কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও দেয়ালে ফাটল, আবার কোনো ভবনের ছাদ থেকে বেরিয়ে এসেছে রড। বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। এমন জরাজীর্ণ ভবনেই চলছে বরিশাল বিভাগের অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকছেন অভিভাবকরাও।
বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৮৭৩টি বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব ভবনের সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের জন্য তালিকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও অনেক বিদ্যালয়ে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান চলছে।
জেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, বরিশালে সবচেয়ে বেশি ৩২০টি বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া পিরোজপুরে ১৯৯টি, বরগুনায় ১৩২টি, ভোলায় ১১৫টি, ঝালকাঠিতে ৮৫টি এবং পটুয়াখালীতে ২২টি বিদ্যালয় রয়েছে এ তালিকায়।
স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয় ভবন সংস্কারের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। বর্ষা মৌসুমে শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় পাঠদান ব্যাহত হয়। প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ ও আসবাবপত্রের সংকটও রয়েছে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ছানিকেদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি ১৯৯৭ সালে নির্মাণের পর আর উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ভবনের বেহাল অবস্থায় স্বাভাবিক পাঠদান নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা। উপজেলার আরও কয়েকটি বিদ্যালয়েও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে।
দেহেরগতি ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহজাহান হাওলাদার বলেন, “ছানিকেদারপুর স্কুলসহ কয়েকটি বিদ্যালয়ের ভবন বেহাল অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণ করা না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
বরিশাল সদর উপজেলার ৭৮ নম্বর আদর্শ মাতৃমন্দির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি তৈরি হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। প্রধান শিক্ষক মিন্টু কুমার কর বলেন, “প্রায় পাঁচ-সাত বছর ধরে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সংস্কার হয়নি।”
বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকার এনায়েত উল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ক্লাস চলার সময়ে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে তিন শিক্ষার্থী আহত হয়েছিলেন। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুসরাত জাহান বলেন, “২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ভবনটি ভেঙে যায়। অবশ্য এর আগে থেকেই ভবনটি ঝুকিপূর্ণ ছিল। এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সংস্কার হয়নি। শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থী আমরা সবাই ঝুঁকিতে আছি।”
বরিশাল বিভাগের অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা। ছবি: চরচা
বাকেরগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন অভিভাবকের সাথে কথা বলে জানা যায়, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে তারা সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকেন। কখন ছাদের পলেস্তারা বা ভবনের কোনো অংশ ধসে পড়ে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। তারা দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এ সব বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল চরচাকে বলেন, “জেলার ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর তালিকা তৈরি করে শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমবে।”
বরিশাল জেলা শিক্ষা প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনগুলোকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব বিদ্যালয়ের সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।”