সংবাদমাধ্যমে কি তবে চর দখলই চলবে?

সংবাদমাধ্যমে কি তবে চর দখলই চলবে?
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম ও নদীর চরের মধ্যে পার্থক্য দিন দিন কমছে যেন। নদীর চর ভেসে উঠলেই যেমন তৎসংলগ্ন অঞ্চলের বাসিন্দারা কয়েক পক্ষ হয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে তা দখলের প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে, তেমনি এই দেশের সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তেমনি হচ্ছে। ক্ষমতায় যে যাচ্ছে, তারই আজ্ঞাবহ হয়ে উঠতে গিয়ে, আজ্ঞা মেনে নেওয়ার মানসিকতার লোকজনকে উড়িয়ে এনে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে নিয়ন্ত্রণের কাজে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে কি তবে চর দখলই চলবে?

এই প্রশ্নটি আসছে মূলত প্রায় দেড় বছরের আগে, পরের কিছু ঘটনা নিয়ে। একই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে বর্তমানেও। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রণের জায়গাতে রাতারাতি কিছু পরিবর্তন এসেছিল। সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এবং এক্ষেত্রে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে, বিপক্ষে থাকার কথা তুলে কাউকে কাউকে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের চাকরি থেকেই ছেঁটে ফেলার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, সেসব কাজ সম্পাদনও হয়েছিল।

এভাবেই শুরু হয় ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো করে সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতির যথেচ্ছ প্রচলন। হ্যাঁ, একটি কথা এখানে বলে রাখা উচিত যে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর বেশির ভাগের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। বিক্ষোভ, হত্যাকাণ্ড বা প্রতিবাদের খবর সেভাবে প্রকাশ করেছিল গুটিকয়েক সংবাদমাধ্যমই। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে ও বিপক্ষে থাকার যে প্রচার, তার পালে হাওয়া লাগে ভালোমতোই।

এই হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে মূলত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টাই করা হয়েছে গত বছর দেড়েকের বেশি সময় ধরে। সেটি যে কেবল ন্যায়ের পক্ষে সংবাদমাধ্যমকে নিয়ে আসার সৎ ইচ্ছায় করা হয়েছে, তা নয়। বরং প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই এক পক্ষ থেকে আরেক পক্ষে যাওয়ার ইচ্ছাই তাতে প্রতিফলিত হয়েছে। এতে সাংবাদিকতার নৈতিক চর্চার সদিচ্ছা খুব একটা ছিল না। উল্টো ‘ক্ষমতা যেদিকে, আমরা সেদিকে’ নীতিকে আলিঙ্গন করা হয়েছে।

ক্ষমতার সাথে সংবাদমাধ্যমগুলোর এমন গলাগলি এবারই প্রথম হয়েছে, তা নয়। গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল। সরকারি ক্ষমতাকে সমঝে চলাই ছিল মূলমন্ত্র, তাতে তোষামোদ করার আকাঙ্ক্ষাও ছিল ব্যাপক। সে কারণেই আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান ব্যক্তির সংবাদ সম্মেলনে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক উপস্থিত হয়ে ওই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় রাখার জন্য প্রকাশ্যে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন!

পচনের পর দুর্গন্ধ ছড়ায় এভাবেই আসলে। এভাবেই বোঝা যায় এ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতার বা স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছার নমুনা। তবে পচনের শুরু একদিনে হয়নি। এ দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বললেও অত্যুক্তি হয় না। সেই থেকেই সংবাদমাধ্যমগুলো নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন এবং কদাপি স্বল্প সময়ের জন্য অর্জিত হয়েছে বলে ভ্রম হলে, তা ধরে রাখা নিয়ে সদা সংগ্রাম করে চলেছে। এ দেশে কতবার শাসক পরিবর্তন হয়েছে, শাসনের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সবকিছুর পরও একটি বিষয়ে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। সেটি হলো–মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকোচিত করার চেষ্টা। সব আমলেই দেখা যাবে যে, আগের আমলের চেয়ে অন্যভাবে, আরেকটু চেপে ধরার ইচ্ছা।

যেকোনো দেশেরই শাসন কাঠামো অবশ্যই স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যমকে ভয় পায়। একই সঙ্গে পুঁজিবাদী কাঠামোও ভয় পায়। এই ভয়ের কারণটি মূলত নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা, শোষণ ও দুর্নীতি প্রকাশিত হওয়ার আশঙ্কায় নিহিত। এবং এই কারণেই সংবাদমাধ্যমকে দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিতি দেওয়া হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বেশির ভাগ উন্নত দেশেই এই কাজটি করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, যাতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে, কেউ বা কোনো পক্ষ (সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষসহ) স্বেচ্ছাচারী না হয়ে উঠতে পারে। এবং এসব কারণেই হয়তো আমাদের দেশে বরাবরই সংবাদমাধ্যমের স্বাতন্ত্র্য না রাখার চেষ্টা করে গেছে ক্ষমতাশালীরা। তাতে আরও বেশি করে তেল, ঘি ঢেলেছে সংবাদমাধ্যমের তথাকথিত মালিকপক্ষের সিংহভাগও। কারণ, ক্ষমতার সাথে থাকলে তারা অনেক অন্যায্য সুবিধা আদায় করে নিতে পারে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের ক্ষেত্রে তারাও একদল কিডন্যাপার বটে। এমন কিডন্যাপারদের সহযোগী হিসেবে থাকেন রাজনৈতিক ও আদর্শিক পক্ষপাতদুষ্ট একদল সাংবাদিকও। এভাবেই তৈরি হয়েছে সার্বিক ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। এবং একাধিক পক্ষের যুগপৎ এই কাজে যে বেশ সফলতাও পাওয়া গেছে, তা তো এ দেশের সংবাদমাধ্যমের বর্তমান দুরবস্থা দেখলেই বোঝা যায়।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

এই দুরবস্থা আরও খারাপের দিকে গেছে এখন। কারণ গণঅভ্যুত্থানের টালমাটাল সময়ের ফাঁকে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে ‘মব’ আয়োজন করে সিদ্ধান্ত আদায়ের একটি সংস্কৃতি চালু করা গেছে। বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে সরাসরি হামলা করে ভাঙচুর চালানো হয়েছে, ভয় দেখানো হয়েছে। কথিত পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে কতিপয় সাংবাদিককে প্রতিষ্ঠানচ্যূত করা হলো। এটি ঠিক যে, এদের কারও কারও বিরুদ্ধে অবশ্যই ক্ষমতার সাথে দহরম মহরমের এবং সেই মতে প্রতিষ্ঠানকে চালিত করার অভিযোগ ছিল। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এদের সরিয়ে যাদের নিয়ন্ত্রক করা হলো, তারাও আবার তৎকালীন ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট বা ছায়া সরকারি রাজনৈতিক মত ও পথের পথচারী! অথচ, এর মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, পতিত স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের দোসর পরিচয়। এভাবে কেবলই যে পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকদেরই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা নয়; বরং এর সাথে অফিসের ভেতরকার ‘পলিটিকস’ও জড়িত ছিল। সেই পলিটিকস অনুযায়ী অনেককে ‘দোসর’ ট্যাগ দেওয়া হয়েছে এবং চাকরি থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে বের করেও দেওয়া হয়েছে।

কথা হলো, এই ‘দোসর’ বানানোর কাজটি কোন সাংবাদিকেরা করেছে? উত্তরটি হলো, দোসরেরাই! এক্ষেত্রে এক সহকর্মীর অভিজ্ঞতা জানানো যাক, বুঝতে সহজ হবে। চব্বিশের জুলাই-আগস্টের সময় একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে তিনি কর্মরত ছিলেন। তো, ওই সময়ের সহিংসতার ঘটনা সেই সংবাদমাধ্যমে প্রচারে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন, কেবলই সাংবাদিকতার খাতিরে অবশ্য। এমনকি সহিংসতায় নিহতের সঠিক সংখ্যা প্রচারের বিষয়েও জোর দিয়েছিলেন। তো, সেই প্রয়াসের বিপরীতে যিনি বেশ সোচ্চার ছিলেন এবং ওই সহকর্মীকে কোনো পক্ষের বলে প্রতীয়মান করতে নানামুখী কটু বাক্যের প্রচার করেছিলেন, ৫ আগস্টের পর তাকেই আবার ওই সহকর্মীর বিরুদ্ধেই ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ ট্যাগ দিতে দেখা গিয়েছিল। কারণ, ৫ আগস্ট-পরবর্তী অন্যায়ের প্রতিবাদও করেছিলেন সেই সহকর্মী, সংবাদ প্রচার করেছিলেন এবং এ ধরনের সংবাদ চেপে যাওয়ার চাপে নতি স্বীকার করেননি।

সুতরাং, সমস্যা মূলত সেই অবিনশ্বর দালালিই। ওটি আগে এক পক্ষ করত, এখন আরেক পক্ষ করে। ভবিষ্যতে আরেক পক্ষও হয়তো করবে। তারাই অফিসের ভেতরে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ তৈরি করে, মবও করে। এমনকি বাইরের মবেও তাদের হাত থাকে। এসবে আবার সংবাদ প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তারাও যুক্ত থাকেন। নিজেদের চেয়ার ও স্বার্থ বাঁচাতে তারা কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপি, কখনও জামায়াত বা কখনও হালের এনসিপি। এভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকেরা চিরকালই টিকে থাকেন, তাদের টিকিয়ে রাখাও হয়। কারণ, তাতে শীর্ষ পদের অনেকের স্বার্থসিদ্ধি হয়। আর এভাবে ক্ষমতার সমীকরণে বদলে যায় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতি, বদলায় চেহারাও।

এক্ষেত্রে উদাহরণ অনেক। যেমন: চব্বিশের আগস্টের আগে তৎকালীন সরকার গঠন করা রাজনৈতিক দলের তুমুল সমর্থক সাংবাদিক কাম সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অনেক বড় কর্তাকে দেখা গেছে গণঅভ্যুত্থানের পর পুরোপুরি বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক আদর্শের তালে তাল মেলাতে। তার পেছনে যেমন ব্যবসায়িক স্বার্থ ছিল, তেমনি ছিল নিজস্ব সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়ও। আর এই করতে গিয়ে তারাই সংবাদ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ আগ বাড়িয়ে তুলে দেন রাজনৈতিক শক্তির হাতে, কাঁধে নেন তাদের দালালি করার দায়িত্ব। এই করতে গিয়ে সম্প্রতি একটি শীর্ষস্থানীয় (সাবস্ক্রাইবারে, ফলোয়ারে) বেসরকারি টেলিভিশনের ডিজিটাল বিভাগে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পেয়ে গেছে একটি রাজনৈতিক দলের একটি উপকমিটিতে চা-বিস্কুট এনে দেওয়ার মতো দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিও! আর এসব নতুন নিয়োগকৃত ব্যক্তি অথবা সাংবাদিকদের (!) বেতন-ভাতা দিতে গিয়েই সাময়িকভাবে আটকে গিয়েছিল ওই প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ও পেশাদার সাংবাদিকদের বেতন। কারণ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাপ একজনের হলেও, ভুগতে যে হয় সবাইকেই। সময়ের ফেরে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা তাই এমন অবস্থাতেই পৌঁছেছে।

প্রশ্ন হলো, মুক্তির উপায় কী? এভাবেই কি চলতে থাকবে?

এখন পর্যন্ত যেসব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাতে এই দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর বেশির ভাগকেই নদীর চর থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না। এসব চরে সাংবাদিকেরাই সময়ভেদে নানা পক্ষের লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করতে থাকে। হই হই রই রই করতে করতে তারাই চর বা মতান্তরে সংবাদমাধ্যম দখলে সহায়তা করে। উল্টো গুটিকতক যারা এই ঘরানা থেকে আলাদা আছে এবং আলাদা থাকারই চেষ্টা করে যাচ্ছে, তারা এসব চর ঘরানার সংবাদমাধ্যমগুলোর রোষের মুখেও পড়ে।

যেকোনো পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আসলে ওই পরিস্থিতির সাথে জড়িত ব্যক্তিগুলোর উন্নত হতে হয়। এই দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর উন্নতির জন্যও তাই আগে সাংবাদিকদের উন্নত হওয়া প্রয়োজন। ওটি হলেই বাকি অবস্থার ধীরে হলেও পরিবর্তন সম্ভব। এখন যার বিয়ে, তারই যদি হুঁশ না থাকে, তাহলে আর পাড়া-পড়শিরা না ঘুমিয়ে থেকে কী করবে?

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত