অবশেষে ভোক্তাদের শঙ্কাই সত্যি হলো। কাঠামোগতভাবে বাড়ানো হলো এলপি গ্যাসের দাম। গত ২৯ অক্টোবর রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে এনার্জি রেগুরেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে অংশ নেওয়া ভোক্তাদের কেউ কেউ তাদের বক্তব্যে সরাসরিই শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, “বিইআরসি শুনানি করছে মানে ধরেই নেওয়া যায় দাম বাড়বে।” সে শঙ্কাই সত্য হলো। এমনকি সংস্থাটির টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশও টিকল না ব্যবসায়ীদের চাওয়ার সামনে।
কমিশনের টেকনিক্যাল কমিটির দেওয়া সুপারিশেও ইঙ্গিত ছিল, এই দফায় ব্যাবসায়ীদের কমিশন বাড়িয়ে ভোক্তা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে। সে সময় গণশুনানিকে দাম বাড়ানোর “চতুর আনুষ্ঠানিকতা” বলেও মন্তব্য করেছিলেন কোনো কোনো ভোক্তা। আর বাংলাদেশর অর্থনীতিক সমিতি তো বিইআরসির আয়োজনকে প্রহসনমূলক দাবি করে গণশুনানিই বর্জন করেছিল। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন, ক্যাব বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গণশুনানি আয়োজনের নিন্দা জানিয়েছিল।
কিন্তু এর কোনোটিই শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি। ভোক্তাদের মতামত ও যুক্তি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির গণশুনানি বর্জন বা ক্যাবের নিন্দা–কোনো কিছুই টলাতে পারেনি বিইআরসিকে। ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে তাদের কমিশন বাড়িয়েই গতকাল সোমবার নতুন দাম নির্ধারণ করল বিইআরসি। এ ক্ষেত্রে এমনকি বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটির প্রস্তাবও তারা রক্ষা করতে পারেনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সুপারিশ ছিল ১২ কেজি প্রতি সিলিন্ডার এলপি গ্যাসের দাম ১৯৭৬ টাকা করার।
বিইআরসির নতুন নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম অক্টোবর মাসের চেয়ে ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২০৬০ টাকা করা হয়েছে। এর আগের মাসে (অক্টোবরে) বাড়ানো হয়েছিলো ২১২ টাকা। তবে এই দুই মাসের দাম বৃদ্ধির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। এ মাসে দাম নির্ধারণে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে। এর মাধ্যমে এলপি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রবণতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কমিশন বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
অক্টোবর মাসে দাম বেড়েছিল সৌদি সিপি, ফ্রেইট কস্ট এবং ডলারের দামের হিসাবে। নভেম্বরে যে দাম বাড়ানো হলো, সেখানে সৌদি সিপির বাড়তি দরের সাথে যোগ হলো বোতলজাতকরণ ও মজুত চার্জ, ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলারের বাড়তি কমিশন যোগ করে। দাম বৃদ্ধির সূত্রে এখন থেকে এই বাড়তি চার্জ প্রতি মাসে যোগ হবে।
গণশুনানির ভিত্তিতে এনার্জি রেগুটরি কমিশন ১২ কেজি সিলিন্ডারের বোতলজাতকরণ ও মজুত চার্জ প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৯১ টাকা থেকে ২৮২ টাকা করেছে। এ ছাড়া ডিস্ট্রিবিউটর কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করা হয়েছে। এই বাড়তি কমিশন এবং চার্জ হিসাব করেই পরবর্তী মাসগুলোতে এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হবে।
এলপি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ও কমিশন বৃদ্ধিতে খুশি ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সেলিম খান চরচাকে বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ।” এখন থেকে বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস পাওয়া যাবে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিম খান বলেন, “ইনশাল্লাহ। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন যৌক্তিকভাবেই দাম বাড়িয়েছে।”
গত তিন মাস ধরে এলপি গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা চলছিল। সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর মাসে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দামে বাজারে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে। সাথে ছিল সরবরাহ সংকটের অভিযোগ। এমন পরিস্থিতিতে ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘটে যাওয়ার ঘোষণা দেয় ব্যবসায়ীরা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ অক্টোবর গণশুনানি করে নতুন কমিশন নির্ধারণ করল বিইআরসি।
কিন্তু নতুন দাম অবাক করেছে ভোক্তা প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের। কারণ, এই দাম বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনেরই টেকনিক্যাল কমিটির প্রস্তাবিত দামের চেয়ে ৮৪ টাকা বেশি!
এলপি গ্যাসের বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই পাঁচটি অপারেটর বোতলজাতকরণ চার্জ বৃদ্ধি এবং ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুযায়ী কমিশন নির্ধারিত সূত্রে ফেললে ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম হতো ২২৩২ টাকা। তবে বিইআরসি আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, জাহাজ ভাড়া, কাস্টমস ও এনবিআর ডেটা এবং কোম্পানিগুলোর অডিট রিপোর্ট্ বিশ্লেষণ করে এ দাম ১ হাজার ৯৭৬ টাকা করা যেতে পারে বলে সুপারিশ করে।
গণশুনানিতে টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করলে বাজারের অস্থিরতা নাও কমতে পারে বলে সতর্ক করেন অপারেটরদের প্রতিনিধি মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির সিএমও আবু সাঈদ রাজা। একই প্রতিক্রিয়া জানান, ডিস্ট্রিবিউটররাও। এই সতর্কতাকে প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসেবে মত দিয়েছিলেন শুনানিতে আসা ভোক্তা প্রতিনিধিরা। শেষ পর্যন্ত দাম বাড়লই। এবং তা কমিশনেরই টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশের চেয়ে বেশি–২০৬০ টাকা।
নতুন দর ঘোষণার পর বিশ্লেষকরা বলছেন, বিইআরসি যে ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি, তা আরেকবার প্রমাণ হলো। দাম বৃদ্ধির এই নতুন কাঠামো কমিশনের জিম্মি দশারই বহিঃপ্রকাশ। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, কমিশনের গণশুনানিতে অপারেটর বা আমাদানিকারক কোনো প্রতিষ্ঠান অলাভজনক নয় বলে প্রমাণ হলেও তাদের লভ্যাংশ বৃদ্ধির দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে।
এলপি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কাঠামোতে এই পরিবর্তনকে পুরোপুরি ‘মনগড়া’ ও ‘বেআইনি’ বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম। চরচাকে তিনি বলেন, “বিইআরসি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ না করে পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের ডিকটেশনে চলছে। টেকনিক্যাল কমিটির প্রস্তাবিত হারের চেয়েও বেশি দাম নির্ধারণ এবং ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো বোতলজাতকরণ ও মজুতকরণ চার্জ বাড়িয়ে ব্যবসায়ী স্বার্থকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।”
অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, “যৌক্তিক প্রমাণ ও গাণিতিক বিশ্লেষণের অভাব: বটলিং বা মজুতকরণ চার্জ কেন একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে নির্ধারণ করা হলো, তার কোনো বাস্তবসম্মত গাণিতিক বিশ্লেষণ বা ডিটেইলড অ্যানালাইসিস প্রকাশ করা হয়নি। প্রমাণ ছাড়া এমন মূল্য নির্ধারণ কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
এবারের আদেশে সরকারি এলপিজির সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১,৮৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে এক্স-রিফাইনারি মূল্য ৪৮০ টাকা ৭৩ পয়সা, ‘এলপিজি খাত উন্নয়ন তহবিল’ ১,০০৪ টাকা ৭ পয়সা এবং এলপি গ্যাস লিমিটেডের মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ ১৬০ টাকা ২০ পয়সা ধরা হয়েছে। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ‘এলপিজি খাত উন্নয়ন তহবিল’ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পরিচালনা করবে। এর জন্য আলাদা ব্যাংক হিসাব থাকবে এবং ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ের জন্য একটি রেগুলেটরি গাইডলাইনের খসড়া কমিশনে পাঠানো হবে।
এ তহবিল গঠনকে পুরোপুরি বেআইনি বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে অধ্যাপক শামসুল আলম চরচাকে বলেন, “সরকারি এলপিজির দাম ১,৮৬০ টাকা নির্ধারণ করে ভোক্তা পর্যায় থেকে অর্থ তুলে যে নতুন তহবিল গঠন করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই আইনসম্মত নয়।”
ক্যাবের এই জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, “অতীতেও একইভাবে গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন ফান্ড এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ফান্ড-এর নামে জনগণের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ফান্ডের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বা কতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, তার কোনো সঠিক হিসাব বা কার্যকারিতা দেখা যায়নি।”
হাইকোর্টের আদেশে ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে গণশুনানির মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। যদিও বেশির ভাগ সময় সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে এলপি গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ আছে ভোক্তাদের।