১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় চার জাতীয় নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এএইচএম কামারুজ্জামান, এম মনসুর আলী ও তাজউদ্দীন আহমদকে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রাখা এই চার জাতীয় নেতাকে কারাগারে বন্দী অবস্থায় হত্যা করে কিছু বিপথগামী সেনাকর্মকর্তা। বাংলাদেশের ইতিহাসের কলঙ্কিত এক অধ্যায় এই জেলহত্যা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে এমন এক নৃশংস ঘটনা ঘটে গেলেও দেশের মানুষের কাছ থেকে তা গোপন রাখা হয়। ঘটনার ৩০ ঘণ্টা পর দেশের মানুষ জানতে পারে কারাগারে বন্দী অবস্থায় জাতীয় নেতাদের হত্যা করা হয়েছে।
১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর স্বাভাবিকভাবেই তার সরকারের পতন ঘটে। শেখ মুজিবেরই অন্যতম সহযোগী খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাদের নিয়েই সরকার গঠন করা হয়। খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হলেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি শেখ মুজিব হত্যার সঙ্গে জড়িত সেনাকর্মকর্তাদের হাতে। শুরুতে শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ চার সহযোগী সৈয়দ নজরুল, এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমেদ ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে সরকারে যোগ দেওয়ার প্রলোভন দেখান রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক। কিন্তু তারা রাজি না হওয়ায় ২২ আগস্ট চারজনকেই গ্রেপ্তার করে কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়।
খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্ষণস্থায়ী সরকার। তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে পাল্টা অভ্যূত্থান ঘটে। রাষ্ট্রপতির আশপাশে শেখ মুজিবের হত্যাকারী সেনাকর্মকর্তাদের অবস্থান ও তাদের কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনীর একাংশের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে যে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে যায়, সেই সময় খন্দকার মোশতাক ও তার সহযোগী সেনাকর্মকর্তারা ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব হারানোর আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যান। ওই সময়ই সর্বোচ্চ মহল থেকে জেলে বন্দী জাতীয় চার নেতাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল ৪ নেতাকে
২ নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একদল সেনা সদস্য প্রবেশ করেন। তারা সবাই ওই মুহূর্তে ছিলেন যুদ্ধসাজে। হাতে ছিল স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী অস্ত্র হাতে সেখানে নিষিদ্ধ হলেও সেনাসদস্যরা জোর করেই প্রবেশ করার চেষ্টা করেন। ওই সময় কারা মহাপরিদর্শক ছিলেন কাজী নুরুজ্জামান। ঢাকার জেলার ছিলেন আমিনুর রহমান। জেলারের কক্ষে ওই রাতে একটি ফোন আসে। অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয় রাষ্ট্রপতি কারা মহাপরিদর্শকের সঙ্গে কথা বলতে চান। এর আগে সেনা সদস্যরা কারা মহাপরিদর্শককে একটি কাগজ দিয়ে দ্রুত কারাগারের ফটক খুলে দিতে চাপ দিচ্ছিলেন। জেলার মহাপরিদর্শককে ডেকে ফোন ধরতে বলেন।
মহাপরিদর্শকে নির্দেশ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক নিজেই। বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে আসে সেই কথপোকথন। রাষ্ট্রপতি কারা মহাপরিদর্শককে সরাসরি বলেন, “সেনাবাহিনীর লোকজন যা করতে চায়, তাদের যেন বাধা দেওয়া না হয়।”
এরপর দুটি আলাদা সেলে অবস্থান করা চার জাতীয় নেতাকে এক কক্ষে জড়ো করে ব্রাশফায়ারে তাদের হত্যা করা হয়। পুরো ঘটনাটা ঘটে যায় দ্রুত। সেনা সদস্যরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে দ্রুতই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে চলে যায়।
ওই সময় দেশের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। ক্যান্টনমেন্ট কিংবা বঙ্গভবনে চলছিল ঘটনার নানা মেরুকরণ। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একাংশ তখন পাল্টা অভ্যূত্থানের জন্য প্রস্তুত। বন্দী করা হয়েছে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। ঢাকার আকাশে উড়ছে মিগ যুদ্ধ বিমান। বঙ্গভবনের ভেতর অবরুদ্ধ রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ। শেখ মুজিবের খুনি সেনা কর্মকর্তারা দেশত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, বীরবিক্রম তার ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে লিখেছেন, “আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় চার নেতাকে বন্দি অবস্থায় হত্যার পর ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রপতি মোশতাক এ ঘটনা চেপে রাখেন যতক্ষণ মেজর ফারুক-রশিদ ও তাদের সহযোগীরা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশত্যাগ না করেন।”
প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর এ ঘটনা যখন প্রকাশিত হয়, গোটা দেশ হতভম্ব হয়ে যায়। দেশের মানুষের বুঝতে বাকি ছিল না জাতীয় চার নেতার এই নৃশংস হত্যার নেপথ্যে কারা আছে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ অভ্যূত্থানের নেতৃত্ব দিলেও তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা না নিয়ে সে সময়ের প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ করেন। রাষ্ট্রপতি সায়েম ৬ নভেম্বর শপথ নিলেও দেশ ওই সময় চরম শাসনতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক শূন্যতার মধ্যে ছিল। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল কার্যত সরকারবিহীন।
২২ আগস্ট গ্রেপ্তার হয়েছিলেন জাতীয় চার নেতা—এ কথা আগেই বলা হয়েছে। ওই সময় থেকেই তাদের পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। চার জাতীয় নেতার বাড়ির টেলিফোন লাইনই কেটে দেওয়া হয়েছিল। কারাগারে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটে গেলেও তারা কিছু জানতে পারেননি। ঢাকা তখন গুজবের শহর। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ভয়ংকর কিছু একটা ঘটে গেছে।
৪ নভেম্বর সকাল থেকে নিহতদের পরিবার জানতে পারেন ঘটনা। খালেদ মোশাররফের অভ্যূত্থানের জেরে ঢাকার আকাশে বিকট শব্দ করে উড়ছিল মিগ যুদ্ধ বিমান। যুদ্ধ বিমানগুলোর লক্ষ্য ছিল বঙ্গভবন যেখানে খন্দকার মোশতাক অবস্থান করছিল। ৪ নভেম্বর সকাল ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছে টিপু সুলতান রোডে বাস করা এক ব্যক্তি তাজউদ্দীন আহমেদের বাসায় এসে তার স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনকে ভয়াবহ সংবাদটি জানান। একই ভাবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানের পরিবার ৪ নভেম্বর থেকে ৫ নভেম্বরের মধ্যে জানতে পারেন তাদের প্রিয়জন আর বেঁচে নেই।