ভারতে এখন জেন-জি আন্দোলনের মৌসুম চলছে। কিছুদিন আগে ‘ককরোচ পার্টি’ বা জেন-জিদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। এখন তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন।
কিন্তু বহু বছর ধরে জম্মু-কাশ্মীর ভারতের এক অমীমাংসিত রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে আছে। ২০১৯ সালের আগস্টে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ) ভাগ করা হয়। এরপর থেকে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে গড়িমসি করে চলেছে। একই সঙ্গে কাশ্মীরের রাজনৈতিক পরিসর থেকে ভিন্নমতের কণ্ঠস্বরও কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে।
কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান এখনো হয়নি। আর এই পরিস্থিতিতে কাশ্মীরের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে ভারতের চলমান জেন-জি আন্দোলন। এমন মতই ব্যক্ত করেছেন ভারতের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট আনন্দ ভক্ত দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
১৪ আগস্ট জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ নয়াদিল্লিকে সতর্ক করে বলেছিলেন, অস্থির এই হিমালয় অঞ্চলে সম্ভাব্য জেন-জি বিক্ষোভ দেখা দিতে পারে। তিনি তার সরকারের বিরুদ্ধে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের একের পর এক বাধার কথাও তুলে ধরেন। সর্বশেষ ঘটনা ছিল সংরক্ষণসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের বাস্তবায়ন আটকে দেওয়া। ওই প্রতিবেদনে সাধারণ মেধাভিত্তিক শ্রেণির মানুষের অভিযোগ ও অসন্তোষের প্রতিকারের চেষ্টা করা হয়েছিল।
ওমর আবদুল্লাহ। ছবি: রয়টার্স
২ সেপ্টেম্বর পরিস্থিতি বদলে যায়। ওমর আবদুল্লাহর মন্ত্রিসভার সদস্যরা শ্রীনগরের রাস্তায় নেমে আসেন। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের বারবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলেন এবং বিজেপি সদর দপ্তরের দিকে মিছিল করেন।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিক্ষোভ ভেস্তে যায়। লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অধীন পুলিশ সদস্যরা মন্ত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং সাধারণ অপরাধীদের মতো জোর করে ভ্যানে তুলে নিয়ে যান। ঘটনাস্থলে থাকা টেলিভিশন ক্যামেরা ও ইউটিউবাররা পুরো ঘটনা ধারণ করেন। কিন্তু সে দিন সন্ধ্যায় ভারতের প্রাইমটাইম টেলিভিশনে এ নিয়ে তেমন কোন ক্ষোভ বা প্রতিবাদ দেখা যায়নি। মোদির ভারতে বিক্ষোভের খবর সাধারণত খুব কমই গুরুত্ব পায়- শুধু যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখনই তা সম্প্রচারিত হয় (যেমন: ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলন বা সাম্প্রতিক মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে জেন-জি বিক্ষোভ)।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়। তাদের প্রায়ই বিদেশি অর্থে পরিচালিত এবং দেশের অখণ্ডতা দুর্বল করার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এভাবে বিক্ষোভের ধারণাকেই ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা একটি গভীর প্রশ্ন সামনে আনে- একটি প্রজাতন্ত্রকে আসলে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়?
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প
সমসাময়িক ভারতের রাজনীতিতে, বিশেষ করে কাশ্মীরে, এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট। মোদি সরকার কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য সীমিত করার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এই শক্তি প্রয়োগকে সমর্থন করেন। এর পেছনে শুধু প্রচারণার প্রভাব নয়, বরং বিজেপির বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রকল্পের সঙ্গে তাদের একাত্মতাও রয়েছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু দৈনন্দিন রাজনীতিতে হিন্দু স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া নয়, বরং ‘হিন্দু গৌরব’ পুনরুদ্ধার করা-রাস্তা-ভবনের নাম পরিবর্তন, পাঠ্যবই থেকে মুঘল ইতিহাস মুছে ফেলা এবং পার্লামেন্টে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে আনা পর্যন্ত।
কাশ্মীরে মুসলমানদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা জয়লাভ ঠেকানো না গেলেও, ক্ষমতা এখন হিন্দু লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিনহার হাতে কেন্দ্রীভূত। নয়াদিল্লির পছন্দে নিয়োগ পাওয়া সিনহা একের পর এক সরকারি আদেশের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। এতে ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি হুমকির মুখে পড়ছে।
সাম্প্রতিক এক পডকাস্টে ওমর আবদুল্লাহ বলেন, “আগে কর্মকর্তারা আমার দেওয়া কাজ কীভাবে করা যায়, তার ১০টি উপায় খুঁজতেন। এখন তারা না করার ১০টি কারণ খুঁজে বের করেন।”
ন্যাশনাল কনফারেন্সের মুখপাত্র ইমরান দার বলেন, “স্থানীয় সরকারকে মানুষের কাছে অজনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে।” তিনি দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এলজির কার্যালয় অকারণে দেরি করছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তির বড় ক্ষতি হতে পারে।”
ছাত্রদের প্রবল আন্দোলনের মুখে শেষমেশ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী। ছবি: রয়টার্স
সিনহা উত্তর প্রদেশের বিজেপির পুরনো নেতা। এই রাজ্যেই রাম জন্মভূমি আন্দোলন হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সেখানে একটি বড় মন্দির নির্মাণ করা হয়। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পাশাপাশি এই মন্দির নির্মাণও মোদি সরকারের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচারিত হয়।
আজকাল ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী জোটও কাশ্মীরের বিষয়ে খুব সতর্ক। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে রাহুল গান্ধী শ্রীনগরে ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রা শেষ করে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলিত ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি জম্মুর দুটি লোকসভা আসনই জিতেছে এবং বিধানসভা নির্বাচনেও বড় জয় পেয়েছে।
এরপর কংগ্রেস ও তার জোট সঙ্গীরা বুঝতে পারে, মুসলিম সংখ্যালঘুদের সমস্যা নিয়ে বেশি কথা বললে নির্বাচনী ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে এখন তারা কাশ্মীরসহ মুসলমানদের উদ্বেগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই চুপ থাকেন- যেমন অধিকারকর্মী উমর খালিদের কারাবন্দি থাকা বা উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের বুলডোজার অভিযান।
জম্মু-কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) জ্যেষ্ঠ নেতা ওয়াহিদ পারা বলেন, “জম্মু-কাশ্মীরের দাবিগুলো এগিয়ে নিতে জাতীয় দলগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করার কোনো কারণ নেই।” তিনি লাদাখের উদাহরণ দেন, যেখানে আঞ্চলিক ঐক্যের ভিত্তিতে নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য সফল চাপ তৈরি করা হয়েছিল। তবে তিনি যোগ করেন, “এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। আমরা কোনো উদ্যোগ নিয়ে সেই ক্ষমতাকে দুর্বল করতে চাই না।”
কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কাশ্মীরের পাশে নেই, তখন স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য আরও জরুরি। কিন্তু কাশ্মীরে এমন ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিদিন একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে-জনসমাবেশে, পডকাস্টে এবং বিশেষ করে এক্সে (সাবেক টুইটার)।
সব পক্ষই মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর প্রতি প্রকাশ্যে অসন্তোষ দেখাচ্ছে। তার দল এক লাখ চাকরি ও বিশেষ সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু সেই রেকর্ড ভাল নয়। তবে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা কমে যাওয়ার বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
জেন-জি আন্দোলন থেকে কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে ন্যাশনাল কনফারেন্স, গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে। ‘ককরোচেস’ নামে পরিচিত এই আন্দোলন কংগ্রেসের মতো শুধু একই মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা ক্ষুব্ধ যে কারও সঙ্গে কাজ করেছে- মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারের তরুণ থেকে শুরু করে মার্কসবাদী ও ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ‘হাম দেখেঙ্গে’ স্লোগান দেওয়া মানুষ পর্যন্ত।
এটি আদর্শ জোট নয়, কিন্তু এমন জোট নির্বাচনে হার ঠেকাতে এবং বিজেপির সমর্থকদের একটি অংশকেও সঙ্গে নিতে সাহায্য করেছিল। ফলে বিজেপির মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, যা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস গত ১২ বছরে তৈরি করতে পারেনি।
কাশ্মীরেও একইভাবে জম্মু অঞ্চলে অসন্তোষ তৈরি করে বিজেপিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করা যেতে পারে। ন্যাশনাল কনফারেন্সকে জম্মুতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে। শুধু প্রান্তিক এলাকায় নয়, বরং ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী, বেকার তরুণ, বিজেপির অসন্তুষ্ট নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর সঙ্গে জোট গঠন করতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তরিত করার মাধ্যমেই এগোনো সম্ভব।
কাশ্মীরে এখন ভয়, সন্দেহ, হতাশা এবং কোথাও কোথাও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতা কাজ করছে। লেফটেন্যান্ট গভর্নর সিনহা অবশ্য কাশ্মীরকে ‘নতুন ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে’ দেখছেন- সড়ক, টানেল, ডিজিটাল অর্থনীতি ও স্টার্টআপ সংস্কৃতির মাধ্যমে। কিন্তু অনেকে মনে করেন, এর আড়ালে কাশ্মীরিদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও অতীতের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।
দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাজনৈতিক শক্তিই অজেয় নয়। আশা, ইচ্ছাশক্তি ও পারস্পরিক সংহতি ধরে রেখে হতাশাকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া সম্ভব। জম্মু-কাশ্মীরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অন্যথায় নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে প্রান্তিক অবস্থাকে স্বাভাবিক করে নেওয়ার পথই খোলা থাকবে- যা ডানপন্থী শক্তিগুলো স্পষ্টভাবে চায়।