ট্রাম্পকে ঠেকিয়ে জনপ্রিয় সানচেজ নিজ দেশে কেন অজনপ্রিয়

ট্রাম্পকে ঠেকিয়ে জনপ্রিয় সানচেজ নিজ দেশে কেন অজনপ্রিয়
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। ছবি: রয়টার্স

স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ হুট করে নেটিজেনদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক কনটেন্ট বানানো পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্সাররা তাকে নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করছেন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাকে নিয়ে তৈরি নানা ধরনের রিলস বা শর্টস। সানচেজের এই জনপ্রিয়তার কারণ রয়েছে।

গত ৪ মার্চ পেড্রো সানচেজ টেলিভিশনে একটি ভাষণ দেন। সেখানে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের বিরুদ্ধে তার বিরোধিতার কথা বলেন তিনি। সানচেজ এই হামলার জন্য আমেরিকানদের দুটি স্প্যানিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকার করেছিলেন। জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলেন।

তখন সানচেজ বলেন, “ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে গণতন্ত্র বা দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা জাগ্রত হবে–এমনটা বিশ্বাস করা হবে বোকামি। কিংবা অন্ধ ও দাসসুলভ আনুগত্য প্রদর্শন করাকে নেতৃত্বের একটি রূপ ভাবাও ভুল... স্রেফ কারো প্রতিশোধের ভয়ে আমরা এমন কোনো কিছুর সহযোগী হব না, যা বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর এবং যা আমাদের মূল্যবোধ ও স্বার্থবিরোধী।” মূলত ট্রাম্পীয় জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ইউরোপের প্রধান মুখপাত্র হয়ে ওঠার লক্ষ্যে এটি সানচেজের একটি বিশেষ প্রচেষ্টা।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার এই কথাগুলো সেই সব মানুষের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে, যারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসে মারিয়া আজনারের অধীনে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণে স্পেনের সমর্থন দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১৫.৭ শতাংশ স্প্যানিশ নাগরিক মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। মানে তারা মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনীর ইরান হামলা সমর্থন করেন।

বর্তমানে ইউরোপের আর কোনো নেতা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বাধানো ‘অন্যায় যুদ্ধে’র বিরুদ্ধে সানচেজের মতো সোচ্চার নয়। তার কণ্ঠস্বর ক্রমশ জোরালো হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অন্তত আপাতত তিনি একা। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেষ্টার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করে প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা পেলেও সানচেজ ইউরোপের অন্যান্য নেতাদের থেকে এখনো তেমন জোরালো সমর্থন পাননি।

এই প্রথম সানচেজ প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরোধিতা করেছেন–বিষয়টি এমন নয়। ভেনেজুয়েলার একনায়ক নিকোলাস মাদুরোকে আমেরিকার সামরিক কায়দায় ক্ষমতাচ্যুত করার পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে বলে সানচেজ সমালোচনা করেন। রয়টার্সের এক খবরে উঠে আসে ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য লাফালাফি করছিলেন, তখন তিনি কীভাবে এর বিরোধিতা করেন। তখন তিনি বলেছিলেন, যদি ট্রাম্প সামরিক অভিযান চালিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখল করেন, তাহলে ন্যাটো পুরোপুরি ভেঙে যাবে এবং তখন পুতিন হবেন বিশ্বের সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি।

সম্প্রতি আমেরিকান দৈনিক বোস্টন হেরাল্ডে এক প্রতিবেদনে সানচেজের আরও কিছু গুণের কথা জানা গেল। যেমন–সানচেজ একজন অভিবাসীবান্ধব প্রধানমন্ত্রী। যখন অনেক ইউরোপীয় দেশ তাদের সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়িয়েছে, তখন স্পেন সেখানে অবস্থানরত পাঁচ লাখ বিদেশিকে কর্মসংস্থান ও বসবাসের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, জানুয়ারিতে তিনি স্পেনে কাগজপত্রহীন অবস্থায় থাকা প্রায় ৮ লাখ অভিবাসীকে সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করেন।

ট্রাম্পের কোন হুমকিতে টলছেন না পেদ্রো সানচেজ। ছবি: রয়টার্স
ট্রাম্পের কোন হুমকিতে টলছেন না পেদ্রো সানচেজ। ছবি: রয়টার্স

স্পেনের শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য অভিবাসনের সুফল তুলে ধরার সময় সানচেজ স্পষ্টভাবে ট্রাম্পের দিকে ইঙ্গিত করেন। সম্প্রতি ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “মাগা-পন্থী নেতারা বলতে পারেন যে, আমাদের দেশ এত অভিবাসীর চাপ নিতে পারবে না–এটি একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ বা ভেঙে পড়া কোনো দেশের মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু তাদের কথায় বিভ্রান্ত হবেন না। স্পেনের অর্থনীতি এখন চাঙা।”

সানচেজের অধীনে স্পেন অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগ দিয়ে অল্পবয়সীদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের লাগাম টানার চেষ্টা করছে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বড় টেক কোম্পানিগুলোকে সমর্থন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বাকস্বাধীনতার রক্ষার দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। গত মাসে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারির পরিকল্পনা ঘোষণার পর, এক্স-এর মালিক ইলন মাস্ক স্প্যানিশ এই নেতাকে আক্রমণ করে আসল ‘ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী’ বলে অভিহিত করেন। অবশ্য কে কী বলল, তাতে সানচেজের কিছু যায় আসে না।

ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে স্পেনই একমাত্র দেশ যারা সামরিক ব্যয় মোট জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকার করেছে। সানচেজ গত বছর ন্যাটোর একটি বৈঠকে শেষ মুহূর্তে এই বিষয়ে অব্যাহতি নিশ্চিত করেন এবং জানান যে, স্পেন কেবল ২.১ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করবে, যাকে তিনি পর্যাপ্ত এবং বাস্তবসম্মত বলে অভিহিত করেছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প স্পেনকে এই সামরিক জোট থেকে বের করে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন। গত মাসে অনুষ্ঠিত মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে তিনি ইউরোপের ‘পারমাণবিক পুনঃঅস্ত্রীকরণ’-এর বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, সানচেজের নেতৃত্বে স্পেন ২০২৩ সাল থেকে ইউরো অঞ্চলের গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাওয়া এক অর্থনীতির সক্ষমতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। গত বছর এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২.৮ শতাংশ। অন্যদিকে সানচেজ এখনো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের পক্ষে সোচ্চার। যখন অন্যান্য নেতারা ট্রাম্পকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন, তখন একটি প্রগতিশীল বিকল্প প্রস্তাবের জন্য ইউরোপের বামপন্থীদের কাছে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী প্রশংসিত হচ্ছেন।

বুধবারের ওই ভাষণ সানচেজের বামপন্থী সমর্থকদের রোমাঞ্চিত করলেও, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া এসেছে। রক্ষণশীল পিপলস পার্টির নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইজো প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দলীয় রাজনীতি করা এবং আমেরিকার সাথে স্পেনের সম্পর্ক বিপন্ন করার অভিযোগ তোলেন।

অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থী ও ট্রাম্পপন্থী দল ‘ভক্স’-এর নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল বলেন, “এই সিদ্ধান্ত মূলত আয়াতুল্লাহ এবং এমন একজন প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা নেওয়া হয়েছে যিনি যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে মরিয়া; যদিও তার ঘনিষ্ঠ মহল, সমাজতান্ত্রিক দল এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু দুর্নীতির কেলেঙ্কারি বিদ্যমান।”

খোদ স্প্যানিশদের কাছে সানচেজ খুব একটা প্রশংসা পাচ্ছেন না। ছবি: রয়টার্স
খোদ স্প্যানিশদের কাছে সানচেজ খুব একটা প্রশংসা পাচ্ছেন না। ছবি: রয়টার্স

খোদ স্প্যানিশদের কাছে সানচেজ খুব একটা প্রশংসা পাচ্ছেন না। এমনকি শান্তিপ্রিয় বা নমনীয় ধারার ভোটারদেরও তার প্রতি অসন্তুষ্টির যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে তিনি প্রতিরক্ষা ব্যয় ৪০ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে জিডিপি-র ২ শতাংশে উন্নীত করেছেন। যদিও ন্যাটোর নির্ধারিত ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় সই করতে তিনি প্রথমে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

দ্য ইকোনমিস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’ থিঙ্ক-ট্যাঙ্কের কর্মকর্তা হোসে ইগনাসিও তোরেব্লাঙ্কা বলেন, “বর্তমানে রক্ষণশীল হয়ে ওঠা ইউরোপে কেউ কেউ সানচেজকে একজন বিরক্তিকর ব্যক্তি হিসেবে দেখেন।” তিনি আরও বলেন, “অভিবাসীদের বৈধ করার বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী একজন।” স্প্যানিশ নাগরিকদের একটি বড় অংশ অভিবাসী-বিরোধী। তাদের কাছে সানচেজের অভিবাসী-নীতি গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রায় আট বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা সানচেজের জোটের এখন আর নির্ভরযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। গত ডিসেম্বরে এস্ত্রে মাদুরা এবং গত মাসে আরাগনের আঞ্চলিক নির্বাচনে সমাজতান্ত্রিকরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে।

আগামী ১৫ই মার্চ কাস্তিয়া ই লিওন এবং পরবর্তীতে আন্দালুসিয়াতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে একই পরিণতি অপেক্ষা করছে বলে ধারণা করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যদি ট্রাম্প সত্যি সত্যিই স্পেনের ওয়াইন, শুকরের মাংস এবং অলিভ অয়েল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

জরিপ অনুযায়ী, স্পেনের জনমত এখন ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। কারণ স্প্যানিশ সরকারের ক্রমবর্ধমান আবাসন খরচ তাদের বর্ধিত বেতনের সুবিধাকে ম্লান করে দিয়েছে। এছাড়া সানচেজের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সমাজতান্ত্রিক দলটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। বাাস্ক এবং কাতালান জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে এই দলের জোট গঠন অন্যান্য অঞ্চলে তাদের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

সানচেজের জোটের এখন আর নির্ভরযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ছবি: রয়টার্স
সানচেজের জোটের এখন আর নির্ভরযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ছবি: রয়টার্স

মূলধারার রক্ষণশীল পিপলস পার্টি নয়, বরং এই পরিস্থিতির মূল সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কট্টর ডানপন্থী পপুলিস্ট দল ‘ভক্স’। সর্বশেষ নির্বাচনে এস্ত্রে মাদুরা এবং আরাগন-উভয় অঞ্চলেই তারা ১৭ শতাংশ বেশি ভোট পেয়েছে, যা পিপলস পার্টিকে সরকার গঠনের জন্য কঠিন আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে। সাম্প্রতিক কিছু জনমত জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখন মনে করেন যে দেশে অভিবাসীদের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে।

সানচেজ স্বীকার করেছেন যে, হতাশ বামপন্থী ভোটাররা এখন ভোটকেন্দ্র বিমুখ হয়ে পড়েছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলছেন যে, ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে তিনি তাদের পুনরায় উজ্জীবিত করবেন। তার প্রগতিশীল পররাষ্ট্রনীতির পেছনে এটিও অন্যতম একটি কারণ। কিন্তু এই কৌশল কাজ নাও করতে পারে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পাবলো সিমন দ্য ইকোনমিস্টকে বলেছেন, “একটি চক্র শেষ হয়ে আসছে। ক্ষমতায় রদবদল হওয়াটাই স্বাভাবিক।” তবে স্পেনের জন্য যা স্বাভাবিক নয় তা হলো পিপলস পার্টির ভক্স-এর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সরকার পরিচালনার সম্ভাবনা।

সম্পর্কিত