রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি-১০) অভিযানের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে কারখানা শ্রমিক মারুফ ওরফে দুখু মিয়ার (২০) মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার এজাহারের সঙ্গে নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে অসংগতি পাওয়া গেছে। পরিবারের দাবি, ঘটনাস্থলে এসআরবি সদস্যরাই গুলি ছুড়েছেন। কিন্তু এজাহারে বলা হয়েছে, দুর্বৃত্তের ছোড়া গুলিতে মারুফ নিহত হয়েছেন।
এছাড়া, মামলার বাদী ও নিহতের মা সেলিনা বেগমের কাছ থেকে থানায় আগে সাদা কাগজে টিপসই নেওয়া হয় এবং এর একদিন পর বৃহস্পতিবার এজাহার লিপিবদ্ধ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে যাত্রাবাড়ীর ধলপুর সিটি পল্লির পাশে ১৪ নম্বর আউটারফল স্টাফ কোয়ার্টারে এসআরবি-১০ এর ছয় সদস্য চারজন মাদক বিক্রেতাকে আটক করেন। এ সময় স্থানীয়দের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার মধ্যে গুলির ঘটনা ঘটে। পাশ থেকে এই ঘটনা দেখার সময় গুলিবিদ্ধ হন মারুফ। দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মারুফ একটি সিলভারের কারখানায় কাজ করতেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, এসআরবি সদস্যরা গুলি ছুড়েছেন। অন্যদিকে এসআরবি-১০ জানিয়েছে, তাদের সদস্যরা আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছুড়েছেন।
এজাহার ও বাদীর বক্তব্যে অসংগতি
এজাহারে বলা হয়েছে, মারুফ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আউটারফল স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে দুষ্কৃতিকারীর ছোড়া গুলিতে আহত হন এবং ৭টা ৫০ মিনিটে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাদী মারুফের মা সেলিনা বেগম চরচাকে বলেন, ‘‘আমি থানায় গিয়ে বলেছি, আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। এখানে উপস্থিত সবাই গুলি ছুড়তে দেখেছে বাহিনীর (এসআরবি) লোকদের। কিন্তু থানায় এজাহারে তা উল্লেখ করা হয়নি।”
সেলিনা বেগম আরও বলেন, “আমি ও মারুফের স্ত্রী মিম আক্তার রুনা গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) মামলা করতে থানায় যান। তখন তার কাছ থেকে একটি সাদা কাগজে টিপসই নেওয়া হয় এবং পরে মামলার বিষয়ে জানানো হবে বলে চলে যেতে বলেন যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহিন। তবে এজাহারে তারিখ লেখা হয়েছে ২৯ অক্টোবর।”
বুধবার টিপসই নিয়ে বৃহস্পতিবার মামলা লিপিবদ্ধ করার কারণ জানতে চাইলে যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু বলেন, ‘‘আমি দুই দিন ছুটিতে ছিলাম। বৃহস্পতিবার জয়েন করেছি। আমি এই বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না।”
যা বলছে সুরতহাল প্রতিবেদন
মামলার সুরতহাল করেন যাত্রাবাড়ী থানার এসআই শাহনেওয়াজ শাহিন। তিনি বলেন, ‘‘নিহতের গলার ডান পাশে একটা এবং পিঠে একটা জখম পাওয়া যায়।” জখম দুটি গুলির কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘তা ঠিক জানি না, ওটা ময়নাতদন্তে বলতে পারবে।”
মারুফকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় সঙ্গে থাকা প্রতিবেশী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘‘গুলি গলার ডান পাশ দিয়ে বাম পাশে পিঠের পিছন দিয়ে বের হয়ে গেছে।”
ভিডিও ফুটেজে যা দেখা গেছে
ঘটনার সময়ের একটি ভিডিও ফুটেজ চরচার প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, সাদা পোশাকে এসআরবির দুই সদস্যের হাতে পিস্তল এবং তাদের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন নারী-পুরুষের বাগবিতণ্ডা চলছে। ভিডিওর একটি অংশে এসআরবির এক সদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘‘ডিরেক্ট গুলি করবো।’’ জবাবে স্থানীয়রা প্রশ্ন তোলেন, সরাসরি মানুষকে গুলি করার কথা তিনি কেন বললেন। তখন এসআরবির এক সদস্য তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন।
সিটি পল্লি ও আউটারফল স্টাফ কোয়ার্টারের মাঝের রাস্তা। ছবি: চরচা
একপর্যায়ে ১৪ নম্বর আউটারফল স্টাফ কোয়ার্টারের গেট লাগিয়ে এসআরবি সদস্যদের আটকে রাখা হয়। এ সময় এক নারীকে বলতে শোনা যায়, ‘‘এই গেইট খুইল্লা দে, তাদের বাইর হইতে দে।” ভিডিওতে এসআরবির ওই দুই সদস্যকে মোবাইল ফোনে কথা বলতে এবং এক কোনায় দুই যুবককে হাতকড়া খোলার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
কোয়ার্টারের দারোয়ান মনু মিয়া (ছদ্মনাম) চরচাকে বলেন, ‘‘গেট খুলে দেওয়ার পর এসআরবি সদস্যরা বেরিয়ে যেতে যেতে কয়েকটি ছিটা গুলি ও একটি আসল গুলি ছোড়েন।” তিনি বলেন, ‘‘ওইটাই মনে হয় মারুফের গলায় লাগে।”
ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন মারুফ
সরেজমিনে দেখা যায়, সিটি পল্লি ও ১৪ নম্বর আউটারফল স্টাফ কোয়ার্টার মুখোমুখি অবস্থিত। মাঝখানে প্রায় ১০ ফুট চওড়া মাটি ও পাথরের রাস্তা। মারুফের বড় বোন রোকসানা বলেন, “গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় কারখানা থেকে ফিরে মারুফ সিটি পল্লির সামনে ভ্যানের ওপর বসে লুডু খেলছিল। গুলির শব্দ শুনে তিনি সিটি পল্লির পেছন দিকে যান এবং সীমানার শেষ প্রান্তে একটি চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলেন। সেখান থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব ১০ থেকে ১৫ গজ।” রোকসানা বলেন, ‘‘এ সময় হঠাৎ সে চায়ের দোকানের চুলার পাশে পড়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে আমার ভাই মারা গেছে।”
চরচার অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসআরবি সদস্যরা যে পথে স্থান ত্যাগ করেন, সেই পথের ধারেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মারুফ। সিটি পল্লির বাসিন্দা রহিমা আখতারও এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আকাশের দিকে ‘ফাঁকা গুলির’ দাবি এসআরবির
এসআরবি-১০ এর কমান্ডিং অফিসার আসাদুজ্জামান চরচাকে বলেন, “মাদকের আখড়া থাকার খবরে তার বাহিনীর ছয় সদস্য ওই স্টাফ কোয়ার্টারে যান এবং ২২৫ পিস ইয়াবা ও ১৩৯ পুরিয়া হেরোইনসহ চারজন মাদক কারবারিকে আটক করেন। হাতকড়া পরানোর পর আটক ব্যক্তিরা চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে সদস্যদের মারধর করে, তাদের মোবাইল ও হাতকড়াসহ আসামিদের ছিনিয়ে নেয় এবং দুজনের পিস্তল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।”
গুলি ছোড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘পিস্তল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার সময় সদস্যরা আকাশের দিকে তাক করে ব্ল্যাংক ফায়ার করেন। এতে মব কিছুটা পিছিয়ে গেলে তারা সরে আসেন।” কয়টি গুলি ছোড়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আকাশের দিকে তারা পাঁচ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন।”
এসআরবির এই কর্মকর্তা বলেন, “এ ঘটনায় এসআরবি বাদী হয়ে দুটি মামলা করেছে। একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মারধর, সরকারি কাজে বাধা ও আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার, অন্যটি মাদকের মামলা।”
সিটি পল্লিতে পুলিশের অভিযান ও উচ্ছেদের হুমকির অভিযোগ
বাসিন্দাদের দাবি, গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুই দফা অভিযান চালিয়ে পুলিশ সিটি পল্লি থেকে ৩০ থেকে ৪০ জনকে আটক করেছে। হালিমা খাতুন নামে এক নারী বলেন, ‘‘বৃহস্পতিবার পুলিশ এসে এখানের প্রতিটা বাসায় তল্লাশি করে। মাদক পায় নাই, তবে অনেককে ধরে নিয়ে গেছে। মৃতের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসে, তাদেরও ধরে নিতে চায়।”
গতকাল শনিবার সকালে মারুফের বড় বোন রোকসানা চরচাকে বলেন, ‘‘সকাল ১০টার দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামি এসে তাদের ওই রাতের মধ্যে জায়গা খালি করতে বলেন।” খালি না করলে পরদিন সবাইকে বের করে ঘর ভেঙে ফেলা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে মল্লিক আহসান উদ্দিন সামির সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা এবং বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।