বাংলাদেশের চাকরির বাজারে বাড়ছে প্রতিযোগিতা। আর ক্রমবর্ধমান এই প্রতিযোগিতার মধ্যে যখন কর্মসংস্থান খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের হাজারো স্নাতক, তেমন পরিস্থিতিতেই চাকরির উপযোগী দক্ষতা গড়ে তুলতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের আটটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন, একটি যৌথ কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন। গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় এসব উদ্যোগ নেওয়া হবে- এ রকমটাই বলা হয়েছে জাপানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়াতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, “কারিগরি দক্ষতা বাড়ানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সরকার চীনের অভিজ্ঞতাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভালো উদ্যোগগুলো কাজে লাগাতে চায়। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ তৈরিতে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, এই সমঝোতা বাস্তবে কার্যকর করা এবং তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা।”
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের স্নাতকদের জন্য চাকরির বাজারে সুযোগ কম। এ কারণে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল এবং এর মধ্য দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে, সেই অসন্তোষের পেছনেও কর্মসংস্থানের সংকট একটি কারণ ছিল।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতি বছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক হয়ে বের হন। তবে তাদের বেশিরভাগই কলা, মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। অথচ কর্মক্ষেত্রে চাহিদা বেশি কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪-২৫ সালের তথ্যপ্রযুক্তি জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক কখনো কম্পিউটার ব্যবহার করেননি।
অনেক স্নাতকই নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। কেউ কেউ কোনো কাজই খুঁজে পাচ্ছেন না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের ৩৬ শতাংশ বেকার। বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নতুন স্নাতক চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন, অথচ তাদের জন্য নতুন চাকরি তৈরি হয় দুই লাখেরও কম।
তবে যারা কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন, তাদের ক্ষেত্রেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার ৪২ শতাংশই ব্যয় হয় কম্পিউটারের প্রাথমিক ব্যবহার শেখার পেছনে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও গাড়ি মেরামতের মতো বিষয়ে হাতে-কলমে কাজ শেখানোর কথা, যাতে শিক্ষার্থীরা চাকরির উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও উন্নত ডিজিটাল সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়ায় এ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষ কর্মীর অভাবে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ৪০ শতাংশ পদ খালি পড়ে আছে। অথচ প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতক চাকরির বাজারে ঢুকছেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বাংলাদেশে তরুণদের বেকারত্বের অন্যতম কারণ হলো শিক্ষার সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার দীর্ঘদিনের অমিল। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো ব্যবহারিক দক্ষতার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে চাকরিদাতারা যে দক্ষতার খোঁজ করেন, প্রয়োজনীয় সে দক্ষতা অনেক স্নাতকেরই থাকে না।”
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন এই সমঝোতা নিয়ে ফাহমিদা খাতুনের বিশ্লেষণ, “চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই অমিল কমাতে সাহায্য করতে পারে। আটটি প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন এবং যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু হলে স্নাতকদের দক্ষতা চাকরিদাতাদের চাহিদার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তবে এ ক্ষেত্রে ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা জরুরি।”
তিন বছর আগে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন হান্নান হোসেন। কিন্তু এখনো চাকরি পাননি। সংসার চালাতে তিনি টিউশন দিচ্ছেন। হান্নান বলেন, “এত প্রতিযোগিতার মধ্যে চাকরি পাওয়া খুব কঠিন। একটি সরকারি চাকরির জন্য হাজার হাজার প্রার্থী প্রতিযোগিতা করেন। গ্রামে থাকা আমার মা-বাবা আমার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। আমি এতদিনেও চাকরি না পাওয়ায় তারা দিন দিন হতাশ হচ্ছেন। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও আমি হতাশ, কী হবে জানি না।”
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১৫টি কারিগরি ও পলিটেকনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর সঙ্গে আরও ২০টি প্রতিষ্ঠান যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই)। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম মনে করেন, চীনের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে তরুণদের উৎপাদন খাতে দক্ষ করে তোলা সম্ভব। গাড়ির যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে খেলনা তৈরির মতো কাজে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে আসন্ন প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের জন্যও কর্মীদের প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
খোরশেদ আলম বলেন, “ফ্যাশন ও ডিজাইনের কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জায়গা নিয়ে নিচ্ছে। চীনে তৈরি পোশাকশিল্পের ফ্যাশন-সংক্রান্ত প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ এখন এআইয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। বাংলাদেশও একই পথে এগোচ্ছে। তাই এখনই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে বেকারত্ব আরও বাড়তে পারে।”
কর্মসংস্থানের এসব সংকট মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের বিদেশে চাকরি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এ লক্ষ্যে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাপানি, আরবি ও ফরাসি ভাষা শেখানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে চীনা ভাষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য, বাংলাদেশের পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চীনের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা। এর মাধ্যমে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে চায় সরকার।
বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর বলেন, “দক্ষতার ঘাটতি ও স্নাতকদের বেকারত্ব কমাতে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে আসতে পারে। তবে শুধু চীনের সহায়তায় দেশে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার দিকে নজর না দিয়ে আরও বেশি শিক্ষার্থীকে চীনে পাঠানো উচিত বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থীকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিতে প্রায় তিন লাখ টাকা বা দুই হাজার ৪০০ ডলার খরচ হয়। এই একই টাকায় একজন শিক্ষার্থীকে দুই থেকে তিন বছরের প্রশিক্ষণের জন্য চীনে পাঠানো সম্ভব।”
ফাহমিদা খাতুনও মনে করেন, সরকারকে শুধু দেশের ভেতরে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর দিকে নজর দিলে চলবে না, “শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব নয়। দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ব্যবসার পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে হবে এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদনশিল্প ও আধুনিক সেবাখাতেরও প্রসার ঘটাতে হবে।”