রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফুয়েল লোডিং শুরু হয়েছে। ছবি: ফেসবুক
২৮ এপ্রিল, ভোর। ঢাকার ঘুম তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। আমি বের হচ্ছি চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আয়োজনে সেখান থেকে টেলিভিশন, পত্রিকা ও অনলাইন–মোট ৬৪ জন সাংবাদিককে নিয়ে দুটি বাস ছেড়ে যাবে পাবনার রূপপুরের পথে। গন্তব্য–রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিকেলে সেখানে শুরু হবে প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম লোডিং–প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি।
দিনটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসের একটি বাঁকবদলের মুহূর্ত। বিস্তীর্ণ বালুচর থেকে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে–রিপোর্টার হিসেবে সেটি নিঃসন্দেহে বিরল অভিজ্ঞতা।
দুই বাসে ৬৪ জন পেশাদার সাংবাদিক, যাদের অনেকেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের শুরু থেকে কাভার করছে। কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজ উদ্যোগে, নানা বই-পুস্তক আর ইন্টারনেট ঘেঁটেই পরমাণু বিদ্যুৎ সম্পর্কে শিখেছেন। প্রকল্পের অগ্রগতি দেখেছেন। রিপোর্ট করেছেন। তাদের সবার কাছে রূপপুর ধরা দিয়েছে নানা আঙ্গিকে, নানাভাবে। বাস চলা শুরু করল। শুরু হলো প্রকল্পকেন্দ্রিক আলোচনা, তর্ক।
রূপপুরের ট্র্যাজেডি, রূপপুরের দুর্নীতি
বাস চলছে। তরুণ এক রিপোর্টার বললেন, “দুর্নীতি যদি না হতো তাহলে রূপপুর বাংলাদেশের গর্ব হতে পারত।” বললেন, “যে প্রকল্পে বালিশ ফ্ল্যাটে তুলতে খরচ হয়েছে হাজার টাকা। প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে ওয়াশিং মেশিন কিনতে না, ফ্ল্যাটে ওঠাতে! আর শেখ হাসিনা একলাই তো মাইরা খাইছে ৫ বিলিয়ন ডলার! সারা দুনিয়ার সামনে মাথা কাটা গেছে।” উত্তরে সিনিয়র একজন রিপোর্টার (সঙ্গত কারণেই নাম প্রকাশ করলাম না, পাছে কোনো ট্যাগিং হয়) বললেন, “৫ বিলিয়ন ডলার মানে বোঝো? প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি (অভিযোগের সময় প্রকল্প খরচ) থেকে ৬০ হাজার কোটি বাদ থাকলে কত থাকে? ৫৪ হাজার কোটি। তখন ডলারের দাম যদি ১১৭ টাকা হয় তাহলে দাঁড়ায় ৪.৬ বিলিয়ন ডলার। এইবার তুমি নিজে গুগল করে বের করো পৃথিবীর কোথায় এই দামে দুইটা ১২০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক চুল্লি কোন দেশ বানিয়ে দেবে। আগৈলঝড়ায় দুইটা বসাব।” দুষ্টুমির সুর কথাগুলো বললেন সিনিয়র ওই রিপোর্টার। আর বালিশকাণ্ড! ওটা এই প্রকল্পের না। সরকারের বাড়িঘর বানানো আর কাথা-কম্বল কেনাকাটা করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এই ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে বলে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে তখন তেমনটাই বলা হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার–যেখানে দুটি ১২০০ মেগাওয়াট ইউনিট অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যয় আন্তর্জাতিক রেঞ্জের বাইরে পড়ে বলে তো মনে হচ্ছে না। বরং এটি রূপপুরের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, জনবল তৈরি, জ্বালানি সরবরাহ ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা একসঙ্গে প্যাকেজ আকারে ধরা হয়েছে।
যদিও আমি প্রথম থেকেই এই প্রকল্প কাভার করছি, তবুও দুজনের তর্কে নিজেই গুগলের কাছে ধরনা দিলাম। কী পেলাম?
ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (ডিব্লিউএনএ) ‘ইন্টারন্যাশনাল কস্ট বেঞ্চমার্ক–নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টস’-এর তথ্য বলছে, রাশিয়ার তৈরি VVER-1200 প্রযুক্তির কিছু প্রকল্পে প্রতি ইউনিটের ব্যয় প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। আবার দক্ষিণ কোরিয়ার APR-1400 প্রযুক্তিতে নির্মিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ প্রকল্পে চারটি ইউনিট মিলিয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৪ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের মতো। অর্থাৎ, প্রতি ইউনিটের হিসাবে সেটিও প্রায় একই রকম।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের হিঙ্কলি পয়েন্ট সি প্রকল্পে দুই ইউনিটের জন্য ব্যয় আরও বেশি দেখা যাচ্ছে, যেখানে ফাইন্যান্সিং মডেল, নির্মাণ বিলম্ব এবং চুক্তিগত কাঠামোর কারণে মোট খরচ ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। চীনের কিছু প্রকল্প তুলনামূলকভাবে কম খরচে সম্পন্ন হলেও সেখানে রাষ্ট্রীয় সাবসিডি ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার বড় ভূমিকা থাকে, যা সরাসরি তুলনাকে জটিল করে তোলে।
এই বাস্তবতায় রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার–যেখানে দুটি ১২০০ মেগাওয়াট ইউনিট অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যয় আন্তর্জাতিক রেঞ্জের বাইরে পড়ে বলে তো মনে হচ্ছে না। বরং এটি রূপপুরের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, জনবল তৈরি, জ্বালানি সরবরাহ ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা একসঙ্গে প্যাকেজ আকারে ধরা হয়েছে।
এখন দুর্নীতি হয়েছে কি হয় নাই, সে বিতর্ক বাদ দিলেও এসব ঘটনা বাংলাদেশের এই মাইলফলক প্রকল্পের ট্র্যাজিডি বলেই আমার মনে হচ্ছে।
রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফাইল ছবি
তরুণ রিপোর্টার নাছোড়বান্দা, জ্ঞ্যানপিপাসু। এবার তিনি বললেন, “ভাই, এখন তো রাশিয়ার ইউরেনিয়াম লোড করছে, কিন্তু তারপর?”
“তারপর কি সমস্যা?” উত্তরে ওই সিনিয়র রিপোর্টার বললেন।
–যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ড. ইউনূসের চুক্তির কারণে এরপর তো আর রাশিয়া থেকে ফুয়েল রড আনতে পারবে না। কাজেই তিন বছর পর তো বিপদে পড়তে হবে।
–এ বিষয়ে আমি জানি না। তুমি নিশ্চিত জানলে আমাকে রেফারেন্সসহ জানিও। আমি আবারও গেলাম গুগলের কাছে।
যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ সম্পৃক্ততা ও জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা IAEA cooperation framework-এর তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সম্পৃক্ততা–বিশেষ করে পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও অ-প্রসারণ কাঠামোয় সহযোগিতা মূলত নিরাপত্তা ও সক্ষমতা উন্নয়নকেন্দ্রিক; রূপপুরের জ্বালানি সরবরাহ কাঠামো সরাসরি এটি নির্ধারণ করে না। রূপপুরের ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে নির্ধারিত এবং VVER-1200 প্রযুক্তি সেই সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে সরাসরি সরবরাহ পরিবর্তনের সম্ভাবনা সীমিত।
তবে হ্যাঁ, পরোক্ষ কিছু ঝুঁকি আছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং চ্যানেল এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থার ওপর ভূরাজনৈতিক চাপ মাঝে মাঝে জ্বালানি সরবরাহের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে পেমেন্ট ও লেনদেন ব্যবস্থায়।
ফলে মূল প্রশ্নটি সরবরাহ নিয়ে নয়; বরং এই সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা ভূরাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারবে, তা নিয়ে। আর এসব বিষয়ে অনেকবার গণমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। সেগুলোর সমাধানও হয়েছে বলে প্রকল্প সূত্রে জানানো হয়েছে।
নির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক ঝুঁকিও। বৈদেশিক ঋণ, মুদ্রা বিনিময় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সক্ষমতার প্রশ্ন। বিশেষ করে রূপপুরের ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় বাংলাদেশের ওপর আরো বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ থাকবে।
রূপপুর কূটনীতি ও অর্থায়ন: নির্ভরতার কাঠামো
রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার প্রায় ৯০ শতাংশ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ঋণ। বাকি অংশ বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন। এই অর্থায়ন কাঠামোকে অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘমেয়াদি “build-now, repay-later” মডেল হিসেবে দেখেন। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া নির্মাণ ও প্রযুক্তি সরবরাহের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়ার দায়িত্বও পালন করবে। ফলে এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নির্ভরতা কাঠামো।
এই নির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক ঝুঁকিও। বৈদেশিক ঋণ, মুদ্রা বিনিময় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সক্ষমতার প্রশ্ন। বিশেষ করে রূপপুরের ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় বাংলাদেশের ওপর আরো বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ থাকবে।
বিদ্যুৎ আমাদের, দ্বায়িত্ব বিশ্বের
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্প নয়–এটি আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের একটি স্থায়ী ব্যবস্থার অংশ। পারমাণবিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই নজরদারি কোনো বিকল্প নয়; বরং বাধ্যতামূলক কাঠামো। একে বলা হয় “Always under watch” কাঠামো। রূপপুর প্রকল্প আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সেফগার্ডস ও সেফটি স্ট্যান্ডার্ডের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য দুটি:
১. Safeguards compliance: পারমাণবিক জ্বালানি যেন শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার না হয়
২. Safety compliance: অপারেশনাল ঝুঁকি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ন্ত্রিত থাকে
রিঅ্যাক্টর ডিজাইন, ফুয়েল হ্যান্ডলিং ও ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট–সবকিছুই আইএইএ-নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যবেক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি নিয়মিত মিশনভিত্তিক রিভিউ, সাইট ইনস্পেকশন এবং টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট চালু থাকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমরা পারমাণবিক প্রযুক্তির নতুন ব্যবহারকারী। ফলে সক্ষমতা উন্নয়ন, রেগুলেটরি স্ট্রাকচার ও মানবসম্পদ প্রশিক্ষণ–সবই আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠছে।
বাংলাদেশের রূপপুরের যে দুটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করা হচ্ছে, তার রেফারেন্স প্রকল্প হচ্ছে–রাশিয়ার নভভারোনেজ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০১৭ সালে রোসাটমের উদ্যোগে ওই শহর ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তখন দেখেছিলাম, নভভারোনেজ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই করে না, বরং এটি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনমান নিশ্চিতে নানামূখী পদক্ষেপও নেয়। মাত্র ৩০ হাজার মানুষের ওই শহরের রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল ও বিনোদন কেন্দ্রের উন্নয়নে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সরাসরি বিনিয়োগ করেছে। এই প্ল্যান্টের পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং এসবের নিয়মিত সেফটি রিভিউ (OSART) করা হয়। শুধু তাই নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা জানার জন্য নির্দিষ্ট মহড়া ও সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হয়। নিয়মিত তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে তা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। একই উদ্যোগ নেওয়ার কথা রূপপুরেও। ২০১৭ সালে সেখানকার মানুষের ধারণা ছিল রূপপুরের কারণে তাদের সন্তান জন্মদান ক্ষমতা নষ্ট হবে, নবজাতক হবে বিকলাঙ্গ, গাছের ফল শুকিয়ে যাবে, হবে ফসলহানী। আর যেকোনো সময় এটি ফেটে যাবে, যাতে সবাই মারা যাবে!
এবার তাই বাস থেকে নেমেই খাবারের আগে গেলাম আশপাশের মানুষের সাথে কথা বলতে। জানলাম, কিছু সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক কালেভদ্রে হয়েছে। গেঞ্জি-টুপি, পোস্টার পেয়েছে। একটু আত্মবিশ্বাস বেড়েছে বটে, তবে কেন্দ্র চালু হওয়ার আগে আগের সব শঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছে না। কারও কারও শঙ্কা আছে আগের মতোই। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট রাশানদের থাকার জায়গা গ্রিন সিটির পাশে ফলের দোকানি মনির বললেন, “বিদ্যুৎ পাব, কিন্তু জীবন কি থাকপিনি কিনা কিডা জানে।” একই সুরে কথা বললেন, পথচারী মোস্তাক, “একনই তো মনে হচ্ছে ডাবগাছ শুকো যাচ্ছে। তয় সবাই কচ্ছে কিচ্ছু হবি নানে। কিন্তু দুদিন আগে চিরোনোবিলি (চেরোনোবিল) দ্যাকলাম সব মইরে ছাই। কী কবো কন?” এসব শোনার পর বলাই যায়, স্থানীয়দের আত্মবিশ্বাস অর্জন এখনো করতে পারে নাই রূপপুর। চোখে পড়ে নাই স্থানীয়দের জন্য তৈরি কোনো অবকাঠামো।
তবে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে রেডিয়েশন ড্যাশবোর্ড লাইভ প্রচারসহ সব উদেোগই দৃশমান হবে। ফুয়েল লোডিংয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কথা হলো প্রকল্পের সাথে জড়িত নানা পর্যায়ের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সাথে।
ছবি: সংগৃহীত
নিরাপত্তা কাঠামো
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, রূপপুরের নিরাপত্তা নকশা তৈরি করা হয়েছে “defense-in-depth” নীতির ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, একটি ব্যর্থ হলে আরেকটি স্তর সক্রিয় হয়ে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে।
রূপপুরের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিতর্কগুলোর একটি হলো এর জনঘনত্ব প্রেক্ষাপট। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী এলাকায় প্রকল্পটি অবস্থিত, যেখানে আশপাশে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামীণ জনপদ রয়েছে।
মূল নিরাপত্তা স্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে–
১. Reactor containment structure: শক্তিশালী ডাবল-ওয়াল কংক্রিট শেল, যা তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়ানো প্রতিরোধ করে
৩. Emergency core cooling system: অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা
৪. Seismic and external hazard protection: ভূমিকম্প, বন্যা ও বিমান দুর্ঘটনা বিবেচনায় ডিজাইন
এই পরমাণু বিজ্ঞানী জানান, “VVER-1200 প্রযুক্তি মূলত Generation III+ রিঅ্যাক্টর, যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা “fail-safe” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে।”
জনঘনত্ব ও ঝুঁকি: নিরাপত্তার ভৌগোলিক প্রশ্ন
রূপপুরের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিতর্কগুলোর একটি হলো এর জনঘনত্ব প্রেক্ষাপট। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী এলাকায় প্রকল্পটি অবস্থিত, যেখানে আশপাশে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামীণ জনপদ রয়েছে। পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সাধারণত বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ৩০-৫০ কিলোমিটার রেডিয়াসের ইমার্জেন্সি প্ল্যানিং জোন (ইপিজেড) বিবেচনা করা হয়। তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, বিশ্বের অধিকাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তুলনামূলক কম জনঘনত্ব বা নিয়ন্ত্রিত নগর বিন্যাসে স্থাপিত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটি আলাদা। কারণ, এখানে জনঘনত্ব বেশি, জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানান্তর (evacuation) ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সীমিত, এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ধাপে ধাপে গড়ে উঠছে।
তবে রূপপুর কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো–আধুনিক VVER-1200 প্রযুক্তি এবং IAEA-অনুমোদিত সেফটি ডিজাইন এই ঝুঁকিকে গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রাখে।
ফুয়েল লোডিংয়ের মুহূর্ত
রিঅ্যাক্টর বিল্ডিংয়ের ভেতরে প্রবেশের আগে নিরাপত্তা প্রোটোকল একাধিক স্তরে পরীক্ষা করা হয়। পরিচয় যাচাই, ডোজিমিটার চেক, ধাতব বস্তু নিয়ন্ত্রণ–সবকিছুই নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে। বাইরে থেকে এটি একটি নির্মাণকেন্দ্র মনে হলেও ভেতরে শৃঙ্খলার মাত্রা প্রায় ল্যাবরেটরি-গ্রেড।
বিশাল কংক্রিট কাঠামোর ভেতরে বাতাসও যেন ভারী। রিঅ্যাক্টর হলের কেন্দ্রে যে স্থানটি ঘিরে আজকের কার্যক্রম, সেখানে উপস্থিত প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের চলাচল সীমিত ও নির্দিষ্ট। প্রতিটি ধাপ পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী চলছে। ফুয়েল অ্যাসেম্বলি ইউনিটগুলো ধীরে ধীরে নির্ধারিত কোর সেকশনের দিকে নেওয়া হচ্ছে। এটি কোনো দৃশ্যমান বিস্ফোরণ বা নাটকীয় পরিবর্তনের মুহূর্ত নয়–বরং নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, ধীর গতি এবং শূন্য ত্রুটির দিকে এগোনো এক প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া।
রাশিয়ান প্রযুক্তিবিদদের তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিটি ফুয়েল রড নির্দিষ্ট বিন্যাসে রিঅ্যাক্টর কোরে স্থাপন করা হচ্ছে–যেখানে সামান্য বিচ্যুতিও গ্রহণযোগ্য নয়।
এই মুহূর্তে প্রকল্পের বাইরে থাকা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, বিতর্ক বা সংখ্যাতত্ত্ব আর প্রাধান্য পায় না। ভেতরের বাস্তবতা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর–একটি নিয়ন্ত্রিত শক্তির সূচনা।
রিঅ্যাক্টর কন্ট্রোল রুমে মনিটরগুলোতে ডেটা প্রবাহ স্বাভাবিক আছে কি না, তা বারবার যাচাই করা হচ্ছে। তাপমাত্রা, নিউট্রন ফ্লাক্স, কুল্যান্ট প্রেসার–সব সূচক নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকতে হবে।
ফুয়েল লোডিংয়ের এই পর্যায়ে এসে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আর ‘নির্মাণাধীন প্রকল্প’ থাকে না। এটি ধীরে ধীরে ‘অপারেশনাল সিস্টেম’-এ রূপ নেয়–যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে গাণিতিক নির্ভুলতা এবং বহুস্তরীয় নিরাপত্তা যাচাই।
তবে নিরাপত্তার কারণেই আমরা কিন্তু রিয়ক্টর বিল্ডিং-এর আশপাশেও ঘেঁষতে পারলাম না আমরা গেলাম সোজা অনুষ্ঠানস্থলে, যেখানে আছেন রোসাটমের ডিজি অ্যালেক্সি লিখাচভ, আছেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা।
নতুন রাজনৈতিক ইতিহাস
পুরো অনুষ্ঠানে সবাই বললেন, রূপপুর বাংলাদেশের এক বিশাল আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানালেন, ১৯৬০-এর দশকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা শুরু হলেও ১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ হয়। ১৯৯৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের, আজ যা বাস্তবে রূপ লাভ করেছে। আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে এ প্রকল্প বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, চলতি বছরের আগস্টে এখান থেকে পাওয়া যাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এক বছরের মধ্যে পাওয়া যাবে প্রথম ইউনিটের ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। বিশেষ সুইচ চেপে শুরু হয় ইউরেনিয়াম লোডিং। অনুষ্ঠান থেকেই প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের পাশে থাকায় রাশিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় বাংলাদেশ। এই মাইলস্টোন অর্জনে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা, আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি।
বালুচর থেকে রিঅ্যাক্টর
স্বাধীনতার আগেই যে প্রকল্প ঘিরে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল বাঙালি বিজ্ঞানীদের মধ্যে, তা শেষ পর্যন্ত সরিয়ে নেওয়া হয় করাচিতে। বাস্তবতা হচ্ছে, তখনকার অধিগ্রহণ করা জমি সযত্নে রেখে দিয়েছিল বাংলাদেশ। সে ইতিহাস লেখা আছে কাগজে, দলিলে। রিপোর্টার হিসেবে শূন্য সে মাঠ আর সেখানে মাথা তুলে দাঁড়ানো দেশের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রকল্প কাভার করার অনুভূতি সত্যিই অনন্য! গত দেড় দশকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রর ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের টাইমলাইন কেমন ছিল? আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিই।
দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগ্রহ ১৯৬০-এর দশক থেকে শুরু হয়। জমি অধিগ্রহণ হয়। কিন্তু, এর বাস্তব অগ্রগতি শুরু হয় ২০০৮ সালে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। অথচ পুরো রাষ্ট্রীয় আয়োজন কিংবা গণমাধ্যমের কোথাও শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগ কথাটা উচ্চরণ হয়নি। কিন্তু প্রকল্প ঘিরে যত অনিশ্চয়তা কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে, তার সবগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে নাম দুটো। যা হোক, তখনকার সরকার একাধিক দেশের সঙ্গে প্রযুক্তি ও অর্থায়ন নিয়ে আলাপ শুরু করে। রাশিয়া (Rosatom) ছাড়াও চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে আলোচনায় ছিল। তাদের নিজস্ব রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি (চীনের Hualong One, কোরিয়ার APR-1400) প্রস্তাবের ওপর প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনাও হয়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ‘turnkey’ মডেল (design–build–finance–fuel–take-back) এবং রাষ্ট্রীয় ঋণের নিশ্চয়তা–এই সমন্বিত প্যাকেজটি রাশিয়াই স্পষ্টভাবে টেবিলে আনে, যা গ্রহণ করে বাংলাদেশ।
২০১১: প্রাথমিক চুক্তি
নভেম্বরে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সহযোগিতার ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সই হয়, যা প্রকল্পটিকে আনুষ্ঠানিক ট্র্যাকে আনে।
২০১৩: আন্তঃসরকার চুক্তি
জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত IGA প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারণ করে। সেই চুক্তিতেই ঠিক হয় রাশিয়ার VVER- ১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে EPC-ধাঁচে বাস্তবায়ন হবে এই দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফুয়েল সাপ্লাই এবং ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেবে রাশিয়া। ঋণ হবে রাষ্ট্র টু রাষ্ট্র। এবং রেগুলেটরি ও প্রশিক্ষণ সহায়তার বিষয়টিও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়।
২০১৫-২০১৬: চুক্তি প্যাকেজ ও নির্মাণ শুরু
ডিটেইলড EPC কন্ট্রাক্ট, ঋণচুক্তি ও সাইট প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়; ২০১৬ সালে মূল নির্মাণ কার্যক্রম শুরু।
২০১৭: ফার্স্ট কংক্রিট–দৃশ্যমান রূপের সূচনা
৩০ নভেম্বর ২০১৭–ইউনিট-১-এর ‘first concrete’ ঢালার মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তব অবকাঠামোয় প্রবেশ করে। ওই অনুষ্ঠানে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করতে চাই।” অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগ দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মন্তব্য করেন, “রূপপুর প্রকল্প রাশিয়া ও বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।”
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে প্রথম দফায় পারমাণবিক জ্বালানি দেশে পৌঁছায়–অপারেশনাল প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
২৮ এপ্রিল ২০২৬; বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে লোড করা হলো ফুয়েল। এর মাধ্যমে কার্যকর অপারেশনের দিকে যাত্রা করল রূপপুর। রূপপুর থেকেই যাত্রা হলো আত্মবিশ্বাসী এক বাংলাদেশের।
লেখক: বিশেষ প্রতিবেদক, চরচা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফুয়েল লোডিং শুরু হয়েছে। ছবি: ফেসবুক
২৮ এপ্রিল, ভোর। ঢাকার ঘুম তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। আমি বের হচ্ছি চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আয়োজনে সেখান থেকে টেলিভিশন, পত্রিকা ও অনলাইন–মোট ৬৪ জন সাংবাদিককে নিয়ে দুটি বাস ছেড়ে যাবে পাবনার রূপপুরের পথে। গন্তব্য–রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিকেলে সেখানে শুরু হবে প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম লোডিং–প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি।
দিনটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসের একটি বাঁকবদলের মুহূর্ত। বিস্তীর্ণ বালুচর থেকে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে–রিপোর্টার হিসেবে সেটি নিঃসন্দেহে বিরল অভিজ্ঞতা।
দুই বাসে ৬৪ জন পেশাদার সাংবাদিক, যাদের অনেকেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের শুরু থেকে কাভার করছে। কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজ উদ্যোগে, নানা বই-পুস্তক আর ইন্টারনেট ঘেঁটেই পরমাণু বিদ্যুৎ সম্পর্কে শিখেছেন। প্রকল্পের অগ্রগতি দেখেছেন। রিপোর্ট করেছেন। তাদের সবার কাছে রূপপুর ধরা দিয়েছে নানা আঙ্গিকে, নানাভাবে। বাস চলা শুরু করল। শুরু হলো প্রকল্পকেন্দ্রিক আলোচনা, তর্ক।
রূপপুরের ট্র্যাজেডি, রূপপুরের দুর্নীতি
বাস চলছে। তরুণ এক রিপোর্টার বললেন, “দুর্নীতি যদি না হতো তাহলে রূপপুর বাংলাদেশের গর্ব হতে পারত।” বললেন, “যে প্রকল্পে বালিশ ফ্ল্যাটে তুলতে খরচ হয়েছে হাজার টাকা। প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে ওয়াশিং মেশিন কিনতে না, ফ্ল্যাটে ওঠাতে! আর শেখ হাসিনা একলাই তো মাইরা খাইছে ৫ বিলিয়ন ডলার! সারা দুনিয়ার সামনে মাথা কাটা গেছে।” উত্তরে সিনিয়র একজন রিপোর্টার (সঙ্গত কারণেই নাম প্রকাশ করলাম না, পাছে কোনো ট্যাগিং হয়) বললেন, “৫ বিলিয়ন ডলার মানে বোঝো? প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি (অভিযোগের সময় প্রকল্প খরচ) থেকে ৬০ হাজার কোটি বাদ থাকলে কত থাকে? ৫৪ হাজার কোটি। তখন ডলারের দাম যদি ১১৭ টাকা হয় তাহলে দাঁড়ায় ৪.৬ বিলিয়ন ডলার। এইবার তুমি নিজে গুগল করে বের করো পৃথিবীর কোথায় এই দামে দুইটা ১২০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক চুল্লি কোন দেশ বানিয়ে দেবে। আগৈলঝড়ায় দুইটা বসাব।” দুষ্টুমির সুর কথাগুলো বললেন সিনিয়র ওই রিপোর্টার। আর বালিশকাণ্ড! ওটা এই প্রকল্পের না। সরকারের বাড়িঘর বানানো আর কাথা-কম্বল কেনাকাটা করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এই ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে বলে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে তখন তেমনটাই বলা হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার–যেখানে দুটি ১২০০ মেগাওয়াট ইউনিট অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যয় আন্তর্জাতিক রেঞ্জের বাইরে পড়ে বলে তো মনে হচ্ছে না। বরং এটি রূপপুরের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, জনবল তৈরি, জ্বালানি সরবরাহ ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা একসঙ্গে প্যাকেজ আকারে ধরা হয়েছে।
যদিও আমি প্রথম থেকেই এই প্রকল্প কাভার করছি, তবুও দুজনের তর্কে নিজেই গুগলের কাছে ধরনা দিলাম। কী পেলাম?
ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (ডিব্লিউএনএ) ‘ইন্টারন্যাশনাল কস্ট বেঞ্চমার্ক–নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টস’-এর তথ্য বলছে, রাশিয়ার তৈরি VVER-1200 প্রযুক্তির কিছু প্রকল্পে প্রতি ইউনিটের ব্যয় প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। আবার দক্ষিণ কোরিয়ার APR-1400 প্রযুক্তিতে নির্মিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ প্রকল্পে চারটি ইউনিট মিলিয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৪ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের মতো। অর্থাৎ, প্রতি ইউনিটের হিসাবে সেটিও প্রায় একই রকম।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের হিঙ্কলি পয়েন্ট সি প্রকল্পে দুই ইউনিটের জন্য ব্যয় আরও বেশি দেখা যাচ্ছে, যেখানে ফাইন্যান্সিং মডেল, নির্মাণ বিলম্ব এবং চুক্তিগত কাঠামোর কারণে মোট খরচ ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। চীনের কিছু প্রকল্প তুলনামূলকভাবে কম খরচে সম্পন্ন হলেও সেখানে রাষ্ট্রীয় সাবসিডি ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার বড় ভূমিকা থাকে, যা সরাসরি তুলনাকে জটিল করে তোলে।
এই বাস্তবতায় রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার–যেখানে দুটি ১২০০ মেগাওয়াট ইউনিট অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যয় আন্তর্জাতিক রেঞ্জের বাইরে পড়ে বলে তো মনে হচ্ছে না। বরং এটি রূপপুরের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, জনবল তৈরি, জ্বালানি সরবরাহ ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা একসঙ্গে প্যাকেজ আকারে ধরা হয়েছে।
এখন দুর্নীতি হয়েছে কি হয় নাই, সে বিতর্ক বাদ দিলেও এসব ঘটনা বাংলাদেশের এই মাইলফলক প্রকল্পের ট্র্যাজিডি বলেই আমার মনে হচ্ছে।
রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফাইল ছবি
তরুণ রিপোর্টার নাছোড়বান্দা, জ্ঞ্যানপিপাসু। এবার তিনি বললেন, “ভাই, এখন তো রাশিয়ার ইউরেনিয়াম লোড করছে, কিন্তু তারপর?”
“তারপর কি সমস্যা?” উত্তরে ওই সিনিয়র রিপোর্টার বললেন।
–যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ড. ইউনূসের চুক্তির কারণে এরপর তো আর রাশিয়া থেকে ফুয়েল রড আনতে পারবে না। কাজেই তিন বছর পর তো বিপদে পড়তে হবে।
–এ বিষয়ে আমি জানি না। তুমি নিশ্চিত জানলে আমাকে রেফারেন্সসহ জানিও। আমি আবারও গেলাম গুগলের কাছে।
যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ সম্পৃক্ততা ও জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা IAEA cooperation framework-এর তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সম্পৃক্ততা–বিশেষ করে পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও অ-প্রসারণ কাঠামোয় সহযোগিতা মূলত নিরাপত্তা ও সক্ষমতা উন্নয়নকেন্দ্রিক; রূপপুরের জ্বালানি সরবরাহ কাঠামো সরাসরি এটি নির্ধারণ করে না। রূপপুরের ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে নির্ধারিত এবং VVER-1200 প্রযুক্তি সেই সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে সরাসরি সরবরাহ পরিবর্তনের সম্ভাবনা সীমিত।
তবে হ্যাঁ, পরোক্ষ কিছু ঝুঁকি আছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং চ্যানেল এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থার ওপর ভূরাজনৈতিক চাপ মাঝে মাঝে জ্বালানি সরবরাহের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে পেমেন্ট ও লেনদেন ব্যবস্থায়।
ফলে মূল প্রশ্নটি সরবরাহ নিয়ে নয়; বরং এই সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা ভূরাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারবে, তা নিয়ে। আর এসব বিষয়ে অনেকবার গণমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। সেগুলোর সমাধানও হয়েছে বলে প্রকল্প সূত্রে জানানো হয়েছে।
নির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক ঝুঁকিও। বৈদেশিক ঋণ, মুদ্রা বিনিময় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সক্ষমতার প্রশ্ন। বিশেষ করে রূপপুরের ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় বাংলাদেশের ওপর আরো বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ থাকবে।
রূপপুর কূটনীতি ও অর্থায়ন: নির্ভরতার কাঠামো
রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার প্রায় ৯০ শতাংশ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ঋণ। বাকি অংশ বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন। এই অর্থায়ন কাঠামোকে অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘমেয়াদি “build-now, repay-later” মডেল হিসেবে দেখেন। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া নির্মাণ ও প্রযুক্তি সরবরাহের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়ার দায়িত্বও পালন করবে। ফলে এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নির্ভরতা কাঠামো।
এই নির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক ঝুঁকিও। বৈদেশিক ঋণ, মুদ্রা বিনিময় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সক্ষমতার প্রশ্ন। বিশেষ করে রূপপুরের ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় বাংলাদেশের ওপর আরো বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ থাকবে।
বিদ্যুৎ আমাদের, দ্বায়িত্ব বিশ্বের
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্প নয়–এটি আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের একটি স্থায়ী ব্যবস্থার অংশ। পারমাণবিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই নজরদারি কোনো বিকল্প নয়; বরং বাধ্যতামূলক কাঠামো। একে বলা হয় “Always under watch” কাঠামো। রূপপুর প্রকল্প আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সেফগার্ডস ও সেফটি স্ট্যান্ডার্ডের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য দুটি:
১. Safeguards compliance: পারমাণবিক জ্বালানি যেন শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার না হয়
২. Safety compliance: অপারেশনাল ঝুঁকি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ন্ত্রিত থাকে
রিঅ্যাক্টর ডিজাইন, ফুয়েল হ্যান্ডলিং ও ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট–সবকিছুই আইএইএ-নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যবেক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি নিয়মিত মিশনভিত্তিক রিভিউ, সাইট ইনস্পেকশন এবং টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট চালু থাকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমরা পারমাণবিক প্রযুক্তির নতুন ব্যবহারকারী। ফলে সক্ষমতা উন্নয়ন, রেগুলেটরি স্ট্রাকচার ও মানবসম্পদ প্রশিক্ষণ–সবই আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠছে।
বাংলাদেশের রূপপুরের যে দুটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করা হচ্ছে, তার রেফারেন্স প্রকল্প হচ্ছে–রাশিয়ার নভভারোনেজ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০১৭ সালে রোসাটমের উদ্যোগে ওই শহর ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তখন দেখেছিলাম, নভভারোনেজ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই করে না, বরং এটি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনমান নিশ্চিতে নানামূখী পদক্ষেপও নেয়। মাত্র ৩০ হাজার মানুষের ওই শহরের রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল ও বিনোদন কেন্দ্রের উন্নয়নে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সরাসরি বিনিয়োগ করেছে। এই প্ল্যান্টের পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং এসবের নিয়মিত সেফটি রিভিউ (OSART) করা হয়। শুধু তাই নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা জানার জন্য নির্দিষ্ট মহড়া ও সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হয়। নিয়মিত তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে তা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। একই উদ্যোগ নেওয়ার কথা রূপপুরেও। ২০১৭ সালে সেখানকার মানুষের ধারণা ছিল রূপপুরের কারণে তাদের সন্তান জন্মদান ক্ষমতা নষ্ট হবে, নবজাতক হবে বিকলাঙ্গ, গাছের ফল শুকিয়ে যাবে, হবে ফসলহানী। আর যেকোনো সময় এটি ফেটে যাবে, যাতে সবাই মারা যাবে!
এবার তাই বাস থেকে নেমেই খাবারের আগে গেলাম আশপাশের মানুষের সাথে কথা বলতে। জানলাম, কিছু সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক কালেভদ্রে হয়েছে। গেঞ্জি-টুপি, পোস্টার পেয়েছে। একটু আত্মবিশ্বাস বেড়েছে বটে, তবে কেন্দ্র চালু হওয়ার আগে আগের সব শঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছে না। কারও কারও শঙ্কা আছে আগের মতোই। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট রাশানদের থাকার জায়গা গ্রিন সিটির পাশে ফলের দোকানি মনির বললেন, “বিদ্যুৎ পাব, কিন্তু জীবন কি থাকপিনি কিনা কিডা জানে।” একই সুরে কথা বললেন, পথচারী মোস্তাক, “একনই তো মনে হচ্ছে ডাবগাছ শুকো যাচ্ছে। তয় সবাই কচ্ছে কিচ্ছু হবি নানে। কিন্তু দুদিন আগে চিরোনোবিলি (চেরোনোবিল) দ্যাকলাম সব মইরে ছাই। কী কবো কন?” এসব শোনার পর বলাই যায়, স্থানীয়দের আত্মবিশ্বাস অর্জন এখনো করতে পারে নাই রূপপুর। চোখে পড়ে নাই স্থানীয়দের জন্য তৈরি কোনো অবকাঠামো।
তবে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে রেডিয়েশন ড্যাশবোর্ড লাইভ প্রচারসহ সব উদেোগই দৃশমান হবে। ফুয়েল লোডিংয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কথা হলো প্রকল্পের সাথে জড়িত নানা পর্যায়ের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সাথে।
ছবি: সংগৃহীত
নিরাপত্তা কাঠামো
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, রূপপুরের নিরাপত্তা নকশা তৈরি করা হয়েছে “defense-in-depth” নীতির ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, একটি ব্যর্থ হলে আরেকটি স্তর সক্রিয় হয়ে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে।
রূপপুরের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিতর্কগুলোর একটি হলো এর জনঘনত্ব প্রেক্ষাপট। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী এলাকায় প্রকল্পটি অবস্থিত, যেখানে আশপাশে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামীণ জনপদ রয়েছে।
মূল নিরাপত্তা স্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে–
১. Reactor containment structure: শক্তিশালী ডাবল-ওয়াল কংক্রিট শেল, যা তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়ানো প্রতিরোধ করে
৩. Emergency core cooling system: অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা
৪. Seismic and external hazard protection: ভূমিকম্প, বন্যা ও বিমান দুর্ঘটনা বিবেচনায় ডিজাইন
এই পরমাণু বিজ্ঞানী জানান, “VVER-1200 প্রযুক্তি মূলত Generation III+ রিঅ্যাক্টর, যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা “fail-safe” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে।”
জনঘনত্ব ও ঝুঁকি: নিরাপত্তার ভৌগোলিক প্রশ্ন
রূপপুরের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিতর্কগুলোর একটি হলো এর জনঘনত্ব প্রেক্ষাপট। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী এলাকায় প্রকল্পটি অবস্থিত, যেখানে আশপাশে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামীণ জনপদ রয়েছে। পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সাধারণত বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ৩০-৫০ কিলোমিটার রেডিয়াসের ইমার্জেন্সি প্ল্যানিং জোন (ইপিজেড) বিবেচনা করা হয়। তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, বিশ্বের অধিকাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তুলনামূলক কম জনঘনত্ব বা নিয়ন্ত্রিত নগর বিন্যাসে স্থাপিত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটি আলাদা। কারণ, এখানে জনঘনত্ব বেশি, জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানান্তর (evacuation) ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সীমিত, এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ধাপে ধাপে গড়ে উঠছে।
তবে রূপপুর কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো–আধুনিক VVER-1200 প্রযুক্তি এবং IAEA-অনুমোদিত সেফটি ডিজাইন এই ঝুঁকিকে গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রাখে।
ফুয়েল লোডিংয়ের মুহূর্ত
রিঅ্যাক্টর বিল্ডিংয়ের ভেতরে প্রবেশের আগে নিরাপত্তা প্রোটোকল একাধিক স্তরে পরীক্ষা করা হয়। পরিচয় যাচাই, ডোজিমিটার চেক, ধাতব বস্তু নিয়ন্ত্রণ–সবকিছুই নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে। বাইরে থেকে এটি একটি নির্মাণকেন্দ্র মনে হলেও ভেতরে শৃঙ্খলার মাত্রা প্রায় ল্যাবরেটরি-গ্রেড।
বিশাল কংক্রিট কাঠামোর ভেতরে বাতাসও যেন ভারী। রিঅ্যাক্টর হলের কেন্দ্রে যে স্থানটি ঘিরে আজকের কার্যক্রম, সেখানে উপস্থিত প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের চলাচল সীমিত ও নির্দিষ্ট। প্রতিটি ধাপ পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী চলছে। ফুয়েল অ্যাসেম্বলি ইউনিটগুলো ধীরে ধীরে নির্ধারিত কোর সেকশনের দিকে নেওয়া হচ্ছে। এটি কোনো দৃশ্যমান বিস্ফোরণ বা নাটকীয় পরিবর্তনের মুহূর্ত নয়–বরং নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, ধীর গতি এবং শূন্য ত্রুটির দিকে এগোনো এক প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া।
রাশিয়ান প্রযুক্তিবিদদের তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিটি ফুয়েল রড নির্দিষ্ট বিন্যাসে রিঅ্যাক্টর কোরে স্থাপন করা হচ্ছে–যেখানে সামান্য বিচ্যুতিও গ্রহণযোগ্য নয়।
এই মুহূর্তে প্রকল্পের বাইরে থাকা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, বিতর্ক বা সংখ্যাতত্ত্ব আর প্রাধান্য পায় না। ভেতরের বাস্তবতা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর–একটি নিয়ন্ত্রিত শক্তির সূচনা।
রিঅ্যাক্টর কন্ট্রোল রুমে মনিটরগুলোতে ডেটা প্রবাহ স্বাভাবিক আছে কি না, তা বারবার যাচাই করা হচ্ছে। তাপমাত্রা, নিউট্রন ফ্লাক্স, কুল্যান্ট প্রেসার–সব সূচক নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকতে হবে।
ফুয়েল লোডিংয়ের এই পর্যায়ে এসে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আর ‘নির্মাণাধীন প্রকল্প’ থাকে না। এটি ধীরে ধীরে ‘অপারেশনাল সিস্টেম’-এ রূপ নেয়–যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে গাণিতিক নির্ভুলতা এবং বহুস্তরীয় নিরাপত্তা যাচাই।
তবে নিরাপত্তার কারণেই আমরা কিন্তু রিয়ক্টর বিল্ডিং-এর আশপাশেও ঘেঁষতে পারলাম না আমরা গেলাম সোজা অনুষ্ঠানস্থলে, যেখানে আছেন রোসাটমের ডিজি অ্যালেক্সি লিখাচভ, আছেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা।
নতুন রাজনৈতিক ইতিহাস
পুরো অনুষ্ঠানে সবাই বললেন, রূপপুর বাংলাদেশের এক বিশাল আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানালেন, ১৯৬০-এর দশকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা শুরু হলেও ১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ হয়। ১৯৯৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের, আজ যা বাস্তবে রূপ লাভ করেছে। আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে এ প্রকল্প বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, চলতি বছরের আগস্টে এখান থেকে পাওয়া যাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এক বছরের মধ্যে পাওয়া যাবে প্রথম ইউনিটের ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। বিশেষ সুইচ চেপে শুরু হয় ইউরেনিয়াম লোডিং। অনুষ্ঠান থেকেই প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের পাশে থাকায় রাশিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় বাংলাদেশ। এই মাইলস্টোন অর্জনে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা, আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি।
বালুচর থেকে রিঅ্যাক্টর
স্বাধীনতার আগেই যে প্রকল্প ঘিরে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল বাঙালি বিজ্ঞানীদের মধ্যে, তা শেষ পর্যন্ত সরিয়ে নেওয়া হয় করাচিতে। বাস্তবতা হচ্ছে, তখনকার অধিগ্রহণ করা জমি সযত্নে রেখে দিয়েছিল বাংলাদেশ। সে ইতিহাস লেখা আছে কাগজে, দলিলে। রিপোর্টার হিসেবে শূন্য সে মাঠ আর সেখানে মাথা তুলে দাঁড়ানো দেশের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রকল্প কাভার করার অনুভূতি সত্যিই অনন্য! গত দেড় দশকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রর ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের টাইমলাইন কেমন ছিল? আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিই।
দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগ্রহ ১৯৬০-এর দশক থেকে শুরু হয়। জমি অধিগ্রহণ হয়। কিন্তু, এর বাস্তব অগ্রগতি শুরু হয় ২০০৮ সালে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। অথচ পুরো রাষ্ট্রীয় আয়োজন কিংবা গণমাধ্যমের কোথাও শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগ কথাটা উচ্চরণ হয়নি। কিন্তু প্রকল্প ঘিরে যত অনিশ্চয়তা কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে, তার সবগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে নাম দুটো। যা হোক, তখনকার সরকার একাধিক দেশের সঙ্গে প্রযুক্তি ও অর্থায়ন নিয়ে আলাপ শুরু করে। রাশিয়া (Rosatom) ছাড়াও চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে আলোচনায় ছিল। তাদের নিজস্ব রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি (চীনের Hualong One, কোরিয়ার APR-1400) প্রস্তাবের ওপর প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনাও হয়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ‘turnkey’ মডেল (design–build–finance–fuel–take-back) এবং রাষ্ট্রীয় ঋণের নিশ্চয়তা–এই সমন্বিত প্যাকেজটি রাশিয়াই স্পষ্টভাবে টেবিলে আনে, যা গ্রহণ করে বাংলাদেশ।
২০১১: প্রাথমিক চুক্তি
নভেম্বরে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সহযোগিতার ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সই হয়, যা প্রকল্পটিকে আনুষ্ঠানিক ট্র্যাকে আনে।
২০১৩: আন্তঃসরকার চুক্তি
জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত IGA প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারণ করে। সেই চুক্তিতেই ঠিক হয় রাশিয়ার VVER- ১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে EPC-ধাঁচে বাস্তবায়ন হবে এই দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফুয়েল সাপ্লাই এবং ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেবে রাশিয়া। ঋণ হবে রাষ্ট্র টু রাষ্ট্র। এবং রেগুলেটরি ও প্রশিক্ষণ সহায়তার বিষয়টিও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়।
২০১৫-২০১৬: চুক্তি প্যাকেজ ও নির্মাণ শুরু
ডিটেইলড EPC কন্ট্রাক্ট, ঋণচুক্তি ও সাইট প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়; ২০১৬ সালে মূল নির্মাণ কার্যক্রম শুরু।
২০১৭: ফার্স্ট কংক্রিট–দৃশ্যমান রূপের সূচনা
৩০ নভেম্বর ২০১৭–ইউনিট-১-এর ‘first concrete’ ঢালার মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তব অবকাঠামোয় প্রবেশ করে। ওই অনুষ্ঠানে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করতে চাই।” অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগ দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মন্তব্য করেন, “রূপপুর প্রকল্প রাশিয়া ও বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।”
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে প্রথম দফায় পারমাণবিক জ্বালানি দেশে পৌঁছায়–অপারেশনাল প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
২৮ এপ্রিল ২০২৬; বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে লোড করা হলো ফুয়েল। এর মাধ্যমে কার্যকর অপারেশনের দিকে যাত্রা করল রূপপুর। রূপপুর থেকেই যাত্রা হলো আত্মবিশ্বাসী এক বাংলাদেশের।