দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে এক বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে এই এক বছর শেষে বর্ষপূর্তির ক্ষণে দাঁড়িয়ে রাকসুর সফলতা ও ব্যর্থতার হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রতিনিধি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে মতভেদ। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজেদের ‘শতভাগ সফল’ দাবি করলেও বিরোধী ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকের কাছে এটি ‘৩৫ বছরের অপেক্ষার পর ব্যর্থতার খতিয়ান’ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব কাজের ফারাকে এখন প্রশ্নবিদ্ধ রাকসুর ছাত্র নেতৃত্ব।
রাজশাহীসহ দেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এই অধ্যাদেশের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
১৯৫৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন (রাসু) নামে প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। পরের বছর একই নামে আরও একটি নির্বাচন হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নাম হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ১৫ বার নির্বাচন হয়েছে। সবশেষ জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর ১৭তম রাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিবির-সমর্থিত প্যানেল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। নির্বাচনের ১০ দিন পর ২৬ অক্টোবর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেন।
মেয়াদ শেষের ক্ষণে রাকসুর কার্যক্রম ও গত এক বছরের পারফরম্যান্স নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন প্যানেলের প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ ছাত্রনেতারা।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট রাবি শাখার আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, “দীর্ঘ ৩৪ বছর পর শিক্ষার্থীরা যে রাকসু পেয়েছিল, তা গণদাবি বাস্তবায়নের বদলে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের দলীয় এজেন্ডা পূরণে ব্যবহৃত হয়েছে। শুরু থেকেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে ইসলামিক বা কাওয়ালি ঘরানার আয়োজন করা এবং পাঠচক্রে জামায়াত-শিবির সমর্থিত ব্যক্তিদের অতিথি করে আনা হয়েছে।”
রাতুল বলেন, “অনিয়ম ও দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশের পর রাকসু কিছু কাজ শুরু করলেও তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা ছিল না।” সোয়া কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ হলেও তা শিক্ষার্থীদের জন্য বা সাংস্কৃতিক খাতে কী পরিবর্তন এনেছে, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে সফলতার দাবি তুলে রাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মুস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “বিগত ১৬টি রাকসুর চেয়ে এই এক বছরে রাবির প্রতিটি বিভাগ ও হলে সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারও আগের চেয়ে সমৃদ্ধ ছিল এবং তারা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করেছেন।”
তার দাবি, অতীতে ক্ষমতাসীনদের ‘টর্চার সেল, সিট বাণিজ্য, দোকানে ফাও খাওয়া ও টেন্ডারবাজির’ মতো যে অপসংস্কৃতি ছিল, নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে তারা তার একটিও স্পর্শ করেননি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
গণতান্ত্রিক ছাত্র গণমঞ্চের সভাপতি নাসিম সরকার বলেন, “দীর্ঘ অপেক্ষার পর নির্বাচিত এই রাকসু সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো ভূমিকাই দেখাতে পারেনি এবং হতাশা ছাড়া কিছুই দেয়নি। তারা একটি নির্দিষ্ট দলীয় প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়ে তাদের নিজস্ব এজেন্ডাই শুধু বাস্তবায়ন করেছে।”
রাকসুতে নির্বাচিতদের মধ্যে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার চেয়ে ‘সন্ত্রাসী মনোভাব’ বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিজের কার্যকালের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “এক বছরের মেয়াদে প্রথম পাঁচ মাস তাদের ফান্ড উদ্ধার, ফাইলপত্র বা রেজুলেশন লেখার নিয়ম শিখতেই চলে গেছে, কারণ কোনো পূর্বসূরি প্রতিনিধি ছিলেন না। মূলত সাত মাসের মতো তারা কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। সীমাবদ্ধতার মাঝেও তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন যেন রাকসু প্রাণবন্ত থাকে।”
নানা সময়ে তুমুল আলোচিত-সমলোচিত রাকসুর এই জিএসের দাবি, তার দপ্তরে সমস্যা নিয়ে আসা কোনো শিক্ষার্থীকেই তিনি খালি হাতে বা সাহায্য ছাড়া পাঠাননি। এছাড়া ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক বা মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়াটাকেও তিনি একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখেন।
রাকসুর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়া প্রসঙ্গে রাবি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, “এটি শিক্ষার্থীদের হতাশা ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। নির্বাচনে দেওয়া চটকদার ম্যানিফেস্টো বা রোডম্যাপের কিছুই তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বরং ক্যাম্পাসজুড়ে শিবিরের আধিপত্য বিস্তার, বড় পরিসরে ভুরিভোজ ও গ্র্যান্ড ইফতারের মতো একবেলার কিছু কর্মসূচি দিয়েই তারা সীমাবদ্ধ ছিল।”
জুলাই ২৬ হলের সুপ্রভা স্বতন্ত্র প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “শিবিরের দলীয় প্যানেল সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় বহু ক্ষেত্রে তারা তাদের নিজেদের এজেন্ডাই চাপিয়ে দিয়েছে।”
সুপ্রভা বলেন, স্বতন্ত্র প্রতিনিধি হিসেবে নিজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাকে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি তিনি পূরণ করতে পারেননি। তবে রাকসুর কিছু কাজ অবশ্যই হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাবি শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘ ৩৫-৩৬ বছর পর নির্বাচন হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অধিকার ফিরে পাওয়ার অনেক বড় আশা করেছিল। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজেদের এক গাদা ইশতেহারের মধ্যে ২০-২৫ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তারা শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ও মৌলিক চাহিদা পূরণে নজর না দিয়ে শুধু তাদের দলের স্বার্থে কাজ করে গেছে।”
রাকসুর কার্যক্রমকে ‘সফলতা ও সীমাবদ্ধতার মিশ্রণ’ হিসেবে অভিহিত করে আরেক শিক্ষার্থী তানজিমুল হক বলেন, “নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাকসুর নিজস্ব পুরো স্বাধীনতা থাকে না, প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে হলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিতর্ক ক্লাব ও খেলাধুলার মতো কিছু ভালো কাজ তারা করেছে। বিপরীতে সাংস্কৃতিক, বিজ্ঞান ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদকদের কোনো দৃশ্যমান কাজ বা কার্যক্রম চোখে পড়েনি।”
রাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক স্বপ্না আক্তার রাকসুর প্রতিনিধিদের সম্পূর্ণ ‘ব্যর্থ’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “১২ মাসে ২৪টি চটকদার ইশতেহার দিয়ে তারা মিথ্যা আশ্বাস ছড়িয়েছে। রাবিকে শতভাগ আবাসিক করা কিংবা অনাবাসিকদের ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কোনোটিই তারা পূরণ করতে পারেনি।”
প্রশাসনের করা কাজের ক্রেডিট নেওয়া এবং নির্বাচনে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি না করার কথা বলে জয়ী হয়ে পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রচারণা করার তীব্র নিন্দা জানান তিনি।
আরেক শিক্ষার্থী কাজী মামুন হায়দার বলেন, “নির্বাচন পরবর্তী দীর্ঘদিনের মূল চাওয়া ও মৌলিক সমস্যাগুলো অলক্ষ্যে রয়ে গেছে। বিশেষ করে হলের ডাইনিংয়ের খাবারের মানোন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান উন্নত হয়নি- যেখানে যেকোনো সমস্যায় শুধু ‘প্যারাসিটামল’ পাওয়া যায় বলে শিক্ষার্থীরা রসিকতা করে এটিকে ‘নাপা সেন্টার’ বলেন। মৌলিক চাহিদা, ক্লাসরুমের পরিবেশ ও শিক্ষা ব্যবস্থার যে প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে ছিল, তার প্রতিফলনে শিক্ষার্থীরা এখনো চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়েই যাচ্ছেন।”