বাংলাদেশের ক্রিকেটে মিরপুরের উইকেট বরাবরই এক ধাঁধার বিষয়। বিশেষ করে স্পিন-নির্ভর কন্ডিশনে প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলার কৌশল হিসেবে এখানে ধীরগতির ও অতিরিক্ত টার্নিং উইকেট ব্যবহারের প্রবণতা প্রায় এক যুগ ধরে চলে আসছে। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে সেই কৌশলই বাংলাদেশের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিপক্ষের স্পিনারদের বিপক্ষে কার্যকর হতে পারেনি বাংলাদেশের ব্যাটিং।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, স্পিন-সহায়ক উইকেট আর র্যাঙ্ক টার্নার কিন্তু এক বিষয় নয়। সাধারণ স্পিন-সহায়ক উইকেটে বিশ্বমানের স্পিনাররা বাড়তি সুবিধা পান। কিন্তু অতিরিক্ত টার্নিং উইকেটে বলের বাউন্স ও টার্ন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ফলে সেখানে খুব ভালো ও সাধারণ মানের স্পিনারের মধ্যে পার্থক্য সেভাবে আর থাকে না। এমন উইকেটে স্রেফ ঠিক জায়গায় ধারাবাহিকভাবে বল করে যেতে পারলেই ব্যাটসম্যানদের বিপদে ফেলা সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ২০১৫ সালে ভারতের মাটিতে দলটির বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার পার্ট-টাইম স্পিনার ডিন এলগার চার উইকেট নিয়েছিলেন এমন এক উইকেটে, যেখানে বলের অস্বাভাবিক আচরণ ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দুই বছর বাদে ভারতের পুনেতে অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি স্পিনার স্টিভ ও’কিফ ১২ উইকেট নিয়ে ভারতকে একাই ধসিয়ে দিয়েছিলেন।
এলগার ওই ম্যাচের আগে ও পরে যেমন বল হাতে কিছুই করতে পারেননি, তেমনই ও’কিফের ক্যারিয়ারেও এরপর বলার মতো আর অর্জন ছিল না। কারণটা খুব সরল। এই দুজন একটানা একই জায়গায় বল করে গেছেন, আর বাকি কাজ করে দিয়েছিল উইকেটের অস্বাভাবিকতা।
দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন রোস্টন চেজ। ছবি: বিসিবি
মিরপুর টেস্টেও একই চিত্র দেখা গেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকান ও অফ স্পিনার রোস্টন চেজ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে কার্যকর হয়েছেন মূলত সঠিক জায়গায় বল ফেলেই। তাদের বোলিংয়ে যে অসাধারণ টার্ন বা বিশেষ কোনো বৈচিত্র্য ছিল, এমন নয়। কেবল উইকেটের সহায়তা কাজে লাগিয়ে ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট জায়গায় বল ফেলেই তারা বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে ফেলে ম্যাচে ১৬ উইকেট নিয়েছেন।
হয়তো বিসিবি ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াকে মিরপুরে স্পিনে হারানোর মন্ত্রে এখনো বিশ্বাসী বলেই এমন উইকেট বানানোর সাহস দেখিয়েছে। তবে ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিরপুরের সেই ভয়ংকর র্যাঙ্ক টার্নারে বাংলাদেশ জিতেছিল, কারণ দলে ছিলেন সেই ধরনের উইকেটে কীভাবে খেলতে হয়, তা জানা অন্তত দুই-তিনজন ব্যাটসম্যান। যেমন-তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান।
স্পিনের বিপক্ষে সুইপ শটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের পারদর্শিতা এখনো কম। ছবি: বিসিবি
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে ব্যাটিংয়ের জন্য দুরূহ উইকেটে সাকিব প্রথম ইনিংসে ৮৪ রান করেছিলেন। তামিম দুই ইনিংসে করেছিলেন ৭১ ও ৭৮ রান। বাকিরা সেই ম্যাচে ব্যর্থই হয়েছিলেন। ফলে সেই ম্যাচে ২০ রানে জেতার জন্য সাকিবকে বল হাতে দুই ইনিংসেই পাঁচ উইকেট নিতে হয়েছিল।
২০২১ সাল পর্যন্ত মিরপুরে এমন উইকেটই তৈরি করা হতো। সাকিব-তামিমরা অনেক দিনের পরিশ্রম আর ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে এমন টার্নিং উইকেটে খেলার কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন।
কিন্তু বর্তমান টেস্ট দলের খেলোয়াড়দের কি এই ধরনের র্যাঙ্ক টার্নারে খেলার মতো টেকনিক আছে? টেকনিকের কথা যদি বাদও দেওয়া হয়, তবুও ইতিবাচক ক্রিকেট খেলে প্রতিপক্ষের স্পিনারদের চাপে ফেলার দক্ষতাও যে এখন আর নেই।
মিরপুর বা এই ধরনের র্যাঙ্ক টার্নারে খেলতে হলে ফ্রন্টফুট ও ব্যাকফুটে ডিফেন্স করার ক্ষেত্রে দক্ষ হওয়ার বিকল্প নেই। ফুটওয়ার্কের সঠিক ব্যবহার করে ক্রিজের গভীরতা কাজে লাগাতে জানতে হয়। পাশাপাশি স্পিনকে অকার্যকর করে দিতে সুইপ ও রিভার্স সুইপ খেলার কৌশলও নিখুঁতভাবে আয়ত্তে রাখতে হয়, যা আজ মিরপুর টেস্টের চতুর্থ দিনে রান তাড়ায় বাংলাদেশের তিন স্পিনারের বিপক্ষে সফলতার সঙ্গে করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ওপেনার।
এ ছাড়া বলের গতিপথ বোঝাটাও গুরুত্বপূর্ণ। অফ স্টাম্পের বাইরের বল তেড়েফুঁড়ে খেলার চেষ্টা না করে সফট হ্যান্ডে খেলার অভ্যাস থাকতে হয়। বলের কাছে আগেভাগে না গিয়ে দেরিতে খেলার অভ্যাসও জরুরি। এসবের ঘাটতি আছে বলেই তাওহীদ হৃদয় দ্বিতীয় ইনিংসে চেজকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে আউট হয়েছেন। কারণ, নিজের ডিফেন্সে আস্থা ছিল না তার।
গোটা ব্যাটিং ইউনিটের চিত্র প্রায় একই। অভিজ্ঞ ওপেনার সাদমান ইসলাম টেস্টে বাঁহাতি স্পিনারদের বিপক্ষে বেশ ভালো ব্যাট করেন। গড় প্রায় ৫৪। তবে প্রতিপক্ষ দলের ডানহাতি স্পিনারদের বিপক্ষে তার দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো। সেখানে তার গড় কমে যায় প্রায় ২০-এ।
আবার তিনে নামা মুমিনুল হকের ডানহাতি স্পিনারদের বিপক্ষে গড় যেখানে ৪২, বাঁহাতি স্পিনারদের বিপক্ষে সেটা নেমে যায় ৩৩-এ।
এই দলে টেস্টে স্পিনারদের বিপক্ষে সবচেয়ে ভালো নাজমুল হোসেন। সুইপ ও রিভার্স সুইপ খুব ভালো খেলেন বলে সব কন্ডিশনেই তিনি স্পিনারদের বিপক্ষে স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাট করেন। যদিও মিরপুর টেস্টের দুই ইনিংসেই তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
দ্বিতীয় ইনিংসে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে আউট হয়েছেন তাওহীদ হৃদয়। ছবি: বিসিবি
লিটন দাস স্পোর্টিং উইকেটে স্পিনের বিপক্ষে দলের অন্যতম সেরা হলেও এখন পর্যন্ত টার্নিং উইকেটে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি। বরং বারবার সোজা ব্যাটে খেলতে গিয়ে আউট হয়েছেন।
তাই শুধু স্পিনারদের দিয়ে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেব—এই মন্ত্রে বিশ্বাস করে নিজেদের ব্যাটসম্যানদের জন্য এমন মরণফাঁদ কেন তৈরি করতে গেল বিসিবি? বিশেষ করে এটা জেনেও যে টেকনিক্যাল দিক থেকে বর্তমান ব্যাটসম্যানরা কতটা নাজুক অবস্থায় আছেন?
অন্যদিকে, ২০২৪ সাল থেকেই দেখা যাচ্ছে, উপমহাদেশে এই ধরনের উইকেট বানিয়ে জেতার কৌশল আর কাজে দিচ্ছে না। প্রথমে নিউজিল্যান্ড ভারতে গিয়ে ৩-০ ব্যবধানে টেস্ট সিরিজ জিতেছে। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকাও ভারতের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছে। এবার ‘ধরা’ খেতে হলো বাংলাদেশকেও।
সুইপ ও রিভার্স সুইপে বাংলাদেশকে ভুগিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওপেনার জন ক্যামবেল। ছবি : বিসিবি
কারণ, এখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলের ব্যাটসম্যানরা এর পাল্টা কৌশল বের করে ফেলেছেন। জন ক্যাম্পবেলকে দেখা গেছে অত্যন্ত কার্যকরভাবে টানা সুইপ খেলতে। ব্র্যান্ডন কিং ব্যাকফুটে থেকে বল দেরিতে খেলেছেন। হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশন কাজে লাগিয়েছেন, ফ্রন্ট লেগ সরিয়ে খেলার জায়গা তৈরি করেছেন। আবার দুজনই মাঝেমধ্যে ক্রিজ ছেড়ে সামনে এসে বলের টার্ন হওয়ার আগেই আক্রমণ করেছেন।
বিসিবি যদি পাকিস্তান সিরিজের মতো কিছুটা টু-পেসড উইকেট, সামান্য মুভমেন্ট এবং স্পিনারদের পরিশ্রম করে বল টার্ন করানোর মতো কন্ডিশন তৈরি করত, তাহলে বাংলাদেশ হয়তো এই টেস্টে জেতার জন্য বেশি এগিয়ে থাকতে পারত। সে ক্ষেত্রে নাহিদ রানা না থাকলেও তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ ও শরীফুল ইসলামরা হয়তো শুরুতেই উইকেট তুলে নিতে পারতেন। এরপর স্পিনাররাও উইকেট নিতে পারতেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাটিংটাও হয়তো এতটা বাজে হতো না।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই টেস্ট বাংলাদেশের জন্য তাই শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং উইকেট তৈরির কৌশল নিয়ে নতুন করে চিন্তার একটা বার্তাও। প্রতিপক্ষের দুর্বলতা কাজে লাগাতে গিয়ে নিজেদের সীমাবদ্ধতা বাড়িয়ে তোলার ঝুঁকি নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও টিম ম্যানেজমেন্টকে।
শেষ পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে সাফল্যের জন্য শুধু স্পিন-সহায়ক উইকেট নয়, প্রয়োজন ব্যাট-বলের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ কন্ডিশন, নিজেদের দক্ষতার সঠিক প্রয়োগ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
মিরপুরের তিক্ত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। বিসিবি কি এই ভুল থেকে শিক্ষা নেবে? নাকি আগামীতেও এভাবে বাংলাদেশেরই উল্টো স্পিন বিষে নীল হওয়ার ঝুঁকি বাড়াবে?