আজ বিশ্ব হার্ট দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতি মিনিটে হৃদ্রোগে মারা যান ৮ জন। এই হার্ট অ্যাটাকের সাথে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। প্রথমেই আসি হার্ট অ্যাটাক কেন হয় সেই আলোচনায়।
মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের ওয়েবসাইটে ইন্টারভেনশনাল হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার লেসলি তাইয়ের লেখা এক নিবন্ধে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
ডাক্তার তাই বলেন, হার্ট অ্যাটাক হয় যখন হৃদ্যন্ত্রের কোনো একটি ধমনিতে এমনভাবে বাধা তৈরি হয়, যার কারণে হৃদ্পেশিতে রক্ত চলাচল কমে যায়। ফলে হৃদ্পেশি প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। এতে হৃদ্পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত এর কিছু অংশের কোষ মারা যেতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের সময় সাধারণত বুকে তীব্র চাপ বা চেপে ধরার মতো ব্যথা হয়। অনেকে এই অনুভূতিকে এমনভাবে বর্ণনা করেন, যেন বুকের ওপর একটি হাতি বসে আছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক কী?
ডাক্তার লেসলি তাই বলছেন, সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে এসব স্পষ্ট বা তীব্র উপসর্গ দেখা যায় না। অনেক সময় রোগী কিছুই অনুভব করেন না। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুব হালকা বা অস্পষ্ট কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যেগুলো অন্য কোনো কম গুরুতর সমস্যার লক্ষণ বলে ভুল হতে পারে।
সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের কারণ কী?
সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের কারণ সাধারণ হার্ট অ্যাটাকের মতোই বলছেন ডাক্তার তাই। বছরের পর বছর হৃদ্যন্ত্রের ধমনিতে কোলেস্টেরল ও প্লাক জমে ধমনি সরু হয়ে যেতে পারে। একপর্যায়ে এসব জমাট পদার্থ হঠাৎ ফেটে গিয়ে সেখানে রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং ধমনি পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে হৃদ্পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক কতটা সাধারণ?
সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক আমাদের ধারণার চেয়ে বেশি সাধারণ। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সব হার্ট অ্যাটাকের প্রায় অর্ধেকই ছিল সাইলেন্ট। এসব ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের গুরুতর অবস্থার বিষয়ে বুঝতে পারেননি।
ফলে চিকিৎসা না নেওয়ায় তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তাই হার্ট অ্যাটাকের কোনো ঝুঁকি থাকলে সতর্ক থাকা জরুরি, বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি। কারণ রক্ত চলাচলে সমস্যা ও রক্তে অতিরিক্ত শর্করার কারণে তাদের স্নায়ুকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফলে অন্যদের মতো তারা ব্যথা অনুভব নাও করতে পারেন। যেমন, পায়ে পেরেক ঢুকে গেলেও তারা তা টের নাও পেতে পারে।
সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ ও উপসর্গ কী?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে তা সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের মতো গুরুতর কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে বলে মনে করেন ডাক্তার তাই-
-পিঠ, হাত, চোয়াল বা বুকে অস্বস্তি
-মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি
-অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট
-বুকজ্বালার মতো অনুভূতি
তবে ডাক্তার লেসলি তাই মনে করেন, সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সাধারণত খুব স্পষ্ট হয় না। রোগীর পিঠ, হাত, চোয়াল বা বুকে অস্বস্তি হতে পারে। মাথা ঘুরতে পারে বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে। অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্টও দেখা দিতে পারে। যেমন, এক সপ্তাহ আগেও কেউ অনায়াসে কয়েক ধাপ সিঁড়ি উঠে যেতে পারতেন, কিন্তু এখন কয়েক ধাপ হাঁটার পরই অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন বা হাঁপিয়ে যাচ্ছেন। আবার বুকজ্বালা বা পেটের অস্বস্তি হচ্ছে বলেও মনে হতে পারে। এসবই এমন সূক্ষ্ম উপসর্গ, যা হার্ট অ্যাটাকের ইঙ্গিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন ডাক্তার তাই।
তিনি বলেন, “আমার এমন বেশ কয়েকজন রোগী ছিলেন, যাদের সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। একজন রোগী জানিয়েছিলেন, দুই দিনের বেশি সময় ধরে তার তীব্র গ্যাস ও বুকজ্বালার মতো অনুভূতি হচ্ছিল। এর সঙ্গে ছিল প্রচণ্ড ক্লান্তি। তিনি যখন হাসপাতালে আসেন, ততক্ষণে তার হৃদ্পেশি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে গিয়ে হৃদ্যন্ত্রের অকার্যকারিতা শুরু হয়েছিল। আমরা তার বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনিটি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করি, যাতে হৃদ্পেশি আবার সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ পায়।”
মূল কথা হলো, নিজের শরীরের সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ নিজের শরীরকে আপনি সবচেয়ে ভালো চেনেন। শরীরে কোনো কিছু স্বাভাবিক মনে না হলে বিষয়টি পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত।
দ্রুত চিকিৎসা না নিলে কী হতে পারে?
হার্ট অ্যাটাক একটি গুরুতর শারীরিক সমস্যা, যা মৃত্যুর কারণও হতে পারে। উপরে উল্লেখ করা সূক্ষ্ম উপসর্গগুলোর কোনোটি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত বলে মনে করেন ডাক্তার তাই।
ইন্টারভেনশনাল হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ কীভাবে সাহায্য করতে পারেন?
সাধারণভাবে হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞরা হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করেন এবং উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করেন।
হার্ট অ্যাটাক হলে ইন্টারভেনশনাল হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ বিশেষ একটি চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্রের বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনি খুলে দেন। এর ফলে হৃদ্যন্ত্রে আবার রক্ত চলাচল শুরু হয় এবং হার্ট অ্যাটাকের ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করা যায়।
সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়?
সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে নিচের বিষয়গুলো মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন ডাক্তার লেসলি তাই-
১. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। এতে হৃদ্যন্ত্রের ধমনিতে কোনো বাধা আছে কি না তা শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নেওয়া যায়।
২. ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা ও ধূমপানের মতো ঝুঁকির কারণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকুন।
৩. এসব ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলুন।
৪. চিকিৎসক কোনো ওষুধ দিলে তা নিয়মিত সেবন করুন।
৫. ধূমপান বন্ধ করুন। ধূমপান হৃদ্রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
৬. স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মতো জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনুন।
৭. দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা এড়িয়ে চলুন। এতে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি হতে পারে।
৮. প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট শরীরচর্চা করুন। এতে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
সবশেষে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো, নিজের ঝুঁকির কারণগুলো শনাক্ত করা এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ও নিয়মিত শরীরচর্চার মতো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলে ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।