ads

বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি: ঢাকার জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা

বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি: ঢাকার জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে স্বাক্ষরিত ‘ইউএস–বাংলাদেশ অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) একদিকে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার আরও সুসংগঠিত করেছে। তবে অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে দেশের কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার পরিসরকে উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করেছে।

একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল অনুসরণ করে এসেছে। কিন্তু এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত নন-মার্কেট অর্থনীতি, নিষেধাজ্ঞা এবং জ্বালানি ক্রয়–সংক্রান্ত শর্তগুলো সেই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে জোরদার করার বদলে বরং আরও সীমিত করে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিতর্ক এখন আর কেবল বাণিজ্য নীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমেই একটি ছোট রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পরীক্ষায় রূপ নিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আর শুধু রপ্তানি আয় বাড়বে কি না—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই। চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক, ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্তগুলো অভ্যন্তরীণ বৈধতা বজায় রেখেই বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতাকে কতটা সীমিত করছে সেটিই এখন মূল আলোচ্য হয়ে উঠেছে।

এদিকে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ এবং বাম ঘরানার বিভিন্ন গোষ্ঠীসহ কড়া সমালোচকরা এআরটি চুক্তিটিকে কাঠামোগতভাবে অসম একটি দলিল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি কার্যত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে সীমিত করছে। অনেকেই চুক্তিটিকে একতরফা ও চরম বৈষম্যমূলক বলেও অভিহিত করছেন, যা দেশের নীতিগত স্বাধীনতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।

রাশিয়া থেকে জ্বালানি ক্রয়ের সুবিধার্থে সরকার আমেরিকার অনুমতি চেয়েছে এমন খবরের পর বিষয়টি আরও বেশি রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। অনেকে একে বাস্তবসম্মত কূটনীতি হিসেবে না দেখে বরং নীতিগত নির্ভরশীলতা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাসের প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

ফলে এই চুক্তি বাস্তবায়ন এবং এর সাথে সমন্বয় করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারকে একদিকে বিতর্কিত ধারাগুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দেখাতে হচ্ছে, অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও তাদের আশ্বস্ত করার কাজও করতে হচ্ছে।

বিএনপি সরকার বর্তমানে চুক্তির ধারা বেছে বেছে বাস্তবায়ন, বিদেশি জোটে নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং সতর্কতামূলক অভ্যন্তরীণ বার্তার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, প্রবল বাহ্যিক চাপ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো তার নিজস্ব কর্তৃত্বের একটি পর্যায় ধরে রেখেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

বিএনপির নির্বাচনী জয়ের পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি অভিনন্দন বার্তা পাঠান। তার সেই চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশাগুলো স্পষ্ট ছিল। ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী রহমানকে এআরটি চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো চূড়ান্ত করতে নির্ণায়ক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

গত ৩-৫ মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. পল কাপুর ঢাকা সফর করেন। তার আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অভিন্ন স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাপুর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে পূর্বশর্ত হিসেবে বাণিজ্য চুক্তির শর্তাবলি কঠোরভাবে মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

এছাড়া তিনি বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো—যেমন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমন্বয় এবং অবৈধ অভিবাসন ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

সার্বিকভাবে, ওয়াশিংটন এই বাণিজ্য চুক্তিকে শুধু ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর কৌশলগত ও নীতিগত সমন্বয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট প্রত্যাশা হলো, এই চুক্তির ফলে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ইস্যুসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।

এআরটি-কে শুল্ক হ্রাস এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের চুক্তি হিসেবে প্রচার করা হলেও, এর ভেতরের ধারাগুলো ভূ-রাজনৈতিক। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্য রক্ষার কৌশলের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথমত, এই চুক্তিতে এমন একটি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশকে কোনো নন-মার্কেট অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক চুক্তি করতে বাধা দেয়। যদি বাংলাদেশ এমন কোনো চুক্তি করে, তবে তার রপ্তানির ওপর ৩৭ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীন এবং রাশিয়া উভয়কেই নন-মার্কেট অর্থনীতি হিসেবে গণ্য করে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়। এই নীতি বাংলাদেশকে একাধিক পরাশক্তির সাথে নমনীয়ভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। বেইজিং বা মস্কোর সাথে সম্ভাব্য জোট গঠন ঠেকাতে এআরটির শাস্তিমূলক শুল্ক বাংলাদেশের সেই ভারসাম্য রক্ষার কৌশলের ওপর একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।

দ্বিতীয়ত, ‘এআরটি’র ৪.১ ও ৪.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশকে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। কৌশলগত পণ্যের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে মার্কিন মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে এবং এমন কোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে চলতে হবে, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে ক্ষুণ্ণ বা দুর্বল করতে পারে।

এর মানে দাঁড়াচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল তৃতীয় কোনো দেশের প্রশ্নেও ঢাকাকে ওয়াশিংটনের অবস্থানের সাথে মিল রেখে চলতে হতে পারে। যার মধ্যে রাশিয়া-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা বা চীনকেন্দ্রিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণও রয়েছে। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি নিরপেক্ষ বা মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ছোট একটি দেশের জন্য, প্রচলিত শুল্কনির্ভর চুক্তির তুলনায় এ ধরনের বাণিজ্য চুক্তির ভেতরে থাকা নিয়ন্ত্রণমূলক ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট শর্তগুলো নীতিগত স্বাধীনতাকে আরও বেশি সীমিত করতে পারে।

তৃতীয়ত, এআরটি চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি, বেসামরিক উড়োজাহাজ কেনা এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ বাড়ানোর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর ফলে জ্বালানি ও নিরাপত্তা খাতে ঢাকার ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। একদিকে এতে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ও আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে নমনীয়তা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি, চুক্তিটি বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করেছে। যেখানে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের অন্তর্ভুক্তি প্রায় নিশ্চিত।

এতদিন বাংলাদেশ রাশিয়ার সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এবং চীনের অর্থায়নে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বহুমুখী বৈদেশিক অংশীদারত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এআরটি চুক্তি তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু সহযোগিতার সুযোগ সীমিত বা বাধাগ্রস্ত করবে। এটি বাস্তবে অন্য শক্তিগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককেই অগ্রাধিকার দেবে।

সব মিলিয়ে, এই বিধানগুলো বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এবং বৃহত্তর চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সমীকরণে তার ভারসাম্যপূর্ণ ও নমনীয় অবস্থান থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক এক ধরনের অসম মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই চুক্তিকে চূড়ান্ত বাস্তবতা হিসেবে নিঃশর্তে মেনে নিচ্ছে না। বরং সরকারের প্রতিক্রিয়ায় একটি ছোট রাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলগত সক্ষমতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সময়ক্ষেপণ, শর্তারোপ, পর্যালোচনা এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের মতো কৌশল ব্যবহার করে ঢাকা একদিকে দরকষাকষির ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে মার্কিন শর্তগুলোর সম্ভাব্য সংকোচনমূলক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে।

কূটনৈতিক বার্তা ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ‘এআরটি’কে স্থায়ী বা জোটসদৃশ প্রতিশ্রুতি হিসেবে না দেখে একটি শর্তাধীন ও পরিবর্তনযোগ্য কাঠামো হিসেবে তুলে ধরছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী উভয় পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, চুক্তিতে প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং সরকার চাইলে যেকোনো সময় এটি পর্যালোচনা করতে পারবে। এই উপস্থাপনার পেছনে দ্বৈত উদ্দেশ্য কাজ করছে। একদিকে ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করা যে চুক্তি প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে না, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে এই বার্তা দেওয়া যে সব শর্ত বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া হয়নি।

জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দলটি জানিয়েছে, তারা চুক্তিটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করবে। এরপর ইতিবাচক অংশ রাখবে এবং বাকি অংশ বাদ দেবে। এতে সরকারের জন্য একটি রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা প্রয়োজনে পুনরায় আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। এটিকে ছোট রাষ্ট্রের কৌশলগত ভেতর থেকে দরকষাকষির একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। যেখানে সরকার অর্থনৈতিক সুবিধা ধরে রাখার ইঙ্গিত দেয়, আবার অভ্যন্তরীণ চাপের যুক্তি তুলে ধরে ভূরাজনৈতিক শর্তগুলোর ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নেয়।

সরকারের প্রকাশ্য বক্তব্যেও এই ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা স্পষ্ট। তারা জোর দিয়ে বলছে, চুক্তি বাস্তবায়ন হবে পূর্বপরামর্শ, আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা, জাতীয় স্বার্থ এবং সংসদীয় প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। এর মাধ্যমে এআরটি-কে বাইরের চাপ হিসেবে নয়, বরং অভ্যন্তরীণভাবে অনুমোদিত একটি নীতিগত কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে সুশীল সমাজ ও নীতিনির্ধারকরাও এই পর্যালোচনার দাবিকে জোরালো করেছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) চুক্তিটিকে চরম বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ, সংসদীয় তদন্ত এবং প্রয়োজনে চুক্তি বাতিলের দাবিও তুলেছে। এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকার মূলত এই বার্তাই দিতে চাইছে বাংলাদেশ তার নীতিগত স্বায়ত্তশাসন ছাড়ছে না, বরং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশ চীন, ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে অবকাঠামো, জ্বালানি ও সংযোগ প্রকল্পে সম্পৃক্ততা বজায় রেখেছে। বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় প্রকল্পগুলোতে অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় উপস্থিতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ জোরদার করার উদ্যোগও চলমান।

সব মিলিয়ে, এই প্রবণতাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশ তার ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল ত্যাগ করতে রাজি নয়। বরং এটি সফট হেজিং বা নমনীয় ভারসাম্য রক্ষার পথেই এগোচ্ছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্দিষ্ট অঙ্গীকার বজায় রেখেও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক, সহযোগিতা ও নির্ভরতার বিকল্প পথ খোলা রাখা হয়। এআরটি চুক্তি ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকে থাকলেও, মূল লক্ষ্য হচ্ছে কোনো একক শক্তির বলয়ে পুরোপুরি আবদ্ধ না হওয়া।

এআরটি চুক্তির ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কিছুটা সংকুচিত হলেও তা একেবারে হারিয়ে যায়নি; বরং দেশটির হাতে এখনো কিছু কার্যকর কৌশলগত সুযোগ রয়ে গেছে, যা মূলত তিনটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত।

প্রথমত, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং সময়ক্ষেপণ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে কাজ করছে। দ্রুত রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থনে না গিয়ে এবং সংসদীয় যাচাই-বাছাই ও নিয়মতান্ত্রিক পর্যালোচনার ওপর জোর দিয়ে ঢাকা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য বাড়তি সময় পাচ্ছে। পরাশক্তির চাপের মুখে থাকা একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য এই ‘সময়’ নিজেই এক ধরনের কৌশলগত সম্পদ।

দ্বিতীয়ত, বেছে বেছে বাস্তবায়নের পথ রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করছে। বাংলাদেশ সম্ভবত সেইসব ধারা আগে বাস্তবায়ন করবে যেগুলো অভ্যন্তরীণভাবে কম সংবেদনশীল। যেমন তৈরি পোশাক খাতের সম্ভাব্য শুল্ক সুবিধা। অন্যদিকে, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো তুলনামূলক কঠোর ও হস্তক্ষেপমূলক শর্তগুলোকে সীমিত করা, পুনর্ব্যাখ্যা করা বা সংশোধনের চেষ্টা করা হতে পারে।  এটি অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং সার্বভৌমত্বের ওপর চাপ কমানো—দুই দিকই সামাল দেওয়ার চেষ্টা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফাইল ছবি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফাইল ছবি

তৃতীয়ত, ন্যারেটিভ ব্যবস্থাপনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকার ‘এআরটি’কে একটি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা অর্থনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরে একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতাও ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এই উপস্থাপনা সরকারকে এমন যুক্তি দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে যে, তারা আত্মসমর্পণ করছে না—বরং সীমিত পরিসরে হলেও ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এআরটি আসলে একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্য নীতিটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই সময়ে কতটা টিকে থাকতে পারে, তা এখানে স্পষ্ট হবে। চুক্তিটি বাস্তবে দেশটিকে ওয়াশিংটনের দিকে কিছুটা ঝুঁকিয়ে দিলেও, রাজনৈতিক দলগুলো, বিরোধী শক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া দেখায় যে বাংলাদেশ এখনো নিজের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। শর্তারোপ, পর্যালোচনা এবং অভ্যন্তরীণ দরকষাকষির মাধ্যমে চুক্তিটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার এই প্রচেষ্টা ইঙ্গিত দেয়—ঢাকা এখনো কোনো একক পরাশক্তির প্রভাব বলয়ে পুরোপুরি ঢুকে পড়তে চায় না, বরং একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবেই নিজের অবস্থান বজায় রাখতে চায়।

*নিবন্ধটি দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনূদিত*

লেখক: চীনের শানডং বিশ্ববিদ্যালয়ের চিংদাও ক্যাম্পাসের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও জনপ্রশাসন অনুষদের একজন ডক্টরাল ক্যান্ডিডেট

সম্পর্কিত