যুদ্ধের ব্যয়, উচ্চ সুদের হার এবং নিত্যপণ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য জিনিসের বর্ধিত মূল্য বিবেচনায় নিলে, এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবারের ওপর প্রায় ২,০০০ ডলারের সমতুল্য আর্থিক বোঝা পড়েছে। আর ট্রাম্প প্রশাসন যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, ততক্ষণ আমেরিকান পরিবারগুলোর ওপর এই ব্যয়ের বোঝা কেবল বাড়তেই থাকবে। মুডি’স-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি এই হিসাব দিয়েছেন। সেন্টার ফর আমেরিকার প্রগ্রেসের ওয়েবসাইটে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
অথচ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সামরিক অভিযানকে ‘দ্রুত সম্পন্ন’ হবে বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু আট মাস পেরিয়ে গেলেও ইরান-কেন্দ্রিক এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পরিকল্পনা তার আছে বলে মনে হয় না। অথচ এই যুদ্ধের কারণে আমেরিকান পরিবারগুলো, জাতীয় নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, ইরানের মিত্র হুথি বাহিনী সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন একটি সংঘাতের ফ্রন্ট খুলেছে। গত তিন মাসে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় সৌদি আরবে অন্তত ২০ জন এবং ইয়েমেনে ১,২৮২ জন নিহত হয়েছেন। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। ২২ অক্টোবর ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে ডিজেল সংগ্রহের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চেষ্টা চালালেও, অদূর ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার কোনো আগ্রহই বর্তমানে ইরানের নেই। মার্কিন প্রশাসনও যুদ্ধবিরতি আলোচনার দিকে ফিরে আসার ব্যাপারে খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছে না—মূলত এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে ইরান এখন সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যয়
মুডি’স অ্যানালিটিক্স -এর প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জ্যান্ডি অক্টোবরের শুরুর দিকে হিসাব করেছেন যে, ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সংঘাতের ফলে প্রতিটি পরিবারের ওপর প্রায় ২,০০০ ডলারের সমান অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি হয়েছে। জ্যান্ডির মতে, এই সংঘাতের ব্যয় “গড় আমেরিকান পরিবারের আয়ের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, তার প্রায় অর্ধেকই গ্রাস করে নিয়েছে।”
সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় পেট্রোল ও ডিজেলের দাম যথাক্রমে ৪৩ শতাংশ এবং ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। ‘ব্রাউন ইউনিভার্সিটি ইরান ওয়ার এনার্জি কস্ট ট্র্যাকার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর সাধারণ পেট্রোলের জাতীয় গড় দাম ছিল প্রতি গ্যালন ৪.২৭ ডলার; অথচ ২৭ ফেব্রুয়ারি এই দাম ছিল ২.৯৮ ডলার।
জ্বালানির দাম এখনও সংঘাত-পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে বেশি। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওই ট্র্যাকার অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত আমেরিকানদের পেট্রোল ও ডিজেল বাবদ ১৪১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ব্যয়
১০ অক্টোবর পর্যন্ত এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ জন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন এবং অন্তত ৮৬৫ জন আহত হয়েছেন। পেন্টাগন হতাহতের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছে; এমনকি জুনের মাঝামাঝি সময়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর যেসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোকে তারা এই যুদ্ধের অংশ হিসেবে স্বীকার করেনি।
পেন্টাগন এখন পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানের ব্যয়ের কোনো যথাযথ হিসাব দেয়নি। সেপ্টেম্বর মাসে কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (সিবিও) প্রাক্কলন করে যে, এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। তবে নির্ভরযোগ্য ও নিরপেক্ষ অন্যান্য হিসাব অনুযায়ী, এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, জুন মাসের শেষ নাগাদ—অর্থাৎ সিবিও-র সেপ্টেম্বর মাসের হিসাবের তিন মাস আগেই—ব্যয়ের পরিমাণ ৩৪ থেকে ৪২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। অন্যান্য কিছু বিশ্লেষণে, যেখানে ব্যয়ের পরিধি আরও বিস্তৃত ধরা হয়েছে এবং গোলাবারুদ ব্যবহারের হার বেশি বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে যে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-এর ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।