সম্প্রতি ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক পদে মনোনয়ন, নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নীতিমালা’ সংশোধন করেছে সরকার। এদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) না থাকায় নতুন নেতৃত্ব নিয়োগের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) ও বেসিক ব্যাংকে একযোগে এমডি পদ শূন্য হওয়ার পর সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
তবে নতুন এমডি হিসেবে কাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। এরই মধ্যে এমডি নিয়োগের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্তে পরিবর্তন এনেছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
একসঙ্গে ছয় ব্যাংকের এমডি পদ শূন্য
রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে একযোগে নিয়মিত এমডি না থাকার ঘটনা এবার দ্বিতীয়বার ঘটল। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ছয় ব্যাংকের এমডিদের সরিয়ে দেয়। এরপর প্রায় দেড় মাস ব্যাংকগুলোতে এমডি ছিল না। এবার অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এমডিদের সরিয়ে দিয়েছে বিএনপি সরকার। তবে এবার ছয় ব্যাংকের এমডিদের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে দুই ধাপে।
গত ২ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মো. আনোয়ারুল ইসলাম, বেসিক ব্যাংকের এমডি মো. কামরুজ্জামান খান এবং বিডিবিএলের এমডি মো. জসিম উদ্দিনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে গত ১৯ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় সোনালী ব্যাংকের এমডি মো. শওকত আলী খান, জনতা ব্যাংকের এমডি মো. মজিবুর রহমান এবং রূপালী ব্যাংকের এমডি কাজী ওয়াহিদুল ইসলামের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়।
শওকত আলী খান ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর তিন বছরের জন্য সোনালী ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। মজিবুর রহমান একই বছরের ৭ নভেম্বর থেকে জনতা ব্যাংকের এমডির দায়িত্ব পালন করছিলেন। আর কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে রূপালী ব্যাংকের এমডি পদে ছিলেন। তাদের সবারই নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্বের অবসান ঘটানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এমডিদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে আগে থেকেই রাজনৈতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত ছিল। পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেন। এরপর বিভাগটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে এমডিদের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করতে বলেন। সূত্রটি জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে নতুন এমডি নিয়োগ দিতে পারে সরকার।
বেসরকারি ব্যাংক থেকে এমডি নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার শর্তে পরিবর্তন এনেছে সরকার। গত সোমবার ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক পদে মনোনয়ন, নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নীতিমালা’ সংশোধন করা হয়।
নতুন নিয়মে বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি হতে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে। তবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত বহাল রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো ব্যাংকার ডিএমডি পদে দুই বছর কাজ না করলেও এমডি হওয়ার সুযোগ পাবেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, সরকারি ব্যাংকগুলোর ডিএমডি পদে এখন যারা আছেন তাদের বেশিরভাগই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া। নীতিমালা যদি সংশোধন না হতো, তাহলে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়াদের কাউকে এমডি করতে হতো। এটা সরকার করতে চায় না বলেই নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ডিএমডিদের মধ্যে এমডি পদের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পেতে সমস্যা হচ্ছিল। অতীতে উচ্চ পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ায় অনেক যোগ্য ব্যাংকার কাঙ্ক্ষিত পদে যেতে পারেননি। এতে ব্যাংকগুলোর নেতৃত্ব পর্যায়ে দক্ষ জনবলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।”
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া এমডিদের নিয়েও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এ অবস্থায় যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ বাড়াতে নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে উপযুক্ত ব্যক্তি পাওয়া না গেলে বেসরকারি ব্যাংক থেকেও এমডি নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।”
এমডি পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থীকে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তত স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না। চাকরিজীবনের সব পর্যায়ে সততা, সুনাম ও সন্তোষজনক কর্মরেকর্ড থাকতে হবে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন মোকাবিলা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাছাই কমিটির সুপারিশের পাশাপাশি প্রার্থীর গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেবে।
এমডি পদে নিয়োগের মেয়াদ হবে তিন বছর। প্রয়োজন হলে সরকার ও পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশের ভিত্তিতে পুনর্নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ডিএমডি পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ নবম গ্রেড থেকে মোট ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতার শর্ত বহাল রয়েছে। অর্থাৎ অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিলের সুযোগ সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এক নয়।
রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এমডি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। চরচাকে তিনি বলেন, “ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে এভাবে পরিবর্তন আনা খারাপ নজির তৈরি করতে পারে। এতে ব্যাংকগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমার ঝুঁকি রয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মূলত মানুষের বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে চলে। গ্রাহকরা আস্থা হারালে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।”
খেলাপি ঋণ ও লোকসানে চাপে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পদে নতুন নেতৃত্ব নিয়োগের প্রস্তুতির মধ্যে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সরকারি মালিকানাধীন নয়টি ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংক ছাড়া বাকি আটটি ব্যাংকই লোকসানে রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং মূলধন ঘাটতির কারণে এসব ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তিও চাপে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল তিন লাখ ৬৯ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৬৯ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৯ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি তিন হাজার ৬৬ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। ২০২৫ সালেও লোকসানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৯৩১ কোটি টাকায়। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৭৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা বিতরণ করা ঋণের ৭৫ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে মূলধন ঘাটতিও ৬৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
অগ্রণী ব্যাংকও বড় ধরনের খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। গত জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এসব ঋণ থেকে প্রত্যাশিত আয় না আসায় ব্যাংকটির মুনাফা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রূপালী ব্যাংকের অবস্থাও ভালো নয়। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং ব্যাংকের কার্যক্রমে স্থবিরতার কারণে লোকসানের চাপ বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটি ৬৪০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। অন্যদিকে, ২০০৯ সালের পর ঋণ অনিয়ম ও লুটপাটের শিকার হওয়া বেসিক ব্যাংক ২০১৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসান দিয়ে আসছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে ব্যাংকটির মোট নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৩২৩ কোটি টাকা।
তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। গত জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে পরিচালন আয় হয়েছে ৫ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। তবে এ আয়ের ৮৩ শতাংশের বেশি এসেছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদ থেকে।