সিগারেটের প্রতিটি প্যাকেটে থাকা ছোট্ট ব্যান্ডরোল শুধু একটি কাগজের ফিতা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারের বিপুল রাজস্ব আদায়ের হিসাব। কোন দামের সিগারেট, কত শলাকা উৎপাদন হচ্ছে এবং সেই উৎপাদনের বিপরীতে কত ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আদায় হওয়ার কথা, তা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই ব্যান্ডরোল ব্যবস্থা।
কিন্তু এই ব্যবস্থার মধ্যেই ফাঁক-ফোকরের অভিযোগও সামনে আসছে। নকল বা ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল ও ব্যান্ডরোল ব্যবহারের হিসাবের অসামঞ্জস্যের অভিযোগে সম্প্রতি কয়েকটি কারখানায় অভিযান চালিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কোথাও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রাথমিক হিসাবও পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বাজারে প্যাকেটে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির তথ্যও মিলছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সিগারেটের উৎপাদন থেকে ব্যান্ডরোল ব্যবহার, কর পরিশোধ এবং শেষ পর্যন্ত বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটি কতটা কার্যকরভাবে নজরদারি করা হচ্ছে?
ব্যান্ডরোল আসলে কী, কোথা থেকে আসে?
সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল মূলত সরকারের নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তামূলক কর-চিহ্ন। দেশের সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তামূলক কর-লেবেল মুদ্রণ করে। ফলে এটি সাধারণ কোনো বাজারজাত করা পণ্য নয়, কোনো প্রতিষ্ঠান ইচ্ছামতো বাজার থেকে কিনে এটি ব্যবহার করতে পারে না।
এনবিআরের ২০১৯ সালের সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় সিগারেটের প্যাকেটে স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি রাখা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। সর্বশেষ গত ১১ জুন সিগারেটের খুচরা মূল্য ও সম্পূরক শুল্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোলের ব্যবহার এবং ভ্যাট-সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ নিয়ে নতুন আদেশ জারি করা হয়।
অর্থাৎ, কোনো সিগারেট কোম্পানি নিজের মতো করে ব্যান্ডরোল তৈরি করে প্যাকেটে লাগাতে পারে না। নির্ধারিত মূল্যস্তর, শলাকার সংখ্যা ও প্যাকেটের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট নকশার ব্যান্ডরোল ব্যবহার করতে হয়।
দাম অনুযায়ী বদলে যায় ব্যান্ডরোল
চলতি অর্থবছরের জন্য সিগারেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণের পর ব্যান্ডরোল ব্যবস্থাতেও নতুন বিধান যুক্ত করেছে এনবিআর। সিগারেটের প্যাকেটের দামের ভিন্নতা হিসেবে ব্যান্ডরোলের একেকটি ক্যাটাগরি ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।
১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৬৫ টাকা বা তার বেশি হলে নির্দিষ্ট ধরনের হালকা সবুজ রঙয়ের ব্যান্ডরোল ব্যবহারের বিধান করা হয়েছে। একইভাবে ৯২ টাকা বা তার বেশি মূল্যস্তরের জন্য আলাদা নকশা, ১৬০ টাকা বা তার বেশি হলে আরেক নকশা এবং ২১০ টাকা বা তার বেশি হলে অন্য একটি নকশার স্ট্যাম্প ব্যবহারের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, শুধু প্যাকেটে ব্যান্ডরোল থাকলেই হবে না, সেটি সংশ্লিষ্ট সিগারেটের মূল্যস্তর, শলাকার সংখ্যা ও প্যাকেটের ধরন অনুযায়ী সঠিক ব্যান্ডরোল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই ব্যান্ডরোল ব্যবস্থার মূল গুরুত্ব। একটি নির্দিষ্ট মূল্যস্তরের সিগারেটের প্যাকেটের জন্য ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলের সংখ্যা এবং কারখানায় উৎপাদিত সিগারেটের প্যাকেটের হিসাবের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকার কথা। ফলে কাগজে যত উৎপাদন দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তত সিগারেট উৎপাদিত হয়েছে কি না এবং সেই উৎপাদনের সঙ্গে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলের হিসাব মিলছে কি না, সেটিই এনবিআরকে মনিটর করতে হয়।
নকল ব্যান্ডরোলে রাজস্ব ক্ষতির চিত্র
মূলত বাজারজাতকরণের সময় ব্যান্ডরোলের মাধ্যমেই সিগারেটের অধিকাংশ কর সংগৃহীত হয়। কিন্তু নকল ও পুনঃব্যবহৃত ব্যান্ডরোল ব্যবহারের কারণে প্রতি বছর সরকার কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ী ও কিছু অনিয়ন্ত্রিত কারখানা মূলত বিদেশ থেকে জাল ব্যান্ডরোল চোরাচালান করে অথবা ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল পুনরায় সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দিয়ে থাকে।
বিভিন্ন গবেষণা, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য ও প্রাক্কলন অনুযায়ী, শুধু সিগারেট ও বিড়ি খাতে জাল ও পুনঃব্যবহৃত ব্যান্ডরোল প্রয়োগের ফলেই বছরে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব ফাঁকি হয়। এ ছাড়া এনবিআরের কিছু সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, তামাকজাত পণ্যে অবৈধ ব্যান্ডরোলের ব্যবহার এবং অসাধু চক্রের এসব কারসাজি পুরোপুরি রোধ করা না গেলে সামগ্রিক রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ব্যান্ডরোল নিলেই কি পুরো কর পরিশোধ হয়ে যায়?
সিগারেটের ব্যান্ডরোল নিয়ে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তির জায়গাগুলোর একটি হলো, ব্যান্ডরোল সংগ্রহের সময়ই কোম্পানি সংশ্লিষ্ট সিগারেটের পুরো কর পরিশোধ করে দেয় কি না। বিষয়টি এত সোজা নয়। ব্যান্ডরোল রাজস্ব আদায় ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ঠিকই; তবে ব্যান্ডরোল হাতে পাওয়া মানেই সিগারেটের পুরো কর পরিশোধ হয়ে গেছে, এমন নয়।
এনবিআরের বিভিন্ন নির্দেশনায় কোম্পানিগুলোর প্রতিটি ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেটের ধরন, এক প্যাকেটে শলাকার সংখ্যা ও প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য অনুযায়ী শুল্ক-কর নির্ধারণ এবং রাজস্ব আদায় কার্যক্রম তদারকির কথা রয়েছে।
এ কারণে ব্যান্ডরোল সরবরাহ, ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল, অব্যবহৃত ব্যান্ডরোল, নষ্ট বা অপচয় হওয়া ব্যান্ডরোল এবং উৎপাদিত সিগারেটের হিসাব–সবগুলোই একটির সঙ্গে অন্যটি মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো কারখানায় কত ব্যান্ডরোল সরবরাহ করা হয়েছে, তার কতটি উৎপাদনে ব্যবহার হয়েছে, কতটি নষ্ট হয়েছে বা অব্যবহৃত রয়েছে এবং সেই অনুপাতে কত সিগারেট উৎপাদিত হয়েছে–এই পুরো হিসাবের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলেই রাজস্ব ফাঁকির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ব্যান্ডরোলের হিসাবেই ধরা পড়তে পারে রাজস্ব ফাঁকি
সিগারেটের রাজস্ব ফাঁকির একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয় তখনই, যখন সিগারেটের প্রকৃত উৎপাদনের হিসাবের সঙ্গে ব্যান্ডরোল ব্যবহারের হিসাবের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। বৈধ ব্যান্ডরোলের বাইরে সিগারেট উৎপাদন, ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল পুনরায় ব্যবহার, নকল ব্যান্ডরোল লাগানো কিংবা উৎপাদনের তথ্য গোপন করা হলে সরকারের জন্য রাজস্ব ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক একটি অভিযান সেই ঝুঁকিকেই সামনে এনেছে। গত ২ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেডে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০ লাখ শলাকা নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট ধ্বংস করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। কারখানাটিতে ব্যবহৃত ও নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেটের প্যাকেট পাওয়া যায়। অভিযানে ব্যবহৃত স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল, সিগারেট উৎপাদনের কাঁচামাল এবং তিনটি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়।
পরে জব্দ করা মোবাইল ফোনের চ্যাট, বিক্রয়সংক্রান্ত বার্তা ও হিসাব বিশ্লেষণ করে নকল ও ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেটের প্যাকেট গোপনে বিক্রির তথ্য পাওয়ার কথা জানায় ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তাদের প্রাথমিক হিসাবে, নকল ও ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল, গোপন উৎপাদন এবং হিসাবের বাইরে বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৭২ কোটি টাকার বেশি কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঈশ্বরদীর ইউনাইটেড টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজে অভিযান চালিয়েও জাল ব্যান্ডরোল ও হিসাবের বাইরে উৎপাদনের মাধ্যমে প্রায় ৯ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
অভিযানে ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৫৯০ শলাকা জাল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট এবং ১০ লাখের বেশি অব্যবহৃত জাল ব্যান্ডরোল উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়।
ব্যান্ডরোল জালিয়াতির শাস্তি কী?
ব্যান্ডরোল জালিয়াতি বা নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহারের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য (ভ্যাট) আলী আহমেদ চরচাকে বলেন, “এমন ঘটনা ঘটলে তা তো সহজেই ধরে ফেলা সম্ভব। আর এটি প্রমাণিত হলে তা অবশ্যই একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে জেল না হলেও বড় অঙ্কের জরিমানা করা হবে।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, নকল বা অবৈধ ব্যান্ডরোল ব্যবহার শুধু একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, প্রমাণিত হলে শাস্তিও হওয়ার কথা। এখানে ব্যান্ডরোলের হিসাব কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও স্পষ্ট। একটি কারখানায় যদি উৎপাদিত সিগারেটের পরিমাণ এবং ব্যবহৃত বৈধ ব্যান্ডরোলের হিসাবের মধ্যে মিল না থাকে, তাহলে সেই অসামঞ্জস্যের কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। কারণ উৎপাদনের একটি অংশ যদি বৈধ ব্যান্ডরোলের বাইরে চলে যায়, সেক্ষেত্রে সরকার রাজস্বও হারাতে পারে।
মাঠপর্যায়ে নজরদারি কতটা হচ্ছে?
কাগজে-কলমে ব্যান্ডরোল ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ থাকলেও মাঠপর্যায়ে নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ঢাকা উত্তরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার আল আমিন চরচাকে বলেন, “আমি বাড্ডা এলাকায় ফিল্ড লেভেলে কাজ করি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে মাঝে মাঝে যে অভিযানের নির্দেশনা আসে, আমরা সেগুলো প্রতিপালন করি। তবে এর বাইরে আপনি যে বিষয়টি বলছেন, সেরকম কার্যক্রম সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমার জানা নেই।”
নিজেদের এলাকায় এমন কোনো ঘটনার অভিযোগ বা অভিযান হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এমন ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি।’
এমআরপির চেয়ে বাড়তি দামে সিগারেট বিক্রি সম্পর্কিত অভিযানের ক্ষেত্রেও আল আমিনের বক্তব্য ছিল একই। তার এই বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, জাতীয় পর্যায়ে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের অভিযান থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়মের তথ্য একইভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
কর কাঠামোর ফাঁক নিয়েও প্রশ্ন
সিগারেটের কর কাঠামোর দুর্বলতা ও রাজস্ব আদায় নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলে আসছে। অ্যান্টি-টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা) সাম্প্রতিক প্রাক্-বাজেট আলোচনায় সিগারেটের মূল্যস্তর কমিয়ে নির্দিষ্ট কর বা স্পেসিফিক ট্যাক্স চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। সংগঠনটির হিসাবে, প্রস্তাবিত কর কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সরকারের রাজস্ব বাড়তে পারে।
ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করা গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা)-এর বিভিন্ন আলোচনা ও কর্মশালাতেও তামাক কোম্পানিগুলোর ঘোষিত উৎপাদন, বাজারে সরবরাহ এবং সরকারের কাছে পরিশোধ করা করের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্যের মূল জায়গা হলো, উৎপাদন ও করের হিসাবের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে সরকার যেমন রাজস্ব হারায়, তেমনি আইন লঙ্ঘনের প্রশ্নও তৈরি হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে কি না, সেটি নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব, উৎপাদন, ব্যান্ডরোল ব্যবহার ও কর পরিশোধের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যান্ডরোল ব্যবস্থার কার্যকারিতা, উৎপাদন ও রাজস্ব পরিশোধের সঙ্গে এর সম্পর্ক এবং বাজারে সিগারেট বিক্রির বিষয়ে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের মন্তব্য জানতে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ফলে কোম্পানিটির ব্যান্ডরোল ব্যবহারের প্রক্রিয়া, সিগারেটের উৎপাদন ও ব্যান্ডরোলের হিসাব কীভাবে সমন্বয় করা হয় এবং এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বাজারে সিগারেট বিক্রির বিষয়ে তাদের অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।
এর বাইরে ক্যামেল ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্রস্তুতকারক জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অলিভার কুটজের সঙ্গেও এ প্রসঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ করা হয়। তিনিও সাড়া দেননি।
সাড়া পাওয়া যায়নি মার্লবোরো ব্র্যান্ডের প্রস্তুতকারক ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল থেকেও। ব্যান্ডরোলের প্রক্রিয়া নিয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশ শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা-উর-রহমান মাহমুদের ফোন ও ইমেইলে যোগাযোগ করা হয়েছিল।
রাজস্ব সুরক্ষায় পুরো শৃঙ্খল নজরদারিতে আনা জরুরি
সিগারেটের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে শুধু ব্যান্ডরোলের সংখ্যা গোনা যথেষ্ট নয়। একটি প্যাকেট উৎপাদনের সময় সঠিক মূল্যস্তরের ব্যান্ডরোল ব্যবহার হয়েছে কি না, সেই ব্যান্ডরোলের হিসাব উৎপাদনের সঙ্গে মিলছে কি না, উৎপাদিত পণ্য বৈধ চালানসহ বাজারে গেছে কি না এবং শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের মধ্যে বিক্রি হচ্ছে কি না–এই পুরো শৃঙ্খলই নজরদারির আওতায় থাকা প্রয়োজন।
এখানে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের মাঠপর্যায়ের নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা উত্তরের কাস্টমস ও ভ্যাট কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনায় অভিযান পরিচালিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। অন্যদিকে বাজার অনুসন্ধানে নিয়মিত অনিয়মের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা জরুরি। কারণ, অভিযোগই যদি মাঠপর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তাদের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে নিয়মিত বাজার তদারকি ছাড়া অনিয়ম শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
সিগারেটের প্রতিটি প্যাকেটের ব্যান্ডরোল তাই শুধু একটি কর-চিহ্ন নয়, এটি উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত রাজস্ব ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ উপাদান। ব্যান্ডরোলের হিসাব, উৎপাদন, কর পরিশোধ, চালান ও বাজারজাতকরণের তথ্য যদি একই সঙ্গে যাচাই করা যায়, তাহলে রাজস্ব ফাঁকির ঝুঁকি অনেকটাই শনাক্ত করা সম্ভব।
আর যদি কোথাও ব্যান্ডরোলের হিসাবের সঙ্গে উৎপাদন না মেলে, নকল বা পুনর্ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলের ব্যবহার পাওয়া যায় কিংবা হিসাবের বাইরে উৎপাদনের প্রমাণ মেলে, তাহলে সেটি শুধু হিসাবের অসঙ্গতি নয়; সরকারের রাজস্ব সুরক্ষা ও আইনের প্রয়োগ–দুটোরই বড় পরীক্ষা।