দুই বছর আগে জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবিতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ও রাজপথে একই মিছিলে দেখা গিয়েছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের। রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও তখন তাদের অভিন্ন লক্ষ্য ছিল–সরকারবিরোধী আন্দোলন। দুই বছর পর সেই দৃশ্য পুরোপুরি বদলে গেছে।
জাতীয় নির্বাচনের পর জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতের দূরত্ব যে বেড়েছে, তার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ছাত্ররাজনীতিতে।
বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের শক্ত অবস্থান এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাসে তাদের বিজয়ের পর থেকেই দুই সংগঠনের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিবৃতি ও পাল্টা বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকা বিরোধ এখন দৃশ্যমান হচ্ছে রাজপথে; তাও সংঘাতের মধ্য দিয়ে।
২০২৬ সালের গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির আগের ২৪ ঘণ্টাতেই দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া–সবখানে একই চিত্র।
একসময় যেসব সংগঠন একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়েছিল, এখন তারাই পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। দুই পক্ষই একে অপরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রতিহত করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে প্রকাশ্যেই।
প্রশ্ন উঠছে–জুলাই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির ঠিক আগেই কেন এই উত্তেজনা? এটি কি কেবল বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, নাকি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে নতুন ক্ষমতার লড়াইয়ের বহিঃপ্রকাশ?
একই দিনে চার ক্যাম্পাস
ঘটনার শুরু সোমবার সন্ধ্যায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। জুলাই অভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত “জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই” শীর্ষক প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা ওই সংঘর্ষে একাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। রাত পর্যন্ত দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে থাকায় ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
পরদিন মঙ্গলবার রাজধানীতে পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং উত্তেজনার ঘটনা ঘটে।
গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির আগের দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি রাজনৈতিক মহলেও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
সেই আলোচনা আরও গুরুত্ব পেয়েছে, যখন বিরোধী দল ও সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এই প্রসঙ্গ নিয়ে নিজেদের বক্তব্য দিয়েছেন।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘটিত হামলা ও সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘বিপ্লবী ছাত্র-জনতা সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিহত করবে’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসা এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনে ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
এনসিপির কড়া প্রতিক্রিয়া
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম ফেসবুকে নিজের ভ্যারিফায়েড পেজে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, “ছাত্রদল যত তাড়াতাড়ি ছাত্রলীগ হবে, তাদের পরিণতি তত তাড়াতাড়ি ছাত্রলীগের চেয়েও খারাপ হবে।”
এদিকে প্রেস ক্লাবে এক সেমিনারে এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কোপাত, এখন ছাত্রদল কোপাচ্ছে। আগে যুবলীগ কোপাত, এখন যুবদল কোপাচ্ছে। আমরা এ ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। পরিবর্তন করতে হলে একটাই পথ, সেটা হলো–বিএনপি সরকারের পতন ঘটাতে হবে।”
আরেক আলোচনা সভায় ছাত্রদল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্ত্রাস, হল দখল ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপি আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। সরকারের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “অতীত থেকে শিক্ষা নিন।”
এ বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নুল আবেদিন শিশির চরচাাকে বলেন, “তারেক রহমানের নির্দেশেই ছাত্রদল-যুবদল বিশ্বিবদ্যালয়গুলোর হল দখলের জন্য এসব বর্বরোচিত হামলা করছে। তারেক জিয়ার হুকুম ছাড়া ছাত্রদল এক পাও সামনে আগায় না; এসব পরিকল্পিত হামলা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে (দেওয়া) ডিরেকশনে হচ্ছে এবং মনিটরিং করা হচ্ছে।” তিনি বলেন, “তারেক সাহেবের লক্ষ্য হচ্ছে; ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে হল দখল করে আবারও ক্যাম্পাসগুলোকে টর্চার সেল বা কসাইখানা বানানো।”
আন্দোলনের ‘ক্রেডিট’ নিয়ে নীরব প্রতিযোগিতা
দুই সংগঠনের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে, তা হলো–২০২৪ সালের আন্দোলনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
ছাত্রদলের নেতাদের দাবি, গণঅভ্যুত্থান ছিল সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলন। কিন্তু ছাত্রশিবির আন্দোলনের পুরো কৃতিত্ব নিজেদের বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।
একজন কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা বলেন, “জুলাই আন্দোলনে সবাই ছিল। কিন্তু এখন শিবির এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যেন তারাই একমাত্র নেতৃত্ব দিয়েছে। বাস্তবতা তা নয়।”
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির চরচাকে বলেন, “অভ্যুথান কারও একার ক্রেডিট না। ছাত্রশিবিরের রাজনীতির কৌশলই হচ্ছে গুপ্ত। তারা বিভিন্নভাবে গুজব ও অপপ্রচারের মাধ্যমে তাদের রাজনীতি পরিচালনা করে আসছে। যত ধরনের বিশৃঙ্খলা, তারাই করে আসছে। আমরা তাদেরকে বিশৃঙ্খলা করতে দেব না।” তিনি বলেন, “আমরা কোনো ক্রেডিট নিতে চাই না। দেশের জনগণ জানেন, কারা কী করেছেন।”
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির আরেক নেতা চরচাকে বলেন, “এখানে মূল বিষয় হচ্ছে, ছাত্রশিবির দুই বছর ধরে জুলাই বেচেই খাচ্ছিল। কিন্ত দিন যাচ্ছে জুলাই আবেগও কমে যাচ্ছে। মানুষ আর তাদের ছলনাময়ী কথায় গা ভাসায় না। সর্বদিক দিয়ে তারা এখন কোণঠাসা। কোণঠাসা হয়ে পাগল হয়ে গেছে। পাগলামি করছে। তারই চিত্র দেখতে পাচ্ছেন এখন।”
অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের নেতাদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, আন্দোলনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রদল আবারও পুরনো আধিপত্যের রাজনীতিতে ফিরতে চাইছে।
সংগঠনটির একজন কেন্দ্রীয় নেতা চরচাকে বলেন, “ছাত্রলীগ যেভাবে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করত, ছাত্রদলের একটি অংশও নিজেদের দল সরকার গঠন করার পর সেই সংস্কৃতিতে ফিরতে চাইছে। তারা কোনো সুস্থ ধারার ছাত্রসংগঠন না; তারা বিএনপি সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী। দীর্ঘ সময় কোণঠাসা ছিল, এখন ফর্মে আসতে চাচ্ছে। অভ্যুত্থানের আগে নিজেদের শক্ত অবস্থান বোঝাতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। আমরা সেটা হতে দেব না।”
ছাত্রশিবিরের এই নেতা বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের ক্রেডিট নিয়ে কোনো টালবাহানা হবে না।”
ঢাবিতে সুযোগের অপেক্ষায় উভয়পক্ষ
আজ মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের সংঘর্ষ না হলেও দুই সংগঠনই পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ মিছিল করে। সন্ধ্যা থেকেই বেশ উত্তেজনা লক্ষ্য করা যায় ক্যাম্পাসে।
এদিন সন্ধ্যায় ছাত্রশিবিরের মিছিলে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগান দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্রদলের পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে বিভিন্ন হল থেকে নেতা-কর্মীরা যোগ দেন। সেখানেও শিবিরবিরোধী একাধিক স্লোগান শোনা যায়।
এর কারণ জানতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট ছাত্রদলের প্রায় ২০ জন নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে চরচা। তারা দাবি করছেন, ছাত্রশিবির বিভিন্ন হলে সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তার করেছে এবং সুযোগ পেলে তারা ‘স্বাভাবিক পরিবেশ’ ফিরিয়ে আনবেন।
অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, ছাত্রদল ছাত্রলীগের মতো ক্যাম্পাসে শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি করতে চাইছে। যেকোনো সময় হল দখল করতে সহিংস হতে পারে ছাত্রদল।
তবে উভয় পক্ষেরই দাবি, কেউ আগ বাড়িয়ে কোনো বিশৃঙ্খলতার দিকে এগোবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার দা সূর্যসেন হলের ছাত্রদলের আহ্বায়ক প্রান্ত মাহমুদ হল দখল কিংবা প্রভাব বিস্তারের এই বিরোধ অস্বীকার করে চরচাকে বলেন, “অন্তত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কিছু ঘটবে না। এখানে বিশৃঙ্খলার সুযোগ নেই। ছাত্রশিবির কিংবা ছাত্রদল কেউই সহিংসতায় জড়াবে না। এখানে ডাকসুর কারণে বিভিন্ন হলে শিবিরের আধিপত্য আছে; তবে তা ইনভিজিবল। এখানে প্রশাসন কড়া অবস্থানে আছে। সবাই ভারসাম্য রক্ষা করেই রাজনীতি করছে।”
একই অভিমত দেন এই হলের আরেক ছাত্রদল নেতা। অবশ্য এর কিছুক্ষণ পরই, ওই নেতাকে শহীদ মিনার অভিমুখে এক ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিলে শিবিরের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশনে যাওয়ার স্লোগান দিতে দেখা যায়।
অন্যদিকে, ছাত্রশিবিরের অনেক নেতা-কর্মীকে বিকেল থেকেই টিএসসিসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট গ্রুপে অবস্থান নিতে দেখা যায়। তাদের কাছে জানতে চাইলে তারাও একই জবাব দেন যে, ঢাবিতে কোনো বিরোধ নেই।
এ আলাপের কয়েক ঘণ্টা পরই রাত সাড়ে ৭টার দিকে একটি বিক্ষোভ মিছিলে এই নেতাদের কয়েকজনকে সম্মুখ সারিতে দেখা যায়। যেখানে তারা স্লোগান দিচ্ছিলেন, ‘আমার সোনার বাংলায় সন্ত্রাসীদের ঠাঁই নাই’, ‘ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশন’।
ঢাবির ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই পক্ষই আসলে সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঢাবি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় এক নেতা চরচাকে বলেন, “আমাদের হলগুলোতে ক্যাপাসিটি আছে। শিবির আগে উসকানিমূলক কিছু করুক। এই ক্যাম্পাস গুপ্তদের থেকে মুক্ত করে ফেলব।”
এরই মধ্যে শহীদ মিনারে ছাত্রদলের পূর্বনির্ধারিত এক কর্মসূচিতে যোগ দিতে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা আসেন। তাদের অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের ইউনিটভিত্তিক গ্রুপগুলোতে বলা হয়েছে, ছাত্রশিবির ঢাবিতে হামলা করতে পারে, তাই সবাই যেন প্রস্তুতি নিয়ে আসে।
কথা হয় আফতাবনগর থেকে আসা ছাত্রদলের এক নেতার সঙ্গে। চরচাকে তিনি বলেন, “আমাদের গ্রুপে বলা হয়েছে ছাত্রশিবির রাতে ক্যাম্পাসে গ্যাঞ্জাম করবে। অন্তত রাত ১২টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে থাকতে হবে।”
আফতাবনগর ইউনিট থেকে ৭০ জন কর্মী নিয়ে এসেছেন বলেও জানান এই নেতা।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে কথা হয় ছাত্রশিবিরের ঢাবি ইউনিটের কেন্দ্রীয় এক নেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, “ধৈর্যকে তারা দুর্বলতা বলে মনে করেছে। এখন সময় এসেছে পাল্টা জবাব দেওয়ার। বিভিন্ন জায়গায় ইনশাল্লাহ আমাদের ভাইয়েরা সেই জবাব দিয়েছেও। ঢাবিতেও দেওয়া হবে, যদি কোনো বিশৃঙ্খলা করা হয়। দরকারে আরও একটা অভ্যুত্থান হবে।”
ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান (আবিদ) চরচাকে বলেন, “সন্ত্রাসী কার্যক্রম কারা করছে সেটা দেশবাসী দেখছে। দুটি সংগঠনের মধ্যে কিছু নিয়ে বিরোধ হলে সেটি আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করা যায়। কিন্তু কোথাও ছাত্রদলকে ছাত্রশিবির আক্রমণ করে রক্তাক্ত করলে, সেটা নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতা বা সংশ্লিষ্টরা যদি বিজয় উল্লাস করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে উসকানি দেয়, সেটা খুবই দুঃখজনক। তারই প্রতিক্রিয়া আপনারা দেখছেন।”
বর্ষপূর্তির আগেই কেন উত্তেজনা?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির আগে এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেখানে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একসঙ্গে আন্দোলন করা শক্তিগুলোর বর্ষপূর্তির নানা আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে তারা নিজেরাই সংঘাতে লিপ্ত কেন?
ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ও অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের বর্তমান ও সাবেক একাধিক নেতা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে।
প্রথমত, গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রতিযোগিতা। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির–দুই সংগঠনই মনে করছে, ২০২৪ সালের আন্দোলনে তাদের ভূমিকা যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আন্দোলনের রাজনৈতিক অর্জন ও জনসমর্থনের ‘ক্রেডিট’ কে বেশি পাবে–তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। বর্ষপূর্তিকে ঘিরে সেই প্রতিযোগিতা আরও প্রকাশ্য হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক আধিপত্যের প্রশ্ন সামনে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ডাকসু ও বিভিন্ন ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। ছাত্রদলের একটি অংশের অভিযোগ, নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই প্রভাবকে কেন্দ্র করে হল ও ক্যাম্পাসে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের দাবি, ছাত্রদল পুরনো ধারার আধিপত্যবাদী রাজনীতিতে ফিরে যেতে চাইছে।
তৃতীয়ত, জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণ। বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান আলাদা হওয়ার পর ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। কেন্দ্রীয় রাজনীতির ভাষা ও অবস্থান ক্যাম্পাসে দ্রুত প্রতিফলিত হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ডাকসুর একজন সাবেক ভিপি চরচাকে বলেন, “আওয়ামী লীগ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রলীগের অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যস্থান পূরণে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই আন্দোলনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, ক্যাম্পাসের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা।”
ডাকসুর সাবেক এই নেতা বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি সামনে থাকায় প্রতিটি পক্ষ নিজেদের অবস্থান দৃশ্যমান করার চেষ্টা করছে। ফলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।”
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক এক সাধারণ সম্পাদক চরচাকে বলেন, “যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তাহলে সংঘর্ষের এই ধারাবাহিকতা শুধু কয়েকটি ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও বড় অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”