অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য জীবাণুনাশক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক বিশ্বজনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই হুমকির ভয়াবহ চিত্র। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতিবছর প্রায় ৯৭ লাখ মানুষ ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছেন। এসব সংক্রমণে বছরে প্রাণ হারাচ্ছেন প্রায় ৫০ হাজার ৮০০ মানুষ।
গত ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম গিজমোডো-তে প্রকাশিত এড কারার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে সিডিসির প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
সিডিসির ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বছরে প্রায় ২৮ লাখ সংক্রমণ এবং ৩৫ হাজার মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হয়েছিল। নতুন পরিসংখ্যান সেই সময়ের তুলনায় সংক্রমণ ও মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। অবশ্য দুটি প্রতিবেদনের পরিধি ও হিসাবের পদ্ধতির পার্থক্য বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। নতুন প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এবং ২০১৯ সালের পর ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এটিই সংস্থাটির সবচেয়ে বিস্তৃত মূল্যায়ন।
এই সংকটের মূল কারণ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠা। অ্যান্টিবায়োটিকের মতো ওষুধের বিরুদ্ধে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করলে প্রচলিত চিকিৎসায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের কেমোথেরাপি, গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন চিকিৎসা এবং অন্যান্য জটিল চিকিৎসাপদ্ধতির নিরাপত্তা অনেকাংশে কার্যকর জীবাণুনাশক ওষুধের ওপর নির্ভরশীল। এসব ওষুধ কার্যকারিতা হারালে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার বহু অর্জন ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সিডিসির হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর কারণে হওয়া মৃত্যুর প্রায় ৪০ হাজার স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত। এসব সংক্রমণে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু রোগীর মৃত্যু বা অসুস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং চিকিৎসাব্যবস্থার ব্যয় বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক জীবাণুগুলোকে জরুরি, গুরুতর ও উদ্বেগজনক—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে ১৯টি প্রধান হুমকি, আর আরও ছয়টি জীবাণুকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। নতুন করে গুরুতর হুমকি হিসেবে যুক্ত হয়েছে ওষুধ-প্রতিরোধী নাইসেরিয়া মেনিনজাইটিডিস (Neisseria meningitides), যা মেনিনজাইটিসসহ গুরুতর সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
তবে পরিস্থিতির সব দিকই নেতিবাচক নয়। ক্লোস্ট্রিডিওইডিস ডিফিকাইল (Clostridioides difficile) নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া সংক্রমণ ২০১৮ সাল থেকে কমতে শুরু করে এবং ২০২০ সালের পর থেকে স্থিতিশীল রয়েছে। এ কারণে জীবাণুটিকে জরুরি হুমকির শ্রেণি থেকে গুরুতর হুমকির শ্রেণিতে নামানো হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং জীবাণুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ যে কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে, এটি তার ইঙ্গিত।
অন্যদিকে, ক্যান্ডিডা অউরিস (Candida auris) নামের ছত্রাক নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০১৯ সালের পর থেকে এর সংক্রমণ প্রায় দশ গুণ বেড়েছে। সংক্রমণটি সামগ্রিকভাবে এখনো তুলনামূলক বিরল হলেও এর কিছু ধরন প্রায় সব প্রচলিত ছত্রাকনাশক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা দেখিয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে—এমন প্রতিরোধী জিন বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে একটি জীবাণুর মধ্যে তৈরি হওয়া প্রতিরোধক্ষমতা অন্য জীবাণুর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিনের সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান এবং সংক্রামক রোগবিষয়ক চিকিৎসকদের সংগঠন আইডিএসএর সভাপতি ওয়েন্ডি আর্মস্ট্রং গিজমোডো-কে বলেছেন, পরীক্ষাগারে অনেক সময় দেখা যায়, কোনো রোগীর সংক্রমণ সৃষ্টিকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে পরীক্ষা করা একাধিক ওষুধই অকার্যকর। তখন কার্যকর চিকিৎসার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের কাছে এটি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; বাস্তবে রোগীর জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এই সংকট মোকাবিলায় নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ও ছত্রাকনাশক ওষুধ উদ্ভাবন জরুরি। পাশাপাশি গনোরিয়া, শিগেলা এবং ক্যান্ডিডা অউরিস (Candida auris)-এর মতো জীবাণুর বিরুদ্ধে টিকা তৈরির গবেষণাও চলছে। কিন্তু নতুন ওষুধ তৈরির গবেষণায় বিনিয়োগ কমে যাওয়া বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ যতটা সম্ভব সীমিতভাবে ব্যবহার করতে হয়, যাতে জীবাণুর মধ্যে দ্রুত প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হয়। ফলে এসব ওষুধের বিক্রি থেকে ওষুধ কোম্পানিগুলোর আয় তুলনামূলক কম হওয়ার আশঙ্কা থাকে। উচ্চ গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়ের কারণে অনেক কোম্পানি এ ক্ষেত্র থেকে সরে গেছে।
এ সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচিত হচ্ছে ‘নেটফ্লিক্স সাবস্ক্রিপশন’ মডেল। এ ব্যবস্থায় সরকার নতুন ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিকে ব্যবহারের পরিমাণের ভিত্তিতে নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি নির্ধারিত অর্থ দিতে পারে। এতে ওষুধের বিক্রি বাড়ানোর চাপ ছাড়াই কোম্পানিগুলো গবেষণায় বিনিয়োগের আর্থিক প্রণোদনা পাবে। এ ধরনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত পাস্তুর অ্যাক্টের পক্ষে আইডিএসএসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রচার চালাচ্ছে। আর্মস্ট্রংয়ের মতে, জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে আর্থিক প্রণোদনা তৈরি করা এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।
সমস্যাটির বৈশ্বিক মাত্রাও অত্যন্ত গুরুতর। যুক্তরাজ্য সরকারের ২০১৪ সালের একটি প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছিল, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে ওষুধ-প্রতিরোধী সংক্রমণে বিশ্বে বছরে এক কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এটি বর্তমানে ক্যানসারে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর বার্ষিক সংখ্যার কাছাকাছি।
সিডিসির সর্বশেষ হিসাব যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি তুলে ধরলেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়। নতুন ওষুধ উদ্ভাবন, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং বিদ্যমান ওষুধের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এর প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। বিশেষ করে কার্যকর চিকিৎসার বিকল্প সীমিত হয়ে গেলে সাধারণ সংক্রমণ থেকে শুরু করে জটিল অস্ত্রোপচার পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়বে। তাই নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার ঠেকানোর উদ্যোগ জোরদার করা এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।