সোহরাব হাসান

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অবস্থা হলো তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওপরে ওঠার মতো। তিন হাত ওপরে ওঠার পর ছয় হাত নিচে নেমে যাওয়া। ৩ মে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবসকে সামনে রেখে রিপোর্টার্স সান ফ্রন্টিয়ার্সের (আরএসএফ) বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের সূচকে দেখা যায়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে আরও তিন ধাপ নিচে নেমে গেছে। ১৮০টি দেশের মধ্যে এবারে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২। গত বছর ছিল ১৪৯। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে গণমাধ্যম নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অবস্থাটা আরও সঙ্গীন।
আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যার বাংলাদেশে ২০ শতাংশেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। এদের কাছে মূলধারার গণমাধ্যমের অভিগম্যতা কম। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৩০ জনেরও বেশি সাংবাদিক মামলার শিকার হয়েছেন।
এদিকে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এক চিঠিতে বাংলাদেশে কারাবন্দী চার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মুক্তি ও তাদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালেও সরকারের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে চিঠি লেখা চিঠিতে সংগঠনটি কারাবন্দী সাংবাদিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে। এই সাংবাদিকেরা হলেন-ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টিভির প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল হোসেন বাবু, বার্তা সম্পাদক শাকিল আহমেদ ও বিশেষ প্রতিবেদক ফারজানা রূপা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হওয়া এই সাংবাদিকেরা গত ১৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন।
সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, এই চার সাংবাদিক খুনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও সিপিজের নথিপত্র, স্বজনদের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা বলছে, তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি এবং কোনো অভিযোগপত্রও (চার্জশিট) দেওয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করার পক্ষে নানা যুক্তি দেখানো হয়েছে। তাদের দাবি, সরকার মামলা করেনি। মামলা করেছেন ভুক্তভোগীরা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে যাদের বাদী হিসেবে দেখানো হয়েছে, তারা বলেছেন, আসামিদের চেনেন না। আর আসামিদের যদি বাদি না চেনেন তাহলে মামলা দিলেন কীভাবে। এসব মামলা নিয়ে বড় ধরনের বাণিজ্য হওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।
কেবল সাংবাদিক নন, প্রায় সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা হয়েছে। ২৭ এপ্রিল ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রায় দুই বছর পার হলেও দায়ের করা হত্যা, হত্যা চেষ্টা ও অন্যান্য অপরাধের মামলার ৯০ শতাংশেরও বেশি তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল; যার মধ্যে ৭৯৯টিই ছিল হত্যা মামলা। বাকি ১ হাজার ৫৬টি হত্যা চেষ্টা বা অন্যান্য অপরাধের কারণে দায়ের করা। পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, ১৭৬টি মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে, যা মোট মামলার ৯.৫ শতাংশ। ঢাকায় ৯০৫টি মামলার মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ৪৩টি মামলার, যা শতকরা হিসাবে মাত্র ৪.৭৫ ভাগ।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, একেকটি মামলায় অসংখ্য আসামি থাকায় তদন্ত কাজ শেষ করা যায়নি। তাহলে প্রশ্ন আসে অসংখ্য মানুষ মিলে কি একজন মানুষকে খুন করেছেন? ঢাকার যে ৪৩টি মামলার তদন্ত কাজ শেষ হয়েছে, তার মধ্যে ১৪টিতে অভিযোগপত্র দায়ের করা হয়েছে। আর ১৯টিতে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ তদন্তাধীন মামলার আসামিদের বড় অংশ নির্দোষ। অথচ তাদের কারাগারে কাটাতে হয়েছে তদন্ত কাজ শেষ না হওয়ার কারণে।
যে কোনো মামলার বিশ্বাসযোগ্য ও যৌক্তিক সময়ে তদন্ত কাজ শেষ করতে হয়। কারণ, দীর্ঘসূত্রিতায় নির্দোষ মানুষগুলোই শুধু নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন না; বিচার ব্যবস্থার ওপরও মানুষ আস্থা হারায়।
উদ্বেগের বিষয় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে যেসব হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়েছে, বেশির ভাগই রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক। আদালতের নথিপত্রে দেখা যায়, ঢাকা শহরে বিভিন্ন থানায় ২৪টি মামলায় ৭৭ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যা চেষ্টা ও অবৈধ সমাবেশ করার কথা বলা হয়েছে। একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়িতে সংঘটিত হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সাংবাদিক ডেইলি স্টারকে বলেছেন, আমি এই ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনা জানতে পেরেছেন। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে তাকে এই মামলার ভোগান্তি বইতে হচ্ছে। তার পেশাগত জীবনও হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত।
শরীয়তপুরে কর্মরত কাজী নুরুল ইসলাম নামে আরেক সাংবাদিককে নিউ মার্কেট এলাকার এক হত্যা চেষ্টা মামলায় আসামি করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি শরীয়তপুরের বাসায় অবস্থান করলেও তাকে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট সংঘটিত ঘটনায় আসামি করা হয়।
ঢালাও মামলা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাপক সমালোচনা হলে নীতিনির্ধারকেরা ভুয়া মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ভুয়া মামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কোনো মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। ভুয়া মামলা দায়ের করার কারণে কাউকে শাস্তিও দেওয়া হয়নি।
জামিনের ক্ষেত্রেও নানা বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তার করে তার নামে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। তিনি আইনের চোখে অপরাধ করলে, সংবিধান লঙ্ঘন করলে সরকার সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করতে পারত। কিন্তু একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে হত্যা বা হত্যা চেষ্টা মামলা কি আইনের শাসনের পরিপন্থী নয়?

সাবেক প্রধান বিচারপদতির ক্ষেত্রেও দেখলাম একটি মামলায় জামিন পান তো আরেক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একই ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ক্ষেত্রেও। সর্বশেষ উচ্চ আদালত তাকে দুটি মামলায় জামিন দিয়েছেন। এখন থানা পুলিশ নতুন কোনো মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখায় কিনা সেটাই প্রশ্ন। জামিন ও বিচারের নামে এই বিড়াল ইঁদুর খেলা বন্ধ না হলে আইনের শাসন যেমন প্রতিষ্ঠিত হবে না, তেমনি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়া দুঃসাধ্য হবে।
এবার যখন মুক্তি সাংবাদিকতা দিবস পালিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীনতা ভোগ করছে? অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্য মামলা দেওয়া হয়েছে। অনেক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান চললেও কর্মীরা নিয়মিত বেতনভাতা পাচ্ছেন না।
এবারে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যমের প্রতিপাদ্য বিষয়– ‘শান্তিময় ভবিষ্যত গড়ার জন্য গণমাধ্যম: পরিবেশগত সংকটের মুখে সাংবাদিকতা।’ সাংবাদিকেরা শান্তিময় ভবিষ্যত গড়বেন কীভাবে, তাদের নিজেদের ভবিষ্যতই যেখানে অন্ধকার। পরিবেশগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। মুক্ত সাংবাদিকতার বাধাগুলো তুলে নেওয়া দরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস মন খুলে সাংবাদিকদের লিখতে বলেছিলেন। কাউকে বাধা দেওয়া হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু মন খুলে লেখা ও বলার কারণে তার আমলে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার সময়েই সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি মব হয়েছে। পত্রিকা অফিস, সংগীত প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
৩ মে যখন মুক্তগণমাধ্যম দিবসটি উদযাপিত হবে, তখন দেশের জনপ্রিয় ও পুরোনো পত্রিকা জনকণ্ঠ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ আছে আরও কিছু প্রতিষ্ঠান। এসব পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে মুক্ত সাংবাদিকতা হতে পারে না।
অতএব, সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতাদের কাছে আহ্বান থাকবে, তারা যেন পত্রিকাটি নতুন করে চালু করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মালিকপক্ষ যতই ক্ষমতাবান হোন দেশের প্রচলিত আইন কানুন উপেক্ষা করে, সাংবাদিক-কর্মীদের বেতন ভাতা পরিশোধ না করে পত্রিকা বন্ধ করতে পারেন না।
লেখক: সম্পাদক, চরচা

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অবস্থা হলো তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওপরে ওঠার মতো। তিন হাত ওপরে ওঠার পর ছয় হাত নিচে নেমে যাওয়া। ৩ মে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবসকে সামনে রেখে রিপোর্টার্স সান ফ্রন্টিয়ার্সের (আরএসএফ) বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের সূচকে দেখা যায়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে আরও তিন ধাপ নিচে নেমে গেছে। ১৮০টি দেশের মধ্যে এবারে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২। গত বছর ছিল ১৪৯। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে গণমাধ্যম নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অবস্থাটা আরও সঙ্গীন।
আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যার বাংলাদেশে ২০ শতাংশেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। এদের কাছে মূলধারার গণমাধ্যমের অভিগম্যতা কম। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৩০ জনেরও বেশি সাংবাদিক মামলার শিকার হয়েছেন।
এদিকে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এক চিঠিতে বাংলাদেশে কারাবন্দী চার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মুক্তি ও তাদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালেও সরকারের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে চিঠি লেখা চিঠিতে সংগঠনটি কারাবন্দী সাংবাদিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে। এই সাংবাদিকেরা হলেন-ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টিভির প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল হোসেন বাবু, বার্তা সম্পাদক শাকিল আহমেদ ও বিশেষ প্রতিবেদক ফারজানা রূপা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হওয়া এই সাংবাদিকেরা গত ১৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন।
সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, এই চার সাংবাদিক খুনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও সিপিজের নথিপত্র, স্বজনদের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা বলছে, তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি এবং কোনো অভিযোগপত্রও (চার্জশিট) দেওয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করার পক্ষে নানা যুক্তি দেখানো হয়েছে। তাদের দাবি, সরকার মামলা করেনি। মামলা করেছেন ভুক্তভোগীরা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে যাদের বাদী হিসেবে দেখানো হয়েছে, তারা বলেছেন, আসামিদের চেনেন না। আর আসামিদের যদি বাদি না চেনেন তাহলে মামলা দিলেন কীভাবে। এসব মামলা নিয়ে বড় ধরনের বাণিজ্য হওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।
কেবল সাংবাদিক নন, প্রায় সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা হয়েছে। ২৭ এপ্রিল ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রায় দুই বছর পার হলেও দায়ের করা হত্যা, হত্যা চেষ্টা ও অন্যান্য অপরাধের মামলার ৯০ শতাংশেরও বেশি তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল; যার মধ্যে ৭৯৯টিই ছিল হত্যা মামলা। বাকি ১ হাজার ৫৬টি হত্যা চেষ্টা বা অন্যান্য অপরাধের কারণে দায়ের করা। পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, ১৭৬টি মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে, যা মোট মামলার ৯.৫ শতাংশ। ঢাকায় ৯০৫টি মামলার মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ৪৩টি মামলার, যা শতকরা হিসাবে মাত্র ৪.৭৫ ভাগ।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, একেকটি মামলায় অসংখ্য আসামি থাকায় তদন্ত কাজ শেষ করা যায়নি। তাহলে প্রশ্ন আসে অসংখ্য মানুষ মিলে কি একজন মানুষকে খুন করেছেন? ঢাকার যে ৪৩টি মামলার তদন্ত কাজ শেষ হয়েছে, তার মধ্যে ১৪টিতে অভিযোগপত্র দায়ের করা হয়েছে। আর ১৯টিতে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ তদন্তাধীন মামলার আসামিদের বড় অংশ নির্দোষ। অথচ তাদের কারাগারে কাটাতে হয়েছে তদন্ত কাজ শেষ না হওয়ার কারণে।
যে কোনো মামলার বিশ্বাসযোগ্য ও যৌক্তিক সময়ে তদন্ত কাজ শেষ করতে হয়। কারণ, দীর্ঘসূত্রিতায় নির্দোষ মানুষগুলোই শুধু নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন না; বিচার ব্যবস্থার ওপরও মানুষ আস্থা হারায়।
উদ্বেগের বিষয় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে যেসব হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়েছে, বেশির ভাগই রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক। আদালতের নথিপত্রে দেখা যায়, ঢাকা শহরে বিভিন্ন থানায় ২৪টি মামলায় ৭৭ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যা চেষ্টা ও অবৈধ সমাবেশ করার কথা বলা হয়েছে। একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়িতে সংঘটিত হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সাংবাদিক ডেইলি স্টারকে বলেছেন, আমি এই ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনা জানতে পেরেছেন। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে তাকে এই মামলার ভোগান্তি বইতে হচ্ছে। তার পেশাগত জীবনও হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত।
শরীয়তপুরে কর্মরত কাজী নুরুল ইসলাম নামে আরেক সাংবাদিককে নিউ মার্কেট এলাকার এক হত্যা চেষ্টা মামলায় আসামি করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি শরীয়তপুরের বাসায় অবস্থান করলেও তাকে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট সংঘটিত ঘটনায় আসামি করা হয়।
ঢালাও মামলা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাপক সমালোচনা হলে নীতিনির্ধারকেরা ভুয়া মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ভুয়া মামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কোনো মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। ভুয়া মামলা দায়ের করার কারণে কাউকে শাস্তিও দেওয়া হয়নি।
জামিনের ক্ষেত্রেও নানা বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তার করে তার নামে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। তিনি আইনের চোখে অপরাধ করলে, সংবিধান লঙ্ঘন করলে সরকার সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করতে পারত। কিন্তু একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে হত্যা বা হত্যা চেষ্টা মামলা কি আইনের শাসনের পরিপন্থী নয়?

সাবেক প্রধান বিচারপদতির ক্ষেত্রেও দেখলাম একটি মামলায় জামিন পান তো আরেক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একই ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ক্ষেত্রেও। সর্বশেষ উচ্চ আদালত তাকে দুটি মামলায় জামিন দিয়েছেন। এখন থানা পুলিশ নতুন কোনো মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখায় কিনা সেটাই প্রশ্ন। জামিন ও বিচারের নামে এই বিড়াল ইঁদুর খেলা বন্ধ না হলে আইনের শাসন যেমন প্রতিষ্ঠিত হবে না, তেমনি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়া দুঃসাধ্য হবে।
এবার যখন মুক্তি সাংবাদিকতা দিবস পালিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীনতা ভোগ করছে? অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্য মামলা দেওয়া হয়েছে। অনেক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান চললেও কর্মীরা নিয়মিত বেতনভাতা পাচ্ছেন না।
এবারে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যমের প্রতিপাদ্য বিষয়– ‘শান্তিময় ভবিষ্যত গড়ার জন্য গণমাধ্যম: পরিবেশগত সংকটের মুখে সাংবাদিকতা।’ সাংবাদিকেরা শান্তিময় ভবিষ্যত গড়বেন কীভাবে, তাদের নিজেদের ভবিষ্যতই যেখানে অন্ধকার। পরিবেশগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। মুক্ত সাংবাদিকতার বাধাগুলো তুলে নেওয়া দরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস মন খুলে সাংবাদিকদের লিখতে বলেছিলেন। কাউকে বাধা দেওয়া হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু মন খুলে লেখা ও বলার কারণে তার আমলে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার সময়েই সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি মব হয়েছে। পত্রিকা অফিস, সংগীত প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
৩ মে যখন মুক্তগণমাধ্যম দিবসটি উদযাপিত হবে, তখন দেশের জনপ্রিয় ও পুরোনো পত্রিকা জনকণ্ঠ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ আছে আরও কিছু প্রতিষ্ঠান। এসব পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে মুক্ত সাংবাদিকতা হতে পারে না।
অতএব, সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতাদের কাছে আহ্বান থাকবে, তারা যেন পত্রিকাটি নতুন করে চালু করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মালিকপক্ষ যতই ক্ষমতাবান হোন দেশের প্রচলিত আইন কানুন উপেক্ষা করে, সাংবাদিক-কর্মীদের বেতন ভাতা পরিশোধ না করে পত্রিকা বন্ধ করতে পারেন না।
লেখক: সম্পাদক, চরচা

গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে স্বাক্ষরিত ‘ইউএস–বাংলাদেশ অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) একদিকে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার আরও সুসংগঠিত করেছে। তবে অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে দেশের কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার পরিসরকে

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অবস্থা হলো তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওপরে ওঠার মতো। তিন হাত ওপরে ওঠার পর ছয় হাত নিচে নেমে যাওয়া। ৩ মে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবসকে সামনে রেখে রিপোর্টার্স সান ফ্রন্টিয়ার্সের (আরএসএফ) বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের সূচকে দেখা যায়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে আরও তিন ধাপ ন