জার্মানিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অন্যান্য সামাজিক ইস্যুতে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ শনিবার রাতে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। দেশটির একাধিক শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট, বার্লিন, হামবুর্গ ও কোলনে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন কীভাবে রাতের অন্ধকারে সহিংসতার দিকে মোড় নিল, তা জার্মানির সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইউরোনিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার বিকেলে জীবনযাত্রার ব্যয়সহ বিভিন্ন ইস্যুতে তরুণদের বিক্ষোভ শুরু হয়। দিনের বেলায় অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যা নামার পর কয়েকটি শহরে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। কোথাও দোকানের কাচ ভাঙা হয়, কোথাও রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। এসব ঘটনা গত মাসে ফ্রান্সে সংঘটিত সহিংস বিক্ষোভের দৃশ্যের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে।
বার্লিনে রোসেনথালার প্লাৎজ থেকে প্রেঞ্জলাউয়ার বার্গ পর্যন্ত তরুণদের একটি মিছিলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ অংশ নেয় বলে পুলিশের হিসাব। এই কর্মসূচিতে ফিলিস্তিনপন্থী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী বিক্ষোভকারীরাও যোগ দেন। তাদের কেউ কেউ পুঁজিবাদবিরোধী, ইসরায়েলবিরোধী এবং জার্মানিবিরোধী স্লোগান দেন। মিছিলে আতশবাজি ও ফ্লেয়ার ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গড়ায়। বার্লিন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা সামান্য আহত হন এবং প্রায় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডব্রিন্ট এই সহিংসতার জন্য বামপন্থী গোষ্ঠী এবং অভিবাসী বিশৃঙ্খলাকারীদের দায়ী করেছেন। তিনি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভের মূল দাবিগুলো এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য করার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। কারণ, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। আয়োজকেরাও সহিংসতার দায় থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছেন।
হামবুর্গে শনিবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ আগুন জ্বালিয়ে সড়কে অবরোধ তৈরি করে। পুলিশের দিকে পাথর, বোতল ও আতশবাজি নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। হামবুর্গ পুলিশের এক মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু বিশৃঙ্খলাকারী ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের মধ্যে ঢুকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সন্ধ্যায় প্রায় ১২০ জনকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।
ফ্রাঙ্কফুর্টে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। শহরের প্রধান বিপণিবিতান এলাকা জাইল স্ট্রিটে দোকানের জানালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালায় লুটেরারা। একটি অস্ত্রের দোকানেও হামলা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুটি অস্ত্র উদ্ধার করে এবং কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে। সংঘর্ষের সময় পুলিশের দিকে পেট্রলবোমা ও অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপ করা হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এক হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য, বিশেষ ইউনিট, জলকামান, সাঁজোয়া যান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছিল। সেখানে ৩০ জনের বেশি মানুষকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়।
উল্লেখ্য, ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রায় আট হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের অধিকাংশই শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেন। কিন্তু একটি অংশের সহিংস কর্মকাণ্ড পুরো আয়োজনকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। রোববার ভোরের দিকে পরিস্থিতি শান্ত হলেও ব্যাপক সম্পদহানির কথা জানিয়েছে পুলিশ।
কোলনেও বিকেল চারটার দিকে একটি সমাবেশ শেষ করে দেওয়া হয়। কয়েকজন বিক্ষোভকারী মুখ ঢেকে আতশবাজি ফোটানোর পর পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। সংঘর্ষে একজন পুলিশ কর্মকর্তা হাতে আঘাত পান এবং পরে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এ ঘটনায় একাধিক ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ।
এই ঘটনাগুলোর তাৎপর্য শুধু কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ ও লুটপাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের বিক্ষোভের ঢেউ দেখা যাচ্ছে। জার্মানিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি আন্দোলনের অন্যতম প্রেক্ষাপট হলেও বিক্ষোভে পুঁজিবাদ, অভিবাসন, ফিলিস্তিন ও ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানের মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ও যুক্ত হয়েছে। ফলে তরুণদের এই আন্দোলনে একাধিক সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সঙ্গে সহিংসতা ও লুটপাটকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। বিপুলসংখ্যক মানুষ যখন নিজেদের দাবি জানাতে রাস্তায় নামেন, তখন একটি ছোট গোষ্ঠীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুরো আন্দোলনের চরিত্র নির্ধারণ করতে পারে না। একইভাবে আন্দোলনের নামে দোকানপাটে হামলা, সম্পদ ধ্বংস কিংবা পুলিশের ওপর আক্রমণও গ্রহণযোগ্য প্রতিবাদের অংশ হতে পারে না।
জার্মানির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে–তরুণদের মধ্যে জমে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং সেই অসন্তোষকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তেজনা। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য যেমন সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য ও দাবিগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করাও জরুরি। অন্যথায় সহিংসতার ঘটনাই আলোচনার কেন্দ্র দখল করবে, আর যে সামাজিক অসন্তোষ থেকে আন্দোলনের সূচনা, তা আড়ালে থেকে যাবে।