পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি ধারণা ছিল, ইরানকে বিচ্ছিন্ন রেখে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ছাতার নিচে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সহযোগিতায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কিন্তু ইরানের রাজধানী তেহরানে ২৬ অক্টোবর সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইরানের প্রতিনিধিদের বৈঠক এই ধারণার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপক চাপের মুখেও ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রেখেছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ-সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক তৎপরতা মোকাবিলায় সৌদি আরব ও তার অংশীদারদের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। দ্য ক্র্যাডল-এ ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত পেইমান সালেহির বিশ্লেষণে তেহরানে চার দেশের এই বৈঠককে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ইরানের অপরিহার্য ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বৈঠকটির তাৎপর্য বুঝতে হলে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিতে হবে। এই তিন দেশের সামরিক সক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ইরানের দৃষ্টিতে এই সহযোগিতা শুধু প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নয়, বরং ইরান ও তার মিত্রদের প্রভাব সীমিত করার সম্ভাব্য কাঠামোও। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ দেখিয়েছে, সামরিক জোট গঠন করলেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনা ইয়েমেনের হুতিদের পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘ সংঘাতের পরও ইয়েমেনের এমন সামরিক সক্ষমতা প্রশ্ন তুলেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে।
তেহরানের বৈঠককে ইরানের মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সালেহির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন সচিব মোহসেন রেজাই আঞ্চলিক সহযোগিতা, বিদেশি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং বাইরের হস্তক্ষেপ বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। চার দেশের যৌথ বিবৃতিতে ভবিষ্যৎ সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও কোনো বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, বৈঠকটি এখনো একটি সম্ভাব্য সমঝোতার ভিত্তি অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, ইসরায়েলের ভূমিকা এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন নিয়ে মতপার্থক্যও যথেষ্ট গভীর।
ইয়েমেন প্রশ্নটি এই কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বৈঠকের আগে ধারণা তৈরি হয়েছিল, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিনিময়ে ইরান হয়তো সানার আনসারুল্লাহ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন কমাতে পারে। কিন্তু সালেহি এই ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও আনসারুল্লাহর নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি ও স্বার্থ রয়েছে। সৌদি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম, গাজাকে সমর্থন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে ইয়েমেনের সিদ্ধান্তকে শুধু তেহরানের নির্দেশের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
বৈঠকের পরদিন, ২৭ অক্টোবর, রেজাই তেহরানে ইয়েমেনের রাষ্ট্রদূত ইব্রাহিম মোহাম্মদ আল-দাইলামির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি গাজার প্রতিরক্ষায় ইয়েমেনের ভূমিকার প্রশংসা করেন। এই সাক্ষাৎকে সালেহি ইরানের একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন: সৌদি আরব ও তার অংশীদারদের সঙ্গে সংলাপ চালালেও তেহরান সানার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে আগ্রহী নয়।
ইরানের রক্ষণশীল সংবাদপত্র কায়হান-এর সম্পাদক হোসেইন শরিয়তমাদারিও ২৭ অক্টোবর লিখেছেন, ইয়েমেনের বিপ্লবীরা ইরানের মিত্র। তার আশঙ্কা, তেহরান সানার কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করছে—এমন ধারণা ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।
সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতিটি বিশেষভাবে জটিল। পাকিস্তান ও তুরস্ক রিয়াদের প্রতি সমর্থন জানালেও ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত। তুরস্কের কর্মকর্তারা ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
পাকিস্তানও ইয়েমেনের বাহিনীর ওপর তাদের বিমান হামলার খবর অস্বীকার করেছে। ফলে প্রতিরক্ষা চুক্তির রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগ্রহের মধ্যে ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। সৌদি আরবকে এখন হিসাব করতে হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মূল্য কত এবং তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সেই চাপ কমানো সম্ভব কি না।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে ইসরায়েলের আঞ্চলিক অবস্থানের প্রশ্নও যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র একটা সময় চেয়েছিল সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে ইসরায়েলকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করতে। এর মাধ্যমে ইরান ও তার মিত্রদের বিচ্ছিন্ন রাখার কৌশল বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারত। কিন্তু গাজা যুদ্ধের পর পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ সেই হিসাবকে জটিল করেছে। রেজাই বৈঠকে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ এবং লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের অধিকৃত অঞ্চল থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয় উত্থাপনের কথা জানিয়েছেন। তবে যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েল প্রসঙ্গে উল্লেখ না থাকায় চার দেশের মধ্যে এ বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সৌদি আরবের অবস্থানের পরিবর্তন অতীতের সঙ্গে তুলনা করলেও স্পষ্ট হয়। সালেহি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ২০১৭ সালে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইরানের ভেতরে সংঘাত নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। প্রায় এক দশক পর সেই সৌদি নেতৃত্বকেই তেহরানে গিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় বসতে হচ্ছে। এটি ইরানের প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কার্যকারিতা নিয়ে সৌদি আরবের উদ্বেগও প্রকাশ করে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রিয়াদ ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছে; বরং তার নিরাপত্তা কৌশলে বিকল্প কূটনৈতিক পথের প্রয়োজন বেড়েছে।
শেষ পর্যন্ত তেহরানের বৈঠকের গুরুত্ব নির্ভর করবে আলোচনাকে বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার ওপর। ইরানকে বাদ দিয়ে কিংবা ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। একই সঙ্গে ইরানকেও প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা-উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হবে।
সালেহির বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা কেবল বাইরের শক্তির সামরিক নিশ্চয়তা বা কয়েকটি দেশের প্রতিরক্ষা জোটের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি হলেও স্থায়ী শান্তির জন্য ইয়েমেনসহ সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থ ও অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি দিতে হবে।