ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ কী জিনিস? কী কী করবে?

রিতু চক্রবর্ত্তী
ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ কী জিনিস? কী কী করবে?
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

গত বছর দায়িত্ব নিয়েই বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ করে দেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ধাপে ধাপে বদল এনেছেন আমেরিকার দীর্ঘদিনের অভিবাসন নীতিমালাতেও। এবার এনেছেন নতুন উদ্যোগ, ‘বোর্ড অব পিস’।

মজার বিষয় হলো, ভিন দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে নাক না গলানো ও বিশ্বজুড়ে সংঘাত নিরসনের নির্বাচনী এজেন্ডা থাকলেও দেশে দেশে সংঘাতের উসকানি দাতা হিসেবে প্রধান ভূমিকা পালন করছেন ট্রাম্প। এক স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্ট আর ফার্স্ট লেডিকে তুলে নিয়ে গেছেন নিজ দেশে। ইরানে হামলার হম্বিতম্বি, সেইসাথে নানান বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য তো আছেই। এই কয়েকদিন আগে আবার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর তার বদলে ট্রাম্প নিজেই খুলতে যাচ্ছে ‘বোর্ড অব পিস’।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: রয়টার্স
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: রয়টার্স

বোর্ড অব পিস কী?

রয়টার্সের হাতে আসা খসড়া সনদ অনুযায়ী, ট্রাম্প আজীবন এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রাথমিকভাবে গাজা সংকট নিয়ে কাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে এটি বৈশ্বিক অন্যান্য সংঘাত নিরসনে কাজ করবে। এই বোর্ডের সদস্য দেশগুলোর মেয়াদ হবে তিন বছর। তবে কোনো দেশ যদি ১ বিলিয়ন ডলার অনুদান দেয়, তবে তারা বোর্ডের স্থায়ী সদস্যপদ লাভ করতে পারবে।

এই বোর্ড গাজা সংঘাত নিরসন থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতা মোকাবিলা করবে। এই নিয়ে এবার কপালে ভাঁজ দেখা গেল বিশেষজ্ঞদের।

এদিকে এই  ‘সাহসী ও নতুন পদক্ষেপ’ গ্রহণের লক্ষ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ১৮ জানুয়ারি রাতে দিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর তার ভেরিফায়েড এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে মোদিকে লেখা ট্রাম্পের সেই আমন্ত্রণপত্রটি শেয়ার করেন। ভারতসহ আরও অনেক দেশকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্যমতে, ইতোমধ্যেই কানাডা, তুরস্ক, প্যারাগুয়ে, আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা ও মিশর ট্রাম্পের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরাগভাজন বর্তমান বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোকে প্রতিস্থাপন করতেই এই বোর্ডের পরিধি বিস্তৃত করা হয়েছে। গত ১৮ জানুয়ারি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

শান্তি নাকি নতুন হাতিয়ার?

ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো খালেদ এলগিন্দি বলেছেন, এই বোর্ড ফিলিস্তিনি স্বার্থকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সভাপতিত্বে গঠিত এই বোর্ডে রয়েছেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, ধনকুবের মার্ক কাওয়েন এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। কূটনীতিকদের মতে, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা জাতিসংঘের কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

খালেদ এলগিন্দি বলেন, “গাজা কেবল শুরু, এটিই ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ লক্ষ্য নয়। সম্ভবত গাজা সংকট সমাধানের চেয়ে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সরিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই এই প্রশাসনের অগ্রাধিকার। কারণ কৌশলগতভাবে গাজা ট্রাম্পের কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।”

ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা উপত্যকার ধ্বংসস্তূপ পুনর্গঠন তদারকিতে ট্রাম্পের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত শুক্রবার বেশ ঘটা করে এই বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয় হোয়াইট হাউস। তবে বর্তমানে বিভিন্ন মহলে ঘুরতে থাকা খসড়া সনদে ওই অঞ্চলের কোনো সরাসরি উল্লেখ নেই। এই বিষয়টিই এমন জল্পনার জন্ম দিয়েছে যে, ট্রাম্প সম্ভবত জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নতুন কোনো সংস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন।

জাতিসংঘের প্রভাব হুমকির মুখে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা জাগছে। ছবি: রয়টার্স
জাতিসংঘের প্রভাব হুমকির মুখে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা জাগছে। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসন একটি আন্তর্জাতিক বোর্ডের তত্ত্বাবধানে গাজার শাসনকার্য পরিচালনা করবে। তবে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা এই কাঠামোকে ‘ঔপনিবেশিক’ ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এছাড়া ইরাক যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসের কারণে টনি ব্লেয়ারের অন্তর্ভুক্তিও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।

এলগিন্দি প্রশ্ন তুলেছেন, ক্ষমতার ব্যাপক ভারসাম্যহীনতার কারণে এই বোর্ড শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে কি না। তিনি বলেন, “তারা কার কথা শুনবে? ইসরায়েল—যাদের হাতে সব নিয়ন্ত্রণ, নাকি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটি—যারা ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়?”

এদিকে ‘বোর্ড অব পিস’-এর কাজ শুরু করার জন্য যে যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন, তা বর্তমানে অত্যন্ত সংকটাপন্ন। গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য ইসরায়েল ও হামাস একে অপরকে দোষারোপ করছে। যুদ্ধবিরতি চলাকালীনও ১০০ শিশুসহ ৪৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি এবং ৩ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় গাজায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং পুরো জনগোষ্ঠী অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই ধ্বংসযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল দাবি করে আসছে যে তারা আত্মরক্ষার্থেই এই অভিযান চালাচ্ছে।

সম্পর্কিত