মেয়েরা বডি বিল্ডার হচ্ছে—বাংলাদেশের সমাজে এই ভাবনাটাই বেশ অপ্রচলিত। এখানে ছেলেরা জিমে যায়, ছেলেদের বডিবিল্ডিং করতে দেখা যায়। কিন্তু শরীর গঠনে মেয়েদের উপস্থিতির কথা কেউ চিন্তাও করতে পারে না।
যেটা সহজে কারও ভাবনাতেই আসে না, সেই শরীর গঠন খাতে দেশের প্রথম নারী হিসেবে বডি বিল্ডিং চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন অহনা রহমান। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব বডি বিল্ডিং অ্যান্ড ফিটনেস (আইএফবিবি) আয়োজিত আইএফবিবি প্রো লিগ মালয়েশিয়া এবং এর অধীনে আয়োজিত এনপিসি রিজিওনাল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রুপা জিতেছেন। ২৫ বছর বয়সী এই অ্যাথলেট ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সিএসই বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।
দেশের নারীবিষয়ক সংবাদমাধ্যম রোকেয়া কালেকটিভে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অহনা বলছিলেন, বডি বিল্ডিংয়ের মতো একটি পেশাদার ও কষ্টসাধ্য খেলায় কোনো পরিকল্পনা থেকে আসেননি। ২০১৮ সালে অন্য সবার মতোই সুস্থ থাকার জন্য জিমে ভর্তি হন। বডিবিল্ডিং তখন ভাবনাতেও ছিল না।
কিন্তু সেই সাধারণ ফিটনেস চর্চাই যে একদিন তাকে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের অংশ করে ফেলবে তা কখনো ভাবেননি। বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণাতে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ শরীর গঠন ফেডারেশনের অধীনে আয়োজিত দেশের প্রথম অফিশিয়াল নারী শরীর গঠন প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। তেমন কোনো লক্ষ্য ছিল না। কিন্তু তিনিই হয়ে গেলেন চ্যাম্পিয়ন। পেলেন স্বর্ণপদক।
অহনার মতে, মেয়েদের জিমে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি পরিবারকে বোঝানোই সবচেয়ে বড় প্রাথমিক বাধা। সেখানে বডি বিল্ডিং করা তো রীতিমতো সাহস দেখানোর কাজ। আর দেশে যেখানে ছেলেদের বডি বিল্ডিংকেই অপ্রয়োজনীয় মনে হয় সেখানে পেশাদার নারী বডি বিল্ডার হয়ে ওঠা জটিল।
পরিবারের সমর্থন অবশ্য পেয়েছিলেন অহনা। কিন্তু বারবার শিকার হতে হয়েছে সাইবার বুলিংয়ের। তিনি বললেন, “আমি যখন ২০১৯ এ বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে বিজয় অর্জন করি, প্রতিদিন অসংখ্য অভিনন্দনের মাঝে আমার পোশাক নিয়ে নানা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য আমার শুনতে হয়েছে, আমার পাশে একমাত্র আমার পরিবারই দাঁড়িয়েছে।”
জিম সংস্কৃতি, প্রশিক্ষক সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ
দেশের সাধারণ জিমগুলোয় নারীদের প্রবেশাধিকার এবং মানসিক অস্বস্তির জায়গা নিয়ে বাংলাদেশের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে অহনা বলেন, “আপনি বাংলাদেশে মেয়ে হয়ে জিম করতে যান শুনতে হবে, মেয়েদের জিম করতে হবে কেন? বাসার কাজ করলেই তো হয়! বা জিম করলে ছেলের মতো বডি হয়ে যাবে, খারাপ হয়ে যাবে। মানে, এরকম অনেক দৃষ্টিভঙ্গি আছে জিমের প্রতি।”
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ জলো ওয়েট ট্রেনিংয়ের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ নারী কোচের সংকট। অহনার মতে, পুরুষ ও নারীদের শারীরিক গঠন ও হরমোন সম্পূর্ণ আলাদা। অধিকাংশ পুরুষ প্রশিক্ষক মেয়েদের হরমোন বা শারীরিক গড়ন বুঝে প্রশিক্ষণ বা খাদ্য পরিকল্পনা করাতে পারেন না, ছেলেদের পরিকল্পনাই মেয়েদের ওপর প্রয়োগ করেন। যেহেতু নারীরা এই শরীরচর্চা কম বেছে নেন, তাই তাদের নিয়ে গবেষণাও কম হয়।
খরচ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতা
অহনা জানান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রস্তুতি, পেশাগত নিরাপত্তা এবং নারী অ্যাথলেটদের হরমোনজনিত শারীরিক জটিলতার মতো নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে এই পথে টিকে থাকা বেশ কঠিন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই খেলার খরচ বাড়ে বহুগুণ।
আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের খরচের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে অ্যাথলেট অহনা বলেন, “দেশে যদি ৫০ হাজার লাগে, আন্তর্জাতিকভাবে খেললে এটা চার-পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। আমরা যে মালয়েশিয়াতে গিয়েছিলাম, বাইরে অংশগ্রহণ করতে গেলেই প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা অংশগ্রহণের জন্য প্রবেশ করতে গেলে দিতে হয়। পাশাপাশি এয়ার টিকিট, হোটেল, ভিসা ইত্যাদি মিলে বাইরে গেলেই অনেক বেশি খরচ লাগে।”
তবে আশার কথা এই যে, আনুষ্ঠানিক পর্যায় বা প্রশিক্ষকদের পক্ষ থেকে নারী বডিবিল্ডারদের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা তিনি শোনেননি বলেই জানান। অহনা বলেন, “অন্তত ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে ভালো জিমগুলোতে এখন পরিবেশ আগের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিক এবং মানুষ ক্রীড়া হিসেবেই এটিকে মূল্যায়ন করতে শিখছে।”
ফেডারেশনের সহায়তা ও সরকারি অনুদানের বাস্তবতা
নারী অ্যাথলেটদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং আর্থিক সহায়তার বিষয়ে সরাসরি কোনো সুবিধা দেয় না বাংলাদেশ বডি বিল্ডিং ফেডারেশন। তবে কোনো অ্যাথলেট যদি নিজ উদ্যোগে বা বাইরে যেতে চান, সেক্ষেত্রে ফেডারেশন থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হয়। দেশের বাইরে কোনো প্রতিযোগিতায় জিতলেই তখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বা মন্ত্রণালয় থেকে একটি সম্মানী পাওয়ার সুযোগ থাকে। আর সরকারি অনুদান বা স্পন্সরশিপ পাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত, নির্ভর করতে হয় মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর।
বাংলাদেশে ১৯৭০-এর দশক থেকে অফিশিয়ালি বডি বিল্ডিং চর্চা হয়ে আসছে। তবে দীর্ঘ এই ইতিহাসে নারী ক্যাটাগরিতে শরীর প্রদর্শনের সংস্কৃতি কখনো মূলধারায় স্থান পায়নি। অতীতে ফেডারেশনের একজন সেক্রেটারি বিষয়টিকে একটি ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে নিয়ে উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তীব্র আপত্তি ও সমালোচনার মুখে তা স্থায়ী হয়নি। সামাজিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের কারণে নিকট ভবিষ্যতেও বাংলাদেশে নারীদের বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতা চালুর কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না আয়োজকরা।
নীতিগত সীমাবদ্ধতা ও পোশাক সংক্রান্ত বিতর্ক
নারী শরীর গঠন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শরীর গঠন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় ক্রীড়া বিচারক ডা. মো. কামরুজ্জামান ফেডারেশনের অবস্থান ও প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের রক্ষণশীল সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং বডি বিল্ডিংয়ের মূল ডিসিপ্লিনের মধ্যে এক গভীর দ্বন্দ্ব রয়েছে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার পাশাপাশি পোশাকের সংবেদনশীলতার কারণে বাংলাদেশে নারীদের বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতা চালু রাখা সম্ভব হয় না। এর পাশাপাশি ফেডারেশনের আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং সরকারি অনুদান ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবও এই ডিসিপ্লিনটির প্রসারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডা. কামরুজ্জামান রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন, “বডি বিল্ডিংয়ের নারীদের জন্য বর্তমানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন নেই। অতীতে ২০১৯-২০২২ চার বছর এ ধরনের আয়োজন করা হয়েছিল, সেগুলো ছিল সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক এবং একটি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পরিচালিত। তবে ওই আয়োজনগুলোকে ঘিরে সমাজে তীব্র সমালচনা তৈরি হয়েছিল। যেহেতু আমাদের মুসলিম দেশ বলা হয়, আমাদের সেভাবে বডিবিল্ডিং আয়োজন নারীদের জন্য করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সেক্ষেত্রে অনেক সমালোচনা তৈরি হয়।”
বডি বিল্ডিংয়ের বিচার প্রক্রিয়া এবং এর পোশাকের সংবেদনশীলতা তুলে ধরে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, অন্যান্য প্রচলিত খেলার সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বডি বিল্ডিংকে প্রথাগত অর্থে কেবল ‘খেলা’ হিসেবে বিবেচনা না করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বডি বিল্ডিংয়ের বিচারে একজন নারীকেও তার শক্তি প্রদর্শন করতে শরীর প্রদর্শন করতে হয়। যেমন ধরুণ, ছেলেরা যেটা করে ওরা খালি গায়ে সেটা করে থাকে, নারীদের আন্তর্জাতিকভাবে একটা পোশাক রয়েছে, তারা সেটা বাংলাদেশে করতে গেলে নানা সমালোচনার সম্মুখীন হতে পারে।”
কামরুজ্জামান আরও উল্লেখ করেন, ফেসবুকে এক নারী প্রতিযোগীর ছবি আসার পর বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে সেই অনুযায়ী বিচার বা পোশাক পরিধান করা সম্ভব নয়।
এতসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েও অহনা টিকে আছেন। তার এই টিকে থাকা কেবল নিজের জন্য নয়। এরকম আরও অনেক অহনার জন্য, যারা নিজের জীবনের ওপর আগ্রহ হারিয়েছেন। বডি বিল্ডিং সেই জীবনেই নিয়ে আসতে পারে নতুন রং। দিতে পারে তাকে নতুন পরিচয়।
লেখক: নওরীন সুলতানা ও মঞ্জুরী বিশ্বাস
(লেখাটি রোকেয়া কালেকটিভের সৌজন্যে প্রকাশিত হলো)