বসছে সংসদ, নতুন এমপিরা কি পারবেন?

বসছে সংসদ, নতুন এমপিরা কি পারবেন?
ছবি: উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার। গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপির নেতৃত্বের এই সংসদ নিয়ে রয়েছে নানা আলোচনা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংসদের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা–দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ আবার সংসদ নিয়ে শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রায় সাত মাসের মাথায় গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। পরদিন সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর দুদিন পর দায়িত্ব নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দেড় বছরের মাথায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হয়। কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় আওয়ামী লীগ এবার ভোট করতে পারেনি।

সংবিধান অনুযায়ী, কোনো সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক বসতে হয়। বিধি মোতাবেক ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি। ফলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় শুরু হবে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন।

সাধারণত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন দীর্ঘ হয়। এই অধিবেশন কত দিন চলবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠনের পর কমিটির বৈঠকে প্রথম অধিবেশনের সময়কাল ঠিক হবে।

এই সংসদের সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা থেকে শুরু করে বেশির ভাগ সদস্য প্রথমবার নির্বাচিত। সেই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে সংসদীয় রাজনীতি বিষয়ক গবেষক কে এম মহিউদ্দিন বলছেন, এবারের সংসদের সামনে ‘অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে’।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের এই অধ্যাপক চরচাকে বলেন, “বিশেষ এক প্রেক্ষাপটে নতুন সংসদ যাত্রা করছে। ত্রয়োদশ সংসদ আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সংসদে যারা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপসহ বড় অংশের সবাই নতুন। একটা চ্যালেঞ্জের বিষয় এটা যে, নতুন সংসদ সদস্য যারা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, তারা কীভাবে সংসদে কাজ করবেন। কারণ, সংসদের কাজের প্রক্রিয়া জটিল। তারা কীভাবে সংসদে কথা বলবে, কমিটিতে কাজ করবে–এগুলো তাদের জন্য নতুন।”

কে এম মহিউদ্দিন বলেন, “কিন্তু সম্ভাবনার যে জায়গাটা, সেটা হলো–নতুন যারা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, তারা নতুন চোখে সংসদকে অর্থবহ, প্রাণবন্ত করার চেষ্টা করবেন। তাদের একটা প্রতিশ্রুতি থাকবে।”

৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে দুটি আসনের নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত রয়েছে এবং প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনের নির্বাচন বাতিল হয়েছে।

বাকি ২৯৭ আসনের নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বিএনপির মিত্র গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি পেয়েছে একটি করে আসন।

বিএনপির এক সময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন নিয়ে বিরোধী দলে বসছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করে পেয়েছে ছয়টি আসন। জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস পেয়েছে একটি আসন।

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেয়েছে একটি আসন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন সাতটি আসনে। স্বতন্ত্ররা সবাই-ই বিএনপির দলছুট নেতা।

নতুন সংসদ নিয়ে কিছু সংশয়ের কথা উল্লেখ করে সাংবাদিক ও কলামিস্ট কামরান রেজা চৌধুরী চরচাকে বলেন, “বিএনপি অনেক ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছে। এখানে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদের বিরাট অংশ নতুন। কিন্তু সেই মানের সংসদ সদস্য আমরা পাব বলে মনে হয় না। কারণ, বেশির ভাগ সদস্যই সংসদীয় রীতি-পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন।”

কামরান রেজা বলেন, “দ্বিতীয় একটা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সংসদ সচিবালয়ের দিক থেকে। হাতে গোনা কিছু মানুষ ছাড়া সংসদীয় প্রক্রিয়াটা সাপোর্ট দেওয়ার মতো কেউ নেই। যারা এখন নেতৃত্ব আছেন, তারা সেটা বোঝেন না। সুতরাং সামনে আমরা সংসদে কিছুটা তালগোল পাকানো এলোমেলো অবস্থা দেখব।”

নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বিধান আছে। সেই ভাষণের পর সংসদ সদস্যরা সেটা নিয়ে আলোচনা করবেন। মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ নিয়ে এরই মধ্যে আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।

বুধবার জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের বলেন, “রাষ্ট্রপতি ফ্যাসিস্টের দোসর। সংসদে তার বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নেই। বিএনপি কেন যে তাকে দিয়ে ভাষণ দেওয়াচ্ছে, আমরা পরিষ্কার নই। এই বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেগুলো কাল দেখবেন।”

রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে গবেষক কে এম মহিউদ্দিন বলেন, “অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। নিয়ম অনুযায়ী বিগত সরকারের রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রস্তুত করে দেবে সরকার। ফলে এখানে রাষ্ট্রপতির জন্য অস্বস্তির বিষয় থাকবে। অনেক বিষয় বলতে না চাইলেও তাকে বলতে হবে। তাছাড়া এই সংসদই সিদ্ধান্ত নেবে, তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে থাকবেন না কি নতুন কেউ আসবেন।”

জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট নিয়েও সংসদ উত্তপ্ত হতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বিএনপির নির্বাচিতরা সংবিধান পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। তাদের ভাষ্য, সংবিধান পরিষদের বিধান বিদ্যমান সংবিধানে নেই। এদিকে জামায়াত ও এনসিপির নির্বাচিতরা সংবিধান পরিষদের সদস্যের শপথ নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন চরচাকে বলেন, “এই সংসদে অনেকগুলো জটিল কাজ আছে। যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো সংসদে উঠবে। সেগুলোর ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত হবে, সিদ্ধান্তগুলো কী তারা ভেবেচিন্তে নেবেন, না কি দলীয় বিবেচনা থেকে নেবেন–সেগুলো একটি বিষয়। জুলাই জাতীয় সনদের ইস্যুটা তারা কীভাবে সামাল দেবেন (তাও দেখার বিষয়)। ফলে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ।”

সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বুধবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, অধিবেশনের প্রথম দিনই ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ম অনুযায়ী সংসদে উত্থাপন করা হবে। এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে।

সংসদে বৈঠকে বিএনপির নেতারা। ছবি: ফেসবুক
সংসদে বৈঠকে বিএনপির নেতারা। ছবি: ফেসবুক

নিয়ম অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের শুরুতে বিদায়ী স্পিকার বা তার অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করেন। প্রথা অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে বৈঠকের শুরু হয়। প্রথম বৈঠকের শুরুতেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়।

দ্বাদশ সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর থেকে আত্মগোপনে আছেন বিদায়ী সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন তিনি।

স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি সংসদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারেন। আবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সভাপতিত্ব করার জন্য দায়িত্ব পেতে পারেন।

চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ বিষয়ে বলেছেন, “আগামীকাল স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হবে। শুরুতে একজন পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করবেন। এরপর সংসদ নেতা এই সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য কোনো একজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম প্রস্তাব করবেন। কোনো একজন সংসদ সদস্য তা সমর্থন করবেন। তারপর ওই সদস্য (যার নাম প্রস্তাব করা হবে) সভাপতিত্ব করবেন।”

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন

সংসদের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের শুরুতে বিদায়ী স্পিকার বা তার অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করেন।

প্রথা অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে বৈঠক শুরু হয়। উদ্বোধনী বৈঠকের কার্যসূচির মধ্যে শুরুতেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়।

এবার যিনি সংসদের প্রথম বৈঠক সভাপতিত্বের জন্য মনোনীত হবেন, তার সভাপতিত্বে সংসদের নতুন স্পিকার নির্বাচিত হবে।

নিয়ম অনুযায়ী সংসদের সরকারি দল থেকেই স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়ে থাকে। তবে এবার জুলাই সনদ ও বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বিএনপি।

যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি স্পিকার পদে কাকে নির্বাচন করবে, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বুধবার সংসদীয় দল সংসদ নেতা তারেক রহমানকে দিয়েছে।

বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে চিফ হুইপ বলেন, এই দায়িত্ব সংসদ নেতার ওপর অর্পণ করা হয়েছে।

নুরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের নেতাই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্ধারণ করবেন। আগামীকাল আমরা এর ফলাফল জানতে পারব।”

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুল্লাহ তাহের সাংবাদিকদের বলেন, “যখন প্রস্তাব আসবে তখন আমরা জানাব। কালকে খোলাসা হবে।”

সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই দুই পদে নির্বাচনের পরই কিছু সময়ের জন্য সাধারণত ৩০ মিনিটের একটা বিরতি হয়। এই বিরতির মধ্যে সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি।

বিরতির মধ্যে শপথ হয়। শপথের পর সংসদের বৈঠক আবার শুরু হয়। রেওয়াজ অনুযায়ী নতুন স্পিকার স্বাগত বক্তব্য রাখেন।

যা আছে প্রথম দিনের কার্যসূচিতে

সংসদ সচিবালয় ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের কার্যসূচি সংসদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা আছে, অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন, এবং শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। এরপর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করবেন।

পরে সংসদ কাজে সরকারি কর্ম কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী ‘বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশনের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন’ সংসদে উপস্থাপন করবেন। এরপর সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি গঠনের পর ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

সম্পর্কিত