যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেতে অনেক অভিবাসীকে আগের তুলনায় দ্বিগুণ সময় অপেক্ষা করতে হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। তবে গুরুত্বপূর্ণ খাতের কর্মী ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ পরিবর্তন কার্যকর হবে না।
বার্তা সংস্থা এপির বরাতে বার্তা সংস্থা ইউএনবি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
গতকাল সোমবার ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, কাজের ভিসায় যুক্তরাজ্যে আসা ব্যক্তিদের স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পেতে ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। এই মর্যাদা পাওয়ার পর তারা কাজ ও পড়াশোনা করার পাশাপাশি বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবেন।
তবে বেশি আয় করলে অপেক্ষার সময় কমবে। বছরে অন্তত ৫০ হাজার পাউন্ড (৬৭ হাজার ডলার) আয় করেন এমন ব্যক্তিদের পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। চিকিৎসক, নার্স ও শিক্ষকদের মতো সরকারি খাতের কর্মীরাও পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আর বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ডের বেশি আয় করা অভিবাসীরা তিন বছর পরই এ অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারবেন।
শাবানা মাহমুদ বলেন, ২০২৭ সালে এসব পরিবর্তন কার্যকর করা হবে। অভিবাসীদের ব্রিটেনে অবদানের সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকারকে যুক্ত করার মাধ্যমে অভিবাসনব্যবস্থায় ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনা হবে।
আইনপ্রণেতাদের তিনি বলেন, তার নিজের বাবা-মা প্রায় ৫০ বছর আগে পাকিস্তান থেকে যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন। কারণ, তারা জানতেন, এখানে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ন্যায্যতাকে মূল্য দেওয়া হয়। আমাদের অভিবাসনব্যবস্থা যেন সেই আদর্শের প্রতিফলন ঘটায়, তা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব।
গত বছর শাবানা মাহমুদ যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, নতুন পরিবর্তনগুলো তার তুলনায় কিছুটা নমনীয়। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির কয়েকজন সদস্যও আগের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। মূল পরিকল্পনায় ব্রিটেনের পরিচর্যাকেন্দ্রগুলো সচল রাখার কাজে নিয়োজিত স্বল্পআয়ের অভিবাসী কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেতে ১৫ বছর অপেক্ষা করার কথা বলা হয়েছিল।
তবে পরিচর্যাকর্মীরা বছরে অন্তত ২৫ হাজার পাউন্ড আয় করলে পাঁচ বছর পরই স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার যোগ্য থাকবেন।
যুক্তরাজ্যে বর্তমানে মধ্যম বেতন বছরে প্রায় ৩৯ হাজার পাউন্ড।
ব্রিটেনে কয়েক দশক ধরেই অভিবাসন একটি বিভাজনমূলক রাজনৈতিক ইস্যু। ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়ার পেছনেও এটি ছিল অন্যতম প্রধান কারণ। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অবাধে যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া, প্রতিবছর ছোট নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থীর যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ঘটনাও রাজনৈতিক আলোচনায় বিষয়টিকে গুরুত্বের শীর্ষে রেখেছে।
উগ্র ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজসহ রাজনীতিকেরা ছোট নৌকায় এই পারাপারকে সংকট হিসেবে তুলে ধরেছেন। অভিবাসনবিরোধী কর্মীরাও বিষয়টিকে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করছেন।
ইংলিশ চ্যানেলের বন্দর, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন এমনকি সমুদ্রে বিপদে পড়া মানুষকে উদ্ধারকারী লাইফবোট দাতব্য সংস্থাও উগ্র ডানপন্থী কর্মীদের উৎসাহে পরিচালিত অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির সরকার বলছে, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা জোরদার হওয়ায় চলতি বছর এখন পর্যন্ত ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া মানুষের সংখ্যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে।
শাবানা মাহমুদ বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কর্মসূচির মতো নিরাপদ ও বৈধ পথে যুক্তরাজ্যে আসেননি—এমন শরণার্থীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেতে ২০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর ছোট নৌকায় করে এলে অপেক্ষার সময় হবে ৩০ বছর।
ছোট নৌকায় আসা অভিবাসীরা যুক্তরাজ্যে মোট অভিবাসীর তুলনায় সামান্য অংশ। অধিকাংশ মানুষই ভিসা নিয়ে বৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশ করেন। তা সত্ত্বেও রিফর্ম ইউকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ফলে মূলধারার লেবার ও কনজারভেটিভ—দুই দলই অভিবাসন বিষয়ে নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করেছে।
কনজারভেটিভ পার্টির অভিবাসনবিষয়ক মুখপাত্র ক্রিস ফিলপ বলেন, শাবানা মাহমুদের অবস্থান পরিবর্তনের ফলে সরকারের ব্যয় ১০ বিলিয়ন পাউন্ড বাড়বে। কারণ, তার আগের প্রস্তাবের তুলনায় নতুন ব্যবস্থায় আরও বেশি মানুষ সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন।
লিবারেল ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ম্যাক্স উইলকিনসন বলেন, সরকার কার্যকর একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে কঠোর বক্তব্য দেওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সমালোচকদের মতে, অভিবাসন বৃদ্ধির যে ঢেউয়ের প্রতিক্রিয়ায় এসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তা ইতিমধ্যে অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে নিট অভিবাসন অর্থাৎ দেশটিতে আসা মানুষের সংখ্যা থেকে দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাদ দেওয়ার পর যে হিসাব পাওয়া যায়, তাতে ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়া ১২ মাসে সংখ্যা ৯ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং হংকংয়ে চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ মানুষও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছিলেন।
জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের (ওএনএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়া ১২ মাসে নিট অভিবাসন কমে ৬ লাখ ৪৯ হাজারে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়া ১২ মাসে তা আরও কমে ২ লাখ ৪ হাজারে নেমে আসে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়া ১২ মাসে নিট অভিবাসনের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার।