবে না যারা মার্কিন সুরক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে থাকে; জাপান বা জার্মানির ডলারের আধিপত্য বজায় রাখার কোনো কারণ থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্র যদি পূর্ব এশিয়ার গতিশীল অর্থনীতি, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ এবং উচ্চ-মূল্যের সাপ্লাই চেইন থেকে ছিটকে পড়ে, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সংঘর্ষে জড়াবে। কারণ হন্ডুরাসের বিনিময়ে তাইওয়ান মোটেও ভালো কোনো বাণিজ্য নয়। বৈশ্বিক লিভারেজ বা শক্তি আসে বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা থেকেই। এবং একটি বলয়-ভিত্তিক ব্যবস্থা যদি মার্কিন ক্ষমতাকে দুর্বল করে, তবে এটি সেই স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করতে পারে যা এর সমর্থকরা মনেপ্রাণে চায়।

তাত্ত্বিকভাবে, প্রভাব বলয়গুলো ছোট দেশগুলোর দাসত্বের বিনিময়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে শান্তি কিনে নেয়– শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো পৃথিবী ভাগ করে নেয় এবং বিশৃঙ্খল উপাদানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। এটা সত্যি যে ওয়াশিংটন যদি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ছেড়ে চলে যায় তবে তাইওয়ান নিয়ে মার্কিন-চীন সংঘাত হবে না। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তির আশা করা ভুল হবে।
জটিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতার কারণে বলয়গুলোতে এই রূপান্তর হবে অত্যন্ত তিক্ত ও সহিংস। দক্ষিণ আমেরিকায় চীনের ডিজিটাল অনুপ্রবেশ এবং অবকাঠামোগত উপস্থিতি নস্যাৎ করতে আমেরিকার প্রচুর জোরজুলুমের প্রয়োজন হবে। বিপরীতভাবে, পূর্ব এশিয়ায় একটি বলয় তৈরি করা চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার শেষ নয়, বরং শুরুও হতে পারে– আমেরিকার নিজের ক্ষেত্রেও কিন্তু গোলার্ধীয় আধিপত্য ছিল বৈশ্বিক হস্তক্ষেপের একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রভাব বলয়গুলো এমনি এমনি বা উপহার হিসেবে পাওয়া যায় না। এগুলোর উৎপত্তি প্রায়শই রক্তে ভেজা থাকে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বৈরাচারীদের তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে চরম নিষ্ঠুরতা, এমনকি গণহত্যার ইতিহাস রয়েছে।

এবং ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তা জেনে, আধিপত্য নিষ্ক্রিয়ভাবে মেনে নেওয়া ছাড়াও অন্যান্য পথ বেছে নিতে পারে। ইউক্রেন রাশিয়ার সাম্রাজ্য থেকে দূরে থাকার জন্য কতটা নির্মমভাবে লড়াই করেছে তা আমরা দেখছি।
জাপানও বেইজিংয়ের কাছে আত্মসমর্পণ এড়াতে একইভাবে লড়াই করতে পারে– অথবা স্রেফ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলতে পারে। এই বিপদটি আমাদের তৃতীয় দৃশ্যপটের দিকে নির্দেশ করে যা আমাদের এই ক্ষয়িষ্ণু ব্যবস্থার পরে আসতে পারে– তা হলো এক কুৎসিত, সহিংস বিশৃঙ্খলা।
এ বছরের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘোষণা করেছিলেন যে, পুরোনো ব্যবস্থার ভেঙে পড়া মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, একসাথে কাজ করে এবং নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে এই দেশগুলো বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর মাঝখানে একটি পথ তৈরি করতে পারে এবং নিজেদের জন্য একটি সহনশীল ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পারে।
এটি আসলে একটি পুরোনো স্বপ্ন। ১৯৭০-এর দশক থেকে পণ্ডিত ও কৌশলবিদরা আশা করে আসছেন যে বিশ্ব ‘শাসক ছাড়াও নিয়ম’ মেনে চলতে পারে– অর্থাৎ মার্কিন নেতৃত্ব চলে যাওয়ার পরও ছোট রাষ্ট্রগুলো মার্কিন-নির্মিত ব্যবস্থার সেরা অংশগুলো কোনোভাবে রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু এটি আসলে একটি অলীক কল্পনা বা মোহ। সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ছাড়া– এবং তাদের আপত্তির মুখে তো নয়ই– কোনো বৈশ্বিক শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
তাই একটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধ বা সাম্রাজ্যের নতুন যুগের সবচেয়ে সম্ভাব্য বিকল্প হলো একটি অরাজক ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। এই দৃশ্যপটে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই একটি ‘রাফ স্টেট’ বা পথভ্রষ্ট রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। ট্রাম্পের ভেতরের অন্ধকার প্রবৃত্তিগুলো একটি নিষ্ঠুর, নিয়ম-ভাঙা পরাশক্তির উত্থানের পূর্বাভাস দেয়। ওয়াশিংটন তখন আক্রমণাত্মক আঞ্চলিক সম্প্রসারণে লিপ্ত হতে পারে।
এটি বলপ্রয়োগ বা জোরজুলুমের মাধ্যমে দুর্বল শক্তির কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ কেড়ে নিতে পারে। এটি তার নির্ভরশীল দেশগুলোর কাছ থেকে আরও বেশি কর বা উপঢৌকন দাবি করতে পারে; এটি ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলের রাজনীতিতে অনুদার পপুলিস্টদের পক্ষে ক্রমাগত হস্তক্ষেপ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র তখন তার বৈশ্বিক ভূমিকাকে পরিত্যাগ না করে বরং তাকে আরও বেশি ক্ষতিকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। এই দৃশ্যপটটি এতটাই ভয়াবহ কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণ এমন এক বিশ্ব তৈরি করে যেখানে তিনটি বৃহৎ শক্তিই লোভী, রাক্ষুসে এবং সংশোধনবাদী হয়ে ওঠে। ছোট শক্তিগুলো, বিশেষ করে ইউরেশিয়ার সংঘাতের সীমানায় থাকা দেশগুলো, তখন চারদিক থেকে চেপে ধরার বিপদে পড়বে।

এমতাবস্থায় ‘স্বনির্ভরতা’– অর্থাৎ মূলত প্রতিটি জাতির নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিজেকেই করা ছাড়া আর কোনো বাস্তবসম্মত পথ থাকবে না। আঞ্চলিক আগ্রাসন, এমনকি রাষ্ট্রের বিলুপ্তি তখন অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে কারণ স্ট্যাটাস কু বা স্থিতাবস্থা রক্ষা করার জন্য কিংবা দুর্বল দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করার জন্য কোনো বৃহৎ শক্তি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে না।
একটি স্বনির্ভর বিশ্ব তাই দেখতে পাবে কীভাবে কিছু অরক্ষিত রাষ্ট্র ধ্বংস, পরাধীন বা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের যুদ্ধ হয়তো আমাদের ফেলে আসা অতীতের কোনো কুৎসিত অনুস্মারক নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যতের একটি আগাম ঝলক মাত্র।
অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখার সেরা গ্যারান্টি হিসেবে চরমভা উদাহরণ হলো অ্যাডলফ হিটলার এবং জোসেফ স্টালিন কর্তৃক পূর্ব ইউরোপের বিভাজন। আজকের কিছু বিশ্লেষক কল্পনা করেন যে শি, ট্রাম্প এবং পুতিনও হয়তো নিজেদের মধ্যে এমন একটি বিশ্ব-বিভাজনকারী চুক্তি করে ফেলবেন। তবে প্রভাব বলয় অবচেতনে বা ধীরে ধীরেও গড়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি তার সদস্যদের জমি কেড়ে নিয়ে ন্যাটোকে ভেঙে দেয়, তবে পশ্চিম গোলার্ধে একটি মার্কিন বলয়ের উত্থান পূর্ব ইউরোপে একটি রুশ বলয়ের উত্থানকে ত্বরান্বিত করতে পারে। যদি চীনের অবিরাম সামরিক প্রস্তুতি জাপান থেকে তাইওয়ান হয়ে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত প্রথম দ্বীপ শৃঙ্খলকে অরক্ষণীয় করে তোলে, তবে পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার না করলেও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর বেইজিংয়ের ছায়াতলে চলে যাবে।
সুতরাং, ওয়াশিংটন যদি গোলার্ধীয় আধিপত্যের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ে এবং ট্রাম্পের মতো এই দৃষ্টিভঙ্গি নেয় যে–মহাসাগরের ওপারের ঘটনা অন্য কারও সমস্যা, তবে একটি বহু-বলয়ের বিশ্বই হবে এর অনিবার্য পরিণতি।
এখনকার অনেক ঘটনা দেখে মনে হয় পৃথিবীটা সেই পথেই চলছে। রাশিয়া এবং চীন বহু বছর ধরেই আঞ্চলিক আধিপত্যের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এখন ট্রাম্প আমেরিকায় ওয়াশিংটনের কর্তৃত্ব কঠোরভাবে প্রয়োগ করছেন–শত্রুভাবাপন্ন শাসকদের জোরপূর্বক অপসারণ করছেন, গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ওপর দাবি জানাচ্ছেন, উন্মুক্ত সমুদ্রে সামরিকীকরণ শুরু করবে, হয়তো অনেকেই পারমাণবিক অস্ত্রের সন্ধান করবে। এরই মধ্যে মার্কিন ক্ষমতার কারণে দীর্ঘকাল ধরে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো বৈরিতিগুলো আবার জ্বলে উঠতে পারে।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো যদি পুনরায় সশস্ত্র হতে শুরু করে এবং একই সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন– হয়তো মার্কিন ও রাশিয়ার সম্মিলিত চাপে– ভেঙে পড়ে, তবে সেই মহাদেশে অতীতে ঘটে যাওয়া চরম অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা প্রতিযোগিতার পুনরাবৃত্তি দেখতে প্রস্তুত হতে হবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচলের স্বাধীনতাকে তখন বিদায় জানাতে হবে। (আগামীকাল সমাপ্য)
কাল পড়বেন: যুক্তরাষ্ট্র কী বিশ্বকে আরও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে?
লেখক: জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক এবং আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো
(এই দীর্ঘ নিবন্ধ মূলত ফরেন পলিসি সাময়িকীর স্প্রিং ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। সেই সূত্রে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।)

সাম্রাজ্যের এই নতুন যুগে লাতিন আমেরিকায় কোনো ইউরোপীয় বা এশীয় সামরিক ঘাঁটি থাকবে না; ওয়াশিংটনের সমুদ্রপারের সব মিত্রজোট তখন মৃত বা ছিন্নভিন্ন। এটিকে বিশ্বের বিভিন্ন অংশের জন্য একগুচ্ছ ‘মনরো ডকট্রিন’ হিসেবে ভাবা যেতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে কিছু প্রভাব বলয় তৈরি হয়েছে অপরাধীদের গোপন চুক্তির মাধ্যমে, যার ক্লাসিক মারাত্মক শক্তি প্রয়োগ করছেন– আর একই সাথে ইউরেশিয়ার সম্মুখভাগের মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে চাপ দিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ট্রাম্পের এই বুড়ো আঙুল দেখানো আসলে ১৯ শতকের মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট রিচার্ড ওলনির সেই ঘোষণার এক ২১ শতকীয় প্রতিধ্বনি, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে ওয়াশিংটন ‘এই মহাদেশে কার্যত সার্বভৌম।’
আমরা এই সম্ভাবনার আভাস পাচ্ছি যে, গোলার্ধীয় আধিপত্য হয়তো একদিন বৈশ্বিক উপস্থিতির পরিপূরক না হয়ে বরং তার স্থান দখল করে নেবে। তবুও ট্রাম্প কোনো সংকীর্ণ গোলার্ধীয় চিন্তাবিদ নন– তিনি একদিকে ডনরো ডকট্রিনের কথা বলেন, আবার অন্যদিকে দূরবর্তী মহাদেশগুলোতে শান্তি চুক্তির জন্য চাপ দেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে চরম উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
সম্ভবত এর কারণ তিনি জানেন যে, কঠোরভাবে বিভক্ত প্রভাব বলয়ের বিশ্ব একটি পরাশক্তির জন্য অত্যন্ত মর্যাদাহানিকর এবং পতনের শামিল হবে। এমন বিশ্বে ইউরেশীয় মিত্রদের সাথে কোনো একতরফা সুবিধাজনক বাণিজ্য চুক্তি থাকবে না যারা মার্কিন সুরক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে থাকে; জাপান বা জার্মানির ডলারের আধিপত্য বজায় রাখার কোনো কারণ থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্র যদি পূর্ব এশিয়ার গতিশীল অর্থনীতি, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ এবং উচ্চ-মূল্যের সাপ্লাই চেইন থেকে ছিটকে পড়ে, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সংঘর্ষে জড়াবে। কারণ হন্ডুরাসের বিনিময়ে তাইওয়ান মোটেও ভালো কোনো বাণিজ্য নয়। বৈশ্বিক লিভারেজ বা শক্তি আসে বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা থেকেই। এবং একটি বলয়-ভিত্তিক ব্যবস্থা যদি মার্কিন ক্ষমতাকে দুর্বল করে, তবে এটি সেই স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করতে পারে যা এর সমর্থকরা মনেপ্রাণে চায়।

তাত্ত্বিকভাবে, প্রভাব বলয়গুলো ছোট দেশগুলোর দাসত্বের বিনিময়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে শান্তি কিনে নেয়– শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো পৃথিবী ভাগ করে নেয় এবং বিশৃঙ্খল উপাদানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। এটা সত্যি যে ওয়াশিংটন যদি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ছেড়ে চলে যায় তবে তাইওয়ান নিয়ে মার্কিন-চীন সংঘাত হবে না। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তির আশা করা ভুল হবে।
জটিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতার কারণে বলয়গুলোতে এই রূপান্তর হবে অত্যন্ত তিক্ত ও সহিংস। দক্ষিণ আমেরিকায় চীনের ডিজিটাল অনুপ্রবেশ এবং অবকাঠামোগত উপস্থিতি নস্যাৎ করতে আমেরিকার প্রচুর জোরজুলুমের প্রয়োজন হবে। বিপরীতভাবে, পূর্ব এশিয়ায় একটি বলয় তৈরি করা চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার শেষ নয়, বরং শুরুও হতে পারে– আমেরিকার নিজের ক্ষেত্রেও কিন্তু গোলার্ধীয় আধিপত্য ছিল বৈশ্বিক হস্তক্ষেপের একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রভাব বলয়গুলো এমনি এমনি বা উপহার হিসেবে পাওয়া যায় না। এগুলোর উৎপত্তি প্রায়শই রক্তে ভেজা থাকে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বৈরাচারীদের তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে চরম নিষ্ঠুরতা, এমনকি গণহত্যার ইতিহাস রয়েছে।

এবং ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তা জেনে, আধিপত্য নিষ্ক্রিয়ভাবে মেনে নেওয়া ছাড়াও অন্যান্য পথ বেছে নিতে পারে। ইউক্রেন রাশিয়ার সাম্রাজ্য থেকে দূরে থাকার জন্য কতটা নির্মমভাবে লড়াই করেছে তা আমরা দেখছি।
জাপানও বেইজিংয়ের কাছে আত্মসমর্পণ এড়াতে একইভাবে লড়াই করতে পারে– অথবা স্রেফ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলতে পারে। এই বিপদটি আমাদের তৃতীয় দৃশ্যপটের দিকে নির্দেশ করে যা আমাদের এই ক্ষয়িষ্ণু ব্যবস্থার পরে আসতে পারে– তা হলো এক কুৎসিত, সহিংস বিশৃঙ্খলা।
এ বছরের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘোষণা করেছিলেন যে, পুরোনো ব্যবস্থার ভেঙে পড়া মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, একসাথে কাজ করে এবং নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে এই দেশগুলো বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর মাঝখানে একটি পথ তৈরি করতে পারে এবং নিজেদের জন্য একটি সহনশীল ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পারে।
এটি আসলে একটি পুরোনো স্বপ্ন। ১৯৭০-এর দশক থেকে পণ্ডিত ও কৌশলবিদরা আশা করে আসছেন যে বিশ্ব ‘শাসক ছাড়াও নিয়ম’ মেনে চলতে পারে– অর্থাৎ মার্কিন নেতৃত্ব চলে যাওয়ার পরও ছোট রাষ্ট্রগুলো মার্কিন-নির্মিত ব্যবস্থার সেরা অংশগুলো কোনোভাবে রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু এটি আসলে একটি অলীক কল্পনা বা মোহ। সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ছাড়া– এবং তাদের আপত্তির মুখে তো নয়ই– কোনো বৈশ্বিক শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
তাই একটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধ বা সাম্রাজ্যের নতুন যুগের সবচেয়ে সম্ভাব্য বিকল্প হলো একটি অরাজক ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। এই দৃশ্যপটে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই একটি ‘রাফ স্টেট’ বা পথভ্রষ্ট রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। ট্রাম্পের ভেতরের অন্ধকার প্রবৃত্তিগুলো একটি নিষ্ঠুর, নিয়ম-ভাঙা পরাশক্তির উত্থানের পূর্বাভাস দেয়। ওয়াশিংটন তখন আক্রমণাত্মক আঞ্চলিক সম্প্রসারণে লিপ্ত হতে পারে।
এটি বলপ্রয়োগ বা জোরজুলুমের মাধ্যমে দুর্বল শক্তির কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ কেড়ে নিতে পারে। এটি তার নির্ভরশীল দেশগুলোর কাছ থেকে আরও বেশি কর বা উপঢৌকন দাবি করতে পারে; এটি ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলের রাজনীতিতে অনুদার পপুলিস্টদের পক্ষে ক্রমাগত হস্তক্ষেপ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র তখন তার বৈশ্বিক ভূমিকাকে পরিত্যাগ না করে বরং তাকে আরও বেশি ক্ষতিকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। এই দৃশ্যপটটি এতটাই ভয়াবহ কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণ এমন এক বিশ্ব তৈরি করে যেখানে তিনটি বৃহৎ শক্তিই লোভী, রাক্ষুসে এবং সংশোধনবাদী হয়ে ওঠে। ছোট শক্তিগুলো, বিশেষ করে ইউরেশিয়ার সংঘাতের সীমানায় থাকা দেশগুলো, তখন চারদিক থেকে চেপে ধরার বিপদে পড়বে।

এমতাবস্থায় ‘স্বনির্ভরতা’– অর্থাৎ মূলত প্রতিটি জাতির নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিজেকেই করা ছাড়া আর কোনো বাস্তবসম্মত পথ থাকবে না। আঞ্চলিক আগ্রাসন, এমনকি রাষ্ট্রের বিলুপ্তি তখন অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে কারণ স্ট্যাটাস কু বা স্থিতাবস্থা রক্ষা করার জন্য কিংবা দুর্বল দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করার জন্য কোনো বৃহৎ শক্তি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে না।
একটি স্বনির্ভর বিশ্ব তাই দেখতে পাবে কীভাবে কিছু অরক্ষিত রাষ্ট্র ধ্বংস, পরাধীন বা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের যুদ্ধ হয়তো আমাদের ফেলে আসা অতীতের কোনো কুৎসিত অনুস্মারক নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যতের একটি আগাম ঝলক মাত্র।
অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখার সেরা গ্যারান্টি হিসেবে চরমভা উদাহরণ হলো অ্যাডলফ হিটলার এবং জোসেফ স্টালিন কর্তৃক পূর্ব ইউরোপের বিভাজন। আজকের কিছু বিশ্লেষক কল্পনা করেন যে শি, ট্রাম্প এবং পুতিনও হয়তো নিজেদের মধ্যে এমন একটি বিশ্ব-বিভাজনকারী চুক্তি করে ফেলবেন। তবে প্রভাব বলয় অবচেতনে বা ধীরে ধীরেও গড়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি তার সদস্যদের জমি কেড়ে নিয়ে ন্যাটোকে ভেঙে দেয়, তবে পশ্চিম গোলার্ধে একটি মার্কিন বলয়ের উত্থান পূর্ব ইউরোপে একটি রুশ বলয়ের উত্থানকে ত্বরান্বিত করতে পারে। যদি চীনের অবিরাম সামরিক প্রস্তুতি জাপান থেকে তাইওয়ান হয়ে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত প্রথম দ্বীপ শৃঙ্খলকে অরক্ষণীয় করে তোলে, তবে পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার না করলেও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর বেইজিংয়ের ছায়াতলে চলে যাবে।
সুতরাং, ওয়াশিংটন যদি গোলার্ধীয় আধিপত্যের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ে এবং ট্রাম্পের মতো এই দৃষ্টিভঙ্গি নেয় যে–মহাসাগরের ওপারের ঘটনা অন্য কারও সমস্যা, তবে একটি বহু-বলয়ের বিশ্বই হবে এর অনিবার্য পরিণতি।
এখনকার অনেক ঘটনা দেখে মনে হয় পৃথিবীটা সেই পথেই চলছে। রাশিয়া এবং চীন বহু বছর ধরেই আঞ্চলিক আধিপত্যের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এখন ট্রাম্প আমেরিকায় ওয়াশিংটনের কর্তৃত্ব কঠোরভাবে প্রয়োগ করছেন–শত্রুভাবাপন্ন শাসকদের জোরপূর্বক অপসারণ করছেন, গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ওপর দাবি জানাচ্ছেন, উন্মুক্ত সমুদ্রে সামরিকীকরণ শুরু করবে, হয়তো অনেকেই পারমাণবিক অস্ত্রের সন্ধান করবে। এরই মধ্যে মার্কিন ক্ষমতার কারণে দীর্ঘকাল ধরে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো বৈরিতিগুলো আবার জ্বলে উঠতে পারে।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো যদি পুনরায় সশস্ত্র হতে শুরু করে এবং একই সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন– হয়তো মার্কিন ও রাশিয়ার সম্মিলিত চাপে– ভেঙে পড়ে, তবে সেই মহাদেশে অতীতে ঘটে যাওয়া চরম অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা প্রতিযোগিতার পুনরাবৃত্তি দেখতে প্রস্তুত হতে হবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচলের স্বাধীনতাকে তখন বিদায় জানাতে হবে। (আগামীকাল সমাপ্য)
কাল পড়বেন: যুক্তরাষ্ট্র কী বিশ্বকে আরও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে?
লেখক: জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক এবং আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো
(এই দীর্ঘ নিবন্ধ মূলত ফরেন পলিসি সাময়িকীর স্প্রিং ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। সেই সূত্রে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।)

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ মূলত আমাদের আবার স্নায়ুযুদ্ধের অতীতের দিকেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। অবশ্য এটি পুরোপুরি অতীতের হুবহু পুনরাবৃত্তি হবে না। কারণ বিশ্বব্যাপী চীনের কাছে অর্থনৈতিক আকর্ষণ এবং জোরজুলুম করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে অনেক ভালো বিকল্প রয়েছে।

১৯৩০ সালে ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি লিখেছিলেন, পুরোনো পৃথিবী মারা যাচ্ছে এবং নতুন পৃথিবী জন্ম নেওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে।” তার মার্ক্সবাদী বিশ্বাস যা-ই হোক না কেন, গ্রামসি আজকের ট্রাম্পের যুগে বেঁচে থাকলে বেশ পরিচিত পরিবেশই খুঁজে পেতেন। এখানে যে পুরোনো পৃথিবীর কথা বলা হচ্ছে, তা হলো দ্বিতীয়

মোদি হিসাব কষছেন যে, মিন অং হ্লাইংয়ের সাথে সম্পর্ক রাখলে ভারতের নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা পাবে। আর মিন অং হ্লাইংয়ের হিসাব হলো, মোদির এই স্বাগত জানানো আগামী ডিসেম্বর এবং জানুয়ারির সাজানো নির্বাচনের পর তার বৈধতা ও স্বীকৃতি পাওয়ার দাবিকে আরও জোরালো করবে। কিন্তু এই দুটি হিসাবই ভুল।