অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের রাজধানী সিডনির বন্দাই বিচে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর জননিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ সশস্ত্র পুলিশ ইউনিট চালু করেছে রাজ্য সরকার। গত রোববার থেকে ‘আর্মড রেসপন্স কমান্ড’ বা এআরসি নামের এই ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে। এর সদস্যরা সিডনির গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকায় আধুনিক অস্ত্র ও বিশেষায়িত যানবাহন নিয়ে টহল দিচ্ছেন।
নতুন ইউনিটের প্রধান দায়িত্ব সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা, সশস্ত্র সহিংসতা ও গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। ধর্মীয় উপাসনালয়, জনবহুল এলাকা, বড় অনুষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানো হবে।
বন্দাই হামলার পর নিরাপত্তায় নতুন পদক্ষেপ
২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর সিডনির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র বন্দাই বিচে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব চলাকালে সন্ত্রাসী হামলায় ১৫ জন নিহত হন। ওই ঘটনা অস্ট্রেলিয়াজুড়ে গভীর শোক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে ধর্মীয় বিদ্বেষ, উগ্রবাদী সহিংসতা এবং জনসমাগমস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়।
হামলার পর জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে স্থায়ী বিশেষ সশস্ত্র পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেয় নিউ সাউথ ওয়েলস সরকার।
সিডনির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র বন্দাই বিচ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এখানেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। ছবি: লেখক
রাজ্য সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, এই ইউনিটের জন্য ৯ কোটি ৪৩ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পূর্ণ সক্ষমতায় এতে ২৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ২৮ জন বেসামরিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক ও সহায়ক কর্মী থাকবেন।
বিশেষ প্রশিক্ষণ ও সার্বক্ষণিক সমন্বয়
কার্যক্রম শুরুর আগে পুলিশ সদস্যদের ছয় মাস বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এতে সশস্ত্র হামলাকারীদের মোকাবিলা, জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষ কৌশলে গাড়ি চালানো, অস্ত্র পরিচালনা এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইউনিটের সদস্যরা বিশেষায়িত যানবাহন ও আধুনিক রাইফেল ব্যবহার করবেন। এ ছাড়া, ২৪ ঘণ্টা পরিচালিত একটি বিশেষ গোয়েন্দা ও সমন্বয়কেন্দ্র থেকে সম্ভাব্য হুমকির তথ্য বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কার্যক্রম সমন্বয় করা হবে।
লাকেম্বা মসজিদে হুমকির পর নিরাপত্তা বৃদ্ধি
সিডনিতে ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের একটি উদাহরণ লাকেম্বা মসজিদে ধারাবাহিক হুমকির ঘটনা।
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজের গত ৩ মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিডনির লাকেম্বা মসজিদে মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে চারটি হুমকিমূলক চিঠি পাঠানো হয়। কয়েকটি চিঠিতে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি এবং মসজিদে অগ্নিসংযোগের কথা উল্লেখ ছিল।
হুমকিমূলক চিঠি পাওয়ার পর সিডনির লাকেম্বা মসজিদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ছবি: এবিসি নিউজের সৌজন্যে
এসব ঘটনার পর মসজিদটির নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ জানিয়েছিল, স্থানীয় কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ‘অপারেশন শেল্টার’-এর সদস্যরাও সেখানে টহল দিচ্ছেন।
এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ায় ইহুদিবিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়ার ঘটনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে অপারেশন শেল্টার চালু করা হয়েছিল।
নতুন আর্মড রেসপন্স কমান্ড প্রাথমিকভাবে ওই কার্যক্রমের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করবে। পর্যায়ক্রমে নতুন ইউনিটের কার্যক্রম সম্প্রসারণের সঙ্গে অপারেশন শেল্টারের পরিসর কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ
সিডনির লাকেম্বাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশি প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বসবাস রয়েছে। তাদের অনেকেই নিয়মিত মসজিদ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং জনসমাগমস্থলে অংশ নেন।
ফলে ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন অভিবাসীদের জন্যও প্রাসঙ্গিক।
তবে বাংলাদেশি কমিউনিটিকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো নিরাপত্তা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। নতুন ব্যবস্থাটি সিডনির সব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চালু হয়েছে।
এদিকে জনসমক্ষে ভারী অস্ত্রধারী পুলিশের উপস্থিতি নিয়ে কিছু মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ জানিয়েছে। তারা পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগে জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বন্দাই হামলায় নিহতদের স্মরণে মেনোরাহর প্রতিকৃতি, ফুল ও মোমবাতি। ছবি: লেখক
জননিরাপত্তা জোরদারে রাজ্য সরকারের উদ্যোগ
বন্দাই হামলার পর বিশেষ সশস্ত্র পুলিশ ইউনিট চালু করা নিউ সাউথ ওয়েলস সরকারের জননিরাপত্তা জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং ধর্মীয় উপাসনালয়, বড় অনুষ্ঠান ও জনবহুল স্থানে নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বহুসাংস্কৃতিক সিডনিতে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপদে বসবাস, ধর্মীয় স্বাধীনতা চর্চা এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে নির্ভয়ে অংশগ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করতে উদ্যোগটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।