পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগালের মতো দেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা ইউরোপের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটতে পারে। কিন্তু তাতে ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। রাশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
রাশিয়ার ভালদাই ক্লাবের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর তিমোফেই বোর্দাচেভ আরটি-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে পশ্চিম ইউরোপের সংকটের এই চিত্র তুলে ধরেছেন। তার বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে শুধু সরকার পরিবর্তন বা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে ইউরোপের অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতা, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তাগত নির্ভরশীলতা এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গভীরভাবে জড়িত।
বোর্দাচেভের মতে, পশ্চিম ইউরোপের বর্তমান সংকটের পেছনে দুটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা কাজ করছে। প্রথমটি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমৃদ্ধির মডেলের কার্যকারিতা কমে যাওয়া। শীতল যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী কয়েক দশক পশ্চিম ইউরোপ বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্য, তুলনামূলক কম প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের প্রভাব এই সমৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু চীনের উত্থান, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা সেই সুবিধাজনক অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক পশ্চিম ইউরোপের জন্য এই সংকট মোকাবিলার একটি সুযোগ হতে পারত। রাশিয়ার বিপুল জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ইউরোপের শিল্প ও অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন সহায়তা করতে পারত। কিন্তু ইউরোপীয় নেতৃত্ব মস্কোর সঙ্গে সমঝোতার পরিবর্তে সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে। বোর্দাচেভের ব্যাখ্যায়, এর পেছনে কাজ করেছে ইউরোপীয় নেতাদের রাজনৈতিক অহংকার এবং রাশিয়ার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে স্বীকৃতি দিতে অনীহা। তবে এটি লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি; ইউরোপের রাশিয়াবিষয়ক নীতির পেছনে ইউক্রেন যুদ্ধ, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক আইনসংক্রান্ত প্রশ্নও রয়েছে।
দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে বোর্দাচেভ উল্লেখ করেছেন পশ্চিম ইউরোপের সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা। তার মতে, ন্যাটোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো বড় দেশও স্বাধীনভাবে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তার ধারণা, ন্যাটো শুধু সামরিক জোট নয়, সদস্য দেশগুলোর বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করে। ফলে ইউরোপের কোনো সরকার মৌলিক রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে চাইলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু ইউরোপীয় নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে সেই স্বাধীনতা অর্জনের উদ্যোগ নেয়নি।
এই দুই সংকটের সম্মিলিত প্রভাব পড়েছে ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। বোর্দাচেভের মতে, প্রায় দুই দশক ধরে ইউরোপের সরকারগুলো প্রকৃত সংস্কারের পরিবর্তে সাময়িক সংকট মোকাবিলার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে। অভিবাসন, করোনা মহামারি, রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধ এবং সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে রাখার সুযোগ দিয়েছে।
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম দিকে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষা খাতে শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। পরে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর অর্থনৈতিক নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন শ্রেণির মানুষও এতে যোগ দেয়। আন্দোলন ক্রমে বড় আকার ধারণ করে এবং কোথাও কোথাও সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। একইভাবে স্পেন ও পর্তুগালে আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের অসন্তোষের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে এসব দেশের সীমিত প্রভাব নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।
এই আন্দোলনগুলোর মধ্যে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বোর্দাচেভের মতে, ফ্রান্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তিতে শিক্ষার্থীরাই আন্দোলনের প্রাথমিক গতি তৈরি করেছে। প্রচলিত রাজনীতির প্রতি অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারের অনাগ্রহ থাকলেও তরুণদের মধ্যে উন্নত ভবিষ্যতের প্রত্যাশা এখনো প্রবল। তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার বাস্তব সমস্যাগুলো রাজনৈতিক অসন্তোষকে আরও গভীর করছে। ফলে ইউরোপের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে নতুন শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিবর্তন একটি সুযোগও তৈরি করতে পারে। নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় এলে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা এবং নিরাপত্তা প্রশ্নে অধিক বাস্তববাদী অবস্থান নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বোর্দাচেভ এই সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার যুক্তি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিপ্লব বা বড় ধরনের পরিবর্তন সব সময় প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে না। ইতিহাসে বরং অনেক সময় অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাইরের দেশে শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা বাড়িয়েছে।
এ ক্ষেত্রে তিনি ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়নের উত্থানের উদাহরণ দিয়েছেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ফ্রান্সের বিপ্লবের পর প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে নেপোলিয়ন ইউরোপের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। একইভাবে ২০ শতকে জার্মানির রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নাৎসি শাসনের উত্থান ইউরোপে ভয়াবহ সামরিক সম্প্রসারণ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ তৈরি করেছিল। হেনরি কিসিঞ্জারের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “নেপোলিয়নের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাশিয়ার সঙ্গে স্থায়ী সমঝোতার পথও সংকুচিত করেছিল।”
বোর্দাচেভের আশঙ্কা, পশ্চিম ইউরোপের বর্তমান সংকট থেকেও একই ধরনের বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হতে পারে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় এলেও তারা যে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের নীতি পরিত্যাগ করবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বরং অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে জনগণের মনোযোগ সরাতে কিংবা নতুন রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করতে কোনো কোনো সরকার বাইরের সংঘাতকে কাজে লাগাতে পারে।
তবে লেখকের বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যও রয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের স্বাধীনভাবে সামরিক অভিযান শুরু করার সক্ষমতা সীমিত থাকতে পারে। এই নির্ভরশীলতা একদিকে ইউরোপের সার্বভৌমত্বকে সংকুচিত করছে, অন্যদিকে নিজস্ব উদ্যোগে বিপজ্জনক সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করতে পারে।
সবশেষে বোর্দাচেভের বক্তব্য হলো, রাশিয়ার নিরাপত্তানীতি ইউরোপে নতুন ও শান্তিপ্রিয় নেতৃত্বের উত্থানের আশার ওপর নির্ভর করতে পারে না। ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সংকট শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা অনিশ্চিত। তাই মস্কোকে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি মাথায় রেখেই কৌশলগত প্রস্তুতি নিতে হবে। তার এই অবস্থান মূলত রাশিয়ার নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৈরি। নিবন্ধটির তাৎপর্য এখানেই যে, পশ্চিম ইউরোপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পরিবর্তনের বিষয় নয়; এর প্রভাব রাশিয়া-ইউরোপ সম্পর্ক এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।