অর্ণব সান্যাল

দুই বছর আগেও বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় উগান্ডা নামটি বেশ আলোচিত ছিল। এ দেশের অনেক মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিশেষত ফেসবুকে, উগান্ডা নিয়ে ঢের আলোচনা করত। তারা উগান্ডার নাম নিয়ে মূলত বাংলাদেশের সরকারি নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করত। উগান্ডায় এই হচ্ছে, উগান্ডায় সেই হচ্ছে–আরও কত কী!
মূলত দেশে সাইবার স্পেস নিয়ে যে ধরনের নিবর্তনমূলক আইন চালু ছিল এবং নানা সময় ফেসবুক স্ট্যাটাসকেন্দ্রিক যেসব মামলাভিত্তিক হয়রানি চালু ছিল, সেই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের নাম সোশ্যাল মিডিয়ায় হয়ে গিয়েছিল উগান্ডা। দেশের বিভিন্ন ঘটনাই এই নামে কিছুটা হাস্যরসাত্মক রূপ নিয়েছিল। সেই সাথে আবার দুই দেশেই ছিল প্রবল পরাক্রমশালী সরকার, যাকে আন্তর্জাতিকভাবেই স্বৈরাচারী বৈশিষ্ট্যের তকমা দেওয়া হতো। উগান্ডায় অবশ্য সেই সরকার এখনও টিকে আছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সেটির পতন হয়েছে।
পূর্ব আফ্রিকার একটি ভূমিবেষ্টিত দেশ উগান্ডা। ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল উগান্ডা। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল এই দেশটিকে অভিহিত করেছিলেন ‘দ্য পার্ল অব আফ্রিকা’ নামে। আফ্রিকার অন্যান্য ব্রিটিশ উপনিবেশের মতো ১৯৬০-এর দশকে দেশটি ধীরে ধীরে স্বাধীনতার স্বাদ পায়। কুখ্যাত স্বৈরশাসক ইদি আমিনের দেশ হিসেবেও উগান্ডা পরিচিতি পেয়েছিল একসময়। সেসব অবশ্য বেশ আগের কথা। মবের দেশ বা মবের মারে মানুষের মরে যাওয়ার দেশ হিসেবেও উগান্ডার কুখ্যাতি আছে।
উগান্ডা তাহলে এগিয়ে থাকছে কীভাবে? ২০২৬ সালের সূচক দেখলেই সে বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ করা যায় বটে। পলিটিক্যাল ও ইকনোমিক ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের স্কোর ৩০-এর একটু বেশি। লিগ্যাল ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের স্কোর ৩৪.৩৮, সোশ্যালে ৩৭.৬০ এবং সিকিউরিটি ইন্ডিকেটরে ৩০.৫১
বাংলাদেশও একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। পাকিস্তানের অধীনেও ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। আর ঠিক সেই বছরই উগান্ডায় কুখ্যাত ইদি আমিন শাসনক্ষমতায় আসেন। ১৯৭৯ সালে ইদি আমিনের ক্ষমতাচ্যুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ইওয়েরি মুসেভেনি। ১৯৮৬ সালে তিনিই উগান্ডার প্রেসিডেন্ট হন। সেই থেকে গত ৪ দশক ধরে মুসেভেনিই উগান্ডা শাসন করছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে আবারও বিজয়ী হয়ে নিজের ক্ষমতার মেয়াদ আরও দীর্ঘায়িত করেছেন মুসেভেনি। নির্বাচনের মান নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বেশ সমালোচনাও আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিজয় উল্লাসের নয়, বরং রাজপথে রক্তপাত, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং বিরোধী শিবিরের ওপর নজিরবিহীন দমন-পীড়নের এক ধূসর আখ্যান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, দেশটির অর্ধেক ভোটারই ভোট দেয়নি।
তো, সেই তুলনায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতায় থাকার ইতিহাস বেশি সমৃদ্ধ। উন্নয়নের খেরো খাতাতেও বাংলাদেশ নিশ্চয়ই এগিয়েই থাকবে। কিন্তু, খুবই অদ্ভুতভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় এগিয়ে আছে উগান্ডা! সেই উগান্ডা, যেটি হয়ে যাওয়ার জুজু বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুল আলোচিত, সমালোচিত। অথচ, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতে যে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রকার অন্যতম সূচক, তাতেই কিনা এগিয়ে উগান্ডা! কিন্তু কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে চলুন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও উগান্ডার অবস্থান সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। সম্প্রতি সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স (আরএসএফ) কিছু তথ্য জানিয়েছে। আরএসএফ প্রতি বছর বিশ্বের ১৮০টি দেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার চিত্র নিয়ে একটি সূচক প্রকাশ করে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিস্থিতিকে ‘খুবই উদ্বেগজনক’ থেকে শুরু করে ‘ভালো’–এমন মোট পাঁচটি স্তরে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।
আরএসএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিশ্ব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, স্কোর ৩৩.০৫। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৯তম। অর্থাৎ, এক বছরে সূচকে আরও তিন ধাপ অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের।
মোদ্দা কথা এই যে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে, এতটাই যে অর্থনীতির দিক থেকে ৮ বা ৯ গুণ ছোট দেশও আমাদের তুলনায় ভালোভাবে এগিয়ে আছে। সেই দেশটির নাম নিয়ে আমরা বাংলাদেশিরা আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ হাস্যরসও করে থাকি
এই একই প্রতিবেদনে এ বছর উগান্ডার অবস্থান ১৩১তম, স্কোর ৪১.৯৮। কী, অবাক লাগছে শুনতে? যদি অবাক হয়ে থাকেন, তবে বলতেই হয়, অবাক হওয়ার আরও বাকি আছে। আফ্রিকার দেশগুলো গড়ে যে ধরনের সমস্যায় জর্জরিত থাকে, তার সবই উগান্ডায় আছে। বাড়তি হিসেবে আছে একসময়ের ‘ত্রাতা’ রাষ্ট্রনায়কের স্বৈরাচার হয়ে ওঠার যন্ত্রণা। চার দশক ধরে নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে উগান্ডার অন্যান্য খাতের মতো সংবাদমাধ্যমেও বেশ কড়াকড়ি আছে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তেমন কিছু বলাও যায় না। নিবর্তনমূলক আইন আছে। আছে ক্ষমতার হুমকি। সমালোচনাও করতে হয় মেপে মেপে।
অথচ, তারপরও উগান্ডা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। গত ৫ বছরের হিসাব দেখা যাক। আরএসএফ-এর সূচক অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে উগান্ডা ছিল ১৪৩তম। বাংলাদেশ ছিল ১৪৯তম। ২০২৪ সালের সূচকে উগান্ডা ছিল ১২৮তম স্থানে, বাংলাদেশ ছিল ১৬৫তম। ২০২৩ সালের সূচকে উগান্ডা ছিল ১৩৩তম, বাংলাদেশ ছিল ১৬৩তম। ২০২২ সালের সূচকে উগান্ডা ছিল ১৩২তম স্থানে, বাংলাদেশ ছিল ১৬২তম। আর করোনাভাইরাস মহামারির পরের বছর, অর্থাৎ ২০২১ সালের সূচকে বাংলাদেশ ছিল ১৫২তম। বিপরীতে উগান্ডা ছিল ১২৫তম স্থানে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। দুনিয়ায় মহামারি থাকুক, আর না থাকুক, যুদ্ধ চলুক বা না চলুক–সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশ বরাবরই পিছিয়ে, এগিয়ে উগান্ডা। পার্থক্যও বেশ। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে উগান্ডা ও বাংলাদেশের মধ্যকার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বছরে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, ওদিকে উগান্ডার অর্থনীতির আকার ৬০ বিলিয়ন ডলারও হয় না টেনেটুনে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় এগিয়েই থাকছে উগান্ডা। আরও অন্যান্য বিষয় টানলেও হয়তো বাংলাদেশ এগিয়েই থাকবে। অথচ সুনির্দিষ্ট একটি বিষয়ে ফেল! আবার ওই বিষয়টিই নির্ধারণ করে একটি দেশের উদার ও মতের হিসাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ হওয়া।
উগান্ডা তাহলে এগিয়ে থাকছে কীভাবে? ২০২৬ সালের সূচক দেখলেই সে বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ করা যায় বটে। পলিটিক্যাল ও ইকনোমিক ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের স্কোর ৩০-এর একটু বেশি। লিগ্যাল ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের স্কোর ৩৪.৩৮, সোশ্যালে ৩৭.৬০ এবং সিকিউরিটি ইন্ডিকেটরে ৩০.৫১। পলিটিক্যাল ও ইকনোমিক ইন্ডিকেটরে উগান্ডার স্কোর ৩০-এর আশেপাশেই। কিন্তু লিগ্যাল, সোশ্যাল ও সিকিউরিটি ইন্ডিকেটরে উগান্ডা ঢের এগিয়ে। লিগ্যাল ইন্ডিকেটরে উগান্ডার স্কোর ৪২.১৭, সোশ্যালে ৪৪.৯৮ এবং সিকিউরিটি ইন্ডিকেটরে ৬৩.৪৯।
পলিটিকস, ইকনোমিকস, লিগ্যাল, সোশ্যাল বা সিকিউরিটি–এই ইংরেজি শব্দগুলোর বাংলা শিক্ষিত মানুষমাত্রই আন্দাজ করতে পারেন। সুতরাং এখানে খুব বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন বোধহয় নেই। অযথা লেখা বড় করারও অর্থ হয় না। মোদ্দা কথা এই যে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে, এতটাই যে অর্থনীতির দিক থেকে ৮ বা ৯ গুণ ছোট দেশও আমাদের তুলনায় ভালোভাবে এগিয়ে আছে। সেই দেশটির নাম নিয়ে আমরা বাংলাদেশিরা আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ হাস্যরসও করে থাকি। উগান্ডা হয়ে যাচ্ছি কিনা, সেই শঙ্কাও হাসতে হাসতে প্রকাশ করি প্রায় সময়।
হাসি বরং একটু কম হোক এখন থেকে। ট্রলও কম হোক সোশ্যাল মিডিয়ায়। কারণ, বাংলায় প্রবাদ আছে, ‘চালুনি কয় সুঁই রে…’। বাকিটা না বলা থাক, বুঝে নিলেই হলো। বুঝতে পারলে সাবধান হওয়া যাবে। সাবধান হওয়াটা বেশ জরুরিও। বলা তো যায় না, কখন আবার উগান্ডার মানুষেরা বলা শুরু করে যে–সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে তারা বাংলাদেশ হতে চায় না!
তা, বাংলাদেশ কি অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে উগান্ডা হতে পারবে? হলে মন্দ হয় না। আন্তর্জাতিক সূচকে একটু হলেও উন্নতি হবে। কিছুটা হলেও এ দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তো বাড়বে!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

দুই বছর আগেও বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় উগান্ডা নামটি বেশ আলোচিত ছিল। এ দেশের অনেক মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিশেষত ফেসবুকে, উগান্ডা নিয়ে ঢের আলোচনা করত। তারা উগান্ডার নাম নিয়ে মূলত বাংলাদেশের সরকারি নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করত। উগান্ডায় এই হচ্ছে, উগান্ডায় সেই হচ্ছে–আরও কত কী!
মূলত দেশে সাইবার স্পেস নিয়ে যে ধরনের নিবর্তনমূলক আইন চালু ছিল এবং নানা সময় ফেসবুক স্ট্যাটাসকেন্দ্রিক যেসব মামলাভিত্তিক হয়রানি চালু ছিল, সেই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের নাম সোশ্যাল মিডিয়ায় হয়ে গিয়েছিল উগান্ডা। দেশের বিভিন্ন ঘটনাই এই নামে কিছুটা হাস্যরসাত্মক রূপ নিয়েছিল। সেই সাথে আবার দুই দেশেই ছিল প্রবল পরাক্রমশালী সরকার, যাকে আন্তর্জাতিকভাবেই স্বৈরাচারী বৈশিষ্ট্যের তকমা দেওয়া হতো। উগান্ডায় অবশ্য সেই সরকার এখনও টিকে আছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সেটির পতন হয়েছে।
পূর্ব আফ্রিকার একটি ভূমিবেষ্টিত দেশ উগান্ডা। ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল উগান্ডা। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল এই দেশটিকে অভিহিত করেছিলেন ‘দ্য পার্ল অব আফ্রিকা’ নামে। আফ্রিকার অন্যান্য ব্রিটিশ উপনিবেশের মতো ১৯৬০-এর দশকে দেশটি ধীরে ধীরে স্বাধীনতার স্বাদ পায়। কুখ্যাত স্বৈরশাসক ইদি আমিনের দেশ হিসেবেও উগান্ডা পরিচিতি পেয়েছিল একসময়। সেসব অবশ্য বেশ আগের কথা। মবের দেশ বা মবের মারে মানুষের মরে যাওয়ার দেশ হিসেবেও উগান্ডার কুখ্যাতি আছে।
উগান্ডা তাহলে এগিয়ে থাকছে কীভাবে? ২০২৬ সালের সূচক দেখলেই সে বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ করা যায় বটে। পলিটিক্যাল ও ইকনোমিক ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের স্কোর ৩০-এর একটু বেশি। লিগ্যাল ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের স্কোর ৩৪.৩৮, সোশ্যালে ৩৭.৬০ এবং সিকিউরিটি ইন্ডিকেটরে ৩০.৫১
বাংলাদেশও একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। পাকিস্তানের অধীনেও ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। আর ঠিক সেই বছরই উগান্ডায় কুখ্যাত ইদি আমিন শাসনক্ষমতায় আসেন। ১৯৭৯ সালে ইদি আমিনের ক্ষমতাচ্যুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ইওয়েরি মুসেভেনি। ১৯৮৬ সালে তিনিই উগান্ডার প্রেসিডেন্ট হন। সেই থেকে গত ৪ দশক ধরে মুসেভেনিই উগান্ডা শাসন করছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে আবারও বিজয়ী হয়ে নিজের ক্ষমতার মেয়াদ আরও দীর্ঘায়িত করেছেন মুসেভেনি। নির্বাচনের মান নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বেশ সমালোচনাও আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিজয় উল্লাসের নয়, বরং রাজপথে রক্তপাত, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং বিরোধী শিবিরের ওপর নজিরবিহীন দমন-পীড়নের এক ধূসর আখ্যান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, দেশটির অর্ধেক ভোটারই ভোট দেয়নি।
তো, সেই তুলনায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতায় থাকার ইতিহাস বেশি সমৃদ্ধ। উন্নয়নের খেরো খাতাতেও বাংলাদেশ নিশ্চয়ই এগিয়েই থাকবে। কিন্তু, খুবই অদ্ভুতভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় এগিয়ে আছে উগান্ডা! সেই উগান্ডা, যেটি হয়ে যাওয়ার জুজু বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুল আলোচিত, সমালোচিত। অথচ, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতে যে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রকার অন্যতম সূচক, তাতেই কিনা এগিয়ে উগান্ডা! কিন্তু কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে চলুন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও উগান্ডার অবস্থান সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। সম্প্রতি সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স (আরএসএফ) কিছু তথ্য জানিয়েছে। আরএসএফ প্রতি বছর বিশ্বের ১৮০টি দেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার চিত্র নিয়ে একটি সূচক প্রকাশ করে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিস্থিতিকে ‘খুবই উদ্বেগজনক’ থেকে শুরু করে ‘ভালো’–এমন মোট পাঁচটি স্তরে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।
আরএসএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিশ্ব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, স্কোর ৩৩.০৫। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৯তম। অর্থাৎ, এক বছরে সূচকে আরও তিন ধাপ অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের।
মোদ্দা কথা এই যে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে, এতটাই যে অর্থনীতির দিক থেকে ৮ বা ৯ গুণ ছোট দেশও আমাদের তুলনায় ভালোভাবে এগিয়ে আছে। সেই দেশটির নাম নিয়ে আমরা বাংলাদেশিরা আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ হাস্যরসও করে থাকি
এই একই প্রতিবেদনে এ বছর উগান্ডার অবস্থান ১৩১তম, স্কোর ৪১.৯৮। কী, অবাক লাগছে শুনতে? যদি অবাক হয়ে থাকেন, তবে বলতেই হয়, অবাক হওয়ার আরও বাকি আছে। আফ্রিকার দেশগুলো গড়ে যে ধরনের সমস্যায় জর্জরিত থাকে, তার সবই উগান্ডায় আছে। বাড়তি হিসেবে আছে একসময়ের ‘ত্রাতা’ রাষ্ট্রনায়কের স্বৈরাচার হয়ে ওঠার যন্ত্রণা। চার দশক ধরে নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে উগান্ডার অন্যান্য খাতের মতো সংবাদমাধ্যমেও বেশ কড়াকড়ি আছে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তেমন কিছু বলাও যায় না। নিবর্তনমূলক আইন আছে। আছে ক্ষমতার হুমকি। সমালোচনাও করতে হয় মেপে মেপে।
অথচ, তারপরও উগান্ডা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। গত ৫ বছরের হিসাব দেখা যাক। আরএসএফ-এর সূচক অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে উগান্ডা ছিল ১৪৩তম। বাংলাদেশ ছিল ১৪৯তম। ২০২৪ সালের সূচকে উগান্ডা ছিল ১২৮তম স্থানে, বাংলাদেশ ছিল ১৬৫তম। ২০২৩ সালের সূচকে উগান্ডা ছিল ১৩৩তম, বাংলাদেশ ছিল ১৬৩তম। ২০২২ সালের সূচকে উগান্ডা ছিল ১৩২তম স্থানে, বাংলাদেশ ছিল ১৬২তম। আর করোনাভাইরাস মহামারির পরের বছর, অর্থাৎ ২০২১ সালের সূচকে বাংলাদেশ ছিল ১৫২তম। বিপরীতে উগান্ডা ছিল ১২৫তম স্থানে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। দুনিয়ায় মহামারি থাকুক, আর না থাকুক, যুদ্ধ চলুক বা না চলুক–সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশ বরাবরই পিছিয়ে, এগিয়ে উগান্ডা। পার্থক্যও বেশ। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে উগান্ডা ও বাংলাদেশের মধ্যকার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বছরে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, ওদিকে উগান্ডার অর্থনীতির আকার ৬০ বিলিয়ন ডলারও হয় না টেনেটুনে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় এগিয়েই থাকছে উগান্ডা। আরও অন্যান্য বিষয় টানলেও হয়তো বাংলাদেশ এগিয়েই থাকবে। অথচ সুনির্দিষ্ট একটি বিষয়ে ফেল! আবার ওই বিষয়টিই নির্ধারণ করে একটি দেশের উদার ও মতের হিসাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ হওয়া।
উগান্ডা তাহলে এগিয়ে থাকছে কীভাবে? ২০২৬ সালের সূচক দেখলেই সে বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ করা যায় বটে। পলিটিক্যাল ও ইকনোমিক ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের স্কোর ৩০-এর একটু বেশি। লিগ্যাল ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের স্কোর ৩৪.৩৮, সোশ্যালে ৩৭.৬০ এবং সিকিউরিটি ইন্ডিকেটরে ৩০.৫১। পলিটিক্যাল ও ইকনোমিক ইন্ডিকেটরে উগান্ডার স্কোর ৩০-এর আশেপাশেই। কিন্তু লিগ্যাল, সোশ্যাল ও সিকিউরিটি ইন্ডিকেটরে উগান্ডা ঢের এগিয়ে। লিগ্যাল ইন্ডিকেটরে উগান্ডার স্কোর ৪২.১৭, সোশ্যালে ৪৪.৯৮ এবং সিকিউরিটি ইন্ডিকেটরে ৬৩.৪৯।
পলিটিকস, ইকনোমিকস, লিগ্যাল, সোশ্যাল বা সিকিউরিটি–এই ইংরেজি শব্দগুলোর বাংলা শিক্ষিত মানুষমাত্রই আন্দাজ করতে পারেন। সুতরাং এখানে খুব বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন বোধহয় নেই। অযথা লেখা বড় করারও অর্থ হয় না। মোদ্দা কথা এই যে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে, এতটাই যে অর্থনীতির দিক থেকে ৮ বা ৯ গুণ ছোট দেশও আমাদের তুলনায় ভালোভাবে এগিয়ে আছে। সেই দেশটির নাম নিয়ে আমরা বাংলাদেশিরা আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ হাস্যরসও করে থাকি। উগান্ডা হয়ে যাচ্ছি কিনা, সেই শঙ্কাও হাসতে হাসতে প্রকাশ করি প্রায় সময়।
হাসি বরং একটু কম হোক এখন থেকে। ট্রলও কম হোক সোশ্যাল মিডিয়ায়। কারণ, বাংলায় প্রবাদ আছে, ‘চালুনি কয় সুঁই রে…’। বাকিটা না বলা থাক, বুঝে নিলেই হলো। বুঝতে পারলে সাবধান হওয়া যাবে। সাবধান হওয়াটা বেশ জরুরিও। বলা তো যায় না, কখন আবার উগান্ডার মানুষেরা বলা শুরু করে যে–সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে তারা বাংলাদেশ হতে চায় না!
তা, বাংলাদেশ কি অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে উগান্ডা হতে পারবে? হলে মন্দ হয় না। আন্তর্জাতিক সূচকে একটু হলেও উন্নতি হবে। কিছুটা হলেও এ দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তো বাড়বে!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

রূপপুরের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিতর্কগুলোর একটি হলো এর জনঘনত্ব প্রেক্ষাপট। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী এলাকায় প্রকল্পটি অবস্থিত, যেখানে আশপাশে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামীণ জনপদ রয়েছে। পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সাধারণত বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ৩০-৫০ কিলোমিটার রেডিয়াসের ইমার্জেন্সি প্ল্যানিং জোন (ইপিজেড) বিবেচনা করা হয়।

গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে স্বাক্ষরিত ‘ইউএস–বাংলাদেশ অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) একদিকে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার আরও সুসংগঠিত করেছে। তবে অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে দেশের কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার পরিসরকে