বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদে। এতে জাতীয় সংসদকে নিম্নকক্ষ এবং ১০০ সদস্যের সিনেটকে উচ্চকক্ষ হিসেবে গঠনের কথা বলা হয়েছে।
নিম্নকক্ষের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর পাওয়া ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হবেন। উচ্চকক্ষের দায়িত্ব হবে নিম্নকক্ষে প্রস্তাবিত আইন পর্যালোচনা করা এবং সংবিধান সংশোধনী বিলে অনুমোদন দেওয়া।
ভারত ও যুক্তরাজ্যেও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা রয়েছে। তবে দেশ দুটির উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচন, মেয়াদ, আইন প্রণয়নে ভূমিকা, অর্থবিল ও সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে ক্ষমতা এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পদ্ধতিতে ভিন্নতা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রস্তাবের পাশাপাশি ভারতের রাজ্যসভা ও যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো তুলে ধরা হলো।
উচ্চকক্ষের গঠন ও সদস্য সংখ্যা
জুলাই জাতীয় সনদের ১৭ নম্বর প্রস্তাবে বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের কথা বলা হয়েছে। এর একটি কক্ষ হবে জাতীয় সংসদ বা নিম্নকক্ষ, অন্যটি সিনেট বা উচ্চকক্ষ। উচ্চকক্ষে সদস্য থাকবেন ১০০ জন।
উচ্চকক্ষের সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো যে অনুপাতে ভোট পাবে, সেই অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন হবে। অর্থাৎ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাওয়া ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
এদিকে, ভারতের সংসদ গঠিত রাষ্ট্রপতি, লোকসভা ও রাজ্যসভা নিয়ে। লোকসভা নিম্নকক্ষ, রাজ্যসভা উচ্চকক্ষ। ভারতের সংবিধানের ৮০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৫০ হতে পারে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৩৮ জন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রতিনিধি এবং ১২ জন রাষ্ট্রপতি মনোনীত সদস্য।
রাষ্ট্রপতি সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সমাজসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা রয়েছে- এমন ব্যক্তিদের মনোনীত করতে পারেন। রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন করা হয়েছে সংবিধানের চতুর্থ তফসিল অনুযায়ী। রাজ্যসভার সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কক্ষটিতে ২৩৩ জন নির্বাচিত ও ১২ জন মনোনীত সদস্য রয়েছেন।
আর যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের দুটি কক্ষের একটি হাউস অব কমন্স বা নিম্নকক্ষ, অন্যটি হাউস অব লর্ডস বা উচ্চকক্ষ। কমন্সের সদস্যরা সাধারণ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। লর্ডসের সদস্যরা নির্বাচিত নন; তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
হাউস অব লর্ডসের সদস্যদের প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়- লর্ডস টেম্পোরাল ও লর্ডস স্পিরিচুয়াল। লর্ডস টেম্পোরালের অধিকাংশই আজীবন মেয়াদের জন্য নিয়োগ পাওয়া লাইফ পিয়ার। অন্যদিকে, লর্ডস স্পিরিচুয়াল হলেন চার্চ অব ইংল্যান্ডের জ্যেষ্ঠ বিশপ ও আর্চবিশপ।
১৯৯৯ সালের হাউস অব লর্ডস আইনে অধিকাংশ বংশানুক্রমিক সদস্যের অধিকার বাতিল করা হলেও ৯২ জনের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল। ২০২৬ সালের হাউস অব লর্ডস (হেরেডিটারি পিয়ার্স) আইনের মাধ্যমে সেই ব্যতিক্রমও বাতিল হয়েছে। ২৯ এপ্রিল ২০২৬ থেকে অবশিষ্ট বংশানুক্রমিক সদস্যদের উচ্চকক্ষে বসা ও ভোট দেওয়ার অধিকার শেষ হয়েছে। ফলে বর্তমানে উচ্চকক্ষটি মূলত লাইফ পিয়ার ও লর্ডস স্পিরিচুয়ালদের নিয়ে গঠিত।
হাউস অব লর্ডসের সদস্য সংখ্যার নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা নেই। প্রায় ৮০০ সদস্য উচ্চকক্ষের কাজে অংশ নেওয়ার যোগ্য। নিয়োগ, অবসর ও মৃত্যুর কারণে সদস্য সংখ্যা পরিবর্তিত হয়।
সদস্য নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্ব
জুলাই জাতীয় সনদের ১৮ নম্বর প্রস্তাবে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্য নির্বাচিত হবেন নিম্নকক্ষের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর পাওয়া ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) পদ্ধতিতে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে নিম্নকক্ষের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সময় উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকাও প্রকাশ করতে হবে। ওই তালিকায় কমপক্ষে ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী রাখতে হবে। অর্থাৎ, উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলগুলোর নির্বাচনী ভোটের অনুপাতের পাশাপাশি প্রার্থী তালিকায় নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে।
ভারতের রাজ্যসভার সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। রাজ্যগুলোর বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যরা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের (সিঙ্গেল ট্রান্সফারেবল ভোট) মাধ্যমে তাদের নির্বাচন করেন। ভোটাররা প্রার্থীদের পছন্দের ক্রমানুসারে ভোট দেন। নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে ভোট পরবর্তী পছন্দের প্রার্থীর কাছে স্থানান্তরিত হয়।
দিল্লি, পুদুচেরি ও জম্মু-কাশ্মীরের প্রতিনিধিরাও সংশ্লিষ্ট বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। এছাড়া, ১২ জন সদস্যকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেন। রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার ন্যূনতম বয়স ৩০ বছর।
যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সদস্যরা নির্বাচনের মাধ্যমে আসেন না; প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাজা তাদের নিয়োগ দেন। লাইফ পিয়ারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থীর নাম সুপারিশ করতে পারে। দলীয় পরিচয়ের বাইরে নির্দলীয় সদস্যরাও রয়েছেন, যারা ক্রসবেঞ্চার নামে পরিচিত।
২০০০ সালে গঠিত হাউস অব লর্ডস অ্যাপয়েন্টমেন্টস কমিশন নির্দলীয় লাইফ পিয়ার নিয়োগের জন্য ব্যক্তিদের সুপারিশ করে। সাধারণ মানুষও কমিশনের কাছে নাম প্রস্তাব করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর সুপারিশ করা প্রার্থীদেরও কমিশন যাচাই করে। তবে কমিশনের যাচাই-বাছাইয়ের ভূমিকা পরামর্শমূলক; প্রধানমন্ত্রীর মনোনয়ন বাতিল করার আইনি ক্ষমতা তাদের নেই। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাজা নিয়োগ চূড়ান্ত করেন।
এছাড়া, চার্চ অব ইংল্যান্ডের ২৬ জন জ্যেষ্ঠ বিশপ ও আর্চবিশপ হাউস অব লর্ডসের সদস্য। তাদের মধ্যে ক্যান্টারবেরি ও ইয়র্কের আর্চবিশপ রয়েছেন। কোনো বিশপের দায়িত্ব শেষ হলে তার সদস্যপদও শেষ হয়।
উচ্চকক্ষের মেয়াদ ও বিলুপ্তি
জুলাই জাতীয় সনদের ১৮ নম্বর প্রস্তাবে উচ্চকক্ষের মেয়াদ পাঁচ বছর করার কথা বলা হয়েছে। তবে কোনো কারণে নিম্নকক্ষ বা জাতীয় সংসদ ভেঙে গেলে উচ্চকক্ষও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে। অর্থাৎ, উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের মেয়াদের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকবে। নিম্নকক্ষের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা ভেঙে গেলে উচ্চকক্ষও আর বহাল থাকবে না।
ভারতের রাজ্যসভা একটি স্থায়ী কক্ষ। লোকসভার মতো পুরো রাজ্যসভা একসঙ্গে ভেঙে দেওয়া হয় না। রাজ্যসভার সদস্যদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতি দুই বছর পরপর সদস্যদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অবসরে যান এবং তাদের জায়গায় নতুন সদস্য নির্বাচিত হন। ভারতের সংবিধানের ৮৩ অনুচ্ছেদে এ বিধান রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে হাউস অব লর্ডসের সদস্যদের মেয়াদ তাদের সদস্যপদের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। লাইফ পিয়াররা জীবদ্দশার জন্য নিয়োগ পান। চার্চ অব ইংল্যান্ডের বিশপ ও আর্চবিশপরা তাদের দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত সদস্য থাকেন। বিশপের দায়িত্ব শেষ হলে লর্ডসের সদস্যপদও শেষ হয়। ফলে হাউস অব লর্ডসের সদস্যদের জন্য বাংলাদেশের প্রস্তাবের মতো পাঁচ বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গণনার মূহুর্ত। ছবি ভিডিও থেকে নেওয়া
আইন প্রণয়নে উচ্চকক্ষের ভূমিকা
জুলাই জাতীয় সনদের ১৯ নম্বর প্রস্তাবে উচ্চকক্ষের দায়িত্ব ও ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নিম্নকক্ষে প্রস্তাবিত আইন উচ্চকক্ষ বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করবে। তবে আইন প্রণয়নে বাধা দেবে না। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন প্রণয়নের জন্য নিম্নকক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠাতে পারবে।
নিম্নকক্ষে পাস হওয়া কোনো বিল উচ্চকক্ষে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে উচ্চকক্ষ তা সর্বোচ্চ দুই মাস বিবেচনায় রাখতে পারবে। এর বেশি সময় আটকে রাখলে বিলটি উচ্চকক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ, উচ্চকক্ষ কোনো বিল অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখতে পারবে না।
উচ্চকক্ষ কোনো বিল অনুমোদন করলে তা রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হবে। আর কোনো বিলের বিষয়ে সংশোধনের প্রয়োজন মনে করলে উচ্চকক্ষ সংশোধনের সুপারিশসহ সেটি নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠাতে পারবে। উচ্চকক্ষের সুপারিশ করা সংশোধনী নিম্নকক্ষ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে গ্রহণ করতে পারবে, আবার প্রত্যাখ্যানও করতে পারবে।
উচ্চকক্ষ থেকে ফেরত আসা বিল পুনর্বিবেচনার পর নিম্নকক্ষ যদি উচ্চকক্ষের সুপারিশ গ্রহণ না করে, তাহলে উচ্চকক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিলটি রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠাতে পারবে। অর্থাৎ, সাধারণ বিলের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের ভূমিকা হবে পর্যালোচনা ও সংশোধনের সুপারিশ করা; নিম্নকক্ষের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে।
ভারতের রাজ্যসভা সাধারণ বিলের ক্ষেত্রে লোকসভার সমান ক্ষমতা ভোগ করে। সাধারণ বিল দুই কক্ষের যেকোনো একটিতে উত্থাপন করা যায়। বিলটি আইনে পরিণত হতে হলে দুই কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। কোনো বিল নিয়ে দুই কক্ষের মধ্যে মতবিরোধ হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি যৌথ অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন। যৌথ অধিবেশনে দুই কক্ষের সদস্যরা একসঙ্গে বিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
সাধারণ বিল পর্যালোচনা ও সংশোধনী প্রস্তাব করার পাশাপাশি রাজ্যসভা নিজেও বিল উত্থাপন করতে পারে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে লোকসভা ও রাজ্যসভার ক্ষমতা মূলত সমান। তবে অর্থবিলের ক্ষেত্রে রাজ্যসভার ক্ষমতা সীমিত।
যুক্তরাজ্যে সাধারণভাবে কোনো বিল আইনে পরিণত হতে হলে হাউস অব কমন্স ও হাউস অব লর্ডস- দুই কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। দুই কক্ষেই বিল নিয়ে আলোচনা হয় এবং সংশোধনী প্রস্তাব করা যায়। কোনো বিল নিয়ে দুই কক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য পুনর্বিবেচনা ও আলোচনা চলে।
তবে হাউস অব লর্ডসের ক্ষমতা সীমাহীন নয়। ১৯১১ ও ১৯৪৯ সালের পার্লামেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী, অধিকাংশ পাবলিক বিলের ক্ষেত্রে লর্ডসের আপত্তি থাকলেও, কমন্স নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পরবর্তী অধিবেশনে বিলটি আবার পাস করতে পারে। সে ক্ষেত্রে লর্ডসের সম্মতি ছাড়াই বিলটি রাজকীয় সম্মতির জন্য পাঠানো সম্ভব। সাধারণত লর্ডস কোনো বিল প্রায় এক বছর পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারে। তবে সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছরের বেশি বাড়ানোর বিলসহ কয়েক ধরনের বিলের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
অর্থবিলের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের ক্ষমতা
জুলাই জাতীয় সনদের উচ্চকক্ষসংক্রান্ত প্রস্তাবে অর্থবিলের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নিয়ে আলাদা কোনো বিধান উল্লেখ করা হয়নি। সাধারণ বিলের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের পর্যালোচনা, সংশোধনের সুপারিশ এবং দুই মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে অর্থবিলের ক্ষেত্রে এসব বিধান কীভাবে কার্যকর হবে, তা সনদের উল্লিখিত প্রস্তাবে আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
ভারতে অর্থবিল শুধু লোকসভায় উত্থাপন করা যায়। লোকসভায় পাস হওয়ার পর বিলটি রাজ্যসভায় পাঠানো হয়। রাজ্যসভা অর্থবিলে কোনো সংশোধনী আনতে পারে না; তবে সুপারিশ করতে পারে।
রাজ্যসভা বিল পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে সুপারিশসহ লোকসভায় ফেরত পাঠাবে। লোকসভা সেই সুপারিশ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। ১৪ দিনের মধ্যে রাজ্যসভা বিল ফেরত না দিলে লোকসভায় পাস হওয়া আকারেই বিলটি দুই কক্ষে পাস হয়েছে বলে গণ্য হয়।
যুক্তরাজ্যে অর্থবিল কেবল হাউস অব কমন্সে উত্থাপন করা হয়। কমন্সের স্পিকার কোনো বিলকে অর্থবিল হিসেবে প্রত্যয়ন করলে হাউস অব লর্ডস তাতে সংশোধনী আনতে পারে না। বিলটি লর্ডসে পাঠানোর এক মাসের মধ্যে রাজকীয় সম্মতির জন্য পাঠানো যায়, এমনকি লর্ডস সেটি পাস না করলেও। ফলে অর্থবিলের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমন্সের হাতে থাকে।
সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের ভূমিকা
জুলাই জাতীয় সনদের ১৯ নম্বর প্রস্তাবে সংবিধান সংশোধনী বিল উচ্চকক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। সাধারণ বিলের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ সংশোধনের সুপারিশসহ নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠাতে পারলেও, সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের জন্য উচ্চকক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন লাগবে।
ভারতে সংবিধান সংশোধনী বিল লোকসভা অথবা রাজ্যসভা–যেকোনো একটিতে উত্থাপন করা যায়। বিলটি পাস হতে হলে দুই কক্ষেই পৃথকভাবে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হয়। সংশ্লিষ্ট কক্ষের মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে দুই কক্ষের ক্ষমতা সমান। কোনো একটি কক্ষ বিলটি অনুমোদন না করলে সংশোধনী পাস হয় না। দুই কক্ষের মধ্যে মতবিরোধ হলে যৌথ অধিবেশনের বিধানও নেই।
যুক্তরাজ্যের সংবিধান একক কোনো লিখিত দলিলে সংকলিত নয়; বিভিন্ন আইন, সাংবিধানিক রীতি ও প্রথার মাধ্যমে দেশটির সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। এ কারণে বাংলাদেশের প্রস্তাব বা ভারতের সংবিধান সংশোধনের মতো নির্দিষ্ট একটি পদ্ধতি হাউস অব লর্ডসের জন্য প্রযোজ্য নয়।
তবে সাংবিধানিক পরিবর্তন আনে- এমন বিলও পার্লামেন্টের আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এসব বিলের ক্ষেত্রে হাউস অব লর্ডস আলোচনা ও সংশোধনী প্রস্তাব করতে পারে। অধিকাংশ পাবলিক বিলের মতো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পার্লামেন্ট অ্যাক্টের আওতায় লর্ডসের সম্মতি ছাড়াও কমন্স বিল পাস করতে পারে।
সরকারের জবাবদিহি ও উচ্চকক্ষের ভূমিকা
জুলাই জাতীয় সনদের উচ্চকক্ষসংক্রান্ত প্রস্তাবে নিম্নকক্ষের আইন পর্যালোচনা, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব এবং সংবিধান সংশোধনী বিল অনুমোদনের দায়িত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকারের ওপর নজরদারি, মন্ত্রীদের প্রশ্ন করা, অনাস্থা প্রস্তাব বা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে উচ্চকক্ষের জন্য আলাদা কোনো বিধান ওই প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়নি।
ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে লোকসভার কাছে দায়বদ্ধ। সংবিধানের ৭৫(৩) অনুচ্ছেদে এ বিধান রয়েছে। রাজ্যসভায় অনাস্থা প্রস্তাব এনে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় না। তবে রাজ্যসভার সদস্যরা প্রশ্নোত্তর, আলোচনা ও বিভিন্ন সংসদীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন এবং মন্ত্রীদের জবাবদিহি চাইতে পারেন।
রাজ্যসভার বিশেষ কিছু সাংবিধানিক ক্ষমতাও রয়েছে। সংবিধানের ২৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় স্বার্থে রাজ্য তালিকাভুক্ত কোনো বিষয়ে সংসদের আইন প্রণয়ন প্রয়োজন হলে রাজ্যসভা উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে। এ প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংসদ ওই বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পায়। প্রস্তাবটি এক বছর কার্যকর থাকে; প্রয়োজনে একইভাবে আরও এক বছর করে মেয়াদ বাড়ানো যায়।
এছাড়া, ভারতের সংবিধানের ৩১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় স্বার্থে কেন্দ্র ও রাজ্যের জন্য অভিন্ন সর্বভারতীয় সরকারি সার্ভিস গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাজ্যসভা দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনে বিশেষ প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে। এ ধরনের প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষমতা রাজ্যসভার বিশেষ সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।
যুক্তরাজ্যের সরকার হাউস অব কমন্সের কাছে দায়বদ্ধ। হাউস অব লর্ডস অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে না। তবে সরকারের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা, প্রশ্ন এবং নীতিগত বিষয়ে বিতর্কের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ভূমিকা পালন করে।
প্রতিদিনের অধিবেশনে লর্ডসের সদস্যরা মন্ত্রীদের প্রশ্ন করতে পারেন। প্রতিদিন সর্বোচ্চ চারটি মৌখিক প্রশ্নের সুযোগ থাকে। মন্ত্রীরা উত্তর দেওয়ার পর সদস্যরা সম্পূরক প্রশ্নও করতে পারেন। লিখিত প্রশ্নের উত্তর সাধারণত দুই সপ্তাহের মধ্যে দেওয়ার কথা।
হাউস অব লর্ডসের সিলেক্ট কমিটিগুলোও সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে। এসব কমিটি সরকারি নীতি, বিল ও বিভিন্ন বিষয়ে অনুসন্ধান চালায়। সাধারণত ১০ থেকে ১৮ জন সদস্য নিয়ে কমিটি গঠিত হয়। বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। কমিটি প্রতিবেদন ও সুপারিশ প্রকাশ করে এবং সরকারকে সেসব বিষয়ে লিখিত জবাব দিতে হয়।
হাউস অব লর্ডসের অধিবেশনকক্ষের প্রায় ৬০ শতাংশ সময় আইন প্রণয়নের কাজে এবং বাকি ৪০ শতাংশ সময় সরকারের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা, প্রশ্ন ও নীতিগত বিষয়ে বিতর্কে ব্যয় হয়।
উচ্চকক্ষের সভাপতিত্ব
জুলাই জাতীয় সনদের উচ্চকক্ষসংক্রান্ত প্রস্তাবে উচ্চকক্ষের সভাপতির পদ, তাকে নির্বাচনের পদ্ধতি কিংবা অধিবেশন পরিচালনার দায়িত্ব সম্পর্কে আলাদা কোনো বিধান উল্লেখ করা হয়নি।
ভারতের উপরাষ্ট্রপতি পদাধিকারবলে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান। তিনি রাজ্যসভার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। রাজ্যসভার সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে একজন ডেপুটি চেয়ারম্যান নির্বাচন করেন। চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি চেয়ারম্যান অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
যুক্তরাজ্যে হাউস অব লর্ডসের সদস্যদের মধ্য থেকে লর্ড স্পিকার নির্বাচিত হন। তিনি অধিবেশন পরিচালনা করেন এবং উচ্চকক্ষের কাজের প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে তার ক্ষমতা হাউস অব কমন্সের স্পিকারের মতো নয়। অধিবেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে লর্ডসের সদস্যরা নিজেদের নিয়ম ও রীতিনীতির ভিত্তিতে অনেক দায়িত্ব নিজেরাই পালন করেন।
উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা
জুলাই জাতীয় সনদের ২০ নম্বর প্রস্তাবে উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা জাতীয় সংসদের সদস্যদের অনুরূপ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, সংবিধানে নিম্নকক্ষের সদস্য হওয়ার জন্য যে যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিধান থাকবে, উচ্চকক্ষের সদস্যদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে।
ভারতের রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার ন্যূনতম বয়স ৩০ বছর। প্রার্থীকে ভারতের নাগরিক হতে হয় এবং সংবিধান ও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। সদস্যপদের অযোগ্যতার ক্ষেত্রেও সংবিধানে বিধান রয়েছে। রাজ্যসভার সদস্যরা নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির মনোনয়নেও আসতে পারেন।
যুক্তরাজ্যে হাউস অব লর্ডসের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে নিয়োগের পাশাপাশি আইনগত যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিধান রয়েছে। লাইফ পিয়ার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা জীবদ্দশায় সদস্য থাকেন। তবে পদত্যাগ, নির্দিষ্ট সময় অধিবেশনে অনুপস্থিতি বা আইন অনুযায়ী অযোগ্য হওয়ার কারণে সদস্যপদ হারাতে পারেন।
জুলাই জাতীয় সনদে উচ্চকক্ষ নিয়ে দলগুলোর অবস্থান
জুলাই জাতীয় সনদের ১৭ নম্বর প্রস্তাবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের বিষয়ে ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট সম্মতি দিয়েছে। তবে পাঁচটি দল বা জোট নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তাদের আপত্তি হলো, দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় উচ্চকক্ষ গঠনের প্রয়োজন নেই।
উচ্চকক্ষের গঠন, সদস্য নির্বাচন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নিয়ে সনদের ১৮ নম্বর প্রস্তাবের তিনটি উপধারা রয়েছে। এর মধ্যে উচ্চকক্ষকে সদস্য সংখ্যা ১০০ করা এবং নিম্নকক্ষ নির্বাচনে পাওয়া ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাবে ২৪টি দল ও জোট সম্মতি দিয়েছে; সাতটি দিয়েছে নোট অব ডিসেন্ট।
উচ্চকক্ষের পাঁচ বছরের মেয়াদ এবং নিম্নকক্ষ ভেঙে গেলে উচ্চকক্ষও বিলুপ্ত হওয়ার প্রস্তাবে ২৯টি দল ও জোট সম্মতি দিয়েছে; একটি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। আর উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ এবং তালিকায় অন্তত ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী রাখার প্রস্তাবে ২৩টি দল ও জোট সম্মতি দিয়েছে; সাতটি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।
উচ্চকক্ষের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে বর্ণনা আছে সনদের ১৯ নম্বর প্রস্তাবে। সেখানে নিম্নকক্ষের বিল পর্যালোচনা, সংশোধনের সুপারিশসহ ফেরত পাঠানো, দুই মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত এবং সংবিধান সংশোধনী বিলে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের বিধান রাখা হয়েছে।
উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নিম্নকক্ষের সদস্যদের অনুরূপ করার প্রস্তাব রয়েছে সনদের ২০ নম্বর প্রস্তাবে। এ বিষয়ে ২৪টি দল ও জোট সম্মতি দিয়েছে, সাতটি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে এবং একটি দল মতামত দেয়নি।
সনদের বিভিন্ন প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া দল ও জোটগুলোর আপত্তির মধ্যে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা এবং দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এ ধরনের কক্ষ গঠনের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।