চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এ বছর পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি।
শিক্ষাবোর্ডের তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।
একই চিত্র দেখা গেছে এসএসসির ফলেও। চলতি বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
পরীক্ষার ফলাফলে এমন পতন কি শুধু শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির কারণে, নাকি এর পেছনে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার আরও গভীর সংকট? আর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষানীতির বারবার বদলে যাওয়া কি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে?
ফলাফলের ধারাবাহিক অবনতি
১৯৯০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত ৩৫ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে সর্বনিম্ন পাসের হার ছিল ১৯৯৬ সালে, মাত্র ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
১৯৯০ সালে পাসের হার ছিল ২৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। পরের দুই বছরে তা বেড়ে ১৯৯১ সালে প্রায় ৫১ শতাংশ এবং ১৯৯২ সালে ৬৫ শতাংশের বেশি হয়। তবে ১৯৯৩ সালে পাসের হার কমে ৪৬ শতাংশের কিছু বেশি হয়। ১৯৯৪ সালে তা ছিল ৪০ শতাংশের বেশি এবং ১৯৯৫ সালে ৪৬ শতাংশের বেশি। ১৯৯৬ সালে পাসের হার নেমে আসে ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশে। পরের বছর তা বেড়ে ৩৯ শতাংশের বেশি হয়।
২০০১ ও ২০০২ সালে পাসের হার ছিল যথাক্রমে ২৮ শতাংশের বেশি ও প্রায় ২৭ শতাংশ। এরপর পাসের হার বাড়তে থাকে। ২০০৩ সালে ৩৮ শতাংশের বেশি এবং ২০০৪ সালে প্রায় ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলোতে তা আরও বাড়ে। ২০০৮ সালে পাসের হার প্রায় ৭৫ শতাংশে পৌঁছায়।
২০০৯ সালে পাসের হার কিছুটা কমে ৭০ শতাংশের সামান্য বেশি হয়। ২০১০ ও ২০১১ সালে তা ছিল প্রায় ৭২ শতাংশ। ২০১২ সালে বেড়ে ৭৬ শতাংশের বেশি হয়। ২০১৩ সালে পাসের হার ছিল ৭১ শতাংশের বেশি এবং ২০১৪ সালে প্রায় ৭৬ শতাংশ। তবে ২০১৫ সালে তা কমে প্রায় ৬৬ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৬ সালে আবার বেড়ে ৭২ শতাংশের বেশি হয়। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে পাসের হার কমে যথাক্রমে প্রায় ৬৭ ও ৬৫ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৯ সালে তা ছিল ৭২ শতাংশের কাছাকাছি।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সব পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করায় ওই বছর পাসের হার ছিল ১০০ শতাংশ। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে ৮৪ দশমিক ৩১ শতাংশে নেমে আসে। এরপরও কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকে। ২০২৩ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৭৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৭৫ শতাংশের বেশি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে পাসের হার নেমে আসে ৫৭ শতাংশের ঘরে।
এবারের ফলাফল সেই নিম্নমুখী প্রবণতারই ধারাবাহিকতা। তবে শুধু পাসের হার কমেছে বলেই শিক্ষার মান কমেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ফলাফলের পেছনে মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
নির্মোহ মূল্যায়ন, নাকি শিখন ঘাটতি?
সরকার বলছে, নির্মোহভাবে খাতা দেখা এবং শিক্ষার্থীদের শিখনের ঘাটতির কারণে এবারের ফলাফল এমন হয়েছে।
আজ শনিবার ফলপ্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর খাতায় তার পরীক্ষায় দেওয়া উত্তরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি এবার প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ফলাফলে এভাবে নিচের দিকে নেমে আসা কাম্য নয়। শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণে অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি তৈরি হলো কেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শিক্ষার্থীরা যদি দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পড়াশোনা করে থাকে, তাহলে তাদের বড় একটি অংশ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। শুধু ফলাফল প্রকাশ করে দায় শেষ করা নয়, বরং কোথায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে, তা চিহ্নিত করাও প্রয়োজন।
শিক্ষানীতিতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা। স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয় শিক্ষাক্রমে সাতবার বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রায় প্রতিবারই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষানীতির পরিবর্তন দেখা গেছে। কখনো নতুন শিক্ষানীতি ঘোষণা করা হয়েছে, আবার কখনো শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিধিবিধানে পরিবর্তন এসেছে।
শিক্ষাক্রম পরিবর্তন অস্বাভাবিক কিছু নয়। সময়ের সঙ্গে শিক্ষার পদ্ধতি ও বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পেছনে যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বেশি প্রভাব ফেলে, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
একটি শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সময়, প্রস্তুতি এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন। কিন্তু একটি নীতি পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগেই নতুন নীতি বা পরিবর্তন এলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
আবারও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
এবারও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভর্তি-সংক্রান্ত বিষয় এবং এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার প্রসঙ্গ।
তবে এসব পরিবর্তনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কাঠামোগত তৎপরতা দেখা যায়নি।
শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিবর্তন আনার আগে প্রয়োজন সমস্যার সঠিক মূল্যায়ন। কেন শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হচ্ছে, কোন পর্যায়ে তাদের শিখন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার কোন অংশে পরিবর্তন প্রয়োজন, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
কোন দিকে যাচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা?
এইচএসসি ও এসএসসির ফলাফলে ধারাবাহিক অবনতি শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণ করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা।
শিক্ষামন্ত্রী নিজেও ফলাফলের এই অবনতি কাম্য নয় বলে জানিয়েছেন। কিন্তু ফলাফলের এই সংকট কাটাতে শুধু শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা অভিভাবকদের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে তা সমাধান করা।
কারণ, শিক্ষানীতি বারবার বদলালেই শিক্ষার মান বাড়ে না। বরং প্রয়োজন এমন একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিখতে পারবে, শিক্ষকরা যথাযথভাবে পাঠদান করতে পারবেন এবং পরীক্ষার ফলাফল হবে সেই শিখনের প্রকৃত প্রতিফলন।