যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। একসময় টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম ছিল মানুষের তথ্য জানার প্রধান উৎস। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান প্রভাব সেই চিত্র পাল্টে দিচ্ছে। এখন অধিকাংশ আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিয়মিত সংবাদ জানতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্বাধীন সংবাদ নির্মাতাদের ওপর নির্ভর করছেন। এমনকি রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংবাদ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচলিত টেলিভিশন সাংবাদিকতাকে পেছনে ফেলেছে। এই প্রবণতা শুধু সংবাদ গ্রহণের মাধ্যম পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং সাংবাদিকতার প্রচলিত কাঠামো, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং পেশাগত পরিচয়ের সামনে নতুন প্রশ্নও তুলে ধরছে।
নিউইয়র্ক পোস্টে এক প্রতিবেদনে সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর দ্য ক্রিয়েটর ইকোনমির সর্বশেষ মাসিক ফ্ল্যাশ রিপোর্টের বরাত দিয়ে এই পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এক হাজার ১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৫৯ শতাংশ উত্তরদাতা নিয়মিত সংবাদ পাওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। রাজনৈতিক তথ্য জানার ক্ষেত্রেও ৫৫ শতাংশ মানুষের পছন্দ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অর্থাৎ সংবাদ ও রাজনৈতিক তথ্যের জন্য মানুষ ক্রমেই প্রচলিত সংবাদ প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন।
জরিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও কনটেন্ট নির্মাতাদের সম্মিলিত প্রভাব। ইউটিউব, এক্স, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, পডকাস্ট, সাবস্ট্যাক এবং স্বাধীন নিউজলেটারের মতো মাধ্যম থেকে সংবাদ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা। অন্যদিকে প্রচলিত সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরতার কথা বলেছেন মাত্র ৩২ শতাংশ। এই ব্যবধান দেখিয়ে দিচ্ছে, সংবাদপত্র শিল্পের ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সংবাদকক্ষের একচ্ছত্র প্রভাব আর আগের মতো নেই।
ব্যক্তিগত প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে ইউটিউব সবচেয়ে এগিয়ে। রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংবাদ পাওয়ার প্রধান স্বতন্ত্র উৎস হিসেবে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা ইউটিউবের কথা বলেছেন। সম্প্রচার ও কেবল টেলিভিশনের ক্ষেত্রে এই হার ১৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং অনলাইন সংবাদসাইটের ক্ষেত্রে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্মটি এখন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।
অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের অবস্থানও তাৎপর্যপূর্ণ। এক্স থেকে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংবাদ পান ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা। ফেসবুকের ক্ষেত্রে এই হার ১০ দশমিক ৮ শতাংশ, টিকটকে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ইনস্টাগ্রামে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। পডকাস্ট ও সাবস্ট্যাক বা নিউজলেটারের ক্ষেত্রে হার যথাক্রমে ৩ দশমিক ৫ ও ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। লিংকডইন সবচেয়ে পিছিয়ে, মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা থাকলেও সব প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা সমান নয়। ভিডিও, তাৎক্ষণিক তথ্য এবং ব্যক্তিনির্ভর কনটেন্টের প্রতি মানুষের আগ্রহ বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সংবাদ পরিবেশকের পরিচয় ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতা এখন সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। জরিপে ৬১ শতাংশ আমেরিকান জানিয়েছেন, রাজনৈতিক বিষয়ে একজন পরিচিত স্বাধীন সংবাদ নির্মাতাকে তারা একজন পরিচিত পেশাদার সাংবাদিক কিংবা বড় সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মতোই বিশ্বাস করেন। আরও ৬৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, কে সংবাদ পরিবেশন করছেন, সেটি তার আনুষ্ঠানিক সাংবাদিকতার যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এটি সাংবাদিকতার প্রচলিত পেশাগত ধারণার জন্য বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করেছে সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সুনাম, প্রতিবেদকের পেশাগত প্রশিক্ষণ, সম্পাদকীয় যাচাই এবং তথ্যের নির্ভুলতার ওপর। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন ব্যক্তির পরিচিতি, উপস্থাপনার ধরন, দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা সংবাদ গ্রহণের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে সাংবাদিকতার কর্তৃত্ব এখন শুধু প্রতিষ্ঠানের হাতে সীমাবদ্ধ নেই; ব্যক্তিগত সংবাদ নির্মাতারাও জনমত গঠনে প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন।
তবে এই পরিবর্তনের মধ্যে ভুল তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কেউ সংবাদ পরিবেশন করতে পারেন। কিন্তু সব সংবাদ নির্মাতার তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা কিংবা সম্পাদকীয় জবাবদিহি সমান নয়। এ ক্ষেত্রে জরিপের একটি ফল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৮৬ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, স্বাধীন সংবাদ নির্মাতারা প্রকাশ্যে নিজেদের ভুল সংশোধন করলে তাদের প্রতি বিশ্বাস বাড়ে। গবেষণায় আস্থাসংক্রান্ত বিষয়গুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ফল। অর্থাৎ দর্শক শুধু তথ্য চান না, তারা সংবাদ পরিবেশকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও প্রত্যাশা করেন।
অন্যদিকে প্রচলিত সাংবাদিকতার গ্রহণযোগ্যতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। জরিপে ৭৯ শতাংশ উত্তরদাতা স্বাধীন সংবাদ নির্মাতা এবং পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে অর্থপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা বাড়লেও পেশাদার সাংবাদিকতার বিশেষ ভূমিকা সম্পর্কে মানুষের ধারণা এখনো রয়েছে। তথ্য যাচাই, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় দায়িত্ব এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জরিপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর তুলে ধরেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্বাধীন সংবাদ নির্মাতারা এখন আর প্রচলিত সাংবাদিকতার প্রান্তিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন; তারা সংবাদ পরিবেশনের মূলধারায় প্রবেশ করেছেন। তবে এই পরিবর্তনের অর্থ পেশাদার সাংবাদিকতার অবসান নয়। বরং ভবিষ্যতের সাংবাদিকতায় প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং স্বচ্ছ জবাবদিহির মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। যে সংবাদমাধ্যম দর্শকের আস্থা অর্জন করতে পারবে, তথ্য যাচাইয়ে দায়িত্বশীল থাকবে এবং ভুল হলে তা প্রকাশ্যে সংশোধন করবে, শেষ পর্যন্ত তারাই এই পরিবর্তিত সংবাদজগতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।