আমি নিজে তেলাপোকার সঙ্গে আজীবন যুদ্ধে প্রায় হেরে গিয়েছি। আত্মসমর্পণের দলিল হিসেবে একটি প্রবন্ধ লিখব বলে ভাবছিলাম। এর ভেতরই প্রতিবেশি ভারতে রাজনীতির মহাভারত অশুদ্ধ করা-প্রায় এক তেলাপোকা যুদ্ধের খবর দেখলাম। ব্যক্তির চেয়ে জগৎ বড় মনে পড়ল; নিজের তেলাপোকার যুদ্ধ ছেড়ে জগত জাগানো ওই তেলাপোকা যুদ্ধ নিয়েই দুকলম লেখা বেশি জরুরি মনে হল।
একদা বাঙালি বোদ্ধা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, “অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।” আর ভারতীয় রাজনীতিবিদ গোপাল কৃষ্ণ গোখলে নাকি বলেছিলেন, “আজ যা চিন্তা করে বাংলা, ভারত তা চিন্তা করে আগামীকাল।”
এ দু’য়ের ধারাবাহিকতায়ই যেন গতকাল বাঙলা যে চিন্তায় ছিল, ভারত পড়েছে সে চিন্তায়। ভারতীয় জনতা পার্টির অতিকায় হস্তীসম বিশাল একটি দুর্দম্য সরকার যেন তেলাপোকা জনতা পার্টি বলে আত্মপরিচিতি দেওয়া অসংগঠিত ‘জি-জেনারেশন’ আন্দোলনের জ্বালায় নড়ে চড়ে উঠছে।
শৈশবে একবার আসামে খালার বাড়ি বেড়াতে গেলে সেখানে তাদের দুটি পোষা হাতি দেখেছিলাম। কোন কিছুতেই তাদের নড়াতে না পারলেও, অতিসংবেদনশীল পায়ের তলায় বরই-বীচির মত অস্বাভাবিকভাবে অতি ক্ষুদ্র কিছু পড়ে গেলেও তারা তার যন্ত্রণা যেন সহ্য করতে পারত না। একইভাবে ঘাড়ের ওপর মাহুত অতি ক্ষুদ্র একটি শলাকা দিয়ে চুলকে দিলেও যেন সহ্য করতে পারত না, বশ মানত।
অতি সুসংগঠিত, অতি কঠোর অনমনীয়তার শতবর্ষী রাজনৈতিক সংস্কৃতির দলীয় ঐতিহ্যে সব কিছুতেই অনড় অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জনতা পার্টির সর্বভারতীয় বিশাল সরকারযন্ত্রের যেন কিশোর-তরুণের এই তথাকথিত ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের মুখে সেই
যে সরকার কোটি কোটি সদস্যবিশিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি, সম্প্রদায়, গোষ্ঠীর দাবি, বা বিশ্বশক্তিসমূহের চাপ, নিন্দা বা হুমকি, এমনকি পারমাণবিক ধ্বংসলীলার সম্ভাবনাসম্বলিত যুদ্ধের মুখেও এক যুগ ধরে অনড় থেকেছে—সেই সরকার নিযুক্ত বিচারকের ‘তেলাপোকা’ বলে তিরস্কার করা বালকদের দাবির মুখে নতি স্বীকার করতে বাধ্য এখনতাদের তিনটি দাবির দুটো তো মেনে নিয়েছেই। তৃতীয়টি, যার কথা শুনতেও ছিল অপ্রস্তুত, তা-ও বিবেচনা করতে শুরু করেছে।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র বলে এককালে বিশ্বময় প্রচুর সমীহ ভারতের ঘোষণা দিয়েই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদী সরকারের ধর্মাবতার বলে পরিচয়ধারী প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা-সংক্রান্ত দুর্নীতির অধর্মের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অনশন ধর্মঘটের ঘটনা থেকে উদ্ভূত এই পরিস্থিতি থেকে নেওয়ার মতো শিক্ষা আছে।
কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে মসনদে গদীনশীন চাটুকারদের মেকি প্রশংসায় গদগদ ক্ষমতাধররা খুব কমই সক্ষম। তবে দিবালোকের মত স্পষ্টকেও দিব্যজ্ঞানের মত আবারো বলে দেওয়া, দৃষ্টিক্ষমদের কৃতজ্ঞচিত্তে সবিনয় বলে দেওয়া, চর্চা করাটা দায়িত্ব।
বঞ্চিত শ্রেণি
কী শিক্ষা এই তেলাপোকা আন্দোলন থেকে?
প্রথম, তেলাপোকা নয় কেউই।
শত সহস্র বছর ধরে বর্ণপ্রথায় অভ্যস্ত ভারতের সমাজপতি শ্রেণির কোনো এক বিচারক বা শাসকদের ধারণায় দলিত, মথিত, বঞ্চিত দুর্বল বিশালতর জনগণ দুর্বল হতে পারেন, কিন্তু তেলাপোকার মত তুচ্ছ তাচ্ছিল্যযোগ্য নন।
সব কিছুর পরও, অবশেষে জনগণমনের সিদ্ধান্তে, বা অন্ততঃ গ্রহণের মাধ্যমেই তাদের ‘অধিনায়ক’ হওয়া, ও থাকা যায়।
মহাত্মা গান্ধীকে গুলি করে মেরে ফেলা গেছে, কিন্তু জনগণমন মানস থেকে ৭০ বছরেও মুছে ফেলা যায় নি। শুধু তার জন্ম ও মৃত্যুভূমি ভারতেই নয়, সারা বিশ্বেই তাই।
আর একই গান্ধী নাম নিয়ে, মহাত্মা গান্ধীর শিষ্যপ্রতীম জওহরলাল নেহরুর কন্যা প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা গান্ধী—অত্যন্ত প্রিয়দর্শিনী সুন্দরী, অক্সফোর্ড শিক্ষিতা, যুদ্ধে প্রতিপক্ষে অপ্রতিরোধ্য পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দু’টুকরা করে ফেলা সমরনায়িকা হয়েও, জরুরি অবস্থা দিয়ে গণতন্ত্রকে ব্যাহত করেও—সেরকম বরণীয় হতে পারেননি। ক’বছরেই পরিত্যক্ত, বিস্মৃত, এমনকি ব্যাপকভাবে নিন্দিত হন।
ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন
তার, এককালের ভারতের একচ্ছত্র জনগণমন অধিনায়ক দল, ‘কংগ্রেস’ আজ অনাথসম অবস্থায়।
পশ্চিম বাঙলায় সেই সর্বভারতীয় কংগ্রেসের একটি ক্ষুদ্র অংশ বেরিয়ে এসে আর্থ-সামাজিক ক্ষমতাবঞ্চিত ম্লান-মূক-মূঢ় প্রান্তিকদের কণ্ঠ হিসেবে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ দাঁড় করিয়ে উচ্চবর্ণ উচ্চশ্রেণির মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে হলেও কিছুটা সমাজবাদী ধ্যানধারণা প্রতিফলিত করে জনপ্রিয় হয়। আজ তাও নেই।
এখান থেকে শিক্ষা এটাই-দলিত, মথিত, বঞ্চিত প্রান্তিক দুর্বলদের ব্যাপকতর জনতাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে অবহেলার পরিবর্তে, তাদের প্রয়োজনগুলো দাবির পূর্বেই আন্তরিক সংবেদনশীলতাসহ পূরণকে সবসময়ই জরুরি অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পঞ্চাশ বছর পূর্বে, মুক্তিযুদ্ধের পরপর আমরা যে একটি সমতাভিত্তিক সর্বজনের স্বাধিকার নিশ্চিতিমূলক নয়া সমাজ গড়বার স্বপ্নে দিবানিশি সক্রিয় ছিলাম যার যার ক্ষেত্রে—তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এই কথা বলেই একটি লেখা লিখেছিলাম, ‘জুতার পেরেক আগে সারান’ বা এরকম একটি নামে।
বক্তব্য ছিল, বড় বড় স্বপ্নের বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যস্ততায় যেন ভুলে না যাই, যে সেই সুদূর পথপরিক্রমা অবশ্যই ব্যাহত হবে, যদি জনগণের দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যতঃ ছোট ছোট সমস্যাগুলোর তাৎক্ষণিক সমাধান করে না দেওয়া হয়।
আমাদের পঞ্চাশোর্ধ্ব বছরের ইতিহাস তারই সত্যায়ন করে। আমাদের বর্তমান, ও ভারতসহ জগতের তাবৎ সব দেশ ও সরকারের জন্যই তা প্রযোজ্য।
‘জেনারেশন গ্যাপ’ ও ‘জেনারেশন-জি’
দ্বিতীয় একটি শিক্ষা হল, কয়েক প্রজন্ম ধরে ঔপনিবেশিক শাসনে শাসিত হওয়ার সময় তৃতীয় বিশ্বের সমাজগুলোর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক সাংস্কৃতিকায়ন পদ্ধতি, আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তামূলক রক্ষাকবচসম ঐতিহ্যবাহী পরিবার ও কর্মসংস্থানের আয়োজন ভেঙে দেওয়া বা ভেঙে পড়ার ফলে যে একটি অস্বাভাবিক প্রজন্মগত দূরত্ব তৈরি হয়, অংশতঃ ঔপনিবেশিক স্বার্থে করা হয়—তার বিহিত করা।
এই অস্বাভাবিক প্রজন্মগত দূরত্ব, তথা ‘জেনারেশন গ্যাপ’-এর কারণেই এমন এক তথাকথিত ‘জেনারেশন-জি’-এর উদ্ভব হয়েছে, যা তার একই পরিবারের ঊর্ধ্বতন প্রজন্মের সঙ্গে সংঘাত-প্রবণ।
ওপরে বর্ণিত বঞ্চনাগত কারণের সঙ্গে দ্বিতীয় কারণ হিসেবে এ আন্তঃপ্রজন্ম যোগ হয়ে এমন এক বিস্ফোরক বারুদসম সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে, যা সামান্যতম স্ফুলিঙ্গেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, এমন এক ধ্বংসাত্মক সমাজ-রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
সংকট নিরসনের উপায়
এটি এমন এক জটিল সমস্যা, যার এমন কোন সহজ বিহিত নেই যা একটি নীতি বা আইন পাস করে সম্ভব। সমাজ-রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের প্রণীত পরিকল্পনার প্রণয়ন, আর সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের আন্তরিক যৌথ উদ্যোগে তার বাস্তবায়নেই বিহিতটি করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে।
তার প্রধান দিক হতে হবে, আধুনিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ঔপনিবেশিক শাসন-পূর্ব ঐতিহ্যবাহী পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক-সাংস্কৃতিকায়ন, ও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার দিকে ধীরে ও পর্যায়ক্রমে ফিরে যাওয়ার বিবিধ পদক্ষেপ।
তা জাতি, দেশ, পরিস্থিতি, সংস্কৃতি ভেদে ভিন্ন হবে, কিন্তু তাত্ত্বিক ভিত্তিতে হবে এই একই।
ভারতের ক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধী মূলতঃ তাই চেয়েছিলেন, ভারতের জাতীয় পতাকায় প্রথমে সন্নিবেশিত চরকা, যাকে পরে অশোকচক্র বলে তাতে আরও অর্থবহতা যোগ করা হয়—তারই প্রতীক।
ঔপনিবেশিক প্রভাবে পাশ্চাত্যায়িত নেহরু তাকে আধুনিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলে পাশ্চাত্যের ‘সিন্ডিক্যালিস্ট সোশ্যালিজমে’ নিয়ে যান।
আর আরও পরে ইউরোপের ফ্যাসিবাদের প্রভাবে গড়ে ওঠা সংগঠন থেকে নিঃসৃত ও উত্থিত ভারতীয় জনতা পার্টি ভারতীয় ঐতিহ্যে ফিরে যাবার চেষ্টায় পাশ্চাত্য ফ্যাসিবাদের সঙ্গে ভারতীয় ধর্ম-সম্প্রদায়গত ঐতিহ্য-পরিচয়ে ফেরার বাসনার সংমিশ্রণে এমন এক ধর্ম-সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক উগ্র দৃষ্টিভঙ্গীর জন্ম দিয়ে বসে, যা সমাজে বিদ্বেষ, হিংসা ও সংঘাতের প্রসার ঘটায়।
প্রকৃত প্রস্তাবে, তা ভারতীয় সম্প্রদায়গত পরিচয়ের মোড়কে বস্তুতঃ পাশ্চাত্যের ইতালীয়-জার্মান ফ্যাসিবাদ-নাৎসিবাদেরই বিষয়বস্তু।
এ থেকে বেরিয়ে এসে, মহাত্মা গান্ধীর প্রচারিত ও শেখানো, ভারতীয় পতাকায় বিধৃত অশোকচক্রের মূল যে অহিংসা ও প্রকৃত ধর্মোৎসাহিত ন্যায়নীতির ভারতীয় ঐতিহ্য-তারই আলোকে নেতাজী, গান্ধী, আজাদ, আম্বেদকার, নেহরু, শাস্ত্রী, মনোমোহনের দেশীয় ঐতিহ্য-প্রসূত বা তদ্দ্বারা অনুপ্রাণিত, বা তৎবন্ধব; অথচ সমসাময়িক আধুনিক জগতের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদারনৈতিক গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনই তেলাপোকা আন্দোলনে সৃষ্ট সাময়িক, আর তাতে প্রতিফলিত ক্রমাগত ভবিষ্যৎ সংকটমালা থেকে উত্তরণের তুলনামূলক স্থায়ী সমাধান।
এর জন্য জাতীয় নেতৃত্বে দল বদলের দরকারও না হতে পারে। নরেন্দ্র মোদির মত তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন জনপ্রিয় নেতা চাইলে হয়ত নিজেরই দলের ও তদ্দ্বারা প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন।
তবে এটা ক্ষমতার আসন রক্ষা করবার জন্য নিছক বর্তমান সংকট মোকাবেলায় দু’-চারটে ছাড় দেওয়ায় সীমাবদ্ধ কৌশল মাত্র হলে হবে না।
উপহাস না উপহার?
ঘটনাপ্রবাহ এখন কোন দিকে যায়, তাই দেখার বিষয়। সাময়িক জোড়াতালির বর্তমান সংকট মাত্র মোকাবেলার ছোটখাটো ছাড়, না তাতেও ব্যর্থতামূলক বুদ্ধি-বৃদ্ধের কিশোর-তরুণের প্রতি কঠোর অনমনীয়তা? এ দু’টাই হবে আসলে উপহাস।
নাকি এ দুইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আধুনিক ভারতের যে বিশ্বময় ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে বহুলাংশে সফলতাসহ সচেষ্ট হয়েছিলেন, তার প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষগণ—বিশ্বের বৃহত্তম, বাস্তবিকই ব্যাপকতর জনগণের কল্যাণে নিবেদিত, একটি বহুজাতিক রাজ্যপুঞ্জ-ভিত্তিক কার্যকর গণতন্ত্রের একটি অনুকরণীয় অভাবনীয় উদাহরণ হিসেবে—তারই পুনরাভিষেকের দিকে। এটা হলে, তা হবে ভারতবাসীকেই নয়, সারা বিশ্বকে একটি মূল্যবান উপহার। ভারতের বিশাল সংখ্যা কর্তৃক দেবতার রূপে দেখা নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই, তার ভারতীয় জনতা পার্টিরই উদ্যোগে। অন্যথায়, অন্য কোন দল, বা দল-জোটের।
লেখক ঢাকা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূতপূর্ব শিক্ষক ও গবেষক।