ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বিশাল বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। ওয়াশিংটনের দাবি, ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্র নিয়ে করা চুক্তিটি দেশটির জ্বালানি খাত পুনরুজ্জীবিত করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসবে। কিন্তু চুক্তির দায়িত্ব পাওয়া উত্তর আমেরিকাভিত্তিক অপরিচিত প্রতিষ্ঠান নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের সক্ষমতা, অর্থায়ন, অবকাঠামো ও জনবল নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
রয়টার্সের ৩০ অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প এই চুক্তিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে প্রায় ৬৪ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত রয়েছে। কিন্তু এই বিপুল সম্পদ বাস্তবে উত্তোলন করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সংশয় রয়েছে। রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউটের লাতিন আমেরিকা এনার্জি প্রোগ্রামের পরিচালক ফ্রান্সিসকো মোনালদি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আগামী ২৫ বছরে বাস্তবসম্মতভাবে মাত্র ১০ বিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্তোলন করা সম্ভব হতে পারে। সেটিও নির্ভর করবে সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোনোর ওপর। অর্থাৎ ঘোষিত মজুতের সঙ্গে বাস্তবে উত্তোলনযোগ্য তেলের পরিমাণের বড় ব্যবধান রয়েছে।
এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের অতীত ও বর্তমান সক্ষমতা। প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে রয়েছেন ভেনেজুয়েলার ব্যবসায়ী আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ট। একসময় তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগসংক্রান্ত মার্কিন তদন্ত হয়েছিল। সুইজারল্যান্ডেও অর্থপাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে। তবে কোনো দেশেই তার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক মামলা বা দণ্ড হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট তদন্তটি এ বছর স্থগিত করা হয়েছে। ফলে অতীতের এসব বিতর্ক প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও ব্যাংকিং সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চুক্তি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন প্রতিষ্ঠানটির মূল কোম্পানির ৩৫ শতাংশ মালিকানা এবং উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশ উৎপাদন খরচে কেনার অধিকার পেয়েছে। অন্যদিকে নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স ঘোষণা দিয়েছে, তারা বর্তমান উৎপাদন দৈনিক প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ব্যারেল থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি করবে। কিন্তু এই লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ নয়। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ১৫ জন তেলশিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞের মধ্যে আটজন জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি ঠিকাদারদের পাওনা পরিশোধে সমস্যায় রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও অবকাঠামো মেরামতেও হিমশিম খাচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের সংকট কেবল অর্থের অভাব নয়, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দক্ষ জনবলের ঘাটতিও বড় সমস্যা। মারাকাইবো অববাহিকার প্রায় চার হাজার নিষ্ক্রিয় কূপের ৮০ শতাংশ মেরামত করা প্রয়োজন। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রপাতি, নষ্ট স্থাপনা, তেল নিঃসরণ এবং সরবরাহকারীদের বিলম্বিত অর্থ পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে অরিনোকো অঞ্চলের জুনিন সুর এলাকায় উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ১৭টি ক্ষেত্রের সাতটিতে অক্টোবরের শুরুতে ড্রিলিং অবকাঠামোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে একটি স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য দাবি করছে, তাদের হাতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আসছে। ৬০টি ড্রিলিং রিগ এবং ৭০টি ভারী যন্ত্রপাতি পর্যায়ক্রমে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন ও পুরোনো কূপ মেরামতের জন্য আরও যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র টেরি ওয়েড বলেছেন, তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছেন এবং সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে। নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের দাবি, ২০২৪ সাল থেকে তারা নিজেদের এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং ভবিষ্যতে পুনর্বিনিয়োগ বাড়াবে। তবে বাইরের অর্থ সংগ্রহ বা নতুন ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই। এই দাবি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ ১৭টি বিশাল তেলক্ষেত্র একই সঙ্গে উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বিপুল অর্থ, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা পাঁচজন শিল্পবিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই কাজ শেভরন, এক্সনমোবিল কিংবা কনোকোফিলিপসের মতো আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হতো। সেখানে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এত বড় দায়িত্ব পালন করা আরও কঠিন। বেতানকুর্টের অতীত তদন্তের কারণে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি সমস্যায় পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানিয়েছেন।
এই চুক্তি নিয়ে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অঙ্গনেও স্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো বলেছেন, তিনি চুক্তির বিস্তারিত দেখেননি, তবে এতে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। তার বক্তব্য, বিনিয়োগ প্রয়োজন, কিন্তু কার সঙ্গে এবং কী শর্তে বিনিয়োগ হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অবশ্য চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর ভাইস প্রেসিডেন্ট জোভান্নি মার্টিনেজের ধারণা, ছয় থেকে সাত বছরের মধ্যে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
চুক্তির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অর্থনৈতিক স্বার্থ। প্রথম চালানে এক মিলিয়ন ব্যারেল ভেনেজুয়েলার তেল টেক্সাসে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প একে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উপহার হিসেবে উল্লেখ করেন। হোয়াইট হাউসের দাবি, মার্কিন করদাতাদের কোনো অর্থ ছাড়াই এই তেল পাওয়া গেছে। নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স প্রথমে জানিয়েছিল, চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদন খরচে তেল কেনার মার্কিন অধিকার ব্যবহার করেই চালানটি পাঠানো হয়েছে। পরে তারা জানায়, চুক্তির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় তেলটি বিনা মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে।
এখানেই চুক্তির প্রকৃত ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্র পরিচালনার দায়িত্ব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলেও চুক্তির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা কতটা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা স্পষ্ট হচ্ছে। ট্রাম্পের বক্তব্য, ‘বিজয়ীরাই তো লুণ্ঠিত সম্পদের অধিকারী হয়’—এই চুক্তির রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা থাকলেও ট্রাম্পের ঘোষিত বিশাল চুক্তিকে এখনই সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিপুল মজুত, উৎপাদন বৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এবং মার্কিন সমর্থন থাকলেই একটি দুর্বল তেলশিল্প দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল, কার্যকর অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা। নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের বহুল প্রচারিত চুক্তির প্রকৃত সাফল্য।