ভারতীয় বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল ও নয়াদিল্লির সেন্টার ফর এয়ার পাওয়ার স্টাডিজের সাবেক মহাপরিচালক অনিল চোপড়া। সম্প্রতি আরটি ডটকমে এক বিশ্লেষণী নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সম্পর্কের উন্নতি হলে ভারতের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরেছেন।
লেখক স্পষ্ট করে বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির দুই প্রধান পরাশক্তি–যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের মধ্যকার সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলনটিকে নয়াদিল্লি কেবল বাণিজ্য ও শুল্কের সাধারণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হিসেবে দেখেনি। তারা এর পেছনের গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ পর্যবেক্ষণ করেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে চীনের ইতিবাচক অবস্থান এবং অন্যদিকে নিজ দেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্রমশ কমতে থাকা জনপ্রিয়তার পটভূমিতে এই হাই-স্টেক্স শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। যদিও এই সম্মেলনে প্রধান কাঠামোগত বিরোধগুলোর খুব বেশি সমাধান আসেনি।
তবে সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান ফলাফল ছিল সংকটময় বাণিজ্য যুদ্ধ স্থগিতের মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। সামগ্রিকভাবে, চীনের রপ্তানি বৃদ্ধি ট্রাম্পের শুল্ক অভিযানকে একপ্রকার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।
অন্যদিকে ইরানে চলমান ব্যয়বহুল যুদ্ধের কারণে মার্কিন অর্থনীতি ও ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল, যার ফলে সি চিনপিং সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেই আলোচনা পরিচালনা করেছেন।
অনিল চোপড়ার এই বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি নয়াদিল্লির ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্মিত। এআই গভর্নেন্স, শুল্ক যুদ্ধ স্থগিতকরণ, বিরল খনিজ সম্পদ, আঞ্চলিক সামুদ্রিক ফ্ল্যাশপয়েন্ট, তাইওয়ান এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত চীন-মার্কিন আলোচনাকে ভারতের শীর্ষ কৌশলবিদরা অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
নয়াদিল্লির আসল ভয় বা মূল উদ্বেগের মূল কারণ হলো একটি নতুন মার্কিন–চীন ‘জি২’ বা দ্বিপাক্ষিক পরাশক্তি কাঠামোর সম্ভাব্য উত্থান। যদি ওয়াশিংটন ও বেইজিং একে অপরের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছে বিশ্বকে নিজেদের প্রভাববলয়ে ভাগ করে নেয়, তবে বৈশ্বিক বিরোধ নিষ্পত্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় ভারত দ্বিতীয় সারির শক্তিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
ভারত ও আমেরিকা–বিশ্বের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম দুটি গণতন্ত্র। তাদের স্বার্থ এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমেরিকার নিজের দুর্বল অবস্থানের কারণে কমিউনিস্ট চীনকে এভাবে তোষণ করা বা তার সঙ্গে আপস করার দৃশ্য নয়াদিল্লির চিন্তার বাইরে ছিল। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনের একক ও অতিমাত্রায় লেনদেনমুখী পররাষ্ট্রনীতির স্পষ্ট আলামত দেখা গেছে। সেই নীতিতে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি দেশটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি ও ভারতের বিরুদ্ধে শুল্ক হুমকির বৈষম্যমূলক আচরণও ভারতের ক্ষোভের একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য ভারতকে যেখানে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কারোপের হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়েছে, সেখানে মার্কিন অর্থনীতির নির্ভরশীলতার কারণে চীনকে একের পর এক ছাড় বা ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পিটার নাভারোর মতো ব্যক্তিরা ইউক্রেন সংকটকে ‘মোদী’র যুদ্ধ বলে অভিহিত করলেও, কেউ কখনোই এটিকে ‘সি’-এর যুদ্ধ বলে অভিহিত করার দেওয়ার সাহস দেখায়নি।
নয়াদিল্লির আশঙ্কা, ধীরে ধীরে চীনকে এড়িয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিয়ে ভারতকেই তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু বানাতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ‘চীন প্লাস ওয়ান’ ম্যানুফ্যাকচারিং নীতির মাধ্যমে যে মার্কিন শিল্পপতিরা ভারতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছিল, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক মসৃণ হলে সেই অর্থনৈতিক রূপান্তর ও বিনিয়োগের গতিও মন্থর হয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ভারতের রক্ষাকবচমূলক বাণিজ্য নীতি ও অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা করেছেন এবং ভারতের কৃষি ও প্রযুক্তি খাত মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য খুলে দেওয়ার চাপ দিতে পারেন।
অন্যদিকে, কোয়াড কৌশল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও এই মার্কিন-চীন উষ্ণতার নেতিবাচক ছায়া পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে গঠিত কোয়াড জোটের কার্যকারিতা ট্রাম্পের ‘দ্বিপাক্ষিক চুক্তিপ্রীতি’ এবং বহুপাক্ষিক জোটের প্রতি অনাগ্রহের কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ওয়াশিংটন যদি অর্থনৈতিক সুবিধা বা বাণিজ্যের বিনিময়ে দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ান ইস্যুতে নিজের অবস্থান শিথিল করে, তবে তা নয়াদিল্লিসহ সমগ্র এশিয়ার জন্য এক উদ্বেগের বার্তা দেবে। লাদাখের লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল এবং ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর চীন যদি বিশ্বমঞ্চে সমকক্ষ পরাশক্তি হিসেবে আরও সাহসী হয়ে ওঠে, তবে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত আলোচনায় বেইজিং নমনীয় হওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।
সামরিক প্রযুক্তি, দুর্লভ খনিজ (যার ৮৫ শতাংশ পরিশোধনের ক্ষমতা চীনের দখলে) এবং এআই প্রযুক্তির ওপর চীনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ভারতকে এক কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সর্বোপরি, অনিল চোপড়া তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে সি চিনপিং একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত খেলা খেলছেন। ওয়াশিংটন যখন একের পর এক বৈশ্বিক যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট (যেমন ইরান যুদ্ধ) এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত, তখন বেইজিং নীরবে নিজের অর্থনীতিকে সুসংহত করছে, সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করছে এবং বিশ্বজুড়ে নিজের কৌশলগত উপস্থিতি সম্প্রসারিত করছে।
অনিল চোপড়ার ভাষ্য, চীনকে আমেরিকাকে পরাজিত করতে হবে না, শুধু মার্কিন মনোযোগের স্থায়িত্বকে ছাড়িয়ে বেঁচে থাকলেই চলবে। ট্রাম্প যদিও বলেছেন যে এই সফরে আমেরিকা ‘খুব খুশি’ এবং আশা করছেন চীনও খুশি, কিন্তু ভারতের নীতি নির্ধারণী করিডোরে এই মার্কিন-চীন সমঝোতার ফলে কতটা অসন্তোষ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে তা এখন অত্যন্ত স্পষ্ট।
তবে চূড়ান্ত বিচারে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চরম বৈরিতা ও প্রতিযোগিতার জায়গাগুলো পুরোপুরি মুছে যাবে না। তবুও মার্কিন-চীন সম্পর্কের যেকোনো ছোট সমঝোতা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে সংকুচিত করে তুলতে পারে।
সূত্র: এয়ার মার্শাল অনিল চোপড়া (অব.), নিবন্ধক, প্রকাশকাল: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬)