যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি এখন শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই বিতর্ক তৈরি করছে না, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে তার প্রশাসন ক্রমেই রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়ছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই অসন্তোষ রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরনের নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার জেনকিনটাউনে বসবাসকারী ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, একসময় ট্রাম্পের সমর্থক ছিলেন এমন অনেক রিপাবলিকান ভোটারও এখন তার ইউক্রেননীতি নিয়ে ক্ষুব্ধ। তাদের কাছে ইউক্রেনের প্রশ্নটি কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি পারিবারিক ইতিহাস, মানবিক সংহতি এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গেও জড়িত।
ইউক্রেনের প্রতি ট্রাম্পের অবস্থানের পরিবর্তন এই অসন্তোষের প্রধান কারণ। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় ফিরলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ করার পরিবর্তে সাম্প্রতিক সময়ে তার প্রশাসনের কর্মকাণ্ড ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডিজেল কেনার চুক্তি, মস্কোর ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করা এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ক্ষমতা ছাড়ার আহ্বান—সবকিছুই ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য এবং স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা। জেনকিনটাউনের ইরিন স্কালস্কির ছেলে ডার্কো কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কাছাকাছি ছিলেন। তার দাবি, আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়ার কারণে বিপদ আরও বেড়েছিল। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জেলেনস্কি বলেছেন, দুটি রুশ হামলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক থেকে তার দেশ আগাম কোনো সতর্কতা পায়নি। এ ধরনের ঘটনা ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই অসন্তোষ দলীয় আনুগত্যকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সমর্থক পিটার ওরিসিয়া হিউকা দম্পতি এবার স্থানীয় নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন। তাদের বক্তব্য, তারা রিপাবলিকান পার্টি ছেড়ে যাননি, বরং দলটি তাদের ছেড়ে গেছে। ইউক্রেনীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের নেতা ইউজিন লুসিউর মতে, ট্রাম্পের সমর্থক ছিলেন এমন অনেকেই সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে তার অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। এটি রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত।
তবে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির নির্বাচনী প্রভাব শুধু ইউক্রেন প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং আমদানি শুল্ক আরোপের নীতিও সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধকে ট্রাম্প প্রথমে স্বল্পমেয়াদি অভিযান হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রল ও ডিজেলের দামে। পরিবহন, কৃষি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয়ও বেড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের শুল্কনীতি। ইস্পাত, তামা ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো আমদানি করা কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন উৎপাদকদের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোক্তাদেরও বিভিন্ন পণ্যের জন্য বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে। কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার ব্যর্থতার পর ২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। কানাডার পাল্টা ব্যবস্থার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এর বিরোধিতা দেখা গেছে। মিশিগানের রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্স পর্যন্ত ট্রাম্পকে বাণিজ্যযুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এখানে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক নীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব যখন জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দামের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়, তখন পররাষ্ট্রনীতি আর দূরের কোনো বিষয় থাকে না। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-নরক পরিচালিত সাম্প্রতিক জরিপের বরাত দিয়ে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধ পরিচালনা এবং অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট।
এদিকে ট্রাম্পের তথাকথিত ‘ডনরো ডকট্রিন’ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর তিনি দেশটির তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণ এবং একে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার মতো মন্তব্য করেছেন। কিউবার কমিউনিস্ট সরকার উৎখাতের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের পরিবর্তে ব্যবসায়ী স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ওপর নির্ভরতা মার্কিন কূটনীতির প্রচলিত কাঠামো থেকে তার দূরত্ব নির্দেশ করে।
এই নীতির সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক পরিণতি হতে পারে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি। ইউক্রেনকে রক্ষার প্রশ্নে ইউরোপের ন্যাটো সদস্যদেশগুলো ব্যাপকভাবে যুক্ত। ওয়াশিংটন যদি কার্যত মস্কোর অবস্থানের কাছাকাছি চলে যায়, তাহলে ন্যাটো জোটের ঐক্য ও ইউরোপীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হতে পারে। ইউক্রেনীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের অনেকের আশঙ্কা, ইউক্রেনের পরাজয় বৃহত্তর বৈশ্বিক সংঘাতের পথ তৈরি করতে পারে।
তবে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের শেষাংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কথাও উঠে এসেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতা সীমিত হতে পারে। কিন্তু তাতে তার পররাষ্ট্রনীতির আগ্রাসী প্রবণতা কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং দেশের ভেতরে রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়লে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বেশি ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারেন।
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি তার পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর মার্কিন জনগণের মূল্যায়নেরও পরীক্ষা। ইউক্রেনের প্রতি অবস্থান পরিবর্তন, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ এবং শুল্কনীতির কারণে সৃষ্ট অসন্তোষ রিপাবলিকান ভোটব্যাংকেও প্রভাবিত করছে। ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি সম্ভবত বিরোধী দলের সমর্থন বৃদ্ধি নয়, বরং নিজের একসময়ের অনুগত ভোটারদের আস্থা হারানো।