হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে অটোমোবাইল, কিংবা এই যে মহাকাশে রোবট পাঠাচ্ছে মানুষ, অথবা যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ যুদ্ধের যে সরঞ্জাম–এই সবকিছুর মধ্যে একটি বিষয় কিন্তু এক। আর তা হলো সেমিকন্ডাক্টর, যাকে বলা হয় ‘ডিজিটাল জ্বালানি’। এ ক্ষেত্রে মূল প্রতিযোগিতায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তাইওয়ান, জাপানের মতো দেশগুলো। তবে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোও এগিয়ে যাচ্ছে। এ দুই দেশের মতো না হলেও একটু একটু করে এগোচ্ছে বাংলাদেশও। কিন্তু কিছু কাঠামোগত পদক্ষেপ ও নীতিকৌশল এ খাতকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জ্বালানিতে পরিণত করতে পারে।
শুরুতেই বলা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান যুগে সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার ‘ডিজিটাল জ্বালানি’ বা প্রধান চালিকাশক্তি বলা হয়। স্মার্টফোন, ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে মহাকাশযান, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, অটোমোবাইল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সেমিকন্ডাক্টরের ভূমিকা অপরিহার্য। তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর দীর্ঘদিনের একক নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় আয়কে বহুমুখী করতে বাংলাদেশ এখন হাই-টেক প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজার দখলের স্বপ্ন দেখছে। চিপ ডিজাইন ও ভেরিফিকেশন সেবার মাধ্যমে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীরা নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রশ্ন হলো–এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কি তার সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারছে?
একটু হিসাবের দিকে নজর দেওয়া যাক। ভারতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের আকার ৫৬ বিলিয়ন ডলারের। আর ভিয়েতনামে এর আকার ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ভারত প্রতি বছর গড়ে ৩০ লাখের বেশি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস (ইইই) এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছে। এর সাথে হয়তো বাংলাদেশের তুলনা হবে না। কিন্তু ভিয়েতনামের দিকে তাকালে দেখা যাবে–দেশটি প্রতি বছর ইইই এবং সিএসই গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ। বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে গড়ে প্রতি বছর এমন গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে ২ লাখের মতো, যা ভিয়েতনাম থেকে বেশি। কিন্তু ভিয়েতনাম এই তরুণদের দক্ষ জনবলে রূপান্তর করে কাজে লাগিয়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের শিল্প গড়ে তুললেও বাংলাদেশ আছে এখনো মিলিয়ন ডলারের কাতারে। অথচ সম্ভাবনা আছে বিপুল।
বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর খাত
বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ শিল্পের পরিধি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ছে। বিশ্ব অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই খাতের বৈশ্বিক বাজার ২০২৩ সালে মোট ৫৪৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল রাজস্ব অর্জন করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বর্তমান সময়ে প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
শিল্পবিশ্লেষকদের ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফাইভ জি নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট অব থিংস এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো যুগান্তকারী প্রযুক্তির কারণে এই বাজারের সম্প্রসারণ আরও ত্বরান্বিত হবে। এর ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভৌগোলিক বিন্যাস ও উৎপাদনের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বর্তমান বিশ্বের মোট উৎপাদিত সেমিকন্ডাক্টরের প্রায় ৮১ শতাংশই এককভাবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদনের অধীনে রয়েছে। এই বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে এশিয়ার প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র ও হাব হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, জাপান ও ভারত অগ্রগণ্য।
পুরো সেমিকন্ডাক্টর শিল্পখাতটি মূলত অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং জটিল তিনটি প্রধান কাঠামোগত বিভাগে বিভক্ত হয়ে বিশ্ববাজার পরিচালনা করছে। প্রথমত, ‘ফ্যাবলেস’ (Fabless) কোম্পানিগুলো নিজেদের কোনো উৎপাদন কারখানা বা ফ্যাব না রেখে কেবল চিপের উন্নত আর্কিটেকচার, ডিজাইন, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি ও বিশেষায়িত সফটওয়্যার তৈরিতে মনোযোগ দেয় (যেমন: এনভিডিয়া বা কোয়ালকম)।
দ্বিতীয়ত, ‘ফাউন্ড্রিজ’ বা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই ফ্যাবলেস কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা নিখুঁত নকশা ও ব্লু-প্রিন্ট অনুযায়ী সিলিকন ওয়েফারের ওপর বাস্তবে চিপ বা মাইক্রোপ্রসেসর তৈরি করে দেয় (যেমন: টিএসএমসি বা স্যামসাং ফাউন্ড্রি)।
তৃতীয়ত, ‘পোস্ট-ফ্যাব’ বা ওস্যাট (OSAT) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদিত সিলিকন ওয়েফার থেকে সূক্ষ্মভাবে চিপ কেটে আলাদা করে, সেগুলোর নিরাপদ প্যাকেজিং সম্পন্ন করে এবং বাজারে ছাড়ার আগে চূড়ান্ত কার্যকারিতা ও মান পরীক্ষার কাজ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিশ্চিত করে।
এই শিল্পের অভূতপূর্ব প্রসারের পেছনে বেশ কিছু শক্তিশালী প্রযুক্তিগত চালিকাশক্তি কাজ করছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং নিত্যনতুন ডিভাইসের চাহিদার ফলে মেমোরি চিপ, মাইক্রোপ্রসেসর এবং সিস্টেম-অন-আ-চিপের চাহিদা বৈশ্বিক বাজারে দিন দিন বেড়েই চলেছে।
চিপের এই চাহিদার কারণে ফ্যাবলেস চিপ ডিজাইন ও উচ্চমানের গবেষণা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। তবে শিল্পখাতের এই দ্রুত প্রসারের বিপরীতে বিশ্বজুড়ে একটি বড় সংকট দেখা দিয়েছে; তা হলো–দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদের ঘাটতি।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রায় ১ মিলিয়ন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০০ মিলিয়ন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের দক্ষ পেশাদার ও প্রকৌশলীর তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই বিশাল জনবল সংকট মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক চাহিদার সাথে তাল মেলাতে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশগুলোর জন্য নিজেদের তরুণ প্রজন্মকে বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সেমিকন্ডাক্টর: বাংলাদেশ পরিস্থিতি
বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর খাত বর্তমানে তার প্রাথমিক পর্যায় পেরিয়ে প্রবৃদ্ধির নতুন এক সম্ভাবনাময় ধাপে প্রবেশ করছে। চিপ ডিজাইন ও ভেরিফিকেশন সেবা রপ্তানি করে বাংলাদেশ বর্তমানে বছরে প্রায় ৭ মিলিয়ন ডলার আয় করছে, যা বাংলাদেশি টাকায় ৮৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকার বেশি। এটি আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম হলেও দেশীয় প্রকৌশলীদের বিশ্বমানের কাজের অনন্য যোগ্যতা ও সক্ষমতা প্রমাণ করে।
এই খাতের অগ্রযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে একটি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এটি ২০২৫ সালের প্রথম অংশে সেমিকন্ডাক্টর খাতের জন্য একটি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী চার ধাপের কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার আগারগাঁওস্থ জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয় ‘বায়োটেক, ইলেকট্রনিক্স, এআই এবং রোবোটিক্স সামিট ২০২৫’ এবং ‘জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম’।
৩০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ, ৩০০টিরও বেশি অত্যাধুনিক প্রজেক্ট প্রদর্শন এবং আড়াই হাজারের অধিক দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে এই সম্মেলন থেকে ঐতিহাসিক ‘ঢাকা ডিক্লারেশন’ পাঠ করা হয়, যেখানে প্রযুক্তিকে সরাসরি জাতীয় সার্বভৌমত্বের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০,০০০ ‘বিয়ার’ (বায়োটেক, ইলেকট্রনিক্স, এআই এবং রোবোটিক্স) পেশাদার তৈরির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএনআইএ) এবং স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রামের (এসআইসিআইপি) মধ্যে ৩৫ কোটি ১৪ লাখ টাকার প্রকল্পের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের অধীনে ৩ হাজার ৫০০ জন তরুণ স্নাতক প্রকৌশলীকে আইসি ডিজাইন, আরটিএল থেকে জিডিএস২, টেস্টিং ও প্যাকেজিংসহ মোট ছয়টি বিশেষ কোর্সে উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে, যেখানে অন্তত ৬৫ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থীর কর্মসংস্থানের নিশ্চিত সুযোগ রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করতে ‘সিলিকন রিভার’ ধারণার আওতায় বর্তমানে বিএসআইএ-এর অধীনে ১৫টি স্বনামধন্য কোম্পানি কাজ করছে।
এই ১৫ কোম্পানির সম্মিলিত বার্ষিক আয় ১০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। কোম্পানিগুলোতে ১,২০০-এর বেশি প্রকৌশলী কাজ করেন। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এই খাতে বাংলাদেশের ৩০০০-এর বেশি প্রবাসী প্রকৌশলী কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ৩০ জনের বেশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ও প্রবাসী বাংলাদেশী অধ্যাপক সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে কাজ করছেন। এ ছাড়া এই খাতকে বেগবান করতে দেশে ব্যাসিকস (বিএএসআইসিএস), স্টার (এসটিএআর), ক্রেস্ট (সিআরইএসটি) এবং বুস্ট (বিওওএসটি) নামের চারটি বিশেষ জাতীয় কর্মসূচিও সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
কিন্তু এ খাতকে সামনে আরও এগিয়ে নিতে হলে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে শিল্প খাতের সংযোগ দৃঢ় করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাদিদ মুনীর চরচাকে বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ও ভিএলএসআই সেক্টরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ডিজাইন সার্ভিস-ওরিয়েন্টেড। এটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশের টেকনোলজি সেক্টরকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের নিজস্ব আইপি তৈরি করতে হবে। এই জায়গায় ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
এই সংযোগের একটা ধরনের কথাও উল্লেখ করেন ড. সাদিদ মুনীর। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামগুলোতে ফাইনাল ইয়ারে সাধারণত ক্যাপস্টোন প্রজেক্ট বা ফাইনাল ইয়ার ডিজাইন প্রজেক্ট থাকে। শিক্ষার্থীরা প্রায় এক বছর ধরে একটি বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করে। ইন্ডাস্ট্রি যদি তাদের বাস্তব ডিজাইন প্রবলেম বা একটি নির্দিষ্ট আইপি ব্লকের রিসার্চ ও ডিজাইন চ্যালেঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়, তাহলে ফ্যাকাল্টি, স্টুডেন্টস এবং ইন্ডাস্ট্রি ইঞ্জিনিয়াররা মিলে একটি টিম হিসেবে সেটি নিয়ে কাজ করতে পারে।”
এত বড় পরিসরে না হলেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে একাডেমি-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবরেশনের দিকে এগোচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বৈশ্বিক মঞ্চেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে এরই মধ্যে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও নানা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে।
এরই একটি উদাহরণ হলো–মালয়েশিয়ায় গত ৫-৭ মে অনুষ্ঠিত ‘সেমিকন সাউথইস্ট এশিয়া ২০২৬’ প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো অংশ নেয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সার্বিক সহায়তায় ও বিএসআইএ-এর অধীনে দেশের তিনটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান, প্রাইম সিলিকন টেকনোলজি, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর ও সিলিকনোভা লিমিটেড এতে অংশ নিয়ে তাদের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও সেবাগুলো সফলভাবে উপস্থাপন করেছে।
সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ দুই কোম্পানির পদচারণা
২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে প্রতিষ্ঠিত হয় উলকাসেমি প্রাইভেট লিমিটেড, যা বাংলাদেশের অন্যতম সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। এর সদরদপ্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় হলেও ঢাকা, বেঙ্গালুরু (ভারত) ও টরন্টোতে (কানাডা) তাদের কার্যালয় রয়েছে। বিশ্বব্যাপী তাদের ৩৫০ জনেরও বেশি কর্মী নিয়োজিত। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে উলকাসেমি তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ফ্ল্যাগশিপ প্রোডাক্ট লাইন; যেমন–মোবাইল ডিভাইস, রাউটার ও সুইচ, কনজ্যুমার প্রোডাক্টস, স্টোরেজ, মাইক্রোপ্রসেসর ও গ্রাফিক্স প্রসেসর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। কোম্পানির এনগেজমেন্ট মডেলটি আর্কিটেকচার বা প্রোডাক্ট স্পেসিফিকেশন ডেভেলপমেন্ট থেকে শুরু করে ফুল টার্নকি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করে থাকে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে ছোট-বড় টিম মোতায়েনের মাধ্যমে ক্লায়েন্টদের দ্রুততম সময়ে পণ্যবাজারে আনতে সহায়তা করে উলকাসেমি।
উলকাসেমির একটি বড় দল রয়েছে, যারা ডিজিটাল ও অ্যানালগ লেআউট ডিজাইন নিয়ে কাজ করে। তাদের বৃহৎ আইসি লেআউট ডিজাইন প্রকৌশলীরা সিনপসিস, ক্যাডেন্স ও মেন্টর গ্রাফিক্সের মতো টুলস ও মেথোডোলজি ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে ১৮০ ন্যানোমিটার থেকে শুরু করে একেবারে আধুনিক ৩ ন্যানোমিটার প্রসেস টেকনোলজিতে কাস্টম অ্যানালগ বা ডিজিটাল লেআউট, ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন, এক্সট্রাকশন, টাইমিং এবং সিগন্যাল ইন্টেগ্রিটি অ্যানালাইসিস করতে পারছে তারা।
মার্কিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইনটেলের ‘এক্সটেন্ডেড অফিস’ হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়ে উলকাসেমি বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে তারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট (জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম) এবং চীন–উভয় বৈশ্বিক গ্রুপের সঙ্গেই যৌথভাবে কাজ করছে।
দক্ষ জনবলের মেধা পাচার রোধ করতে তারা কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছে। জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে নতুন অফিস খোলার পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ৫,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ, নমনীয়তা, স্বাস্থ্য বিমা ও এমপ্লয়ি রিকগনিশন অ্যাওয়ার্ডের মতো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে মেধাবী তরুণ ও নারীদের নেতৃত্বদানে উৎসাহিত করছে উলকাসেমি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অপর শীর্ষস্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনার হলো নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর লিমিটেড। ডিবিএল গ্রুপের অধীনে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠান ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এখানে ১৫০ জনেরও বেশি প্রকৌশলী কর্মরত। প্রতিষ্ঠানটি মূলত ডিজাইন ফর টেস্টেবিলিটি, ফিজিক্যাল ডিজাইন এবং সফটওয়্যার সার্ভিস–এই তিনটি মূল ক্ষেত্রে কাজ করার পাশাপাশি ইন-হাউজ উন্নয়নের জন্য একটি গবেষণা ও উন্নয়ন ইউনিট পরিচালনা করছে।
নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, গ্রিস, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের বাজারের সঙ্গে কাজ করছে। দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান ১৮টি সেমিকন্ডাক্টর ল্যাব ও ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্রকৌশলীরা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কাজ করছেন। ২০২২ সালে ইনটেলের তৎকালীন চেয়ারম্যান বাংলাদেশে এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিদর্শন করে এর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। বুয়েট, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, আহছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র মধ্যে অন্যতম।
২০৩০ সালের মধ্যে ৬০টি কোম্পানির জন্য ১০,০০০ প্রকৌশলী প্রস্তুত করা এবং ১ বিলিয়ন ডলারের বাজার নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর। সামগ্রিকভাবে, উলকাসেমি ও নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর লিমিটেড–উভয় প্রতিষ্ঠানই বিশ্বমানের প্রযুক্তিগত সেবা প্রদান, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর বিপ্লবকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর খাতের বর্তমান বাস্তবতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ব্যবধান রয়েছে। আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে তাকালেই এটি বোঝা যায়। ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো শক্তিশালী সরকারি অনুদান, উন্নত অবকাঠামো এবং সুনির্দিষ্ট ও অনুকূল নীতিমালার মাধ্যমে অত্যন্ত সফলভাবে তাদের নিজ নিজ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো তেমন কিছু গড়তে পারেনি।
বাংলাদেশে অসামান্য মেধা ও সাশ্রয়ী মূল্যের দক্ষ জনবল আছে। তবুও সামগ্রিক কাঠামোগত সহায়তা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সংকটের কারণে এ অবকাঠামো গড়া যায়নি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এই ব্যবধান ঘুচিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হলে দেশীয় অবকাঠামোর ভিত্তিকে আরও মজবুত করতে হবে।
ড. সাদিদ মুনীর বলেন, “বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ইইই ও সিএসই গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। তবে তাদের মধ্যে সরাসরি সেমিকন্ডাক্টর কিংবা ভিএলএসআই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার জন্য প্রস্তুত ও দক্ষ জনবল তুলনামূলকভাবে কম। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, যেহেতু ভিএলএসআই একটি ডিপ-টেক ফিল্ড, তাই এখানে কার্যকরভাবে কাজ করতে বিশেষায়িত জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়।”
এখানটাতেই প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ার ওপর জোর দেন ইউআইইউর এই সহযোগী অধ্যাপক। শুধু ডিগ্রি শিল্প খাতের সুনির্দিষ্ট দক্ষতার পরিমাপক নয়। এর কারণও ব্যাখ্যা করেন তিনি। তার মতে, “একজন ইইই আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী কেবল ভিএলএসআই পড়েন না; তাকে পাওয়ার, ইলেকট্রনিক্স এবং কমিউনিকেশনের মতো একাধিক বিষয়ে পড়াশোনা করতে হয়। একইভাবে সিএসই শিক্ষার্থীদের কারিকুলামও বেশ বিস্তৃত। ফলে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি পর্যায় থেকেই একজন শিক্ষার্থীকে পুরোপুরি ইন্ডাস্ট্রি-রেডি ভিএলএসআই ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা সবসময় বাস্তবসম্মত নয়।”
সেমি কন্ডাক্টর তৈরির কারখানা। ছবি: রয়টার্স
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ শিল্পের মতো অতি সংবেদনশীল ও উচ্চপ্রযুক্তির খাত সফলভাবে বিকশিত করতে হলে বেশ কিছু বিষয় আগেই নিশ্চিত করা জরুরি। সেগুলো হলো–নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিশ্বস্ত ডেটা নিরাপত্তা, শক্তিশালী কানেকটিভিটি এবং উচ্চমানের ইন্টারনেট ক্যাপাসিটি রিলায়াবিলিটি। বড় মাপের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বা বহুজাতিক টেক জায়ান্টগুলো যেকোনো দেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ করার আগে মূলত এই ধরনের কাঠামোগত নিশ্চয়তা এবং নির্ভরযোগ্য লজিস্টিকস সুযোগ-সুবিধাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে দেখে।
এই খাতের প্রসারে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জটি হলো–বিপুল পরিমাণ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের জোগান নিশ্চিত করা। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান শর্ত। কোনো আন্তর্জাতিক বহুজাতিক বা বিশ্বখ্যাত সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি যদি বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ নিয়ে আসে, তবে তাদের টেকসই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী ও পেশাদার কর্মীবাহিনীর প্রয়োজন হবে।
দক্ষ জনবল প্রস্তুতির জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ড. সাদিদ মুনীর বলেন, “এই জায়গায় একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে টার্গেটেড ট্রেনিং। গ্র্যাজুয়েশনের পর দুই, তিন বা ছয় মাসের একটি ইনটেনসিভ ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু সেমিকন্ডাক্টর ও ভিএলএসআই সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে কাজ করবে। সেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পুনরাবৃত্তির চেয়ে ইন্ডাস্ট্রি ওয়ার্কফ্লো, ইডিএ টুলস, বাস্তব ডিজাইন সমস্যা সমাধান এবং প্রজেক্ট-ভিত্তিক ট্রেনিংয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।”
পাশাপাশি বর্তমান বাজার ও ভবিষ্যতের এই চাহিদা সফলভাবে পূরণের জন্য গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থায় বসে থাকলে চলবে না। শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষায় বিশেষায়িত কারিকুলাম, আধুনিক ল্যাব সুবিধা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশকে সেমিকন্ডাক্টরের একটি আকর্ষণীয় বৈশ্বিক গন্তব্যে পরিণত করতে বহুমুখী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সিলরদের সরাসরি বিশ্বমানের বড় বড় সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যোগাযোগ করতে হবে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে জিটুজি (গভর্নমেন্ট-টু-গভর্নমেন্ট) উদ্যোগগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সরকারের নীতি ও কৌশলগত রূপরেখা
স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনুকূল এবং আকর্ষণীয় পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সেমিকন্ডাক্টর খাতের জন্য বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ শুল্ক মওকুফ ও কর সুবিধা প্রদান করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করার জন্য অর্জিত আয়ের ওপর ৬ শতাংশ সরাসরি নগদ অর্থ (ইনসেনটিভ) সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এটি ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এই ধরনের নীতিগত প্রণোদনাগুলো দেশীয় উদ্যোক্তা ও বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের এই উদীয়মান খাতে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করবে।
হাই-টেক পার্কগুলোতে ব্যবসা প্রসারের জন্য আকর্ষণীয় ‘ট্যাক্স হলিডে’ বা কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে হাই-টেক পার্কে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার আয়ের ওপর প্রথম ৭ বছর শতভাগ এবং পরবর্তী ৩ বছর; অর্থাৎ, অষ্টম থেকে দশম বছর পর্যন্ত ৭০ শতাংশ করছাড় উপভোগ করা যাবে। এই সুবিধা ৩০ জুন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত থাকবে। পাশাপাশি, হাই-টেক পার্ক নির্মাণ বা অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সকল কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ওপর কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, অ্যাডভান্স ট্যাক্স, ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও সংযোজন খাতকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে চিপ তৈরি ও অ্যাসেম্বলির কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। এর আওতায় রেগুলেটরি ডিউটি, অ্যাডভান্স ট্যাক্স, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং কাস্টমস ডিউটি ১ শতাংশের বেশি হলে তাও সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। এটি ৩০ জুন, ২০৩১ পর্যন্ত জারি থাকবে।
এই ধরনের শুল্ক ও কর সুবিধার পাশাপাশি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গঠিত জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্সের রূপরেখা অনুযায়ী বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই রূপরেখার প্রথম দুটি কৌশলগত ক্ষেত্র হলো দক্ষ জনবল ও মেধা বিকাশ এবং অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ ও নীতিমালা তৈরি। বাংলাদেশে প্রতি বছর ইইই, সিএসই এবং ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে দুই লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে। তাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভিএলএসআই কোর্স, ইডিএ টুলস ও আধুনিক ল্যাব অবকাঠামোর মাধ্যমে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে আগামী ৫ বছরে ১০,০০০ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প-উপযোগী প্রকৌশলী তৈরি করা সম্ভব। পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর নীতি’ প্রণয়ন, গবেষণায় সরকারি অনুদান প্রদান এবং সেমিকন্ডাক্টরের জন্য বিশেষায়িত একটি ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
কৌশলগত রূপরেখার শেষ দুটি ক্ষেত্র হলো–এফডিআই ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং স্কেল-আপ বা শিল্প সম্প্রসারণ। ‘ইউএস সেমিকন অ্যালায়েন্স’-এর মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া, প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কাজে লাগানো এবং অন্তত দুটি বড় আন্তর্জাতিক ‘অ্যাঙ্কর ইনভেস্টমেন্ট’ বা মূল বিনিয়োগ আকর্ষণ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চিপ ডিজাইনের প্রাথমিক সাফল্যকে শক্ত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে অদূর ভবিষ্যতে পোস্ট-ফ্যাব; অর্থাৎ টেস্টিং ও প্যাকেজিং বা ওস্যাট খাতে সফলভাবে প্রবেশের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প তার চূড়ান্ত সম্প্রসারণ ও বৈশ্বিক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে পারে।
এ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনাগুলোর সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভিয়েতনামের মতো করে এ খাতকে শক্ত একটি ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী অবকাঠামো, যেখানে দেশের স্নাতক ও সন্তকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তোলার একটা দিশা থাকবে।
এ বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন চরচাকে বলেন, “২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। দেশের বিদ্যমান সক্ষমতা ও বৈশ্বিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআইএ) সাথে যৌথভাবে কাজ চলছে। এ ছাড়া স্থানীয় উদ্যোক্তা ও প্রকৌশলীদের গবেষণা সুবিধা দিতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বিএইসি) দুটি ফ্যাব্রিকেশন ল্যাব ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।”
দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন জোরদারে সরকারের পক্ষ থেকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে সরকারি বিনিয়োগ ও সহযোগিতার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সচিব। বিএসআইএ প্রণীত ১০ বিলিয়ন ডলারের রোডম্যাপ চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়নের জন্য আগামী নভেম্বরে শিল্প খাতের নেতৃবৃন্দের সাথে বিশেষ বৈঠকে বসবে মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকে প্রয়োজনীয় বাজেট সহায়তা নিশ্চিতের পাশাপাশি যেসব প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবকাঠামো তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মো. আনোয়ার হোসেন চরচাকে বলেন, “সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি চিপ ডিজাইন হওয়ায় বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং কারিকুলাম যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএসআইএ-এর প্রস্তাবিত একটি প্রমিত (স্ট্যান্ডার্ড) কারিকুলামের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) সাথে নিয়ে একযোগে কাজ করা হবে, যাতে স্নাতক শেষ করেই শিক্ষার্থীরা সরাসরি দেশীয় চিপ শিল্পে যুক্ত হতে পারে এবং মেধাপাচার রোধ হয়। বাংলাদেশ আপাতত ব্যয়বহুল চিপ ফ্যাব্রিকেশনের দিকে না গিয়ে মূলত চিপ ডিজাইন, টেস্টিং এবং প্যাকেজিংয়ের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে পূর্ণ মনোযোগ দেবে।”