
‘বিদেশি’ বনাম ‘ত্যাগী’: বিএনপির ভেতরে কি নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব?
কে দেশে ছিলেন, আর কে বিদেশে ছিলেন—এমন প্রশ্নের চাইতে বিএনপির সামনে এখন বড় প্রশ্ন, দলের দুঃসময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মানুষদের সঙ্গে ক্ষমতার সময়ের নেতৃত্ব কতটা ন্যায্য আচরণ করতে পারছে?

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের অবসান এবং বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার উত্থান নিয়ে আলোচনা ক্রমেই জোরাল হচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তি ভারত ও চীনের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফরি স্যাকস মনে করেন, ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতাই একটি প্রকৃত বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি হতে পারে। তার মতে, চীনকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই ভারতের। বরং দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম আরটির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্যাকসের এই বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের বারানসিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ভারত ও চীন একসঙ্গে কাজ করলে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে সেই সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হবে। তার যুক্তির মূল ভিত্তি হলো, ভবিষ্যৎ বিশ্বে কোনো একটি দেশের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের বিকাশ ঘটবে। ভারত কিংবা চীন—কোনো দেশই বিশ্বে আধিপত্যবাদী নতুন শক্তিতে পরিণত হবে না।
স্যাকসের এই বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে হলে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার কাঠামো বিবেচনায় নিতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেটি আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল নিরঙ্কুশ। কিন্তু গত দুই দশকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভূমিকা, ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ব্রিকসের মতো জোটের সম্প্রসারণ সেই এককেন্দ্রিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ফলে বিশ্বব্যবস্থা এখন একক আধিপত্য থেকে একাধিক ক্ষমতাকেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভারত ও চীনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চীন ইতিমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক উৎপাদন ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। অন্যদিকে ভারত বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ এবং দ্রুত বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর একটি। আরটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যেখানে চীনের অর্থনীতি ১৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৭ শতাংশ ও ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। স্যাকসের ধারণা, এই দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ ভারতের জনসংখ্যা চীনের দ্বিগুণ হবে এবং দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
তবে ভারতের উত্থানকে চীনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখার পরিবর্তে স্যাকস দুই দেশের পরিপূরক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। চীনের রয়েছে শক্তিশালী শিল্পভিত্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। ভারতের রয়েছে বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী, সেবা খাতের শক্তি এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। দুই দেশ সহযোগিতার পথে এগোলে এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর একক প্রভাবও কমতে পারে।
কিন্তু এই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় বাধা দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস। ২০২০ সালে সীমান্তে সংঘাতের পর ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা চলেছে। সীমান্ত বিরোধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে। যদিও ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে ব্রিকস সম্মেলনের সময় দুই দেশের নেতাদের বৈঠক এবং সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ প্রকাশ পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিল। স্যাকসের বক্তব্য মূলত এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে দুই দেশকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে সহযোগিতার কৌশল গ্রহণের আহ্বান।
ভারতের জন্য তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সঙ্গে কোয়াডের মতো কৌশলগত জোটে অতিরিক্তভাবে যুক্ত না হওয়া। কোয়াডকে সাধারণত চীনের প্রভাব মোকাবিলার একটি কৌশলগত কাঠামো হিসেবে দেখা হয়। স্যাকসের মতে, এই ধরনের জোট পশ্চিমা শক্তিগুলোর ক্ষয়িষ্ণু প্রভাব দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টার অংশ। তার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, ভারতকে নিজের জাতীয় স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বাধীনতার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ খোলা রাখা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। ভারত ঐতিহাসিকভাবেই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি অনুসরণ করে আসছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিল দেশটি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বেড়েছে। ফলে ভারতের সামনে এখন একদিকে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বাস্তবতা। স্যাকস মনে করেন, ভারতের উচিত এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা এবং কোনো বৃহৎ শক্তির কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশীদার না হওয়া।
স্যাকসের বক্তব্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, চীনের উচিত ভারতকে নিরাপত্তা পরিষদের ষষ্ঠ স্থায়ী সদস্য হিসেবে সমর্থন করা। বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। চীন যদি এই দাবিকে সমর্থন করে, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সম্পর্কে স্যাকসের সমালোচনাও তার বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা এখনো ১৯৫০-এর দশকের আধিপত্যবাদী মানসিকতায় আটকে আছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এখনো বিশ্বকে এমনভাবে দেখতে অভ্যস্ত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী শক্তি। ইউরোপের মধ্যেও একই ধরনের মানসিকতা কাজ করছে। স্যাকসের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে পশ্চিমা শক্তিগুলো নতুন আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারবে না।
তবে ভারত-চীন সহযোগিতার সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। সীমান্ত বিরোধ, নিরাপত্তা উদ্বেগ, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং এশিয়ায় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে। ভারতের জন্য চীনের সঙ্গে সহযোগিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করাও অপরিহার্য। একইভাবে চীনকেও ভারতের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূমিকার স্বীকৃতি দিতে হবে।
জেফরি স্যাকসের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের অবসানের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে না; বরং নতুন শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার ধরনও তা নির্ধারণ করবে। ভারত ও চীন যদি পরস্পরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা না করে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, তাহলে এশিয়া বিশ্বরাজনীতির একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তার দৃষ্টিতে, বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার অর্থ কেবল পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প তৈরি করা নয়, বরং এমন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কোনো একক শক্তি অন্যদের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারবে না।
ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো জালিয়াতি হয়নি, জানাল দেশটির নির্বাচন কমিশন
গ্রাহকের ৮৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ: ডাচ-বাংলার কর্মকর্তাসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা
ব্যবসায়ী নাসিরের করা মামলায় পরীমণির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
হাম উপসর্গে প্রাণ গেল আরও ৬ শিশুর
কমলাপুরে তার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত এক ব্যক্তির মৃত্যু

‘বিদেশি’ বনাম ‘ত্যাগী’: বিএনপির ভেতরে কি নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব?
কে দেশে ছিলেন, আর কে বিদেশে ছিলেন—এমন প্রশ্নের চাইতে বিএনপির সামনে এখন বড় প্রশ্ন, দলের দুঃসময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মানুষদের সঙ্গে ক্ষমতার সময়ের নেতৃত্ব কতটা ন্যায্য আচরণ করতে পারছে?

ইরানের সঙ্গে আবার যুদ্ধে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় জুয়া
প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত জন হালটিওয়াঙ্গারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করতে পারেন ট্রাম্প।

ব্যবসায়ীরাই ঠিক করল জ্বালানির দাম, ভোক্তার কথা শুনবে কে?
অবশেষে ভোক্তাদের শঙ্কাই সত্যি হলো। কাঠামোগতভাবে বাড়ানো হলো এলপি গ্যাসের দাম। গত ২৯ অক্টোবর রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে এনার্জি রেগুরেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে অংশ নেওয়া ভোক্তাদের কেউ কেউ তাদের বক্তব্যে সরাসরিই শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, “বিইআরসি শুনানি করছে মানে ধরেই নেওয়া যায় দাম বাড়বে।”

ইরান যুদ্ধ কি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে?
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারের দীর্ঘদিনের কাঠামোকে বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। এই সংঘাতের প্রভাব শুধু তেলের উৎপাদন, রপ্তানি কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।