যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক শুধু একটি কূটনৈতিক সফরের স্থান নির্বাচন নিয়ে নয়; এর গভীরে রয়েছে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েন, বাণিজ্য নিয়ে মতবিরোধ, রাশিয়ার জ্বালানি তেল কেনা এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা। আজ রোববার আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রুবিও তার দ্বিতীয় ভারত সফরে রাজধানী নয়াদিল্লিতে না গিয়ে মুম্বাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর তিনি গুজরাটের জামনগরে একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শন করবেন।
সফরের এই সূচি এবং জয়শঙ্করকে মুম্বাইয়ে গিয়ে রুবিওর সঙ্গে দেখা করার বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতারা ঘটনাটিকে ভারতের কূটনৈতিক মর্যাদার জন্য বিব্রতকর বলে বর্ণনা করেছেন। তবে এই বিতর্কের তাৎপর্য বুঝতে হলে সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করতে হবে।
রুবিওর ভারত সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, তিনি নয়াদিল্লি এড়িয়ে মুম্বাইয়ে জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতি অনুযায়ী, সফরে বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগ এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা হবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও জানিয়েছেন, আলোচনায় জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তির বিষয়গুলো স্থান পাবে। ফলে সফরের আলোচ্যসূচি দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করছে। কিন্তু কূটনীতিতে আলোচনার বিষয়বস্তুর পাশাপাশি সফরের স্থান, কর্মসূচি এবং আনুষ্ঠানিক আয়োজনও রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে যখন দুটি দেশের সম্পর্কে আগে থেকেই চাপ রয়েছে, তখন একটি সফরের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা বেড়ে যায়।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুবিও কেন নয়াদিল্লি যাচ্ছেন না, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে সফরের স্থান নির্বাচনের পেছনে রাজনৈতিক অসন্তোষ রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্যও প্রকাশিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সফরটিকে জ্বালানি ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক হিসেবে তুলে ধরেছে। মুম্বাই ভারতের আর্থিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র, আর গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের তেল শোধনাগার বিশ্বে একক স্থানে অবস্থিত বৃহত্তম শোধনাগার হিসেবে পরিচিত। এই দুই স্থানকে কেন্দ্র করে সফরের কর্মসূচি নির্ধারণের পেছনে অর্থনৈতিক ও জ্বালানিসংক্রান্ত যুক্তি থাকতে পারে। তা সত্ত্বেও নয়াদিল্লিকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি ভারতের রাজনৈতিক মহলে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, তা দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান সংবেদনশীলতাকেই প্রকাশ করে।
বিতর্কের সূত্রপাত আরও স্পষ্ট হয় ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের বক্তব্যের পর। নয়াদিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে বৃহস্পতিবার গোর বলেন, রুবিও মুম্বাইয়ে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং ওয়াশিংটন আশা করছে, জয়শঙ্করসহ নয়াদিল্লির অন্য কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এই বক্তব্যের আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জয়সওয়াল রুবিওর সফর সম্পর্কে বিস্তারিত নিশ্চিত করেননি।
তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, যথাসময়ে সরকার সফর সম্পর্কে ঘোষণা দেবে। ফলে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই সফরের আয়োজন সম্পর্কে প্রত্যাশা প্রকাশ করে এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে মন্তব্য করেন। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, রুবিও যেন তার কর্মচারীকে মুম্বাইয়ে তলব করেছেন। কংগ্রেসের সংসদ সদস্য পবন খেরা আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ভারতের ভূখণ্ডে একটি বিদেশি সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তলব করা নরেন্দ্র মোদি সরকারের মানদণ্ডেও নতুন এক নিম্নস্তর। এসব মন্তব্য বিরোধী দলের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, জয়শঙ্করের মুম্বাইয়ে যাওয়া কি বাস্তবেই ভারতের কূটনৈতিক মর্যাদার অবনমন, নাকি সফরের আয়োজন নিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্ককে বিরোধীরা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ হিসেবে দেখছেন?
কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো মন্ত্রীর অন্য শহরে গিয়ে বৈঠক করা নিজে থেকেই অসম্মানজনক নয়। রাষ্ট্রীয় সফরের কর্মসূচি নির্ধারণে নিরাপত্তা, সময়, আলোচনার বিষয় এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের মতো বিষয় বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ‘প্রত্যাশা’ প্রকাশের ধরন এবং ভারতের সরকারের আগাম ব্যাখ্যার অনুপস্থিতি বিতর্ককে তীব্র করেছে। ভারতের মতো একটি বড় আঞ্চলিক শক্তির জন্য কূটনৈতিক সমমর্যাদা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভাবমূর্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি সরকার যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতকে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়, তখন বিদেশি প্রতিনিধির বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
তবে রুবিওর সফরকে শুধু প্রটোকল বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃত সমস্যা আড়ালে থেকে যাবে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা। ২০২৫ সালের আগস্টে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অধিকাংশ পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে একটি কাঠামোগত সমঝোতা হয়, যার আওতায় শুল্কের হার ১৮ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু এরপর বাণিজ্য আলোচনা আবার স্থবির হয়ে পড়ে। অর্থাৎ শুল্ক কমানোর উদ্যোগ সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক মতপার্থক্য পুরোপুরি দূর হয়নি।
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন চলতি মাসে আলোচনার অগ্রগতিকে প্রায় স্থবির বলে বর্ণনা করেছেন বলে জানিয়েছে দ্য হিন্দু। অন্যদিকে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেছেন, সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তির প্রথম পর্যায়ের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে ভারত এমন কোনো চুক্তি করতে চায় না, যাতে বাংলাদেশের, ভিয়েতনামের ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশের তুলনায় ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা অসুবিধায় পড়েন। রয়টার্সের বরাত দিয়ে আল জাজিরা এই অবস্থানের কথা জানিয়েছে। এতে বোঝা যায়, দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা থাকলেও ভারত নিজের রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য নয়াদিল্লি এমন কোনো চুক্তিতে যেতে প্রস্তুত নয়, যা তার বাণিজ্যিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
এই বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাশিয়ার জ্বালানি তেল। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রুশ তেল আমদানিকারক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই আমদানি দীর্ঘদিন ধরে একটি সংবেদনশীল বিষয় হয়ে রয়েছে। ওয়াশিংটন রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চায়, আর নয়াদিল্লি নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিতে চায়। ভারত যদি রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলক সুবিধাজনক শর্তে তেল কিনতে পারে, তাহলে তা তার জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে রুশ তেল কেনা মস্কোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে জ্বালানি বাণিজ্য এখানে নিছক বাণিজ্যিক লেনদেন নয়; এটি ভূরাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত স্বাধীনতার সঙ্গেও যুক্ত।
গ্রিসের এথেন্সের কাছে এলেফথেরিওস ভেনিজেলোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে ওঠার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি: রয়টার্স
গত মাসে ট্রাম্প ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’-এ স্বাক্ষর করেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আইনের আওতায় রাশিয়া বা ইরানের তেল-গ্যাসের পাঁচ বৃহত্তম আমদানিকারক দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এমন পদক্ষেপ ভারতের জন্য বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারত। কারণ, ভারতের রপ্তানিপণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভারত আগেই ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছিল, নতুন শুল্ক দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে। তবে ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ট্রাম্প শুক্রবার একটি নির্বাহী আদেশে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা থেকে শুল্ক ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের প্রভাবও স্পষ্ট হয়।
রুবিওর জামনগর সফর এই জ্বালানি কূটনীতির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। সেখানে তিনি মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ পরিচালিত তেল শোধনাগার পরিদর্শন করবেন এবং আম্বানি পরিবারের আয়োজিত একটি সংবর্ধনায় অংশ নেবেন বলে দ্য হিন্দু জানিয়েছে। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আল জাজিরা বলেছে, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা হলো রিলায়েন্স; যুক্তরাষ্ট্রের পরেই প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান। এমন এক সময়ে এই সফর হচ্ছে, যখন ওয়াশিংটন ভারতকে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার বিষয়ে উৎসাহিত করছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর দেশটির তেলশিল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কার্যত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির উদ্যোগ নেয়। এই প্রেক্ষাপটে রিলায়েন্সের মতো একটি বৃহৎ ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিসংক্রান্ত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জামনগরের শোধনাগার তাই কেবল শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের স্থান নয়; এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার সঙ্গেও যুক্ত।
রিলায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি নতুন তেল শোধনাগারেও বিনিয়োগ করছে, যা প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত প্রথম নতুন শোধনাগার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্চে ট্রাম্প এই বিনিয়োগকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন বলে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে। ফলে রুবিওর জামনগর সফরের পেছনে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বাণিজ্যিক ও জ্বালানিসংক্রান্ত বাস্তবতা থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এই সফরকে শুধু নয়াদিল্লি এড়িয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবে দেখলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকটি উপেক্ষিত হবে।
এদিকে দুই দেশের সম্পর্কে চাপ শুধু শুল্ক বা রুশ তেল কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গত সপ্তাহে মার্কিন শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারলিং ঘোষণা করেন, তার বিভাগ আটটি কোম্পানিকে শ্রম-সনদসংক্রান্ত একটি কর্মসূচি থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানি ইনফোসিস, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, উইপ্রো ও এইচসিএল রয়েছে। বিদেশি কর্মীদের জন্য গ্রিন কার্ড পেতে নিয়োগদাতাদের যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, এই কর্মসূচি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ফলে মার্কিন সিদ্ধান্তটি ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক যখন নতুন সমঝোতার অপেক্ষায় রয়েছে, তখন শ্রম ও অভিবাসনসংক্রান্ত এমন পদক্ষেপও পারস্পরিক আস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক সমীর লালওয়ানি চলতি সপ্তাহে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ভারতের জনমত রেকর্ড পরিমাণ নেতিবাচক হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে তার বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এই মনোভাবের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, এসব পরিস্থিতি ভারতকে আবার রাশিয়ার তেলের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করেছে। ভারতের কৌশলগত হিসাবের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নয়াদিল্লি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতে চায়, অন্যদিকে নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতাও বজায় রাখতে চায়।
তবে লালওয়ানি মনে করেন, রাজনৈতিক সম্পর্কের ভাবমূর্তি খারাপ হলেও প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নীরবে গভীর হয়েছে। একই সময়ে ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই তথ্য দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তুলে ধরে। জনমত ও রাজনৈতিক বক্তব্যে অবিশ্বাস বাড়তে পারে, অথচ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা অব্যাহত থাকতে পারে। লালওয়ানির মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাজনৈতিক সম্পর্ক সম্পর্কে ধারণার অবনতি দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তির অবনতির চেয়ে দ্রুত ঘটেছে। অর্থাৎ বর্তমান বিরোধকে দুই দেশের সম্পর্কের সম্পূর্ণ ভাঙন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাস্তব সহযোগিতা পাশাপাশি চলার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এই দ্বৈত বাস্তবতা রুবিওর সফরের তাৎপর্য বুঝতে সাহায্য করে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে চাপ ভারতের কাছে ওয়াশিংটনের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান ও ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিও ভারতের রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে পারস্পরিক স্বার্থের কারণে সহযোগিতা প্রয়োজন, কিন্তু নীতিগত মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস সেই সহযোগিতাকে জটিল করে তুলছে।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষা করা। ভারত একদিকে মার্কিন বাজারে রপ্তানি বাড়াতে চায়, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বজায় রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তা এবং উন্নয়ননীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওয়াশিংটন যদি বাণিজ্যিক সুবিধাকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে নয়াদিল্লির সামনে কঠিন সিদ্ধান্তের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ভারতকে শুধু চাপ দিয়ে নিজের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসা সহজ হবে না। ভারতের বিশাল বাজার, অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে তাকে নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখার সুযোগ দেয়।
রুবিওর সফরকে ঘিরে ভারতের বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়াও এই পরিস্থিতির একটি রাজনৈতিক মাত্রা তুলে ধরে। রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের অন্য নেতারা সফরের আয়োজনকে মোদি সরকারের কূটনৈতিক দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাদের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য হলো, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিদেশি কর্মকর্তার প্রত্যাশা অনুযায়ী অন্য শহরে গিয়ে দেখা করতে হওয়াকে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত করা। কিন্তু সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু সফরের স্থান যথেষ্ট নয়। আলোচনায় ভারত কী অর্জন করছে, বাণিজ্য চুক্তির শর্ত কতটা অনুকূল হচ্ছে, জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা বজায় থাকছে এবং প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কীভাবে এগোচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বোপরি, আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা হলো ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক একদিকে গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, অন্যদিকে শুল্ক, রাশিয়ার তেল, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং কূটনৈতিক আচরণ নিয়ে নতুন চাপের মুখে পড়েছে। রুবিওর নয়াদিল্লি সফর না করার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নেই।
তাই এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি অসম্মান হিসেবে চিহ্নিত করা তথ্যের সীমা অতিক্রম করবে। তবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য এবং ভারতের বিরোধী নেতাদের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতীকী বিষয়গুলোও এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসছে।
ফিলিপাইনের মেট্রো ম্যানিলার পাসাইয়ে আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি: রয়টার্স
শেষ পর্যন্ত এই সফরের প্রকৃত গুরুত্ব নির্ধারিত হবে আলোচনার ফলাফল দিয়ে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র যদি বাণিজ্য চুক্তিতে অগ্রগতি অর্জন করতে পারে, জ্বালানি সহযোগিতার বাস্তব ক্ষেত্র বাড়াতে পারে এবং রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে বিরোধ সামাল দিতে পারে, তাহলে বর্তমান রাজনৈতিক অস্বস্তি সত্ত্বেও সম্পর্কের ভিত্তি শক্তিশালী থাকতে পারে। বিপরীতে শুল্কের হুমকি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং কূটনৈতিক মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক যদি বাড়তে থাকে, তাহলে দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতাও চাপের মুখে পড়তে পারে। রুবিওর মুম্বাই সফর তাই শুধু একটি শহরে বৈঠক করার ঘটনা নয়; এটি এমন এক সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি, যেখানে সহযোগিতার প্রয়োজন প্রবল, কিন্তু সেই সহযোগিতার শর্ত ও সীমা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।