নাইর ইকবাল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। প্রথম দিনই নির্বাচিত হবেন নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার। সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন তত্ত্বাবধান করার কথা আগের সংসদের স্পিকারের। তবে এই রেওয়াজ সব সময় মেনে চলা হয়নি। এবার তো সেই রেওয়াজ মানার উপায়ও নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যূত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। দ্বাদশ সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু এই মুহূর্তে আছেন কারাগারে।
ফলে এবারের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে রেওয়াজ ভেঙেই। প্রশ্ন হলো–স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মানদণ্ড কী? কারা স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকার পদের জন্য বিবেচিত হতে পারেন? এই দুটি পদে বিবেচিত হওয়ার দুটি স্থায়ী মানদণ্ড আছে—বিবেচিত ব্যক্তিকে অবশ্যই সংসদ সদস্য হতে হবে। আর বিবেচিত ব্যক্তির বয়স হতে হবে কমপক্ষে ৩৫ বছর।
নতুন সংসদের প্রথম কাজ হবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, স্পিকার নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সময়ের অন্তত এক ঘণ্টা আগে যেকোনো সংসদ সদস্য অন্য কোনো সদস্যকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে সম্বোধন করে লিখিতভাবে একটি প্রস্তাবের নোটিশ দিতে পারেন। এই নোটিশ তৃতীয় একজন সদস্য কর্তৃক সমর্থিত হতে হয়। যার নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি নির্বাচিত হলে স্পিকার হিসেবে কাজ করতে সম্মত আছেন–এমন একটি বিবৃতিও নোটিশের সঙ্গে দিতে হয়।
তবে কোনো সদস্য স্পিকার পদে নিজের নাম প্রস্তাব বা সমর্থন করতে পারেন না। এ ছাড়া কোনো সদস্য নিজের নির্বাচনের সময় সভাপতিত্বও করতে পারেন না। যথাযথভাবে উত্থাপিত ও সমর্থিত প্রস্তাবগুলো উত্থাপিত হওয়ার ক্রমানুসারে ভোটে দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনে ‘বিভক্তি-ভোটের মাধ্যমে’ সিদ্ধান্ত হবে। কোনো প্রস্তাব গৃহীত হয়ে গেলে বাকি প্রস্তাবগুলো ভোটে দেওয়া হয় না। একই পদ্ধতিতে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়।
নির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত রাষ্ট্রপতির কার্যালয়েই এই শপথ পড়ানো হয়। নতুন স্পিকার শপথ নেওয়ার পর তিনি সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন হতে পারে।
সাধারণত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একজন করে প্রার্থীর নামই প্রস্তাব করা হয়। আর এটি করে থাকে সরকারি দল। তারা যেহেতু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেহেতু তাদের প্রস্তাবিত প্রার্থীই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।
অবশ্য এবার ক্ষমতাসীন দল বিএনপির পক্ষ থেকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামী ডেপুটি স্পিকার পদটি এখনই নেবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে সাধারণত একজন অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যকে নির্বাচন করা হয়। তবে এই রেওয়াজও যে সব সময় মেনে চলা হয়েছে, ব্যাপারটি এমন নয়। সর্বশেষ সংসদে যিনি স্পিকার ছিলেন, সেই শিরীন শারমিন চৌধুরী যখন ২০১৪ সালে স্পিকার নির্বাচিত হন, তিনি ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় স্পিকার পদে দায়িত্ব পালন করেছেন শিরীন শারমিন চৌধুরীই।

এ দেশের ইতিহাসে নিখাঁদ রাজনীতিবিদ যেমন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, ঠিক তেমনি অন্য পেশা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা ব্যক্তিও স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদের স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরী ছিলেন একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য হয়ে তিনি স্পিকার হন এবং টানা দুটি সংসদে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যদিও দুটি সংসদের একটিও পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করেনি।
বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ কূটনীতিক হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ১৯৯৬ সালে স্পিকার নির্বাচিত হন। তিনি স্পিকার হওয়ার আগে এরশাদ সরকারের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ছিলেন ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নির্বাচিত হয়ে তিনি স্পিকার হন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত হয়েছিল গণপরিষদ। সেই গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেছিলেন খ্যাতনামা রাজনীতিক মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ। তার তত্ত্বাবধানেই গণপরিষদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে শাহ আবদুল হামিদ ও মোহাম্মদউল্লাহ। শাহ আবদুল হামিদ ছিলেন ওই সময়ের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি ব্রিটিশ ভারতে দুইবার আইনসভার সদস্য ছিলেন। ছিলেন ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য। তবে গণপরিষদের স্পিকার হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তার মৃত্যু হলে স্পিকার হন মোহাম্মদউল্লাহ। তিনি ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য ও ১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। মোহাম্মদউল্লাহ ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর মোহাম্মদউল্লাহ পদত্যাগ করেন।
মোহাম্মদউল্লাহ স্পিকার হলে ডেপুটি হয়েছিলেন মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ। ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ সদস্য হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ নির্বাচিত হয়েছিলেন সংসদ সদস্য হিসেবে। মোহাম্মদউল্লাহকে যখন রাষ্ট্রপতি করা হয়, তখন স্পিকার হন আবদুল মালেক উকিল। তিনি স্পিকার হওয়ার আগে তিনবার পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি স্পিকার পদে নির্বাচিত হন।
১৯৭৯ সালের নির্বাচনের পর গঠিত দ্বিতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেননি আবদুল মালেক উকিল। সেবার স্পিকার হয়েছিলেন মির্জা গোলাম হাফিজ ও ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন ব্যারিস্টার সুলতানউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। মির্জা গোলাম হাফিজ একজন বিখ্যাত আইনজ্ঞ ছিলেন। তবে তিনি স্পিকার হন ১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরপরই। সুলতানউদ্দিন আহমেদ চৌধুরীও ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী। তিনিও ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন ১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েই।
১৯৮৬ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদের স্পিকার ছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী। তিনি স্পিকার হওয়ার আগে ১৯৭৯ সালে বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে শামসুল হুদা চৌধুরী স্পিকার হন।
১৯৮৬ সংসদে শামসুল হুদা চৌধুরীর ডেপুটি ছিলেন ব্যারিস্টার কোরবান আলী। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক রাজনীতিক। ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালে কোরবান আলী সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ডেপুটি স্পিকার হন।
১৯৮৮ সালে ডেপুটি স্পিকার হন রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়া। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ সদস্য, ১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য হন। ১৯৮৮ সালে তৃতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন।
১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে প্রথমে স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯১ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্পিকার হন। তবে খুব অল্প দিনের মধ্যেই তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তখন স্পিকার হন শেখ রাজ্জাক আলী। রাজ্জাক আলী পঞ্চম সংসদের শুরুতে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার। দেশের খ্যাতনামা এই রাজনীতিক ডেপুটি স্পিকার হওয়ার আগে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।

আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হলে রাজ্জাক আলী যখন স্পিকার হন, তখন তার ডেপুটি হয়েছিলেন হুমায়ূন খান পন্নী। তিনি ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত ষষ্ঠ সংসদ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ১৩ দিন। সেই সংসদে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শেখ রাজ্জাক আলী। তার ডেপুটি হয়েছিলেন এল কে সিদ্দিকী। তিনি ডেপুটি স্পিকার হওয়ার আগে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালেই সপ্তম সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সংসদে স্পিকার হয়েছিলেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। তার ডেপুটি হন আবদুল হামিদ। মাঠের রাজনীতিক আবদুল হামিদ ডেপুটি স্পিকার হওয়ার আগে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০০১ সালে সপ্তম সংসদের একেবারে শেষ দিকে মৃত্যু হয়েছিল স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর। সংসদের শেষ অধিবেশনে স্পিকার হন আবদুল হামিদ। তার ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব নেন আলী আশরাফ। তিনি ডেপুটি হওয়ার আগে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অষ্টম সংসদের স্পিকার ছিলেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। তিনি এর আগে ১৯৭৯, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার ডেপুটি আখতার হামিদ সিদ্দিকী ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আখতার হামিদ চতুর্থবার সংসদ সদস্য হওয়ার পর ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন।
২০০৮ সালে নবম সংসদে আবার স্পিকার হন আবদুল হামিদ। তার ডেপুটি ছিলেন শওকত আলী। ডেপুটি স্পিকার হওয়ার আগে শওকত আলী চারবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।
২০১৪ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য থেকেই স্পিকার হয়ে যান শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি ১০ বছর ধরে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ডেপুটি স্পিকার হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন দুই রাজনীতিক ফজলে রাব্বী মিয়া ও শামসুল হক টুকুকে। ফজলে রাব্বী মিয়া ডেপুটি স্পিকার হওয়ার আগে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। শামসুল হক টুকু এর আগে ছিলেন দুইবারের সংসদ সদস্য।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। প্রথম দিনই নির্বাচিত হবেন নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার। সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন তত্ত্বাবধান করার কথা আগের সংসদের স্পিকারের। তবে এই রেওয়াজ সব সময় মেনে চলা হয়নি। এবার তো সেই রেওয়াজ মানার উপায়ও নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যূত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। দ্বাদশ সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু এই মুহূর্তে আছেন কারাগারে।
ফলে এবারের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে রেওয়াজ ভেঙেই। প্রশ্ন হলো–স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মানদণ্ড কী? কারা স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকার পদের জন্য বিবেচিত হতে পারেন? এই দুটি পদে বিবেচিত হওয়ার দুটি স্থায়ী মানদণ্ড আছে—বিবেচিত ব্যক্তিকে অবশ্যই সংসদ সদস্য হতে হবে। আর বিবেচিত ব্যক্তির বয়স হতে হবে কমপক্ষে ৩৫ বছর।
নতুন সংসদের প্রথম কাজ হবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, স্পিকার নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সময়ের অন্তত এক ঘণ্টা আগে যেকোনো সংসদ সদস্য অন্য কোনো সদস্যকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে সম্বোধন করে লিখিতভাবে একটি প্রস্তাবের নোটিশ দিতে পারেন। এই নোটিশ তৃতীয় একজন সদস্য কর্তৃক সমর্থিত হতে হয়। যার নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি নির্বাচিত হলে স্পিকার হিসেবে কাজ করতে সম্মত আছেন–এমন একটি বিবৃতিও নোটিশের সঙ্গে দিতে হয়।
তবে কোনো সদস্য স্পিকার পদে নিজের নাম প্রস্তাব বা সমর্থন করতে পারেন না। এ ছাড়া কোনো সদস্য নিজের নির্বাচনের সময় সভাপতিত্বও করতে পারেন না। যথাযথভাবে উত্থাপিত ও সমর্থিত প্রস্তাবগুলো উত্থাপিত হওয়ার ক্রমানুসারে ভোটে দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনে ‘বিভক্তি-ভোটের মাধ্যমে’ সিদ্ধান্ত হবে। কোনো প্রস্তাব গৃহীত হয়ে গেলে বাকি প্রস্তাবগুলো ভোটে দেওয়া হয় না। একই পদ্ধতিতে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়।
নির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত রাষ্ট্রপতির কার্যালয়েই এই শপথ পড়ানো হয়। নতুন স্পিকার শপথ নেওয়ার পর তিনি সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন হতে পারে।
সাধারণত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একজন করে প্রার্থীর নামই প্রস্তাব করা হয়। আর এটি করে থাকে সরকারি দল। তারা যেহেতু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেহেতু তাদের প্রস্তাবিত প্রার্থীই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।
অবশ্য এবার ক্ষমতাসীন দল বিএনপির পক্ষ থেকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামী ডেপুটি স্পিকার পদটি এখনই নেবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে সাধারণত একজন অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যকে নির্বাচন করা হয়। তবে এই রেওয়াজও যে সব সময় মেনে চলা হয়েছে, ব্যাপারটি এমন নয়। সর্বশেষ সংসদে যিনি স্পিকার ছিলেন, সেই শিরীন শারমিন চৌধুরী যখন ২০১৪ সালে স্পিকার নির্বাচিত হন, তিনি ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় স্পিকার পদে দায়িত্ব পালন করেছেন শিরীন শারমিন চৌধুরীই।

এ দেশের ইতিহাসে নিখাঁদ রাজনীতিবিদ যেমন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, ঠিক তেমনি অন্য পেশা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা ব্যক্তিও স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদের স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরী ছিলেন একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য হয়ে তিনি স্পিকার হন এবং টানা দুটি সংসদে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যদিও দুটি সংসদের একটিও পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করেনি।
বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ কূটনীতিক হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ১৯৯৬ সালে স্পিকার নির্বাচিত হন। তিনি স্পিকার হওয়ার আগে এরশাদ সরকারের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ছিলেন ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নির্বাচিত হয়ে তিনি স্পিকার হন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত হয়েছিল গণপরিষদ। সেই গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেছিলেন খ্যাতনামা রাজনীতিক মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ। তার তত্ত্বাবধানেই গণপরিষদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে শাহ আবদুল হামিদ ও মোহাম্মদউল্লাহ। শাহ আবদুল হামিদ ছিলেন ওই সময়ের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি ব্রিটিশ ভারতে দুইবার আইনসভার সদস্য ছিলেন। ছিলেন ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য। তবে গণপরিষদের স্পিকার হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তার মৃত্যু হলে স্পিকার হন মোহাম্মদউল্লাহ। তিনি ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য ও ১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। মোহাম্মদউল্লাহ ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর মোহাম্মদউল্লাহ পদত্যাগ করেন।
মোহাম্মদউল্লাহ স্পিকার হলে ডেপুটি হয়েছিলেন মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ। ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ সদস্য হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ নির্বাচিত হয়েছিলেন সংসদ সদস্য হিসেবে। মোহাম্মদউল্লাহকে যখন রাষ্ট্রপতি করা হয়, তখন স্পিকার হন আবদুল মালেক উকিল। তিনি স্পিকার হওয়ার আগে তিনবার পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি স্পিকার পদে নির্বাচিত হন।
১৯৭৯ সালের নির্বাচনের পর গঠিত দ্বিতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেননি আবদুল মালেক উকিল। সেবার স্পিকার হয়েছিলেন মির্জা গোলাম হাফিজ ও ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন ব্যারিস্টার সুলতানউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। মির্জা গোলাম হাফিজ একজন বিখ্যাত আইনজ্ঞ ছিলেন। তবে তিনি স্পিকার হন ১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরপরই। সুলতানউদ্দিন আহমেদ চৌধুরীও ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী। তিনিও ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন ১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েই।
১৯৮৬ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদের স্পিকার ছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী। তিনি স্পিকার হওয়ার আগে ১৯৭৯ সালে বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে শামসুল হুদা চৌধুরী স্পিকার হন।
১৯৮৬ সংসদে শামসুল হুদা চৌধুরীর ডেপুটি ছিলেন ব্যারিস্টার কোরবান আলী। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক রাজনীতিক। ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালে কোরবান আলী সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ডেপুটি স্পিকার হন।
১৯৮৮ সালে ডেপুটি স্পিকার হন রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়া। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ সদস্য, ১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য হন। ১৯৮৮ সালে তৃতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন।
১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে প্রথমে স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯১ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্পিকার হন। তবে খুব অল্প দিনের মধ্যেই তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তখন স্পিকার হন শেখ রাজ্জাক আলী। রাজ্জাক আলী পঞ্চম সংসদের শুরুতে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার। দেশের খ্যাতনামা এই রাজনীতিক ডেপুটি স্পিকার হওয়ার আগে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।

আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হলে রাজ্জাক আলী যখন স্পিকার হন, তখন তার ডেপুটি হয়েছিলেন হুমায়ূন খান পন্নী। তিনি ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত ষষ্ঠ সংসদ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ১৩ দিন। সেই সংসদে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শেখ রাজ্জাক আলী। তার ডেপুটি হয়েছিলেন এল কে সিদ্দিকী। তিনি ডেপুটি স্পিকার হওয়ার আগে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালেই সপ্তম সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সংসদে স্পিকার হয়েছিলেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। তার ডেপুটি হন আবদুল হামিদ। মাঠের রাজনীতিক আবদুল হামিদ ডেপুটি স্পিকার হওয়ার আগে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০০১ সালে সপ্তম সংসদের একেবারে শেষ দিকে মৃত্যু হয়েছিল স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর। সংসদের শেষ অধিবেশনে স্পিকার হন আবদুল হামিদ। তার ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব নেন আলী আশরাফ। তিনি ডেপুটি হওয়ার আগে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অষ্টম সংসদের স্পিকার ছিলেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। তিনি এর আগে ১৯৭৯, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার ডেপুটি আখতার হামিদ সিদ্দিকী ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আখতার হামিদ চতুর্থবার সংসদ সদস্য হওয়ার পর ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন।
২০০৮ সালে নবম সংসদে আবার স্পিকার হন আবদুল হামিদ। তার ডেপুটি ছিলেন শওকত আলী। ডেপুটি স্পিকার হওয়ার আগে শওকত আলী চারবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।
২০১৪ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য থেকেই স্পিকার হয়ে যান শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি ১০ বছর ধরে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ডেপুটি স্পিকার হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন দুই রাজনীতিক ফজলে রাব্বী মিয়া ও শামসুল হক টুকুকে। ফজলে রাব্বী মিয়া ডেপুটি স্পিকার হওয়ার আগে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। শামসুল হক টুকু এর আগে ছিলেন দুইবারের সংসদ সদস্য।

জ্বালানি সংকটের গুজবে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের হিড়িক পড়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, গত কয়েক দিনের তুলনায় গ্রাহকরা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমার বাইরে। এর ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্রাহক