Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১০ অক্টোবর, ২০২৬
১০ অক্টোবর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১০ অক্টোবর, ২০২৬
১০ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
Advertisement
Advertisement
> বিশেষ প্রতিবেদন

সিগারেটের দামে হরিলুট: বাড়তি মুনাফা নাকি রাজস্ব ফাঁকির খেলা?

রেজাউল করিম

রেজাউল করিম

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ৪১
সিগারেটের দামে হরিলুট: বাড়তি মুনাফা নাকি রাজস্ব ফাঁকির খেলা?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সিগারেটের প্যাকেটে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা এমআরপি লেখা থাকলেও বাজারে সেই দামে সিগারেট বিক্রি হচ্ছে না। বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট প্যাকেটের গায়ে লেখা এমআরপির চেয়ে ১২ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এক শলাকা হিসেবে বিক্রির ক্ষেত্রেও প্যাকেটের ঘোষিত দামের সঙ্গে বাজারের প্রকৃত দামের বড় ব্যবধান দেখা গেছে।

Advertisement

বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ৪২১ টাকা এমআরপি লেখা বেনসন ব্র্যান্ডের সিগারেটের একটি প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৪৬০ টাকায়। আর গোল্ডলিফ ৩২০ টাকার এমআরপির বিপরীতে বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ টাকায়, লাকি ২১৬ টাকার বিপরীতে ২৪০ টাকায় এবং স্টার ব্র্যান্ডের সিগারেটের একটি প্যাকেট ১৮৪ টাকার বিপরীতে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ, প্যাকেটপ্রতি একজন ভোক্তাকে নির্ধারিত এমআরপির চেয়ে বেশি দাম দিতে হচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

তবে খুচরা বিক্রেতা কেন বেশি দাম নিচ্ছেন–তার চেয়েও বড় প্রশ্নটা এখানে সিগারেটের দাম, কোম্পানি ও পরিবেশকের মুনাফা এবং খুচরা পর্যায়ে এমআরপি কার্যকর রাখার ব্যবস্থা নিয়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য (ভ্যাট) আলী আহমেদ বলছেন, “এমআরপির মধ্যে কর ও মুনাফা হিসাব করেই মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এর বেশি দামে বিক্রি পুরোপুরি অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ।

প্যাকেটে এক দাম, বাজারে আরেক

চরচার বাজার পর্যবেক্ষণে ৯টি ব্র্যান্ডের সিগারেটের দাম যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে বেনসনের প্যাকেটে এমআরপি লেখা রয়েছে ৪২১ টাকা। কিন্তু বাজারে পুরো প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৪৬০ টাকায়। অর্থাৎ প্যাকেটপ্রতি ৩৯ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এক শলাকার দাম নেওয়া হচ্ছে ২৩ টাকা। মার্লবোরোর ক্ষেত্রেও হিসাবটা একই–প্যাকেটে এমআরপি ৪২০ টাকা থাকলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৪৬০ টাকায়। এক শলাকার দাম নেওয়া হচ্ছে ২৩ টাকা।

গোল্ডলিফের ক্ষেত্রে প্যাকেটে এমআরপি ৩২০ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ বা ৩৬০ টাকায়। এক প্যাকেটে ব্যবধান ৩০/৪০ টাকা। এক শলাকার দাম নেওয়া হচ্ছে ১৮ টাকা। লাকির এমআরপি ২১৬ টাকা, কিন্তু বাজারে প্যাকেটপ্রতি দাম ২৪০ টাকা এবং এক শলাকা ১২ টাকা।

স্টার ও লাকি দুই ব্র্যান্ডেরই প্যাকেটে এমআরপি ১৮৪ টাকা লেখা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। একইভাবে ক্যামেলের ১৮৪ টাকার এমআরপি থাকা প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।

রয়েলের ক্ষেত্রে এমআরপি ১২৮ টাকা হলেও প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। হলিউড ও ডারবির এমআরপি ১৪৪ টাকা হলেও উভয় ব্র্যান্ডের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়।

ই-সিগারেটসহ নতুন তামাকপণ্য ব্যবহারকারী সাড়ে ৫% তরুণ: গবেষণার ফলe-cigg

অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ করা প্রতিটি ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রেই প্যাকেটে লেখা এমআরপির চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যবধান ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটপ্রতি ১২ টাকা থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত।

এমআরপি’র বেশি দামে বিক্রি বেআইনি

পুরানা পল্টনের সিগারেট বিক্রেতা কাউসার আলী চরচাকে বলেন, “আমরা ডিলারদের কাছ থেকে যে দামে সিগারেট কিনি, তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি না করলে আমাদের লাভ থাকে না। ডিলাররাও আমাদের কাছে গায়ের দামেই বিক্রি করে। তাই প্যাকেটে যে এমআরপি লেখা থাকে, সেই দামে বিক্রি করলে আমাদের পক্ষে ব্যবসা চালানো কঠিন।”

পুরো বাংলাদেশেই চিত্রটা একই বলে জানালেন কাউসার আলী। তিনি বলেন, “এটা শুধু আমার দোকানের বিষয় নয়। বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি দোকানের একই অবস্থা। আমরা যে দামে সিগারেট কিনি, সে দামেই বিক্রি করতে গেলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বাধ্য হয়ে গায়ের দামের চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।”

তবে সিগারেটের এমআরপি নিয়ে দোকানদাররা কেনা দাম ও মুনাফার যে যুক্তি দিচ্ছেন, সেটিকে সরাসরি নাকচ করে দিচ্ছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য (ভ্যাট) আলী আহমেদ, “দোকানদারদের এই কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমআরপি হিসাব করেই নির্ধারণ করা হয় এবং এর মধ্যে ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত থাকে। এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করার কোনো কারণ নেই। যদি ডিলাররা এমআরপি রেটেই তাদের কাছে দাম রাখে, তাহলে তারা (দোকানদাররা) প্রশ্ন করে না কেন যে, কেন তারা (ডিলাররা) এমআরপিতে দাম রাখছেন? তার মানে হলো, এই অবৈধ কারবারের সাথে তারাও (দোকানদার) জড়িত।”

এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করার ক্ষেত্রে আইনি বিধান আছে জানিয়ে আলী আহমেদ বলেন, “এমআরপি কথাটির অর্থই হলো সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য। এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করার নিয়ম নেই। এমনটি করা হয়ে থাকলে তা আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।”

আইন কী বলছে

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৩৭ ধারায় প্যাকেটজাত পণ্যের মোড়কে সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই আইনের ৪০ ধারায় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কোনো পণ্য বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাবকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

নিজের স্বার্থেই বাংলাদেশের তামাকের ওপর কর বাড়ানো প্রয়োজনcigarette

অর্থাৎ কোনো প্যাকেটে যে এমআরপি লেখা রয়েছে, তার চেয়ে বেশি দামে সেই পণ্য বিক্রি হলে সেটি ভোক্তা অধিকার আইনের আওতায় অপরাধ। কিন্তু এই আইন পরিপালনে এনবিআর বা ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে কতটা কাজ করছে, এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এই বিষয়ে ঢাকা উত্তরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার আল আমিন চরচাকে বলেন, “আমি বাড্ডা এলাকায় ফিল্ড লেভেলে কাজ করি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে মাঝে মাঝে যে অভিযানের নির্দেশনা আসে, আমরা তখন সেগুলো পরিচালনা করি।”

তবে এমআরপির বেশি দামে সিগারেট বিক্রির মতো বিষয়ে নিয়মিত কোনো কার্যক্রমের তথ্য তার জানা নেই বলে জানান আল আমিন। তার নিজের এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ বা অভিযান হয়েছে কি না–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এমন ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি।”

অর্থাৎ চরচার বাজার পর্যবেক্ষণে এমআরপির বেশি দামে সিগারেট বিক্রির তথ্য পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে এ ধরনের অভিযোগ আসার তথ্য নেই। ফলে বাজারে যে বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে যে অভিযোগ পৌঁছাচ্ছে, এ দুটির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে।

কোম্পানিই কি এমআরপি দামে দোকানদারের কাছে বিক্রি করছে?

সিগারেটের বাজারে এমআরপি লঙ্ঘনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই। বাজারে প্যাকেটে লেখা দামের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির তথ্য পাওয়া গেলেও, এর পুরো দায় শুধু খুচরা বিক্রেতার কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

কারণ সিগারেটের মূল্য শৃঙ্খলে কোম্পানি, পরিবেশক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা–একাধিক স্তর রয়েছে। একজন খুচরা বিক্রেতা কোনো পণ্য কত দামে কিনছেন এবং সেই পণ্যের প্যাকেটে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কত লেখা রয়েছে, সেটিই তার বৈধ মুনাফার জায়গা বোঝার অন্যতম ভিত্তি।

তবে আলী আহমেদ এই যুক্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছেন। তিনি বলেন, “এমআরপি নির্ধারণের সময় কর ও মুনাফা দুটিই বিবেচনায় থাকে। ফলে এমআরপির বেশি দামে বিক্রির জন্য দোকানদারের কেনা দামকে কারণ হিসেবে দেখানো ঠিক নয়।”

এখানে অবশ্য কোম্পানি থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত প্রকৃত ক্রয়মূল্য যাচাই করা জরুরি। কোম্পানি কত দামে পণ্য ছাড়ছে, পরিবেশক ও পাইকার কত দামে বিক্রি করছেন এবং খুচরা বিক্রেতার প্রকৃত ক্রয়মূল্য কত—এসব তথ্য ছাড়া সরবরাহশৃঙ্খলের কোন স্তরে অতিরিক্ত মূল্য তৈরি হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

‘মদ-সিগারেটের দাম বাড়ানো বাজেট বিরোধীদলের পছন্দ না’tarek-rahman-at-coxbazar

এসব ব্র্যান্ডের মধ্যে বেনসন, গোল্ডলিফ, লাকি, লাকিজ, স্টার, রয়েল, হলিউড ও ডারবি হলো ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের। এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটি) সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে বিএটি বাংলাদেশের ডিলার রায়হান হোসেন চরচাকে বলেন, “পণ্যের গায়ে যদি ৩৬ টাকা লেখা থাকে, তবে আমরা দোকানদারের কাছে ৩৬ টাকাতেই বিক্রি করি। কারণ আমরাও ৩৬ টাকা রেটেই সরকারের কর পরিশোধ করি।”

যদি এমআরপি রেটেই দোকানদারের কাছে বিক্রি করা হয়, তাহলে দোকানদার কীভাবে এমআরপির রেটে বিক্রি করবে–এমন প্রশ্ন করা হলে রায়হান হোসেন বলেন, “দোকানদার কী দামে বিক্রি করবে, সেটা আমাদের দেখার দরকার নাই। কোম্পানি আমাদের খুবই কম লাভে দেয়। তাই এমআরপির চেয়ে কম আমরা রাখতে পারি না।”

কোম্পানি থেকে ডিলার কত দামে কেনে–জানতে চাইলে বিএটির এই ডিলার বলেন, “এটা আরও উপর লেভেলের কাজ। এটা নির্ধারণ হয় আরও বড় জায়গা থেকে। সেটা আমি বলতে পারব না।” এই বলে ফোন কেটে দেন রায়হান হোসেন।

এছাড়া ক্যামেল হলো জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের। এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অলিভার কুটজের সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ করা হয়। তিনিও সাড়া দেননি।

বিশ্বখ্যাত ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনালের ফ্ল্যাগশিপ ব্র্যান্ড হলো মার্লবোরো। এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে ফিলিপ মরিস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা-উর-রহমান মাহমুদের ফোন ও ইমেইলে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

এক শলাকায় বাড়তি দামের আরেক চিত্র

সিগারেটের বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একেকটি শলাকার বিক্রয়মূল্য। প্যাকেটের এমআরপি দিয়ে পুরো প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারিত হলেও বাস্তবে বেশিরভাগ ভোক্তাই একসঙ্গে পুরো প্যাকেট না কিনে একটি বা কয়েকটি শলাকা কেনেন।

চরচার বাজার পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, এক শলাকার দামে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে বড় ব্যবধান রয়েছে। বেনসনের এক শলাকার দাম ২৩ টাকা, মার্লবোরো ২৩ টাকা, গোল্ডলিফ ১৮ টাকা, লাকি ১২ টাকা এবং স্টার, লাকিজ ও ক্যামেল ১০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এর বাইরে রয়েল ৭ টাকা এবং হলিউড ও ডার্বি ৮ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

তামাকপণ্য সহজলভ্য হলে হাতছাড়া হবে রাজস্বের সুযোগ: প্রজ্ঞা ও আত্মাcigarette

এক শলাকার দামকে প্যাকেটের এমআরপির সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্যাকেটে কতটি শলাকা রয়েছে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এক শলাকার বাড়তি মূল্য এবং প্যাকেটপ্রতি এমআরপির পার্থক্য এক বিষয় নয়।

তবে এক শলাকা বিক্রির ক্ষেত্রে ভোক্তা কী দাম দিচ্ছেন এবং সেই দামের সঙ্গে প্যাকেটে ঘোষিত মূল্যের সম্পর্ক কী, সেটি বাজার বাস্তবতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক শলাকা বিক্রির ক্ষেত্রে বাড়তি দামের আরেকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। সিগারেটের মূল্য নির্ধারণে ভগ্নাংশ বা খুচরা পয়সার সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, “একটি সিগারেটের দাম ৬ টাকা ২০ পয়সা দেওয়া থাকলে আপনার পক্ষে তো ২০ পয়সা ভাঙতি দেওয়া কঠিন, আপনি ৭ টাকাই দেবেন। এই যে ভাঙতি বা খুচরা পয়সার ঝামেলা, এই খুচরাটা ক্রেতার জন্য সুবিধাজনক নয়। ফলে ক্রেতা ঘুরেফিরে ওই রাউন্ড ফিগার বা পূর্ণ টাকাটাই দিয়ে দেয়।”

এই সমস্যার সমাধানে হোসেন জিল্লুর রহমানের পরামর্শ, “দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে পূর্ণ সংখ্যা বা ‘রাউন্ডিং অফ’ করে দাম দেওয়া বেশি যুক্তিসংগত। এই বিষয়টি মনিটর বা তদারকি করেও খুব একটা সমাধান করা যাচ্ছে না। সরকারের উচিত এই এমআরপি মনিটর না করে, মূল্য নির্ধারণ বা প্রাইস সেটিংয়ের সময় এমনভাবে ঠিক করা, যাতে এই রাউন্ডিং এরর বা খুচরা পয়সার সমস্যা না হয়।”

“ভোক্তারাও এ ধরনের সামান্য পার্থক্য নিয়ে সাধারণত প্রশ্ন করেন না। ফলে দাম নির্ধারণের সময়ই এমন ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে খুচরা পয়সার কারণে ঘোষিত মূল্য থেকে বাস্তব বাজারদর বেড়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকে”, বলেছেন হোসেন জিল্লুর রহমান।

তবে বাজার পর্যবেক্ষণে যে ব্যবধান পাওয়া গেছে, তার সবটুকু শুধু ‘রাউন্ডিং’ বা খুচরা পয়সার সমস্যায় ব্যাখ্যা করা যায় না। বেনসন, গোল্ডলিফ, লাকি, স্টার, লাকিজ, রয়েল, ক্যামেল, হলিউড, ডার্বি ও মার্লবোরোর ক্ষেত্রে প্যাকেটপ্রতি যে ১২ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান পাওয়া গেছে, তা খুচরা পয়সার সমস্যার তুলনায় অনেক বড়।

রাজস্ব ফাঁকির প্রশ্নও সামনে

এমআরপির চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির বিষয়টির সঙ্গে শুধু ভোক্তার অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের বিষয় নয়, সরকারের রাজস্ব আদায়ের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট।

২০২৬ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো এবং বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসির এক গবেষণায় দাবি করা হয়, এমআরপির চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার সম্ভাব্য ৫ হাজার ১৮২ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। গবেষণাতে ১২টি শহরের ৪৮টি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের তথ্য ব্যবহার করা হয়।

গবেষকদের দাবি, কোম্পানিগুলো প্যাকেটে লেখা এমআরপি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করলেও খুচরা পর্যায়ে তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় প্রকৃত বাজারমূল্যের ওপর প্রযোজ্য কর কাঠামো থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে।

তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞা ও আত্মাও (অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স) চলতি বছরে সিগারেটের কর কাঠামো পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে। গত ২০ এপ্রিলের যৌথ প্রাক্-বাজেট সংবাদ সম্মেলন এবং ২৮ এপ্রিল এনবিআরের সঙ্গে আত্মার প্রাক্-বাজেট আলোচনায় সিগারেটের মূল্যস্তর কমানো, সুনির্দিষ্ট কর আরোপ ও কার্যকর কর আদায়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আত্মার হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত কর সংস্কার বাস্তবায়ন হলে বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব।

প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেছেন, “তামাক কোম্পানিগুলোর সুচতুর রাজস্ব ফাঁকি ও অসদুপায় বাণিজ্য বন্ধ করতে হলে দ্রুত সিগারেটের একাধিক মূল্যস্তর বাতিল করে একটি সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে তামাক ব্যবহার হ্রাসের পাশাপাশি সরকার প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব পেতে পারে।”

সিগারেটের দামের কারসাজির প্রভাব রাজস্বের ওপর কীভাবে পড়ে, এ নিয়ে এবিএম জুবায়ের বলেন, “প্যাকেটের গায়ে একটি এমআরপি (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) লেখা থাকলেও বাজারে প্রতিটি সিগারেট নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এতে কেবল সাধারণ ভোক্তাই আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছেন না, বরং ভোক্তাদের কাছ থেকে এই বাড়তি টাকা তুলে নিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো নিজেদের পকেটে পুরছে, যা সরাসরি ভোক্তা অধিকারের লঙ্ঘন।”এনবিআরের বাজেট সংলাপে আত্মা-এর নেতাদের লিখিত প্রস্তাব হলো, “নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে তামাকপণ্য বিক্রি বন্ধ করতে এনবিআর ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কড়া মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। এমআরপির বাস্তবায়ন না থাকায় তামাক কোম্পানি ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরি করে ভোক্তা থেকে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, যা অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি।”

বিষয়: ভ্যাটসিগারেটবাজারদরজাতীয় রাজস্ব বোর্ডবাজেট
Advertisement
সর্বশেষ
  • ১

    রাজনৈতিক প্রোপাগাণ্ডা ও বিদ্যায়তনিক পরাধীনতার শিকার তাসনীম সিরাজ

  • ২

    ব্রাজিলের নির্বাচন ও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য

  • ৩

    সরকারি কর্মী: বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক ও সময়োচিত

  • ৪

    ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান আইনসভায় নির্বাচিত অমুসলিম ছিলেন ৭২ জন, এখন বাংলাদেশে ৪

  • ৫

    ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন: গভর্নর

সম্পর্কিত
  • বার বার হয় দাম নির্ধারণ, তবু এলপি গ্যাস মেলে না কেন

    বার বার হয় দাম নির্ধারণ, তবু এলপি গ্যাস মেলে না কেন

    রাজধানীর দোকানে দোকানে ঘুরে এলপি গ্যাস পাচ্ছেন না ক্রেতারা। কোনো দোকানে পাওয়া গেলে তার জন্য গুনতে হচ্ছে কমপক্ষে দুই হাজার ৪০০ টাকা। সরকার নির্ধারিত দাম এক হাজার ৮৩৭ টাকা। অভিযোগ ছিল, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দামে বিক্রি করা হয় এলপি গ্যাস। যদিও তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, স

  • গবেষণার নতুন নিয়মে আপত্তি কেন শিক্ষকদের?

    গবেষণার নতুন নিয়মে আপত্তি কেন শিক্ষকদের?

    পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চলতি অর্থ-বছরের বাজেটে গবেষণায় কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। গবেষণায় বরাদ্দে নতুন নিয়ম করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এখন থেকে ইউজিসি গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা করে তহবিল দেবে।

  • ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশায় লাভ আসলে কেমন? নিয়ন্ত্রণ কার?

    ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশায় লাভ আসলে কেমন? নিয়ন্ত্রণ কার?

    রাজধানীর গলি থেকে আবাসিক সড়ক, বাজার, এমনকি প্রধান সড়কও এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে। ‘অটোরিকশা’ নামেই বেশি পরিচিত এই রিকশাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

  • হকার-দোকানের দখলে খুলনার ফুটপাত, ভোগান্তি

    হকার-দোকানের দখলে খুলনার ফুটপাত, ভোগান্তি

    খুলনা মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়কগুলোর দু’পাশের ফুটপাত হকার ও ব্যবসায়ীদের অবৈধ দখলে থাকায় নিত্যদিন তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের সুযোগ না থাকায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে সড়কের ওপর দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিনই ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনা।