ads

ভারতে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসকে ঘিরে কেন ‘ককরোচ’ আন্দোলন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভারতে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসকে ঘিরে কেন ‘ককরোচ’ আন্দোলন?
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকেরা। নয়াদিল্লি, ২০ জুলাই ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

ভারতের তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ’ আন্দোলনের হাজারো সমর্থক দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের প্রধান দাবি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদে এটিই সবচেয়ে বড় জনসম্মুখের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই আন্দোলনের কারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।

Advertisement

কেন ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি?

বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ভারতের মেডিকেল কলেজে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট) বাতিল করা।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর পরীক্ষাটি বাতিল করা হয়। গত ৩ মে অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় সারা দেশে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। পরে পরীক্ষা বাতিলের ঘটনায় অন্তত এক ডজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানা যায়।

পরবর্তীতে জুন মাসে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়।

নিট কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতে স্নাতক পর্যায়ে মেডিকেল শিক্ষায় ভর্তির একমাত্র পথ হলো নিট পরীক্ষা। প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী এতে অংশ নেয়, কিন্তু আসন রয়েছে দেড় লাখেরও কম। ফলে এটি ভারতের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষাগুলোর একটি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট দেশটির উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বৃহত্তর সমস্যাকেও সামনে এনেছে। সীমিতসংখ্যক আসনের কারণে লাখো শিক্ষার্থী মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। উচ্চ প্রতিযোগিতার এসব পরীক্ষার কারণে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয় এবং আর্থিক চাপেও পড়ে।

আগে কি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে?

ভারতে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নতুন ঘটনা নয়। ২০২৪ সালেও কয়েকটি স্থানে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। তবে সে সময় পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশটিতে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও অতীতে ফাঁস হয়েছে।

এবার কেন ভিন্ন?

এবারের প্রশ্নফাঁসের ঘটনা এমন সময়ে ঘটে, যখন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে নিজেদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ নামে পরিচয় দেওয়া একটি তরুণ আন্দোলনের জন্ম হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মে মাসের মাঝামাঝি গঠিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে কয়েক মিলিয়ন অনুসারী পাওয়া এ আন্দোলন ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণদের হতাশা ও ক্ষোভকে সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে উচ্চ যুব বেকারত্ব এবং বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা।

সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছেন, সরকার তরুণদের উদ্বেগ দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হবে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য সময় চান।

আন্দোলনকারীদের অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে—অনশনরত অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুকের মুক্তি এবং প্রশ্নফাঁস-পরবর্তী ঘটনায় আত্মহত্যাকারী প্রতিটি শিক্ষার্থীর পরিবারের জন্য এক কোটি রুপি (প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার আমেরিকান ডলার) ক্ষতিপূরণ।

এখন পরিস্থিতি কী?

সংসদ অভিমুখে মিছিলের সময় পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করার দুই দিন পরও হাজারো আন্দোলনকারী দিল্লির অবস্থানস্থলে ক্যাম্প করে রয়েছেন।

আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ অন্য বিরোধী দলও সংসদের ভেতরে ও বাইরে এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিষয়টি উত্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের মতে, ব্যাপক জনসমর্থন পাওয়া এই ইস্যুতে মোদি সরকারকে চাপে ফেলার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে এর প্রভাব বিবেচনায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তরুণদের মধ্যে চাকরির সংকট এবং ঘন ঘন প্রশ্নফাঁসের মতো ইস্যুতে জমে থাকা ক্ষোভের প্রতিফলন।

এ আন্দোলন বিরোধী দলগুলোকেও মোদি ও বিজেপির ওপর চাপ সৃষ্টি করার একটি বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। কারণ তরুণ ভোটাররা বিজেপির অন্যতম প্রধান সমর্থকগোষ্ঠী এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পরও দলটি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে জয় পেয়েছে।

আন্দোলনটি আরও গতি পায় সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সমর্থনে। তিনি ২৮ জুন অনশন শুরু করেন। গত শনিবার পুলিশ তাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে তার স্ত্রীর করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে মঙ্গলবার তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আবেদনে অভিযোগ করা হয়, তাকে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়েছিল।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টিএস লম্বার্ডের প্রধান ভারত অর্থনীতিবিদ শুমিতা দেবেশ্বর বলেন, “শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চলা এই আন্দোলন মোদি সরকারের জন্য আরও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে। কারণ এটি এমন এক ক্রমবর্ধমান তরুণ কর্মশক্তির ক্ষোভকে স্পর্শ করেছে, যারা চাকরি পেতে হিমশিম খাচ্ছে।”

সম্পর্কিত