ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট গণনার পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এগিয়ে গেছেন। তবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোয় আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার জন্য তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে জোট গঠনের পথ খুঁজতে হবে।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি এবং বুধবার প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোট গণনা শেষে ইসরায়েলের তিনটি প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমের পূর্বাভাসে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী, উগ্র ডানপন্থী ও অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলোর জোট পার্লামেন্টে ৫৩টি আসন পেতে পারে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এগিয়ে রয়েছে ৪৮টি আসন নিয়ে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
৬১টি আসন পেলে নেসেট বা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব। তবে দুই পক্ষের কেউই সেই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি। অন্যদিকে, ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো ১৯টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
নেতানিয়াহুর সাবেক উপদেষ্টা আভিভ বুশিনস্কি বলেন, “হয়তো কথাটি বলা বা বিষয়টি উপলব্ধি করা কঠিন, কিন্তু তিনিই বিজয়ী।” নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনকে তিনি ‘পুনরুত্থান’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
বুশিনস্কির মতে, এই নির্বাচনের পরিহাস হলো, যে নির্বাচনে নেতানিয়াহু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি, সেটিই হয়তো তার রাজনৈতিক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা এবং এর জেরে সৃষ্ট রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও নেতানিয়াহু অপ্রত্যাশিতভাবে ইসরায়েলের ইহুদি ভোটারদের বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন। ফলে তিনি এখন সবচেয়ে বড় সংসদীয় জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন।
আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিত্রিনোভিচের মতে, নেতানিয়াহুর সাফল্য জয়ী হওয়ার চেয়ে টিকে থাকার মধ্যেই বেশি।
নেতানিয়াহুর জোট আসন হারিয়েছে এবং এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পায়নি। তবে আইজেনকোটের শিবিরও আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়ার বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে পায়নি।
সিত্রিনোভিচ বলেন, “না হেরেই তিনি জিতেছেন। তিনি টিকে থাকতে পেরেছেন।”
লিকুদ পার্টির নেতা ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতীয় নির্বাচনের বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর জেরুজালেমে পার্টির নির্বাচনী সদর দপ্তরে বক্তব্য দেওয়ার সময় তার স্ত্রী সারা নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। ২৮ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
আরব ইসরায়েলিদের অগ্রগতি
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট কাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সুবিধা রয়েছে এবং জোট সরকার গঠনের সুযোগও খোলা আছে।
নির্বাচনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ইসরায়েলের আরব ভোটারদের কাছ থেকে। তাদের নজিরবিহীন ভোটার উপস্থিতির কারণে পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলো নির্ণায়ক প্রভাব অর্জন করতে পারে।
বংশপরিচয়ে ফিলিস্তিনি হলেও নাগরিকত্বে ইসরায়েলি—দেশটির মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ আরব ইসরায়েলি। এখন প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোটের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের অবস্থানে রয়েছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক শান্তি আলোচক ডেনিস রস বলেন, “আরবরা আগে কখনো এতটা ক্ষমতাধর অবস্থানে ছিল না।”
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পথ বিরোধীদের জন্য কঠিন। সরকার গঠনের জন্য আরব দলগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। তবে নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যানের মতো সম্ভাব্য ডানপন্থী অংশীদারদের পক্ষে এমন সমীকরণ মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামনে প্রধানত দুটি পথ খোলা রয়েছে—নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে বৃহত্তর ঐক্যের সরকার গঠন অথবা আরেকটি নির্বাচন।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর জেরুজালেমে নিজ দলের সদর দপ্তরে বক্তব্য দেওয়ার সময় সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নাড়ছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২৮ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
বুশিনস্কির মতে, জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি নেতানিয়াহুকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে এবং উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচকে পাশ কাটিয়ে চলতে চাপ দেন, তাহলে এ সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
বুশিনস্কি বলেন, ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থনকে বৃহত্তর জোট সরকার গঠনে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তা না হলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে এবং দেশটিকে আবারও নির্বাচনে যেতে হতে পারে। কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, নতুন নির্বাচন হলে ফলাফলে বড় পরিবর্তন না এসে বরং নেতানিয়াহুর অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সিত্রিনোভিচের মতে, এই অচলাবস্থায় আইজেনকোটের তুলনায় নেতানিয়াহুই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। অধিকাংশ দলের কাছে আরেকটি নির্বাচন আকর্ষণীয় বিকল্প না হওয়ায় তার ধারণা, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে একটি ঐক্যের সরকারই অচলাবস্থা কাটানোর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পথ। সেই সরকারে আইজেনকোট বা বেনেটও যোগ দিতে পারেন।
ক্ষমতার লড়াইয়ে ইরান বড় ফ্যাক্টর
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে ইসরায়েল গাজায় হামাস এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ হামলাও চালিয়েছে দেশটি।
নির্বাচনের পর উল্লসিত সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু একটি ‘শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার’ গঠনের আহ্বান জানান। ইসরায়েলের সামরিক সাফল্যকে তিনি ইরানের হুমকি চিরতরে নির্মূল করার ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেন।
নেতানিয়াহু বলেন, “আমাদের অংশীদার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরানের অস্তিত্বগত হুমকি চিরতরে দূর করার এক অনন্য ঐতিহাসিক সুযোগ ইসরায়েলের সামনে এসেছে। তবে কোনো গোপন উদ্দেশ্য যেন এই পবিত্র লক্ষ্য থেকে আমাদের বিচ্যুত করতে না পারে।”
ট্রাম্প এর আগে ইসরায়েলিদের প্রতি নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যাতে দুই নেতা মিলে ইরানে তাদের অভিযান ‘শেষ করতে’ পারেন। নির্বাচনের পর ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহু ‘খুব ভালো’ করেছেন। নিজের সমর্থনও তার সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, “এটি হয়তো জয়, নয়তো সমতা। এ ক্ষেত্রে সমতাকেও জয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ এটি একটি বড় দাবার খেলা।”
তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে নেতানিয়াহু আবারও ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংকট—বিশেষ করে ইরানকে—রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন কি না।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও লিকুদ পার্টির নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
তেহরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে জাতীয় ঐক্যের পক্ষে নেতানিয়াহুর আহ্বান আরও জোরালো হতে পারে। তবে সংঘাত কতটা বাড়বে, তা অনেকাংশে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট গাজা যুদ্ধে নিজের এক ছেলে ও দুই ভাতিজাকে হারিয়েছেন। তিনি নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর গণরায় হিসেবে নির্বাচনকে তুলে ধরে ক্ষমতার বৈধতা দাবি করার চেষ্টা করেছেন।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান ও সরকারি কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় আইজেনকোট বলেন, নেতানিয়াহু এখন এমন একটি অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার ওপর জনগণের আস্থা হারিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আপনাদের চ্যালেঞ্জ করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ় ও অবিচল থাকুন।”
দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির বিচার, হামাসের হামলা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের বিরোধিতা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি এবং অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক সেবার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্নে তীব্র বিরোধ—এসব চাপ নিয়েই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন নেতানিয়াহু।