ভিক্টর ও তার যমজ ভাইয়ের বয়স যখন ১২ বছর, তখন রাশিয়ার সঙ্গে ফ্রন্টলাইন যুদ্ধে নিহত হন তাদের বাবা। ইউক্রেনের সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন তিনি।
এখন তাদের বয়স ১৫ বছর। ভিক্টর তার যমজ ভাইয়ের চেয়ে দুই মিনিটের বড়। তাই যে যুদ্ধে তার বাবা মারা গেছেন, সেই যুদ্ধে যাওয়ার দায়িত্বও সে নিজের ওপর বেশি অনুভব করে। ইউক্রেনের সামরিক ধাঁচের একটি স্কুলে পড়াশোনা করে এই কিশোর। পড়াশোনা শেষ করার পর ভিক্টর বাবার পথ অনুসরণ করতে চায়। তখন রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চলবে কি না, সেটাও সে জানে না।
ভিটালি তার চেয়ে ১২০ সেকেন্ডের ছোট। সে ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবা বিভাগে যোগ দিতে চায়। সেখানে উদ্ধারকর্মী ও জরুরি সেবাকর্মীদের সঙ্গে কাজ করবে সে। তবে পরিবারের পথ অনুসরণ করার জন্য নয়, ভিটালি বলেছে, “ওদের পোশাক আমার ভালো লাগে।”
ভিক্টর ও ভিটালি যে বিভাগেই যাক না কেন, এই স্কুল তাদের ইউক্রেনের নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার একটি পথ তৈরি করে দিচ্ছে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীতে এখন নতুন সদস্যের প্রয়োজন। তাদের মতো আরও শত শত শিক্ষার্থী এমন সরকারি সামরিক একাডেমিতে পড়ছে, যেগুলো যুদ্ধে নিহত সেনাসদস্যদের সন্তানদের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালিত এমন পাঁচটি দুই বছর মেয়াদি হাইস্কুলের একটিতে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে। এসব স্কুলে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিহত, নিখোঁজ, বন্দী এবং শারীরিকভাবে অক্ষম সদস্যদের সন্তানদের পড়ানো হয়।
নিরাপত্তার কারণে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট স্কুলটির নাম বা সঠিক অবস্থান প্রকাশ করেনি। একই কারণে শিক্ষার্থী ও কর্মীদের শুধু প্রথম নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
ইউক্রেনের সরকারি হিসাবে, যুদ্ধে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার নিখোঁজ রয়েছেন। তবে সহায়তা দেওয়া সংস্থাগুলো বলছে, অন্তত একজন অভিভাবককে হারানো শিশুর সংখ্যা বোঝার জন্য এই পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়।
কিয়েভভিত্তিক দাতব্য সংস্থা জেন ইউক্রেনীয়ের প্রতিষ্ঠাতা ওকসানা লেবেদিয়েভা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, চাহিদা এত বেশি যে তা সামাল দেওয়া কঠিন।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সব পর্যায়েই এখন জনবলের সংকট রয়েছে। ছবি: রয়টার্স
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সব পর্যায়েই এখন জনবলের সংকট রয়েছে। ন্যাশনাল গার্ডের বিভিন্ন ইউনিট ও পুলিশের কিছু দল সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। একই সময়ে উদ্ধারকর্মী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রতিদিন অসংখ্য জায়গায় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবিলায় কাজ করছেন।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ধরে রাখতেই প্রতি মাসে অন্তত ৩০ হাজার মানুষকে নতুন করে সেনাবাহিনীতে নিতে হবে।
ফেরা যাক সামরিক স্কুলের শ্রেণিকক্ষে। ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিকরা দেখেন, একটি শ্রেণিকক্ষে প্রায় ২৪ জন শিক্ষার্থী সোজা হয়ে বসে আছে। এখানে সোজা হয়ে বসা নিয়মের অংশ। তবে আগের রাতে পাঁচবার বিমান হামলার সতর্কবার্তা পাওয়ায় তাদের ক্লান্ত ও ঘুমঘুম দেখাচ্ছিল।
প্রশিক্ষক হেন্নাদিয় তাদের বোঝাচ্ছিলেন, বর্তমানে ইউক্রেনের প্রতিটি প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্সে কী কী থাকা দরকার। সেটি সাধারণ মানুষের জন্য হোক বা সেনাবাহিনীর জন্য–প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামের প্রয়োজন এখন প্রায় একই।
হেন্নাদিয় বলেন, “এখন দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যুদ্ধ সেই পার্থক্য মুছে দিয়েছে।” এ কথা বলতে বলতে তিনি ইসরায়েলের তৈরি বিশেষ ব্যান্ডেজ ও রক্তপাত বন্ধে দ্রুত ব্যবহারের ফিতা বের করে দেখান। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রায় নিয়মিত হওয়ায় কিন্ডারগার্টেনের চিকিৎসা বাক্সেও এখন এসব সরঞ্জাম রাখা হচ্ছে।
এই শ্রেণির পরবর্তী বিষয় ছিল ইউক্রেনের ইতিহাস, ড্রোন শনাক্ত করা, নাশতা এবং ভলিবল। সারা দেশে গত মাসে সামরিক স্কুলের নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করেছে ৪৭৫ জন শিক্ষার্থী। তবে যেসব এলাকায় ব্যাপক বোমা হামলা হচ্ছে, সেখানকার কিছু স্কুলে অনলাইনে পড়াশোনা শুরু হয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিকরা যে ক্যাম্পাসে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিল, সেখানে ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকে। তাদের মধ্যে ৪৮ জন মেয়ে। তারা দুই শ্রেণিতে সমানভাবে ভাগ হয়ে পড়াশোনা করছে। এখানকার প্রত্যেক শিক্ষার্থীর একজন অভিভাবক নিরাপত্তা বা সামরিক বাহিনীতে কাজ করেন। তাদের প্রায় অর্ধেক ইতোমধ্যে একজন অভিভাবককে হারিয়েছে।
১৫ ও ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা এই স্কুলটিকে ‘লাইসিয়াম’ বলে। এটি একদিকে শোক কাটিয়ে ওঠার জন্য মানসিক সহায়তার জায়গা, অন্যদিকে সামরিক প্রশিক্ষণের মতো কঠোর একটি প্রতিষ্ঠান।
ইউক্রেনের সামরিক স্কুলগুলো নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার একটি পথ তৈরি করে দিচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
স্কুলের উজ্জ্বল করিডোরগুলোতে সাধারণ স্কুলের মতো টি-শার্ট ও ঢিলেঢালা জিন্স পরা শিক্ষার্থীদের দেখা যায় না। সেখানে কিশোর-কিশোরীরা একই ধরনের গাঢ় রঙের পোশাক পরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলেদের চুল খুব ছোট করে কাটা, আর মেয়েদের চুল শক্ত করে বাঁধা।
দেয়ালের পোস্টারগুলোতে দেখা যায়, পুলিশ গাড়ির দিকে বন্দুক তাক করে আছে, ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে এবং সেনাসদস্যরা মর্টার ব্যবহার করছে।
শ্রেণিকক্ষে বড় কেউ ঢুকলে শিক্ষার্থীরা নিয়ম মেনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। গণিত ও ইতিহাসের পাশাপাশি তারা যুদ্ধের সময় আহত ব্যক্তির বুকের ক্ষত কীভাবে চিকিৎসা করতে হয় এবং বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে কীভাবে ঢুকতে হয়, তাও শেখে। ছুটির সময় ‘ইউক্রেনের জয় হোক’ বলে যে কণ্ঠগুলো শোনা যায়, সেগুলোর কিছু এখনো কিশোরসুলভ।
জেন ইউক্রেনীয়ের লেবেদিয়েভা বলেন, “ওরা শিশু। কিন্তু মানসিক আঘাত থেকে সেরে ওঠা শিশুদের অন্য শিশুদের সঙ্গে থাকা দরকার। তাদের একটি পরিবেশ ও নিয়মকানুন দরকার। এই স্কুলগুলোতে তারা সেটিই পায়।”
এখানে শিক্ষার্থীরা ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিচালনা ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বাহিনীর কাজের মৌলিক বিষয়ও শেখে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল গার্ড, জাতীয় পুলিশ, সীমান্তরক্ষী, উদ্ধারকারী দল ও ফায়ার সার্ভিস। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর চার বছর পর এসব বাহিনীর নতুন সদস্যের ব্যাপক প্রয়োজন রয়েছে।
স্কুলের কর্মকর্তারা জানান, পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থীরা এসব বাহিনীর কোনো একটিতে যোগ দেবে কি না, তা পুরোপুরি তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত।
স্কুলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ওলেহ বলেন, দ্বিতীয় বছরে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি দেওয়া হয়। নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দিলেও প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একটি ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হবে। আর ১৮ বছর বয়স হলেই তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পায়।
স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই পরে নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী স্কুলে যে ধরনের প্রশিক্ষণ শুরু করেছিল, পরে সেই পথেই এগিয়েছে। যতদিন যুদ্ধ চলবে, যুদ্ধে নিহত সেনাসদস্যদের সন্তানদের অনেকেই এভাবেই ধীরে ধীরে যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে।
তাদের জীবিত অভিভাবকরা এ বিষয়ে কী ভাবছেন, তা অবশ্য জানা যায়নি। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের কারো সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়নি। তবে লেবেদিয়েভা বলেন, ইউক্রেনে এমন সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক নয়। কারণ দেশটি অস্তিত্বের সংকট তৈরি করা রুশ হামলা ঠেকাতে পুরোপুরি যুদ্ধে নিয়োজিত। তিনি আরও বলেন, “ইউক্রেনে মানসিক সমস্যার চিকিৎসা নিয়ে আমরা এখনই কথা বলতে পারি না। কারণ আমরা এখনো যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পৌঁছাইনি।”
লেবেদিয়েভা বলেন, স্কুলে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মানসিক কষ্ট দ্রুত ভুলে যেতে বলা হয়। এতে তিনি হতাশ হন। তার মতে, সোভিয়েত আমলের মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা নিয়ে অবিশ্বাসের প্রভাব এখনো ইউক্রেনে রয়েছে। তবে তিনি বলেন, ধীরে ধীরে স্কুল কর্তৃপক্ষ তার মানসিক চিকিৎসার পদ্ধতিকে গ্রহণ করছে। তিনি যে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানীদের নিয়ে আসেন, তাদেরও এখন আগের চেয়ে বেশি গ্রহণ করা হচ্ছে।
লেবেদিয়েভা বলেন, প্রতিদিন পাঁচবার খাবার, কঠোর নিয়ম এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য মেনে চলার কারণে অনেক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিশু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে–এটি দেখে তিনি অবাক হয়েছেন।
ভিক্টর ও ভিটালি বলেন, তাদের বাবার সঙ্গে তাদের একটি গভীর সম্পর্কের অনুভূতি এখনো রয়েছে। তাদের বাবা ট্রাকচালক ও সাবেক সেনাসদস্য ছিলেন। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর তিনি আবার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।
ভিটালি স্কুলের পরামর্শদাতার কক্ষে ওয়াশিংটন পোস্টকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বলেন, “আমি জানি, বাবা আমাদের নিয়ে গর্বিত হতেন।” এ কথা বলার সময় তার চোখে পানি চলে আসে। তার ভাই ইউক্রেনের ন্যাশনাল গার্ডে যোগ দিতে চায়। সে মাথা নিচু করে বসে থাকে। দুই ভাই এক মাস ধরে এই স্কুলে আছে। অক্টোবর মাসে শিক্ষার্থীদের শপথ অনুষ্ঠান না হওয়া পর্যন্ত তারা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বা বাড়ি যেতে পারবে না।
পরিবারের এক বন্ধু তাদের এই স্কুলের কথা জানিয়েছিলেন। এখানে পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার খরচ সরকার বহন করে। ভিক্টর বলেন, ভর্তি পরীক্ষায় দুই ভাই পাস করায় তাদের মা খুশি হয়েছিলেন। তবে দুই সন্তান থেকে তিন ঘণ্টার বাসযাত্রার দূরত্বে থাকতে হবে বলে তিনি দুঃখও পেয়েছিলেন।
তাদের প্রথম বর্ষের সহপাঠী ১৫ বছরের উলিয়ানা প্রতিদিন মায়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলে। তাদের দীর্ঘ সময় ফোনে কথা হয়। শুরুতে উলিয়ানার মা তাকে এই স্কুলে দিতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন, উলিয়ানা জিমন্যাস্টিকসে মন দিক। কারণ সে এই খেলায় ভালো করছিল। কিন্তু উলিয়ানা পুলিশে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার বাবার মতো।
২০২৪ সালে সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় অবস্থায় একটি অভিযানে তার বাবার সঙ্গে থাকা দুই সহকর্মীর একজন নিহত হন। কিন্তু উলিয়ানার বাবা এবং অন্যজনের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাদের ইউনিট ড্রোন পাঠিয়ে খোঁজ করেছিল। উলিয়ানা ও তার পরিবারের সদস্যরাও বিভিন্নভাবে তাদের খুঁজেছেন। তার বাবার নাম নিহত বা বন্দীদের কোনো তালিকায়ও পাওয়া যায়নি। তিনি শুধু ‘নিখোঁজ’ তালিকায় রয়েছেন। উলিয়ানা এখনো তার বাবাকে খুঁজছে।
লেবেদিয়েভা বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্তানদের জন্য বিষয়টি সবচেয়ে কঠিন। বন্দি বিনিময়ের প্রতিবারের তালিকায় তারা তাদের প্রিয়জনের নাম খোঁজে। ফিরে আসা সেনাদের সন্তানদের দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরার ভিডিওও তারা নিয়মিত দেখে। কিন্তু তারা সেই সুযোগ পায় না। এমনকি বাবার শেষকৃত্য করার সুযোগও তাদের নেই।
এই শিশুরা এখন এতটাই বড় হয়েছে যে তারা বুঝতে পারে, যুদ্ধে যাওয়া তাদের প্রিয় মানুষগুলো আর ফিরে আসবে না। আর তাই দেশের সমর্থন ও উৎসাহ নিয়ে তারাও সেই যুদ্ধের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।