সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েকবছর ধরে নতুন কিছু ভাইরাল গ্রুপ আর পেজের দেখা মিলছে। ‘বাস লাভার’, ‘ট্যুর বাস লাভার’, ‘বাস স্পটার’ নামের অনেক গ্রুপ আর পেজ দেখা যায় ফেসবুকে। এই গ্রুপ বা পেজগুলোয় বাস নিয়ে নানা ধরনের ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এসব গ্রুপের সদস্য বা পেজের অ্যাডমিনরা কিছুদিন পরপরই বাস ভাড়া করে দূরপাল্লার ট্যুরের আয়োজন করে থাকে।
এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু গ্রুপ বা পেজগুলো ভাইরাল হওয়ার জন্য ট্যুরে গিয়ে অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বাস চালানো, ওভারটেকিং, হঠাৎ বাঁক নেওয়া (বাউলি মারা), ঝুঁকিপূর্ণ মোড় ঘোরার ভিডিও তৈরি করে। এ ধরনের কনটেন্ট তৈরির জন্য বাসের চালক ও সহকারীদেরকে উসকানি দেন খোদ যাত্রীরা। একই সাথে চালকরাও অত্যুৎসাহী হয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস চালান কনটেন্টের জন্য।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার কারণে বিভিন্ন বাসের চালকরাও জনপ্রিয় হয়েছেন বাস লাভার জাতীয় গ্রুপ আর পেজগুলোর বরাতে। বাস চালকদের চালানোর স্টাইলের ওপর ভিত্তি করে তাদের বিভিন্ন নাম দেওয়া হয় ভিডিওর ক্যাপশনে। এমন কয়েকজনের নাম হলো- কেরালা সাহাদাত, কাঁচা বাবু, অস্থির কোয়েল, পলাশ কমান্ডার, আজিজ শো, টাইগার ড্রাইভার। ভিডিওতে দেখা যায়, চালকদের অনেকে নাচতে নাচতে কিংবা আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাস চালাচ্ছেন। এ ধরনের কাজ করে চালকরা পান ‘সেলেব্রিটি’ তকমা।
বাস চালানোর ধরন, ওভারটেকিং, গতির ওপর ভিত্তি করেও বিভিন্ন নাম দেওয়া হয় ভিডিওর ক্যাপশনে। সেগুলো হলো- গ্যাপ শর্ট (দুই বাসের ফাঁক দিয়ে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে যাওয়া), পাগলামি, জিন ভর করা, হট সিট, গাড়ির খেলা, কাটিং, বাম্পার টু বাম্পার (একটি বাসের পিছনে একদম লাগিয়ে আরেকটি বাস চালানো), কড়া বাউলি, পাতি ভাংগা বাউলি, মাপা গ্যাপ ইত্যাদি।
এ ধরনের ভিডিওগুলো করার জন্য বাস নিয়ে যাওয়া হয় দেশের জাতীয় মহাসড়কগুলোয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাতীয় মহাসড়কের সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৫২১টি। এর মধ্যে বাস সম্পৃক্ত ছিল মোট দুর্ঘটনার ১৪ দশমিক ৫১ শতাংশে।
বাস ভালোবাসলেই কী উচ্ছৃঙ্খল হতে হয়?
দ্রুতগতিতে যানবাহন চালানো নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। মহাসড়কে দ্রুতগতিতে যান চালানোর নিয়ম আছে। কিন্তু যখন বেপরোয়াভাবে দ্রুতগতিতে বাস চালানো হয় শুধুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বা রিল দিয়ে ভাইরাল হওয়ার জন্য, তখন সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কয়েকটি ‘বাস লাভার’ গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে চরচা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানিয়েছে, গ্রুপের সদস্যরা বাস চড়তে ভালোবাসে। নতুন কোনো বাস কবে দেশে আসছে, কোন কোম্পানি তাদের বহরে কী বাস যুক্ত করেছে, কোন কোম্পানির বাস রাস্তায় সবচেয়ে ভালো কিংবা খারাপ চলে-এমন নানা বিষয়ে তারা খোঁজ রাখার চেষ্টা করে। এগুলো নিয়েই তারা মূলত ফেসবুকের গ্রুপ কিংবা পেজগুলো চালায়।
গ্রুপ বা পেজে আপলোড করা ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস চালানোর কয়েকটি ভিডিও তাদেরকে দেখানোর পর পাওয়া গেছে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। ফেসবুকে বাংলাদেশের অন্যতম বেশি সদস্যের গ্রুপ ‘বাস লাভার’-এর একজন অ্যাডমিন নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “আমরা যারা বাস-লাভার আছি, জোরে বাস চালাইলে অনেক আনন্দ পাই। যখন তখন এক্সিডেন্ট হয়ে যাইতে পারে- এই ভয় আমাদের নাই। আমরা বাস ভাড়া করার সময় এমন ড্রাইভার বেছে নেই যার কন্ট্রোল ফার্স্ট ক্লাস।”
এসব পেজ ও গ্রুপের অ্যাডমিন ও মডারেটরা জানিয়েছেন, দুইভাবে ভিডিও করা হয়। একটি হলো বাসের ভেতর থেকে; আরেকটি বাস থেকে নেমে একটু সামনে দাঁড়িয়ে। ওভারটেকিং, দ্রুতগতিতে চালানো- এ ধরনের ভিডিওগুলো করা হয় বাসের ভেতর থেকে। আর বাউলি মারার ভিডিওগুলো করা হয় বাইরে থেকে।
‘বিডি বাস ভ্লগার’ গ্রুপের একজন মডারেটর বলেন, “বাইক জোরে চালায়ে যেভাবে অনেকে মজা পায়, আমরা বাস জোরে চালাইলে মজা পাই। অ্যাডভেঞ্চারাস বাস ট্রিপ প্রতি মাসেই দেই আমরা। ভিডিও করে ফেসবুকে ছাড়লে মিলিয়ন ভিউ পার হয়, সেখান থেকে যেই আয় হয়- সেই টাকা দিয়েই আমরা আবার ট্রিপ দেই। আমার জানামতে এভাবে কোনো এক্সিডেন্ট এখনো হয়নি।”
তবে ওই মডারেটরের দুর্ঘটনা না হওয়ার দাবি সঠিক নয়। ‘বাংলাদেশ বাস স্পটার’ নামক একটি দল গত ২০ আগস্ট শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস ভাড়া করে কক্সবাজার যায়। পরদিন ভোরবেলা ঢাকা ফেরার পথে ফৌজদারহাটে সি-সাইড ফিলিং স্টেশনে বিরতি নিয়ে মহাসড়কে ওঠার পরই বাসটি হঠাৎ বাউলি মারে। তখন দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ধ্রুবজিৎ রায় আপন (২৬)। বাস দ্রুতগতিতে হঠাৎ বাউলি মারার কারণে দরজা থেকে পড়ে যান তিনি। বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। আপনের লাশ সেখানেই ফেলে বাস নিয়ে পালিয়ে যান বাস চালক ও তার বাস লাভার গ্রুপের সদস্যরা।
বাসটি চালাচ্ছিলেন ফেসবুকের ভাইরাল ড্রাইভার ‘অস্থির কোয়েল’। এই ঘটনায় একটি দুর্ঘটনা মামলা হলেও পুলিশ বাস আটক কিংবা এর চালককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
বাস কর্তৃপক্ষ যা বলছে
বাস লাভার গ্রুপের সদস্যরা কোথা থেকে ভাড়া করেন এসব বাস? এর সন্ধান করতে চরচা এই প্রতিবেদক যান মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে। ফেসবুক ও ইউটিউবে আপলোড করা বেশ কিছু ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি ভাড়া করা হয় হিমাচল, নীলাচল, ঈগলসহ আরও কয়েকটি মাঝারিপাল্লার বাস। ৪০ বা ৪৫ সিটের এসব বাস ভাড়া করা হয় ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায়।
হিমাচল বাসের ম্যানেজার নাদিমের সাথে সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তাদের কোম্পানির বাস কেন এভাবে ব্যবহার হচ্ছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এগুলায় কোম্পানি বা ড্রাইভারের কোনো দোষ নাই। যারা এসব ট্যুরের জন্য বাস ভাড়া করে, তারাই ড্রাইভারদেরকে উসকানি দেয় ওইভাবে চালানোর জন্য। ড্রাইভার তাদের কথা না শুনলে দুর্ব্যবহারও করে অনেক সময়। এমন ভিডিও আমাদের চোখে পড়লে আমরা বাসের নাম্বার দেখে সাথে সাথেই ড্রাইভারদেরকে শাস্তির ব্যবস্থা করি। যারা বাস ভাড়া করে এসব ভিডিও বানায়, তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব তো আমাদের না।”
মহাসড়কে বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খলভাবে বাস চালানো রোধে নেওয়া পদক্ষেপ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এস এম আহাম্মেদ খোকন চরচাকে বলেন, “মহাসড়কে অনিয়ম ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস চালনার বিষয়ে আমরা হাইওয়ে পুলিশকে অবহিত করেছি, যাতে তারা জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পাশাপাশি আমাদের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির জেলা কমিটিগুলোকে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যাতে বিপজ্জনকভাবে চলাচলকারী এসব পরিবহনের বিরুদ্ধে জেলাপর্যায়ে দ্রুত প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল ও আঞ্চলিক রুটের প্রতিযোগিতা বিষয়ে তিনি বলেন, “ঢাকা থেকে চলাচলকারী বড় বা নামী পরিবহনগুলোতে সচরাচর এমন ঘটনা ঘটে না। মূলত এক জেলা থেকে আরেক জেলায় চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে টাইম শিডিউল ও পাল্লাপাল্টির কারণে বিপজ্জনক ড্রাইভিং বেশি দেখা যায়। বাস লাভার গ্রুপগুলোতে আমরাও নজর রাখছি। এ ধরনের কোনো বাউলি বা ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনার ভিডিও নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মহাসচিবের নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিকদের ডেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান মহাসড়কে ভাইরালের নেশায় এমন বেপরোয়া বাস চালানোর বিষয়ে বলেন, “এ বিষয়টা আমাদের সামনে আগে তেমনভাবে আসে নাই। কিন্তু এখন এ ধরনের ভাইরাল ভিডিওর কারণে সাধারণ যাত্রীদের আর রাস্তার অন্যান্য গাড়ি যদি ঝুঁকির মুখে পড়ে, তবে অবশ্যই এ বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সংবাদমাধ্যমেও এই বিষয়টা নিয়ে তেমনভাবে প্রচার-প্রচারণা আমরা দেখি না। সবাই মিলে এগিয়ে আসলে, অবশ্যই আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা করার জন্য জোরালোভাবে সুপারিশ জানাব।”
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি শামসুল আলম চরচাকে বলেন, “হাইওয়েতে ২৫-৩০ কিলোমিটার পরপরই আমাদের থানা বা ফাঁড়ি আছে। এছাড়াও আছে এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা। আমাদের ক্যামেরায় এমন বিপজ্জনক ড্রাইভিং নজরে এলেই আমরা ব্যবস্থা নিই। এ বিষয়ে কেউ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ অভিযোগ জানায়নি। ভাইরাল হওয়ার জন্য এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে আমরা অভিযান চালাব।”