Advertisement Banner

শেষ পর্ব

যুক্তরাষ্ট্র কী বিশ্বকে আরও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে?

হ্যাল ব্র্যান্ডস
হ্যাল ব্র্যান্ডস
যুক্তরাষ্ট্র কী বিশ্বকে আরও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে?
ছবি: ফ্রিপিক থেকে নেওয়া

আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন দেশ এবং এমনকি আধা-রাষ্ট্রীয় বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো পানামা খাল, নর্দার্ন সি রুট থেকে শুরু করে বাব আল-মান্দেব এবং হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট বা জলপথগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। একটি আইনহীন বিশ্বে বাণিজ্য, সম্পদ এবং বাজারের ওপর শারীরিক বা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ অনেক বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়– যা বিজয়ের অন্যান্য উদ্দেশ্যকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এমনকি বিশ্ব যদি শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীলতার কোনো নতুন মডেল খুঁজেও পায়, তবুও দেখা যাবে যে ১৯৪৫-পরবর্তী যুগের যে আকাশচুম্বী অর্জনগুলো ছিল, তা মাঝখানের এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে চিরতরে হারিয়ে গেছে।

এই সবকিছুই একটি দুঃস্বপ্নের মতো শোনায়। কিন্তু ইতিহাসের চোখে দেখলে এটি মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। ১৯০০-এর দশকের শুরুতে ব্রিটিশ আধিপত্যের অবসান কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে একটি নতুন সুন্দর বিশ্ব নিয়ে আসেনি, বরং তা কয়েক দশকের চরম বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসের দুয়ার খুলে দিয়েছিল। ব্রিটিশ আধিপত্যের উত্থানের আগে বহু শতাব্দী ধরে একটি বহু-মেরু ইউরোপ– যা তৎকালীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্র ছিল। ছিল স্বৈরাচার এবং যুদ্ধের এক উর্বর ক্ষেত্র। আমাদের এই বিশ্বাস যে আপেক্ষিক স্থিতিশীলতাই হলো স্বাভাবিক নিয়ম এবং ব্যাপক নিষ্ঠুরতা হলো একটি ব্যতিক্রম। তা আসলে আমেরিকার উদার আধিপত্যের কয়েক প্রজন্মের রেখে যাওয়া এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অবশিষ্টাংশ মাত্র।

সেই আধিপত্য যদি শেষ হয়ে যায় বা তা যদি শিকারী রূপ নেয়, তবে আমাদের এক ভয়াবহ অতীতে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, অরাজকতাকে আমরা যতটা দমন করা হয়েছে বলে মনে করি, তা কখনোই পুরোপুরি দূর হয় না। এবং একটি স্বনির্ভর বা সেলফ-হেল্প বিশ্বের লক্ষণগুলো ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। মার্কিন নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ ইতিমধ্যেই পারমাণবিক কৌতূহলকে উস্কে দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন পাওয়ার আগ্রহ বা সুইডেন ও জার্মানিতে তীব্রতর হতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্রাগার তৈরির বিতর্ক এর বড় প্রমাণ। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির পরিকল্পনা এখন সর্বত্র গুরুত্ব পাচ্ছে।

কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এই প্রথমবার কানাডা নাকি মার্কিন আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। নতুন নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে উঠছে, যা প্রায়শই নতুন উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে। গত বছর স্বাক্ষরিত পাকিস্তান-সৌদি আরব প্রতিরক্ষা চুক্তি ইতিমধ্যেই ভারতীয় উদ্বেগকে উস্কে দিয়েছে; তুরস্ক যদি এতে যোগ দেয় তবে তা ইসরায়েলের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বৈরিতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে আন্দোলিত করছে। পারস্য উপসাগর তো দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতে জর্জরিত। কিন্তু লিবিয়া এবং হর্ন অব আফ্রিকার পরিস্থিতি, যেখানে সম্পদ এবং কৌশলগত রিয়েল এস্টেটের সন্ধানে বেশ কয়েকটি শক্তি প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধে মেতে উঠেছে, তা আগামী দিনের বহু-মেরু বিশৃঙ্খলার একটি স্পষ্ট জানালা হতে পারে।

সেই বিশৃঙ্খলা অবশ্য চিরকাল থাকবে না; শেষ পর্যন্ত একটি নতুন নিয়ম ও অনুক্রমের সাথে এক নতুন ব্যবস্থার জন্ম হবে। কিন্তু প্যাক্স ব্রিটানিকা এবং প্যাক্স আমেরিকার মধ্যকার সেই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবধান ঘুচাতে মানবজাতিকে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং দুটি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল। বিশ্ব যদি শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীলতার একটি নতুন মডেল খুঁজেও পায়, তবুও দেখা যাবে যে ১৯৪৫ পরবর্তী যুগের সেই মহান অর্জনগুলো ততদিনে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

আমাদের এই বর্তমান মুহূর্তটিকে একটি চৌরাস্তা হিসেবে ভাবা যেতে পারে। এটা এমন একটি বিন্দু যেখান থেকে বৈশ্বিক রাজনীতি যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে পারে। অনিশ্চয়তা গভীর কারণ পথগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়। তবে আমরা ইতিমধ্যেই যা জানি তা হলো, পরবর্তী যুগটি গত যুগের চেয়ে অনেক বেশি বিভক্ত এবং বিপজ্জনক হবে। এক দশক আগেও একটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধকে সবচেয়ে খারাপ পরিণতি বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি বিবেচনা করলে, এটাই সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বড় ও সেরা আশা।

একটি দুই-মেরু বিশ্বের দৃশ্যপট অবশ্যই বিপজ্জনক সংকট তৈরি করবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও খণ্ডিত করবে। একটি আত্মবিশ্বাসী, যুদ্ধংদেহী চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য গণতান্ত্রিক ব্লকের বিশাল সম্পদ এবং বিচক্ষণতার প্রয়োজন হবে। কিন্তু সেই দৃশ্যপট অন্তত ‘অর্ধেক পৃথিবী’ রক্ষা করবে, যেমনটা একদা সাবেক মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট ডিন আচেসন লিখেছিলেন। বেইজিংয়ের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রবৃত্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ক্ষমতার একটি সহনশীল ভারসাম্য বজায় রাখতে পর্যাপ্ত গণতান্ত্রিক সহযোগিতার সুযোগ দেবে এটি। অন্য দৃশ্যপটগুলো– যেমন একটি নতুন সাম্রাজ্যের যুগ যা ধারণার চেয়ে অনেক কম স্থিতিশীল ও সুবিধাজনক প্রমাণিত হবে, অথবা বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হওয়া– তা অনেক বেশি কুৎসিত। সেই পথগুলো হয়তো এমন একটি পরাশক্তিকে প্রলুব্ধ করতে পারে যারা প্যাক্স আমেরিকার আগের সময়টা কতটা ভয়াবহ ছিল তা মূলত ভুলে গেছে।

তবে নিশ্চিত থাকুন, সেই পথগুলোর শেষ পরিণতি চরম অন্ধকার। বিড়ম্বনা এটাই যে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের তৈরি এই ব্যবস্থার পতনের পরও এর পরবর্তী পরিণতি কী হবে তা নির্ধারণে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে। কারণ ভালো বা মন্দের জন্য– বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের সিদ্ধান্তই এখনো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। দেশটি যদি ট্রাম্পের সেরা নীতিগুলোকে কাজে লাগাতে পারে, তবে এটি স্বৈরাচারী চাপ প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সম্মিলিত প্রচেষ্টার দিকে একটি সংস্কারকৃত গণতান্ত্রিক সম্প্রদায়কে চালিত করতে পারে।

তবে ওয়াশিংটন যদি সমুদ্রপারের ঘটনাগুলো থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। তাহলে এটি প্রভাব বলয় দখলের এক উন্মাদ লড়াইকে আমন্ত্রণ জানাবে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেই পথভ্রষ্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তবে এটি পুরোনো ব্যবস্থাকে ধ্বংসকারী সংশোধনবাদীদের দলে যোগ দেবে এবং বিশ্বকে একটি নতুন স্বনির্ভর ও অরাজক যুগের দিকে ঠেলে দেবে। ট্রাম্পের এই সারগ্রাহী ও মিশ্র বৈদেশিক নীতির মধ্যে এই তিনটি প্রবণতারই লক্ষণ রয়েছে।

আগামী বছরগুলো এবং মার্কিন নির্বাচনী চক্র নির্ধারণ করবে এই প্রবণতাগুলোর মধ্যে কোনটি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রূপ নেবে, যা পরবর্তীতে পরিবর্তন করা ক্রমান্বয়ে আরও কঠিন হয়ে পড়বে। সম্ভবত গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য মার্কিন অভ্যন্তরীণ সমর্থনের অভাব এটাই দেখায় যে ট্রাম্পের চরমপন্থাগুলো শেষ পর্যন্ত তার নিজের বন্য প্রবৃত্তিগুলোকেই কলঙ্কিত বা অকার্যকর করে তুলবে। তার উত্তরসূরি, তিনি ডেমোক্র্যাট হোন বা রিপাবলিকান, হয়তো আমেরিকার প্রথম বা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ যুগের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে ঐতিহ্যগত বৈদেশিক নীতির ধারণাগুলোর একটি মেলবন্ধন ঘটানোর পথ খুঁজে পাবেন। সেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রেখে যাওয়া বিশৃঙ্খলাকে কিছুটা সংযত করতে পারেন এবং একই সাথে একটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধের জন্য মুক্ত বিশ্বকে পুনর্গঠন করতে তার আরও কার্যকর ও ইতিবাচক উত্তরাধিকারগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন।

বিকল্পভাবে, হয়তো ট্রাম্পের কোনো একটি সামরিক দুঃসাহসিক অভিযান উল্টো ফল বয়ে নিয়ে আসবে। এর পরিনামে, মাগা আন্দোলনের নব্য-বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশ– যারা টাকার কার্লসনের মতো পণ্ডিতদের কাছ থেকে ইঙ্গিত নেয়, তারা জয়ী হবে এবং একটি পরাশক্তি তার নিজের গোলার্ধে গুটিয়ে যাবে। অথবা হতে পারে রিপাবলিকান পার্টি এবং প্রেসিডেন্সিতে ট্রাম্পের প্রকৃত উত্তরসূরি এমন কেউ হবেন যিনি যুক্তি দেবেন যে ট্রাম্প প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট দূর যাননি। ইতিহাসে এটিই প্রথমবার হবে না যে কোনো একটি বিপ্লব শেষ পর্যন্ত তার সবচেয়ে উগ্রবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। পুরোনো ব্যবস্থা মারা যাচ্ছে, একটি বিশ্বজনীন, উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য বিলাপ করে একে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। আগামী দশকে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মিলবে তা হলো, ওয়াশিংটন কি সেই বিশ্বের পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সহনশীল কিছু তৈরি করার চেষ্টা করবে—নাকি বর্তমান অনিশ্চয়তাকে আরও আমূল খারাপ ও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে। (শেষ)

লেখক: জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক এবং আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো।

(এই দীর্ঘ নিবন্ধ মূলত ফরেন পলিসি সাময়িকীর স্প্রিং ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। সেই সূত্রে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।)

সম্পর্কিত