রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা নাজমা আক্তার। শাশুড়ি ও জায়ের সঙ্গে পারিবারিক মনোমালিন্য থেকে একদিন বাগবিতণ্ডা, পরে মারধরের শিকার হন তিনি। নির্যাতনের শিকার হয়ে সাহায্য চেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করেন নাজমা। তার কল পেয়ে সংশ্লিষ্ট থানা থেকে পুলিশও আসে। কিন্তু যে প্রতিকার পাওয়ার আশায় তিনি জরুরি সেবায় যোগাযোগ করেছিলেন, তা আর মেলেনি।
নাজমার অভিযোগ, পুলিশ তার বাসায় পৌঁছানোর আগেই স্বামী সেখানে উপস্থিত হন। এরপর পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে বসে পারিবারিক আলোচনা। কিন্তু অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে তাকে পারিবারিক বিষয় নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে ‘মানিয়ে নেওয়ার’ উপদেশ দিয়ে চলে যান। এরপর আবারও স্বামী ও শাশুড়ির হাতে মারধরের শিকার হন তিনি।
নাজমার ভাষায়, “পুলিশ যদি আমার অভিযোগগুলো আমলে নিত, তাহলে দ্বিতীয়বার নির্যাতনের শিকার হতে হতো না।”
নিজের সুরক্ষার জন্য জরুরি সেবা নম্বরে কল করে নাজমার হয়েছে এক তিক্ত অভিজ্ঞতা। তার মনে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আর তা হলো- নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ কতটা ভূমিকা রাখছে?
জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়া হয়। জরুরি সেবার নীতিমালায় জীবন বিপন্ন হতে পারে এমন ঘটনাকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে নারী ও শিশুর প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতা, হয়রানি, সম্মানহানি ও ইভটিজিংয়ের বিষয়টিও আলাদাভাবে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা জরুরি সেবার কার্যপরিধির বাইরে নয়। বরং এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে এই ব্যবস্থায়।
জরুরি সেবার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নারীদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় ২৭ হাজার ৯১১টি সেবা দেওয়া হয়েছে। এই সংখ্যা দেখায়, নারী নির্যাতনসংক্রান্ত অভিযোগ ও সহায়তার ক্ষেত্রে জরুরি সেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সহিংসতার চিত্র বলছে ভিন্ন কথা
হিউম্যান রাইট সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য বলছে, গত নয় মাসে সারা দেশে দুই হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার ৩৯২ জনের বয়স ১৮ বছরের কম। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে।
এছাড়া ৬৯৬ জন নারী ও শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩২ জন নারী, আহত হয়েছেন ৩৫ জন। একই সময়ে পাঁচজন নারী আত্মহত্যা করেছেন।
অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যেও নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র উঠে এসেছে উদ্বেগজনকভাবে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৩৩৯ জন। এসব ঘটনার মধ্যে ১৪৯টির ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে মামলা হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলোর প্রায় অর্ধেক পুলিশের নজরের বাইরে থেকে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৮ জনকে পরিবারের সদস্যরা হত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে ৩২ জনকে হত্যা করেছেন স্বামী। এছাড়া, ৯৭ জন আত্মহত্যা করেছেন।
একই সময়ে ৫১৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৬ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ২০০ নারী। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮১ জন এবং হত্যা করা হয়েছে ৪২ জনকে।
এছাড়া, ২০ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও জানিয়েছে আসক। তাদের মধ্যে দুজন নির্যাতনে নিহত হয়েছেন। গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় ১৪টি মামলা হলেও বাকিগুলোতে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তথ্যটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জরুরি নম্বরে কল করেও সময়মতো সাড়া পাননি সুফিয়া
রাজধানীর একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন সুফিয়া খানম। বনশ্রীর বাসিন্দা সুফিয়া প্রশ্ন তুলেছেন জরুরি সেবার দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে। তিনি দাবি করেন, অভিযোগের পর ঘণ্টাখানেক সময় গেলেও পুলিশের তরফ থেকে তিনি কোনো সহায়তা পাননি।
সুফিয়া জানান, এক রাতে পাশের বাসায় রাত ২টার দিকে এক দম্পতির মধ্যে মারামারি চলছিল। একপর্যায়ে তাদের একজন ছুরি দিয়ে অন্যজনকে আঘাত করেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে সুফিয়া ৯৯৯-এ ফোন করেন।
সুফিয়া দাবি করেন, কলে অবস্থান জানার পর তাকে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট থানা থেকে যোগাযোগ করা হবে। কিন্তু এক ঘণ্টা পার হলেও পুলিশের কোনো সাড়া পাননি তিনি। পরে আবার ৯৯৯-এ ফোন করে নিজের পরিচয় জানানোর পর পুলিশ আসে। এমন পরিস্থিতিতে সহায়তা পৌঁছাতে অনিশ্চিত সময় লাগলে যে কারও জীবন বিপন্ন হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই ব্যাংক কর্মকর্তা।
ভুক্তভোগী নিজে অভিযোগ করতে না পারলে কী হবে?
নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক সময় ভুক্তভোগী নিজেই সাহায্য চাইতে পারেন না। পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ, আটকে রাখা কিংবা যোগাযোগের সুযোগ না থাকার কারণে অন্য কাউকে এগিয়ে আসতে হয়। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তি সাহায্য চাইলে জরুরি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
পরিবারের অপছন্দে বিয়ে করেন রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সামিয়া তন্বী। তন্বীর অভিযোগ, পরিবার এই বিয়ের সম্পর্কে জেনে যায়। এরপর তাকে মারধর করে বাসায় আটকে রাখা হয়। নিজের ফোনও তার কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হয়।
এমন পরিস্থিতিতে তন্বী বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টে (ব্লাস্ট) মেইল করে সাহায্য চান। এরপর ব্লাস্টের পক্ষ থেকে জরুরি সেবা নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। তবে ভুক্তভোগী নিজে যোগাযোগ না করায় কোনো সহায়তা করা হয়নি।
তন্বী চরচাকে বলেন, “আমার ফোন নিয়ে ফেলা হয়েছে তাই আমি ব্লাস্টকে মেইল করেছিলাম, আমাকে উদ্ধার করতে। আমার যদি সুযোগ থাকত আমি নিজেই ৯৯৯ এ কল দিতাম।”
তিনটি হটলাইন, কিন্তু ৯৯৯-এর সঙ্গে সমন্বয় কোথায়?
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এক বছর আগে তিনটি হটলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। নম্বরগুলো হলো- ০১৩২০০০২০০১, ০১৩২০০০২০০২ ও ০১৩২০০০২২২২।
কিন্তু জরুরি সেবা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেওয়া এই তিনটি নম্বরের সেবা তারা দেয় না। তাদের সিস্টেমে নম্বরগুলো নেই।
এসব অভিযোগ নিয়ে যা বলছে পুলিশ
জাতীয় জরুরি সেবার প্রধান পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মহিউল ইসলামকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ যদি ভুক্তভোগীকে ‘মানিয়ে নেওয়ার’ পরামর্শ দেয়, সেটি তাদের কাজ কি না। এমন প্রশ্নের উত্তরে মহিউল ইসলাম চরচাকে বলেন, ‘‘এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা বিস্তারিত বলতে পারবে। তাদের (জরুরি সেবা) কাজ ভুক্তভোগীর সঙ্গে শুধু সংশ্লিষ্ট থানায় কলটি সংযুক্ত করে দেওয়া। তবে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে ভুক্তভোগীকে কাউন্সেলিং করা পুলিশের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।”
সঠিক সময়ে সেবা না পাওয়ার বিষয়ে মহিউল ইসলাম বলেন, “সংশ্লিষ্ট থানা যদি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করে তা আমাদের দায়িত্বে পড়ে। তবে অভিযোগকারী সেবা পেয়েছে কি না আমাদের থেকে আবার কল করে জেনে নেওয়া হয়। যদি অভিযোগকারী সহায়তা না পান তখন আমরা আবারো সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করি।”
৫ আগস্টের আতঙ্ক কাটেনি পুলিশের
পুলিশ কর্মকর্তা মহিউল ইসলাম চরচাকে বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পুলিশ আগের মতো মুভ (চলাচল) করতেও একটু ভীত থাকে।”
লজিস্টিক সার্পোটের অভাব রয়েছে দাবি করে মহিউল ইসলাম বলেন, ‘‘আবার অনেক থানায় দেখা যায়, পর্যাপ্ত গাড়ি নেই। একটা গাড়ি দিয়ে পুরো থানা চলছে, তখন ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়। স্বীকার করতে হবে, আমাদের লজিস্টিক সার্পোটের অভাব রয়েছে।”
অন্য কেউ অভিযোগ করলে সহায়তা দেওয়ার সীমাবদ্ধতা
ভুক্তভোগীর পরিবর্তে অন্য কেউ ৯৯৯-এ যোগাযোগ করলে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন মহিউল ইসলাম। তিনি বলেন, “কেউ ফোন করলে তার পরিচয় ও অবস্থান কম্পিউটার স্ক্রিনে দেখা যায়। একই সঙ্গে অভিযোগকারীর কাছের থানার তথ্যও সিস্টেমে আসে। এরপর কলটি সংশ্লিষ্ট থানায় স্থানান্তর করা হয়।”
কিন্তু অভিযোগকারী যদি ভুক্তভোগীর অবস্থান থেকে অন্য কোনো স্থান থেকে কল করেন, তাহলে সিস্টেমে কলকারীর অবস্থান দেখা যায়। এতে ভুক্তভোগীর অবস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়।” তবে ভুক্তভোগীর কাছাকাছি অবস্থান থেকে কেউ কল করলে তারা সাড়া দেন বলেও দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
যা বলছেন মানবাধিকার কর্মীরা
নারীদের জরুরি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের প্রশিক্ষণ দরকার এমনটি উল্লেখ করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম। তিনি চরচাকে বলেন, “আমাদের থানাগুলোতে যেসব পুলিশ সদস্যরা আছেন তাদের নারী ও শিশুদের বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দরকার। প্রশিক্ষণটা এমন হবে যেখানে নারীদের ওপর ঘরে ও বাইরে সহিংসতাগুলোতে কী ভূমিকা থাকবে তা শেখাবে। আরেকটা বিষয় দরকার তা হলো প্রতিটি থানায় নারী কর্মকর্তা থাকার বিষয়টা নিশ্চিত করা। এতে নারীদের ওপর পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে প্রতিকারটা আরও ভালোভাবে করা সম্ভব হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরিনের মতে, নারীদের ওপর পারিবারিক সহিংসতাকে পুলিশ অপরাধ হিসেবে মনে না করার একটি প্রবণতা আছে। তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘নারীরা যখন পারিবারিকভাবে সহিংসতার শিকার হন তখন শহর অঞ্চলে পুলিশকে জানান। আমাদের এখানে এমনভাবে নিয়ম তৈরি করা যে, কারো হাত-পা না ভাঙলে অথবা রক্তাক্ত না হলে পুলিশ সহিংসতা হিসেবে নেয় না। তখন দেখা যায়, পুলিশ গড়িমসি করে রেসপন্স করে। অথবা ভুক্তভোগীকে মানিয়ে নিতে বোঝায়।”