দেশের ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিলের অর্থ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ৪১টি ব্যাংকের তহবিল থেকে একটি ট্রাস্টের নামে ২৭৬ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা, বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের নথি নিয়ে নিরীক্ষার আপত্তি এবং নির্ধারিত খাতে ব্যয়ের ঘাটতি এই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ও তদারকি ব্যবস্থা থাকলেও অর্থ বরাদ্দ, প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদারকে আসামি করা হয়েছে। দুদকের অভিযোগ–২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে ৪১টি তফসিলি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। দুদকের অভিযোগ, ট্রাস্টটির সরকারি অনুমোদন ছিল না। ঘোষিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রমাণও অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
দুদক আরও বলছে, বিএবির তৎকালীন সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির একটি বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরে বিভিন্ন বৈঠকে ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
টাকার পরিমাণ ও ব্যাংকের সংখ্যা বিবেচনায় ঘটনাটি সিএসআর তহবিলের বরাদ্দপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এখানে ৪১টি ব্যাংকের অর্থ একটি ট্রাস্টের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিটি ব্যাংক আলাদাভাবে প্রকল্প নির্বাচন করে অর্থ ব্যয় করেছে, নাকি ব্যাংকারদের সংগঠনের সিদ্ধান্তের প্রভাবে অর্থ বরাদ্দ করেছে, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান চরচাকে বলেন, “আগে ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক বিভিন্ন উদ্যোগে ব্যয় হতো। এতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে অনেক ব্যাংকের মুনাফা ও আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণও কমেছে। তবে আসলে এই খাতের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সেটা দেখা জরুরি।”
সিএসআর অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম আছে আরও
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের বাইরে ব্যাংকের সিএসআর তহবিলের অর্থ আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগে ব্যয় হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২৯টি ব্যাংকের অনুদান নিয়ে করা নিরীক্ষায় দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, সূচনা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদও অনুদান পেয়েছে। ১০ বছরে এসব প্রতিষ্ঠান ও তহবিলসহ বিভিন্ন খাতে মোট ১ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। নিরীক্ষায় ৫৩৩ কোটি টাকার ব্যয় অনুকূলে প্রয়োজনীয় নথি পাওয়া যায়নি। এসব অর্থ এমন খাতে ব্যয় করা হয়ে থাকতে পারে, যা সিএসআর হিসেবে ব্যয় হওয়ার নিয়ম নেই। আর সিএসআর খাতে ব্যয় করার নিয়মই হলো, কোন খাতে সেই টাকা ব্যয় হচ্ছে সেটার সমস্ত নথি দেখাতে হবে। নথি দেখাতে না পারলে সেটা অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত হবে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের গণভোটের প্রচারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও উদ্যোগে ব্যাংক খাতের সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ ব্যয়ের ঘটনাও বিতর্ক তৈরি করে। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব সিএসআর তহবিল থেকে স্টুডেন্টস অ্যাগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশনকে ১ কোটি টাকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এবিবি) তহবিল থেকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে যথাক্রমে ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা ও ২০ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এ ব্যয়ের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তখন বলেছিলেন, “গণভোটে সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল সংস্কার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং জনস্বার্থে উদ্যোগটিকে সমর্থন করা, কোনো ব্যক্তিগত লাভ অর্জন নয়। এ কারণে সিএসআর তহবিল ব্যবহার নৈতিকভাবে যুক্তিসংগত ছিল।”
এসব ঘটনার বাইরে ব্যাংকগুলো নিজেদের পরিচিত ব্যক্তি, পরিচালক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে সিএসআর অর্থ ব্যয় করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যেমন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। কারণ এই খাতে ব্যয়ের অনুমোদন ছিল না পরিচালনা পর্ষদের। এক বা একাধিক কর্মকর্তার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে এই অর্থ ব্যয় হয়েছিল–এমন তথ্য উঠে আসে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট প্রতি ৬ মাস পরপর তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের ব্যয়ের বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা নেয়। সিএসআর খাতের বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে শিক্ষাবৃত্তি, স্বাস্থ্যসেবা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো নির্ধারিত জনকল্যাণমূলক খাতগুলোতে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি ও পরিদর্শন করা হয়। মাঝে মাঝে ব্যাংকগুলোকে পৃথকভাবে চিঠিও দেওয়া হয়।
পরিচালকদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অর্থ বরাদ্দে নিষেধাজ্ঞা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি জারি করা ‘পলিসি গাইডলাইনস অন করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ফর ব্যাংকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস’-এর ১৩.৯ ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের, জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের এবং তাদের সিএসআর ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টিদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা যাবে না।
এই নির্দেশনার অর্থ হলো, ব্যাংকের কোনো পরিচালক যে প্রতিষ্ঠানের মালিক, সেখানে সিএসআর তহবিল বরাদ্দের সুযোগ নেই। একইভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ স্বার্থ রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞাটি প্রযোজ্য হতে পারে। শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাঠালেও প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা আড়াল করা যায় না।
নীতিমালার ১৩.৭ ধারায় সিএসআর কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাইরের সংস্থা, এনজিও বা তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সুনাম যাচাই করতে বলা হয়েছে। ১৩.৮ ধারায় ব্যাংকের নিজস্ব ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, কোনো ব্যাংক তার নিজস্ব ফাউন্ডেশনে অর্থ দিয়েছে, শুধু এই তথ্য দিয়ে অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। ফাউন্ডেশন অর্থ কোথায় ব্যয় করেছে এবং চূড়ান্ত সুবিধাভোগীর সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালক বা ট্রাস্টির কোনো স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিই মূল যাচাইয়ের বিষয়।
এ প্রসঙ্গে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ চরচাকে বলেন, “সিএসআর নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। এই তহবিলের ব্যবহার আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই অর্থ অনেক সময় অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়। ব্যাংক কর্মকর্তারাও বিভিন্ন সময় বলেছেন, প্রভাবশালীদের চাপে সিএসআর বরাদ্দ অন্য খাতে দেওয়া হয়েছে। তাদের সেই বক্তব্য ধরেই যদি বলি, তাহলে সিএসআর তহবিলের বরাদ্দ প্রক্রিয়া ও প্রকৃত সুবিধাভোগী যাচাই প্রয়োজন।”
তিন বছরে সিএসআর ব্যয় কমেছে ৪৫ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশের ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে ১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা ব্যয় করে। ২০২৩ সালে এই ব্যয় কমে ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে তা আরও কমে ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে সিএসআর ব্যয় কমে প্রায় ১৮ শতাংশ। পরের বছর কমে প্রায় ৩৩ শতাংশ। দুই বছরের ব্যবধানে মোট ব্যয় কমেছে ৫১৩ কোটি টাকার বেশি, যা প্রায় ৪৫ শতাংশ।
নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর মোট সিএসআর ব্যয়ের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শিক্ষা, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্য এবং ২০ শতাংশ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যয় করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের খাতভিত্তিক তথ্য বলছে, এসব খাতে ব্যয়ের হার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ছিল। বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলো শিক্ষা খাতে ৬৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা মোট সিএসআর ব্যয়ের ২০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে এ খাতে ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকায়, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে প্রথম ছয় মাসে ৭১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বা ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ ব্যয় হয়।
পরের ছয় মাসে তা বেড়ে ৮২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা হলেও মোট ব্যয়ের প্রায় ২৭ শতাংশে সীমিত থাকে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যয় প্রথম ছয় মাসে ছিল ৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা পরের ছয় মাসে বেড়ে ১৫ কোটি ২ লাখ টাকা হয়। তবে দুই সময়েই এ খাতে ব্যয় নির্ধারিত ২০ শতাংশের অনেক নিচে ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের সিএসআর-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে ব্যাংক খাতের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং তাদের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যের একটি স্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বছরে মোট সাতটি ব্যাংক সিএসআর খাতে কোনো অর্থই ব্যয় করেনি। এ তালিকায় থাকা বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক ইতোমধ্যে বড় ধরনের আর্থিক চাপে জর্জরিত। ২০২৪ সাল শেষে এসব ব্যাংকের কয়েকটির বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালে জারি করা নীতিমালায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মতো খাতগুলোতে ব্যয়ের আনুপাতিক হার ঠিক করে দেওয়া হলেও সব ব্যাংকের জন্যই প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সিএসআরে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক নয়। এই নীতিমালায় বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের পর অনুমোদন পাওয়া ১৩টি নতুন ব্যাংকের জন্য তাদের আগের বছরের নিট মুনাফার অন্তত ১০ শতাংশ অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে সিএসআর খাতে ব্যয় করার শর্ত রয়েছে। তবে ব্যাংক লোকসান করলে সেই বাধ্যবাধকতা আর থাকে না।
সিএসআর নীতিমালা না মানা কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ?
সরাসরি কোনো আইনি সাজা বা অর্থদণ্ড নেই। তবে সিএসআর নীতিমালা না মানলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত ব্যাংকগুলোর টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বিবেচনা করে ‘সাসটেইনেবিলিটি রেটিং’ প্রকাশ করে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক ঝুঁকি ও আর্থিক স্বাস্থ্য মাপতে ব্যবহৃত ‘ক্যামেলস’ রেটিংয়েও সিএসআরের পারফরম্যান্সের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সিএসআরে পিছিয়ে থাকলে বা নির্দেশনা অমান্য করলে এসব রেটিং কমে যায়। এতে আর্থিক বাজারে ব্যাংকের ভাবমূর্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা কমে যায়।
এ ছাড়া সিএসআর নীতিমালা না মানলে মাশুল গুণতে হয় ব্যাংকের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে। যেসব ব্যাংক সিএসআর নীতিমালা অমান্য করে বা সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নতুন কোনো শাখা, উপ-শাখা বা বুথ খোলার আবেদনে অনুমোদন দিতে অনীহা প্রকাশ করে। এ ছাড়া অফশোর ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স প্রদান, বৈদেশিক বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানো কিংবা বিশেষ ব্যবসায়িক নমনীয়তা পাওয়ার ক্ষেত্রগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। অর্থাৎ, সরাসরি নগদ টাকা জরিমানা না করলেও পরোক্ষভাবে ব্যাংকের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ও পরিধি আটকে দেওয়ার মাধ্যমেই নীতিগত শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়।
সিএসআর অর্থের ব্যবহার যাচাইয়ের দায়িত্ব কার
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার ১৪ নম্বর ধারায় সিএসআর কার্যক্রমের তদারকি, অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। ১৫ নম্বর ধারায় সিএসআর কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশ ও বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সিএসআর ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যাংকভিত্তিক তথ্য প্রকাশও গুরুত্বপূর্ণ। কোন ব্যাংক কোন প্রতিষ্ঠানকে কত টাকা দিয়েছে, অর্থ কোন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে এবং প্রকল্পের ফলাফল কী, তা প্রকাশ করা হলে অর্থের ব্যবহার যাচাই করা সহজ হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালকদের সঙ্গে অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও স্বার্থের সম্পর্ক যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর নীতিমালার ১৩.৯ ধারায় ব্যাংকের পরিচালক, জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এবং সিএসআর ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টিদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। নীতিমালার ১৪ নম্বর ধারায় সিএসআর কার্যক্রমের তদারকি, অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণের বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান চরচাকে বলেন, “ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়ের জন্য। এ অর্থ কোন খাতে, কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয়ের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে। কোনো ব্যাংকের ব্যয়ের নথিতে অসংগতি কিংবা নীতিমালার ব্যত্যয় পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়। তারপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে সতর্ক করা এবং অনিয়মের ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”